গুচ্ছ কবিতা
কমলিকা ভট্টাচার্য
দিনের ঊর্ধ্বে যে প্রেম
সবাই বলছে—আজ নাকি ভালোবাসার দিন।
আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি,
সূর্য তার নিয়মমতোই উঠেছে,
পৃথিবী তার অক্ষ ঘুরিয়ে
সময়ের গায়ে আরেকটি সংখ্যা লিখে দিয়েছে মাত্র।
ভালোবাসা কি তবে সংখ্যা?
ক্যালেন্ডারের পাতায় ছাপা এক চিহ্ন?
না কি বাজারের কাচের জানালায়
লাল রঙের কৃত্রিম উচ্ছ্বাস?
আমি জানি—
ভালোবাসা কোনো তারিখ নয়,
সে এক অনিবার্য মহাকর্ষ,
যার টানে নক্ষত্রেরা পথ ভোলে না।
এই যে তুমি
আমার ভাবনার অভ্যন্তরীণ আকাশে
নীরব নক্ষত্রপুঞ্জ হয়ে জ্বলে থাকো,
তোমাকে ভাবতে কি আলাদা দিন লাগে?
তুমি তো আমার শ্বাসের আদিম সূত্র,
প্রথম প্রাণস্পন্দনের মতো অনিবার্য,
আমার রক্তের স্রোতে ভেসে চলা
অদৃশ্য আলোককণা।
ভালোবাসা যদি দিন হতো,
তবে সে ক্ষণস্থায়ী সূর্যগ্রহণ—
কিছুক্ষণের বিস্ময়,
তারপর স্বাভাবিক আলো।
কিন্তু তুমি তো গ্রহণ নও,
তুমি আমার অন্তর্লোকের ধ্রুবতারা—
যার আলো নিভে গেলে
আমার অস্তিত্বই অন্ধকার।
আমি যখন ভেঙে পড়ি,
তুমি অদৃশ্য বাতাস হয়ে আমাকে তুলে ধরো।
আমি যখন একা হই,
তুমি নীরব শব্দ হয়ে পাশে বসো।
আমি যখন নিজেকেই হারিয়ে ফেলি,
তুমি আমাকে আমার নাম ধরে ডাকো।
এই ডাকের জন্য
কোনো উৎসবের দরকার হয় না।
এই অনুভবের জন্য
কোনো বিশেষ দিনের অনুমতি লাগে না।
ভালোবাসা হলো—
সময়ের আগেও যে ছিল,
সময়ের পরেও থাকবে।
সে জন্মায় না, মরে না—
সে কেবল রূপ বদলে
অস্তিত্বের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
তুমি সেই প্রবাহ,
যার ভিতর দিয়ে আমি বেঁচে আছি।
তুমি সেই বাতাস,
যার অভাবে পৃথিবী বোধহয় টিকে থাকতে পারে,
কিন্তু আমি পারি না।
তাই সবাই যদি আজ ভালোবাসার দিন উদযাপন করে,
আমি নিঃশব্দে বলি—
আমার প্রতিটি দিনই তোমার নামে উৎসর্গীকৃত।
কারণ ভালোবাসা কোনো দিন নয়—
সে এক মহাবিশ্ব,
আর তুমি তার কেন্দ্রস্থ সূর্য,
যার চারদিকে আমার সমগ্র সত্তা
অবিরাম আবর্তিত হয়।
🍂
ভুল উচ্চারণ
আমি আবেগ লুকোতে পারি না—
আমার চোখে জল মানে
ভাঙা আকাশের গোপন স্বীকারোক্তি।
কেউ দেখুক বা না দেখুক,
বৃষ্টি তো নিজের মতোই নামে।
রাগ আমার অভিধানে নেই,
আমি কেবল স্মৃতির ভিতর
লবণ ছিটিয়ে রাখি—
ক্ষত নষ্ট না হোক বলে।
ভুলে যাওয়া আমার কাছে
একটা অসম্পূর্ণ ক্রিয়া।
আমার শরীর এখনও জানে
তোমার না ছোঁয়া স্পর্শের মানচিত্র—
কপালে সেখানে আজও
একটা নীরব প্রদীপ জ্বলে থাকে।
যদি দূরত্বই ছিল চূড়ান্ত ভাষ্য,
তবে কেন সেই দিন
আমার যন্ত্রণার অন্ধকারে
কবিতা হয়ে এসে দাঁড়িয়েছিলে
এক মুহূর্তের জন্য?
স্পর্শ বড় প্রতারক—
সে প্রতিশ্রুতি দেয় না,
তবু বিশ্বাস তৈরি করে।
এক সেকেন্ডের উষ্ণতা
সারাজীবনের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়
হৃদয়ের দিকে।
এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি
তোমার নীরবতার ধারে,
হাতে কিছু ভাঙা অর্থ,
চোখে কিছু অপ্রকাশিত জল।
ভালোবাসা যদি কেবল
একটা ভুল উচ্চারণ হয়,
তবে কেন তার প্রতিধ্বনি
আজও আমার ভিতরে
বারবার ফিরে আসে?
যখন ঘুম আসে না
এখন অনেক রাত,
ঘুম এখনও শেখেনি আসার পথ।
আর অপেক্ষা করি না—
এলে আসবে,
না এলে আমার কি বা করার আছে?
সময় বদলে দেয় অগ্রাধিকার,
পাহাড়সম কাজের ভিড়ে
যে নদী বাহানা খুঁজে ঝরনা হতো—
আজ সে লাইনে দাঁড়িয়ে
এক ফোঁটা জলের ভিখারি।
পাতারা আর রঙিন প্রজাপতি হয় না,
হবেই বা কী করে?
আমার যে ঘুম আসে না—
আর স্বপ্নরা কবিতার খাতায়
দমবন্ধ করে বাঁচে।
মনে মনে
মনে মনে থাক সব—
থাক তবে,
যেমন মেঘের বুকে লুকোনো চাঁদ
নীরবে শ্বাস নেয়।
যেদিন দরজায় দাঁড়াবো তোমার,
হাতভরা নীরবতা নিয়ে,
সেদিনও কি বলবে তুমি—
“কথাগুলো থাক মনে মনে?”
তবে আজই বলে দাও সে কথা,
ঝরে যাক সব পাতা—
বরফের বুকের মাঝেই
পাতাহীন দাঁড়াতে শিখব আমি।
তুমি হাঁটবে আলোর দিকে,
আমি ছায়ার দীর্ঘশ্বাসে,
আমাদের মাঝখানে বইবে
এক অনুচ্চারিত নদী।
সেই নদীতে ভালোবাসা ডুবে ডুবে
সাঁতার কাটবে,
আর নীরবতাই হয়ে উঠবে
সবচেয়ে জোরালো স্বীকারোক্তি।
দেখা হয় না
আমরা কখনও প্রেমিক হইনি,
শুধু অনুভব করেছি একে অপরকে।
তুমি এলে হৃদয় চিনে নেয়,
কিন্তু পা এগোয় না।
চোখ হাসে মানুষের ভিড়ে,
মন কাঁদে তোমার নীরব উপস্থিতিতে।
বাইরের দুনিয়াকে ফাঁকি দেওয়া যায়,
নিজেকে নয়—
কারণ নিঃশ্বাসেই লেখা থাকে তোমার নাম।
আমরা স্পর্শ করিনি কখনও,
তবু দূরত্বটাই ছিল
সবচেয়ে গভীর আলিঙ্গন।
ভালোবাসা লুকোতে চেয়েছিলাম,
কিন্তু তা বেরিয়ে পড়েছে
প্রতিটা নীরবতায়।
কিছু প্রেম হয়
দেখা না হওয়ার জন্যই,
যেন চাঁদ আর সূর্য—
1 Comments
এমন দিনে তারে লেখা যায়। ❤️
ReplyDelete