জ্বলদর্চি

অযাচিত/পুলককান্তি কর

অযাচিত

পুলককান্তি কর


অনেকক্ষণ ধরেই টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। জানলা খুলে কয়েক দফা রাস্তার দিকে উঁকি দিল রুচি। আবিরের আসার কথা বারোটায়। প্রায় দেড়টা বাজতে গেল, দেখাও নেই, ফোনও নেই। নিজে থেকে দু-একবার ফোন করতে গিয়েও নিরস্ত করেছে সে নিজেকে। থাক, হ্যাংলা ভাবতে পারে আবীর। ওর মুখে কথা আটকায় না। এসেই হয়তো বলবে, ‘এতদিন তো সমানে বাধা দিতে, এবার আর তর সইছে না বুঝি?’ বা বলবে, ‘তোমারও এসব ইচ্ছে হয়? সব কথার প্রতি সবসময় সমান সহ্যশক্তি নাও থাকতে পারে। আজ প্রথমবার যখন, মাথায় বিরক্তি না থাকাই ভালো। অথচ আবিরের স্বভাবই এমন, মাথাটা গরম হয়েই যায়। ও আসবে বলে রুচি সাতসকালে রান্না সেরে স্নান সেরে নিয়েছে। আবিরের কিনে দেওয়া ফরাসী পারফিউম মেখেছে সারা গায়, হাত-পা চোখের ভ্রূ পরিষ্কার করিয়েছে যত্ন করে, আজ পরস্পরকে আবিষ্কার করা দিন। অথচ আবিরই...

    অপেক্ষা করতে করতে ফিস ফ্রাইটা বানিয়ে নেওয়াই মনস্থ করল সে। ভেবেছিল খাওয়ার সময় গরম গরম তৈরী করবে, কিন্তু আবির এসেই হুড়োতাড়া করবে, হয়তো অন্য সব কিছুর চাপে বানানোই হবে না আজ! নির্ঘাত রবিবার, বন্ধুদের ঠেকে গিয়ে জুটেছে। আজ ছ’ বছরের সম্পর্ক ওর আবিরের সাথে। আবির একটা বড় কোম্পানীতে চাকরি করে,  ইঞ্জিনিয়ার। বিয়েও প্রায় ঠিক। দিন দেখাই বাকী কেবল। রুচি পেয়িং গেস্ট থাকার সময় থেকেই আবির বায়না ধরতো মাঝে মাঝে এক আধবার হোটেল টোটেলে যাবার – কলকাতায় নাকি এমন নিভৃতি টাকা দিয়ে কেনা যায়; রুচি রাজী হয়নি কোনওদিন। মাস তিনেক আগে সে যখন নিজের জন্য আলাদা ফ্ল্যাট ভাড়া করলো, আবীরের বায়না যেন বেড়েই চলল প্রতিদিন। কতদিন আর ঠেকানো যায়! বিশেষ করে বিয়ে যখন ঠিক! দূরের গাছটায় বৃষ্টি ভেজা কাক ক্রমাগত ডানা ঝাপটাচ্ছে। অন্ধকার চারদিকে, কেমন যেন একটা মনখারাপের আবহ চারপাশে। রুচির ঘরে সবসময় হাল্কা সুরে কোনও না কোনও মিউজিক চালানো থাকে। ইমনই চালিয়েছিল রুচি, যদিও পরিবেশের সাথে খাপ খাচ্ছিল না মোটে, এখন গিয়ে শব্দটা বন্ধ করে দিল সে।

🍂

 বেশ কিছুক্ষণ পরে কলিংবেলের শব্দ শুনে রুচি দেখল, সামনে আবীর। ঘরে ঢুকেই রুচিকে জাপটে জড়িয়ে ধরল সে, ‘রাগ করেছো সোনা? জানো তো প্রতীক্ষায় ভালোবাসা বাড়ে।’ রুচি নিজেকে সজোরে আলিঙ্গন থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘বন্ধুদের থেকে টিপস নিয়ে এলে বুঝি!’

 কোনও কথা না বলে আবীর হাসল, দেখেই একেবারে যেন পিত্তিটা জ্বলে গেল রুচির। বলল, দু পেগ গিলেও এসেছ মনে হচ্ছে? লবঙ্গ চিবোলে কি গন্ধ যায়?

–  তুমি তো এসব নিয়ে কোনওদিন বায়াস ছিলে না সোনা। আজ এত খিটখিট করছো কেন? আমি তো আগেও দু-একবার খেয়েছি! 

– আজ খাওয়ার কী দরকার ছিল?

 দিব্যেন্দু বলল, ‘অল্পমাত্রায় ওয়াইন খেলে নাকি রোমান্সটা খুব এক্সোটিক হয়!’

– ছিঃ ছিঃ, তুমি কি আসার আগে রাষ্ট্র করে এসেছ সবকিছু? 

– আরে না না। তাড়া দেখে সবাই জিজ্ঞাসা করলো কোথায় যাব? বললাম; লোকে কি আর বোঝে না? আমি নিজের মুখে কিছু বলিনি। 

– এখানে আসবে এটাই বা ঢাক পেটানোর কী ছিল? তুমি কি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির?

– ওঃ মা! বন্ধুদের মিছিমিছি মিথ্যে বলতে যাবো কেন!

– নিজের দাম্পত্যটাও কি আড্ডার বিষয়? 

– ছাড়ো তো সোনাই। বলেই আবীর আবার এসে জাপটে ধরল রুচিকে। আবীর এমনই। জোর করেই নিজের মতে ভাসিয়ে দিতে চায় সে রুচিকে। রুচি নিজেও ভেসে যেতে চায়। ও চায় আবীরের রঙেই নিজেকে রাঙাতে। অথচ কোথাও তার মনস্খলন হচ্ছে প্রতিদিন। প্রায় পাঁচ-ছ’মাস সে যেন মোহাবিষ্টের মতো অযাচকের কেবিনে অকারণ যেতে চাইছে, না চাইতেই তার কথা ভাবছে। ভদ্রলোক যে সরাসরি তাকে ডাকছেন বা তার প্রতি দুর্বলতার কোনও কথা বলছেন এমন নয় – অথচ তার মনে হয়, উনি যেন একটা লাটাই ধরে ক্রমাগত সুতো টানছেন আর ও সেই টানে বারবার তাঁর সামনে গিয়ে পড়ছে। আজ সকালে এমন মেঘ বদলের দিনে আবীরের বদলে ওর অযাচকের কথাই বারবার মনে পড়ছে; সে সত্যি চায় এমনটা না হোক! 

আবীর বললো ‘চলো সোনাই।’ 

রুচিও আবীরের অলিঙ্গনে নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে চেয়ে বলল, ‘কোথায়?’

–  স্বপ্নের দেশে!

–  আগে খেয়ে নাও। ঠান্ডা হয়ে যাবে সব।

– না... সোনাই... তোমার তাপে... 

ভালো লাগছে না। কিছু ভালো লাগছে না রুচির। কিছুতে তার মন স্হির থাকতে চাইছে না আবীরের আকাশে। তার মন বারবার অন্য কিছু ভাবছে, অন্য কিছু চাইছে, বড় কষ্ট হচ্ছে তার। সে প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল আবিরকে... ছাড়ো...।

 – কী হচ্ছে সোনাই... আর একটুখানি, জোর করতে লাগল আবির। 

– আমার কষ্ট হচ্ছে আবীর। সিরিয়াসলি আমার ভালো লাগছে না, ছাড়ো। 

রুচির গলার স্বরে কিছু একটা ছিল, উঠে বসলো আবীর। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘এটা একটা স্বাভাবিক বিষয় রুচি, এটা নিয়ে এত রিজিড হলে তো চলবে না।’ 

– আমাকে একটু সময় দাও আবীর। আমার সত্যি কষ্ট হচ্ছে। কোনও কিছুই যেন জমলো না। খাওয়া হল, যাওয়ার সময় আলিঙ্গন হল, বাইরে বেরিয়ে শপিংমলে কেনাকাটাও হল, কিন্তু কোনও কিছুতেই যেন সুর মিললো না দুজনের। যাবার সময় আবীর বলল, ‘আগামী রবিবার কি আসবো? প্রমিস করছি, মদ খেয়ে আসবো না। টাইমে আসবো। রুচি একটু হেসে বলল, ‘ঠিক আছে, এত তাড়ার তো কিছু নেই, জানাবো।’ 

সন্ধে হয়ে এসেছে। অযাচক তাঁর কেবিনে বসে আছেন। এই অফিসের বড় একটা পোস্টে আছেন তিনি। বয়স বিয়াল্লিশ তেতাল্লিশ। গাম্ভীর্যের মধ্যে একটা সমাহিত ভাব আছে তাঁর। রুচিকে চুপচাপ সামনে বসে থাকতে দেখে অযাচক বললেন, ‘বাড়ী যাওনি?’ 

– না স্যার। 

– কেন, কাজ বাকী আছে কিছু? বাকীরা তো এতক্ষণে ফাঁকা হয়ে গেছে। 

– মোটামুটি হয়ে গেছে স্যার। যাবো এবার। 

– তোমাকে এতটা এলোমেলো লাগছে কেন রুচি? তুমি কি কোনও কারনে ডিস্টার্বড হয়ে আছো? 

রুচি চুপ করে বসে রইলো। উত্তর করলো না। অযাচক বললেন, ‘কী ব্যাপার রুচি। সিরিয়াস মনে হচ্ছে। নির্দ্বিধায় বলো আমাকে, এখানে কাজে কোনও সমস্যা হচ্ছে?’ 

– না স্যার। ব্যক্তিগত। 

– তোমার ব্যক্তিগত কথা আমার সাথে শেয়ার করতে চাও? বেশ তো। আমি শুনলে তোমার যদি কোনও সুরাহা হয়, নিশ্চই শুনবো। 

– না স্যার, আপনি বিষয়টায় জড়িত যখন আপনাকেই শোনাতে হবে। বলতে আমার অস্বস্তি হচ্ছে, কিন্তু না বলেও উপায় নেই। 

– বেশ তো, বলে ফেলো। 

একটুক্ষণ চুপ থেকে রুচি বলল, ‘স্যার আপনি কি আমায় ভালোবাসেন?’ 

কিছুটা বিষ্মিত হয়ে অযাচক বললেন, ‘হ্যাঁ, বাসি।’ 

– আমাকে বিয়ে করবেন? 

– কী আবোল তাবোল বকছো রুচি। তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? তোমাকে তো এইভাবে আগে কখনও দেখিনি? কী হয়েছে তোমার? 

– আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে স্যার। 

অযাচক উঠে এসে রুচির মাথায় হাত রাখতেই ওর পেটের উপরে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলল রুচি। ওর মতো শক্ত মনের মেয়েকে এ অবস্থায় দেখতে একেবারেই অভ্যস্ত নন অযাচক। তিনি ওর মাথায় আস্তে আস্তে হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, ‘চুপ করো রুচি, শান্ত হও। কি হয়েছে, বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া? 

– না স্যার। 

– তবে? আমি যদ্দুর জানি তোমার স্টেডি বয়ফ্রেন্ড আছে, বিয়ের কথাবার্তাও চলছে শুনেছি... 

– কার থেকে শুনেছেন স্যার... আমি তো বলিনি কখনও। আপনি কি গোপনে আমার পেছনে গোয়েন্দা লাগিয়েছেন? 

মুচকি হাসলেন অযাচক। ‘আমি লাগাইনি।’ 

– তবে? 

অযাচক ওই দিকে পা মাড়ালেন না। বললেন, ‘তোমার মাথায় তবে এরকম অসম্ভব খেয়াল চাপলো কেন রুচি?’ 

– অসম্ভব কেন? আপনি তো ব্যাচেলার। আর লোকে আমাকে তো দেখতে শুনতে ভালোই বলে। 

– তাতেই কি বিয়ে করা যায় রুচি? 

– নিশ্চই যায় না। কিন্তু আপনি নিজেই তো বললেন আমায় ভালোবাসেন। আর বাসেন বলেই আমি রোজ সম্মোহিতের মতো আপনার সামনে বারবার এসে পড়ছি, আপনি আমার আসায় বিরক্ত হন না, বরং বেশ বুঝি আপনার মনে কোথাও ভালো লাগা কাজ করে... 

– তাতে কি আর বিয়ের সম্বন্ধে যাওয়া যায় রুচি? 

– অসম্ভবই বা কেন? 

– তুমিই বা আমার সাথে সম্বন্ধে উদ্গ্রীব হয়ে উঠলে কেন? বয়ফ্রেন্ডকে দেখাতে চাও কিছু? 

– না স্যার, আমি কাউকে কিছু দেখাতে চাই না। আমি শুধু মনটাকে স্থির করতে চাই, নিজের প্রকৃত চাহিদাটা খুঁজে পেতে চাই। 

– তোমার স্হায়ী সম্পর্কে মন দাও রুচি। তাতেই নিজেকে দেখতে পাবে। 

– আপনি কি আমায় হ্যাংলা ভাবছেন স্যার? বিশ্বাস করুন গত ছ’মাস আমি নিজেকে নানাভাবে আপনার থেকে সরিয়ে নিতে চেয়েছি, আবীরের সাথে মুভি দেখে, মলে ঘুরে নিজেকে অন্যমনস্ক করতে চেয়েছি, কিন্তু কেন জানিনা মনে হয় সবসময় আপনি আমায় লাটাইয়ের সূতো দিয়ে টেনে রেখেছেন। আপনি কি আমায় হিপনোটাইজ করেছেন স্যার? 

– তুমি বাড়ী যাও আজ রুচি। তোমার মন ঠিক নেই। অকারণ আমায় স্বপ্ন দেখিও না। কাল তোমার নিজেরই আফশোস হবে। 

– আমি সবকিছু ভেবেচিন্তেই বলেছি স্যার। কোনও স্বপ্ন নয়, আপনি যদি মনস্থির করেন, আমি সামনের দিনেই রাজী আছি। 

– তা হয় না রুচি। আমি তোমাকে পছন্দ করি, তুমি যথেষ্ট আমার মনকে বিচলিত করেছ – সবই সত্যি। কিন্তু সমস্যা অনেক। বয়সের পার্থক্য আছে, আরো অনেক ইস্যু আছে। তুমি বাড়ী যাও। ভালো করে চিন্তা ভাবনা করো। 

– আমার ভাবনার কিছু নেই স্যার। 

– তোমার বয়ফ্রেন্ডকে কী ভাবে ম্যানেজ করবে? 

– সারা জীবন আফসোস করার চেয়ে একদিন সামনাসামনি তিক্ততা ভালো। হয়তো ও কষ্ট পাবে, কিন্তু মিথ্যে অভিনয়ে ওকে না ভুলিয়ে স্পষ্ট বলে দেওয়াই ভালো। 

অযাচক বললেন, ‘ঠিক আছে, এক্ষুনি অফিসে কাউকে কিছু বলো না।’ 

– আপনি তো কাল ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছেন। ফিরবেন কবে স্যার? 

– চারদিন পরে। 

– নেক্সট মানডে দেখা হবে তো স্যার? 

– হুঁ।

– আমি কি ফোন করব? নাকি আপনি ট্যুরে বিজি থাকবেন? 

– আমি তোমায় কল করে নেব। 

সোমবার সকাল সকাল বেশ সাজগোজ করে এসেছে রুচি। অযাচকের মাপ মতো একটা সাদা পাঞ্জাবী কিনে গত চারদিন এক মনে ফেব্রিকের কাজ করেছে সে নিজে। একটু অভিমানও হয়েছে যদিও, গত চারদিন অযাচক একবারের জন্যও ওকে ফোন করেননি। গতকাল রাতে একবার ফোন করেছিল রুচি, সুইচড অফ এসেছে। হয়তো প্লেনে ছিলেন সে সময়। রুচি বোঝে হেড অফিসে কাজের প্রচুর চাপ থাকে, কথা বলার ফুরসৎ হয় না, তবু...। আবীর গতকালও অনেকবার ফোন করেছিল, একবার সামনাসামনি এসে কথা বলতে চায়। কী এমন ঘটে গেল... এত দিনের সম্পর্ক...। এসব নিয়ে বেশী ভাবতে চায়না রুচি। ও নিজেরই খারাপ লাগা যথেষ্ট আছে এই নিয়ে। কোথাও একটা কমিটমেন্ট মনে মনে হলেও তো ছিল। রুচি নিজের মনে অনেক ভেবেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে সে নিজের মুখ ফুটে এতকথা অযাচককে বললো কী ভাবে, এই ভেবেই সে অবাক হয়ে যাচ্ছে এই ক’দিন। কী যে এমন একটা আগ্রাসী জাদু আছে ভদ্রলোকের, সে কিছুতেই সেই টান অস্বীকার করতে পারছে না। এটা কি নিছক দেহের টান? ব্যক্তিত্বের মাধুর্য্য? নাকি অন্য কিছু? সে শুধু ভেবেছে, যে আকর্ষণ এত বছরের সম্পর্ককে একেবারে ধূলিস্যাৎ করে ঢেকে দেয়, সেটা নিছক চোখের দেখা প্রেম নয়। এর মধ্যে গভীর কিছু আছে। 

ঠিক দশটায় একটা ফুলের তোড়া ব্যাগের মধ্যে লুকিয়ে অযাচকের ঘরে হাজির হল রুচি। উনি এখনও আসেন নি। মিটিং আছে বোধহয়। হেড অফিস থেকে ফিরলে বড় সাহেব প্রথম এক দু ঘন্টা ওঁকে নিজের চেম্বারে ডেকে নেন। তবে রুচিকে নিজের আবেগ সামলে চলতে হবে বাকী জীবন। ভদ্রলোক নিশ্চই খুব রসিক নন, নয়তো এসে একবার ওর সারপ্রাইজ গিফট গুলো অন্তত এনজয় করে যেতেন। খানিকক্ষণ গুনগুন করে রুচি নিজের চেয়ারে ফিরে এল। একটু বাদে এল সায়ন্তন, ওদের সেকশন অফিসার। বলল, কী মিস ব্যানার্জী, সেজেগুজে এসেছেন, কোথাও যাবেন না কি? 

– না, না। যাবো আর কোথায়? 

– আপনি তো রিজার্ভড থাকেন খুব, তাই বলতে সাহস পাইনা, আজ আপনাকে দেখে যে কোনও পুরুষ মানুষ দুর্বল হয়ে যাবে। 

রুচি স্মিত হেসে বলল, ‘তাই বুঝি, থ্যাংকস ফর ইয়োর কমপ্লিমেন্ট। তবে আপনি আবার দুর্বল হয়ে পড়বেন না। বিবাহিত পুরুষ দুর্বল হলে সংসারে অশান্তি লাগে।

– ঠিক কথা বলেছেন মিস ব্যানার্জী। মানুষ জীবনে বিয়ের ভুলটা যে কেন করে? এ্কবার ফুল মার্কস পেতে গিয়ে জীবনের বাকী সব পরীক্ষাই অধরা থেকে যায়। নিজের রসিকতায় হাসতে লাগল সায়ন্তন। 

– বাই দা বাই, মি. দত্তগুপ্ত কি মিটিং এ গেছেন? 

– ওঃহো, আপনি খবরটা জানেন না বুঝি? অযাচকবাবু গত শনিবার অফিসে রেজিগনেশন লেটার পাঠিয়েছেন। 

বুকের মধ্যে ধক করে উঠল রুচির। ওর মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ও কোনও রকমে কথা শেষ করে ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিল। কী এমন হয়ে গেল অযাচকের? কাপুরুষ! একবার ফোনও কি করতে পারতো না ওকে? দ্রুত হাতে বেশ কয়েকবার অযাচকের নাম্বারটা ডায়াল করল রুচি। সুইচড অফ। ওর ভীষণ কান্না পাচ্ছে। ভীষণ রাগ হচ্ছে নিজের উপর – নিজের হ্যাংলামির জন্য, নিজের প্রগলভতার জন্য। লোকটার মুখোমুখি একবার হতেই হবে – কেন সে মিছিমিছি আশা দিল। না কি এটা ভগবানের পরিহাস? আবীরকে ছাড়ার পাপ? অফিস থেকে অযাচকের ঠিকানা নিয়ে একটু তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেল সে। ওখানে পৌঁছেও দেখল সে নেই। ভাড়ার ফ্ল্যাট। আজ সকালেই নাকি মালপত্র নিয়ে কোথাও চলে গেছে সে, নতুন ঠিকানা কেউ জানে না। 

এসব কথা কাউকে বলার নয়। এসব দুঃখ ভাগ দেওয়ারও নয়। কাছের বন্ধু যারা আছে, তাদের দু’একজন আবীরের ঘটনায় ওর পক্ষ কেউ নেয় নি। রাত্রে চুপচাপ নিজের বালিশ ভেজানো ছাড়া কিছু করার নেই। সারারাত ওর ঘুম এলো না। দু একবার ফোন করার চেষ্টা করল – এসব নপুংসক ফোন ধরে না। পুরুষ জাতের উপর অকারণ ঘেন্না ধরে গেল তার। থাক, বিয়ে করবে না সে... 

দিন দুই পরে, অফিসে একটা চিঠি পেল সে। অযাচকের লেখা। ‘রুচি, রাগ করেছ জানি; তবে এই লেখা সেই রাগের নিরসনের জন্য নয়। আমি চাই তুমি রেগে যাও, খুব রেগে যাও – যাতে তুমি আমাকে রাগের বশেই ভুলে যেতে পারো খুব তাড়াতাড়ি। তাহলে ভাবতেই পারো, মিছিমিছি লেখালেখি করে আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টাই বা কেন? আসলে কি জানো, আমরা মুখে যাই বলি না কেন, মনে মনে কোথাও বেঁচে থাকতেই চাই আমাদের ভালোবাসার মানুষের মধ্যে। 

জানো রুচি, জীবনে তোমার সাথে দেখা হওয়ার আগে আমি কখনও প্রেম করিনি, করার সুযোগ হয়তো ছিল, প্রয়োজনের চাপে বা স্বভাবের কারণে কোনওদিন করা হয়ে ওঠেনি। তোমাকে দেখার পর ভেতরে এমন একটা ফাল্গুনের হাওয়া বইতো অথবা ঝর্ণার কলকল – তাকে অনুভব করার সাহস হয়ে উঠতো না কখনও। বিশেষ করে জানতামই, তুমি বাগদত্তা। তবে বিশ্বাস করো, তোমাকে আমি কখনও বিড়ম্বিত করতে চাইনি। 

অবাক হলাম। সেদিন তুমি অতর্কিতে আমার এতদিন মনে মনে গড়া কল্পকথাগুলোকে নিজেই তুলে ধরলে, এতো তোমার স্বভাব নয়। কী আশ্চর্য!তুমি আমাকে চাইছো আমার ভাষায়, আমার মতো করে তুমি আমায় বিবাহ প্রস্তাব দিচ্ছ! 

ভেসে গেলাম আবেগে। মানুষ বানের জলে ভাসতে ভাসতে হয় ডুবে যায়, নইলে খড়কুটোর হাত ধরে কোথাও গিয়ে থিতু হয়। আমার হলো দ্বিতীয়টা। ব্যাঙ্গালোরে এসে বুঝলাম, তোমার সাথে আমার জীবন জড়ানোটা তোমার প্রতিই অন্যায়। শরৎচন্দ্রের কথাই মনে পড়ল, বড় প্রেম কেবল কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়। আমার প্রেম বড় কিনা জানিনা, তবে তাকে আমি মহৎ রূপ অবশ্যই দিতে চাই। 

তুমি আমার সাথে ভাগ্য জড়িও না রুচি, আমার ভাগ্যে তোমার মতো নারীকে পাওয়া নেই। আমার অতীত তুমি জানো না। বাবা মা বেঁচে থাকতে সম্বন্ধ করেই আমার বিয়ে ঠিক করেছিলেন, বিবাহের দিন পাত্রীর বাড়ি উপস্থিত হয়ে দেখলাম মেয়ে উধাও। বোধহয় পুরনো প্রেমের জের। কী অসম্মান! বাবা বুক চাপড়াচ্ছেন। স্থানীয় এক গরীবের মেয়ের সাথে সেই লগ্নেই বিয়ে হয়ে গেল গল্প বা সিনেমার দেখা ঘটনার মতো। ফুলশয্যার দিন সে মেয়েও আমার হল না, গলায় দড়ি দিল সে। আমি কি এতখানি খারাপ? তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে যদি বা বিয়েটা হয়ে থাকেই, আমাকে বলতে পারতো একবার। তখন থেকেই ভেবেছিলাম এই জীবনে বিয়ে আর করবো না। মনের দুঃখে বাবা-মা দুজনেই গত হলেন, এখন আর এই নিয়ে পীড়াপীড়ি করারও কেউ নেই। কিন্তু মানুষের মন তো আর অধীন নয়। তোমাকে দেখার পর সে প্রতিজ্ঞা আমার টিকলো না। কোথাও অসম্ভব জেনেও আমার তোমার প্রতি আকাঙ্ক্ষা হল। তবে সেটা তুমি নিজে বলবে এই আশা কখনও ছিল না। 

আমার এই বিড়ম্বিত ভাগ্যে তোমাকে জড়াতে চাইনা রুচি। দ্যাখো না আমার সংস্পর্শে এসে তোমার এত বছরের প্রেমও ভেঙ্গে গেল। আমি তোমার আর ক্ষতি করতে পারবো না রুচি। 

আমার জন্য রাগ করো, মন খারাপ করো না। চাকরিটা ছেড়ে দিলাম। জানি, তোমার সামনা সামনি এলে সিদ্ধান্তটায় টিকে থাকতে পারবো না। ভালোই হল। অপূর্ণতাতেই আমার প্রাপ্তি হবে। পারলে তোমার পুরোনো সম্পর্কেই ফিরে যেও। ইতি- 

চোখ থেকে দু ফোঁটা জল পড়ে গেল রুচির, ঠিক ‘অযাচক’ নামটার উপর। ফাউন্টেন পেনের কালি জলে ভাসতে ভাসতে চারিদিকে ছড়িয়ে গেল অস্পষ্ট কামনার মতো, না বলা কথাদের মতো, ধীরে কিন্তু খুব গভীর হয়ে। ‘কোথায় যাবে তুমি? কর্পোরেট জগতের কোনও কথাই এই ডিজিটাল যুগে কারুর গোপনে থাকে না। যেখানে জয়েন করবে, ঠিক সেখানে পৌঁছে যাব আমি। দেখি কীভাবে আমাকে দূরে রাখো! চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল সে। অযাচককে নিয়েই পূর্ণ হবে সে।

Post a Comment

0 Comments