কমলিকা ভট্টাচার্য
১৬ এপ্রিল, ২০২৫
ভোর সাড়ে পাঁচটায় ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙল বললে ঠিক হবে না, কারণ সারারাত উৎকণ্ঠায় ছটফট করেছি। এতদিন যাঁর লেখা পড়ে বড় হওয়া, যাঁর কলমের ছোঁয়ায় হাসি, কষ্ট, দার্শনিকতা, সহানুভূতির মূর্ত রূপ পেয়েছে—আজ সেই মানুষটির সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হবে!
এক অদ্ভুত অনুভূতি মন জুড়ে—কিছু দ্বিধা, কিছু ভালো লাগা। যদি না দেখা হয়? যদি কোনো ভুল হয়ে যায়? উনি যদি রাগ করেন? আবার মনে হয়, এত সহজে কি আর ভাগ্য এমন সুযোগ দেয়?
কয়েকদিন আগেই ‘জ্বলদর্চি’ পত্রিকার তরফে ঋত্বিকবাবু ফোন করে বলেছিলেন, এবারকার বিশেষ সংখ্যার জন্য বিখ্যাত সাহিত্যিক শ্রী সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়-এর সাক্ষাৎকার নিতে আমি যদি রাজি থাকি। যেন স্বপ্ন সত্যি হলো—সাক্ষাৎকার নেওয়া তো দূর, ওনাকে সামনাসামনি দেখার কথা ভাবলেই হৃদয় কাঁপে। তাই সেই সুযোগটা আর হাতছাড়া করলাম না। আর এমনই সহযোগ, এই সময় আমাদের কলকাতা আসারও ছিল।
ঋত্বিকবাবু জানিয়েছিলেন, অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার দরকার নেই; সকাল ন’টার আগে গেলেই দেখা হবে ওনার সঙ্গে। তবে ১১টার পর উনি পুজোয় বসে পড়েন। ফোনেও যোগাযোগের উপায় নেই।
চেন্নাই থেকে কলকাতায় আসার মুখ্য উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়াল একটাই—এই সাক্ষাৎকার। ভাবলাম, এমন একজন মানুষকে সম্মানস্মারক হিসেবে কিছু দিলে আমাদের ভালো লাগবে। চেন্নাইয়ের বিশেষ কটনের ধুতি আর অঙ্গবস্ত্র উপহার হিসেবে সঙ্গে নিলাম।
১৬ এপ্রিলের সকাল। আমি ও আমার স্বামী বিপ্লব পৌঁছে গেলাম ওনার বাড়িতে, ঋত্বিকবাবুর দেওয়া ঠিকানায়। বাইরে থেকে উঁকি মেরে কাউকে দেখতে না পেয়ে দরজায় একটু ঠেলা দিতেই ওপরে বারান্দা থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
“কী হয়েছে?”
উপরে তাকাতে দেখি, উনি বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে বসে।
ওনাকে দেখা মাত্র আর ওনার স্বস্তিভরা স্বরে আমাদের মনের সব সংশয় মিটে গেল। উনি হয়তো বলতেই পারতেন, “কে?”, “কী চাই?” কিন্তু না, অচেনা মানুষকেও তিনি স্নেহে আপন করে নিতে জানেন! আমি নিচু গলায় বললাম—
“আপনার সঙ্গে একটু গল্প করতে এসেছি, বেশি সময় নেব না।”
আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলেন ওনার বৌমা। অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সৌজন্যের সঙ্গে কথা বললেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে এলেন শ্রী সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় স্বয়ং।
আমি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আমার নাম বলতেই উনি বললেন—
“তোমার নাম তো আমি জানি, শুনেছি। তোমার লেখাও পড়েছি। ভালো লিখো। লিখে যাও।”
আমি যেন অবশ! এত বড় সাহিত্যিক আমার নাম জানেন? আমার লেখা পড়েছেন? তাঁর মুখে এমন প্রশংসা আমার কাছে পরম প্রাপ্তি।
উপহার হিসেবে ধুতি ও অঙ্গবস্ত্র হাতে তুলে দিতেই বললেন—
“এটাই আমি আজ পুজোয় পরব।”
বিপ্লব খুশিতে আত্মহারা, কারণ ও-ই পছন্দ করে উপহারটি নিয়ে এসেছিল। সঙ্গে আনা মিষ্টি উনি আমাকে পুজোর স্থানে রাখতে বললেন। এতক্ষণ যা ঘটছিল, সবই আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল।
ওনার বৌমা আমাদের জন্য চা-বিস্কুট নিয়ে এলে উনি আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন—
“আমার বৌমাই আমার সবকিছু দেখে। ও-ই সবটা সামলায়।”
একজন শ্বশুরমশাই যখন বৌমার প্রতি এমন অকপট কৃতজ্ঞতায় মুখর হন, তখন তা হৃদয়ে গেঁথে যায়। এই ছোটখাটো মুহূর্তেই বড় মানুষ চিনিয়ে দেন নিজেকে।
সাক্ষাৎকারের কিছু অংশ এইখানে দিলাম , বিস্তৃতভাবে আপনারা জ্বলদর্চি অ্যাপ বা বিশেষ সাক্ষাৎকার সংখ্যায় পড়তে পারেন।
(আমি—কমলিকা, শ্রদ্ধেয়—শ্রী সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়)
আমি: জীবনের এতটা বছর পার হয়ে আসার পর আপনার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা কী এবং কেন?
শ্রদ্ধেয়: প্রকৃতির মধ্যে বসে থাকা আর নিজের চিন্তাকে মুক্ত করে দেওয়া—এই মুহূর্তগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়। বই পড়লে আমরা অন্যের ভাবনার জগতে ঢুকে পড়ি, কিন্তু নিজের ভাবনাকে চিনে নেওয়ার অবসর কোথায় মেলে? চাকরিজীবনে কাজের চাপে সে সময় বিশেষভাবে পাওয়া যায় না; মাঝেমধ্যে “আমি”-টা খালি উঁকি মেরে যায়। নিজের সঙ্গে একটু নির্জন সময় কাটানো, ধ্যানমগ্ন হওয়া খুব দরকার। সেখানে আমরা নিজেদের প্রশ্ন করতে পারি—“আমরা কে? কোথা থেকে এলাম? কোথায় যাচ্ছি?” এই ভাবনাগুলো জীবনের গভীরে নিয়ে যায়।
চিন্তা আমাদের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে—যেমন বোতলে মধু ভরে যদি গঙ্গার জলে ভাসিয়ে দিই, তাহলে মধুটা ধীরে ধীরে মিশে যাবে আর হারিয়ে যাবে কোথাও। সময়ও ঠিক তেমনই, যেন কোনো রহস্য। টি. এস. এলিয়ট বলেছিলেন—
Time present and time past
Are both perhaps present in time future,
And time future contained in time past.
এই সময়ের ধারা অনির্বচনীয়। আমরা অনবরত সময়ের ভিতর দিয়ে সরে চলেছি, এবং ভাবনাও তার সঙ্গেই বদলে যাচ্ছে। একদিন সব শেষ—পড়ে থাকবে খালি একটা টেবিল, কেউ কোথাও নেই, শুধু থৈ থৈ করছে সময়। তাই একটু ভাবা দরকার, তারপরেই এগোনো—এটাই তো ধর্মের সার কথা। রাজ কাপুরের সেই গানটা মনে পড়ে—“ও ভাই, জরা দেখকে চলো, আগে ভি, পিছে ভি, জরা সামলকে চলো।” জীবনকে ঠিকভাবে ব্যালেন্স করে চলার জন্য ভেবে-চিন্তে চলার প্রয়োজন আছে।
এই সমাজের বাইরের কাঠামোটা বড় কঠিন এবং ভীষণভাবে বস্তুবাদী। আমাদের সব কাজই করতে হবে—কিন্তু কেবল ভাবনার আশায় বসে থাকলে কেউ সময় দেবে না। তাই জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেই আমাদের নিজের জন্য কিছু সময় বার করে নিতে হবে। তবে সে সময় বেশিক্ষণ থাকবে না, কারণ কেউ না কেউ এসে জীবনের ফর্দ খুলে বসবে। এভাবেই আমরা নিজের ভেতরের “আমি”-টাকে আবিষ্কার করার আগেই তাকে হারিয়ে ফেলি।
তাই নিজেদের খোঁজে কিছুটা সময় নিজের জন্য, একধরনের স্বার্থপরতার সঙ্গেই খুঁজে নিতে হবে। সেই “আমি”-টাকেই খুঁজতে হবে, যেটা চাপা পড়ে থাকে দায়িত্ব আর দৈনন্দিনতার ভিড়ে।
আমি: আমাদের সবার মধ্যেই বিভিন্ন সত্তা থাকে, আপনি নিজেকে কোন সত্তায় সবচেয়ে বেশি সার্থক মনে করেন?
শ্রদ্ধেয়: যে সত্তায় আমি স্বার্থপর নই, কাউকে কষ্ট দিইনি, কারো সঙ্গে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিনি—সেই সত্তায় নিজেকে সার্থক মনে হয়। যেখানে আমি শিকারি নই, বরং সহমর্মী। আমাদের উচিত প্রতিনিয়ত নিজের ভুল বুঝে নেওয়া এবং সেটা শুধরে নেওয়া।
“Try and try for less error”—এই হোক জীবনদর্শন। নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝে যতটা পারা যায় সমাজের জন্য পারফেক্ট একটা জীবন তৈরি করা—এটাই তো সাধনা।
আমি: লেখককে তার লেখনীর থেকে আলাদা করা যায় কি? কোন লেখনী দেখে কি তার আত্মার সত্তাকে অনুভব করা যায়?
শ্রদ্ধেয়: আমরা যে সমাজে বাস করি, তার প্রভাব লেখকের উপর অবধারিত। তার চিন্তাভাবনা লেখনীর ভিতর দিয়ে উঠে আসে সেই সমাজচিত্র। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর লেখনীতেই তো আমরা তার পরিবেশ, পারিপার্শ্বিকতার ছাপ পাই—তিনি গোধূলির আলো দেখেছেন, গ্রামবাংলার প্রকৃতিকে অনুভব করেছেন। তাই তো তাঁর ভাষা এত মাটির কাছাকাছি। এমনকি Percy Bysshe Shelley ও John Keats-এর লেখাতেও সেই প্রকৃতি-পরিবেশ উঠে এসেছে। সব লেখকের ক্ষেত্রে না হলেও, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই লেখনীর মধ্যে লেখকের মনের অবস্থান ফুটে ওঠে। নিজস্ব ভাবনার প্রতিচ্ছবি ছাড়া লেখনী কখনোই সম্পূর্ণ হয় না।
আমি: আজকের যুগে যে ডিজিটাল মিডিয়া এবং টেকনোলজি সাহিত্য প্রচার ও সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, আপনি সেটিকে কীভাবে দেখেন?
শ্রদ্ধেয়: সমাজমাধ্যম এখন জরুরি এক বাস্তবতা, তবে তার দুঃখজনক দিকও আছে—এটা অনেক সময়েই বাণিজ্যিক হয়ে পড়ছে। প্রচারের যন্ত্রণা এত বেশি যে সাহিত্য হারিয়ে যায় মাঝে মাঝে। তবুও, কেউ যদি সত্যিকারভাবে সৃষ্টি করতে চায়, সে উপায় বের করেই নেবে।
আমি: আমরা যারা নতুন প্রজন্মের লেখক, আমাদের কী করণীয় বলে মনে করেন?
শ্রদ্ধেয়: করাটা যেন থেমে না যায়—এটাই আসল। লেখা—সে কবিতা হোক, গল্প হোক বা নিবন্ধ—চলতে থাকুক। কাজ করো, ঠিক পথ সে নিজেই খুঁজে নেবে। একবার থেমে গেলে আবার শুরু করাটা খুব কঠিন। তাই অভ্যাসটা টিকিয়ে রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি।
আমি: আপনি কি মনে করেন লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা কেমন?
শ্রদ্ধেয়: লিটল ম্যাগাজিন সব সময় ছিল, আছে এবং থাকবে। কারণ এর মধ্যে একটা অন্তরাত্মার চাহিদা আছে। এটা কেবল প্রকাশনা নয়—এটা ভাবনার প্রতিচ্ছবি, আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। বড় পত্রিকাগুলোর অধিকাংশই এখন বাণিজ্যিক, আর তাতে প্রতিভার জায়গা কমে যায়। কিন্তু ছোট পত্রিকাগুলো হল যেন শহরের গলিপথ—ছোট ছোট বাড়ি, যার প্রতিটিতেই জীবন আছে, আবেগ আছে, ভালোবাসা আছে।
ছোট ছোট বাড়ির মতোই লিটল ম্যাগাজিন—তাদের বাদ দিলে শহরটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আমি: ‘জ্বলদর্চি’ পত্রিকার ৩২ বছর পূর্তিতে আপনার কোনো বার্তা?
শ্রদ্ধেয়: যেমন চলছে, তেমনই চলুক। যদি ‘জ্বলদর্চি’-র মতো পত্রিকা একদিন বিরাট কোনো কর্পোরেট পত্রিকা হয়ে যায়, তাহলে তা শেষ হয়ে যাবে। যদি আমার ছোট্ট বাগানটা একদিন বড় কোনো ন্যাশনাল পার্কে পরিণত হয়ে যায়, তাহলে তো আমার অস্তিত্বই হারিয়ে যাবে।
এই ছোট্ট বাগানটাই ভালো—যেখানে একটি ছোট্ট টবে একটি ছোট্ট ফুল হাসছে, একটি গল্প ভেসে যাচ্ছে বাতাসে, নিরলস।
সাক্ষাৎকার শেষে উনি বললেন—
“আজ অনেক কথা হলো, সোনা লক্ষ্মীটি—আবার একদিন এসো, আরও অনেক গল্প হবে।”
ওনার মুখে “সোনা লক্ষ্মীটি” শুনে মনটা একরাশ ভালো লাগায় ভরে গেল। সেই স্নেহমাখা সম্বোধনে একটুও ভণিতা ছিল না, ছিল খাঁটি মমতা।
বিপ্লবের সঙ্গে ওনার সেলফি তোলার মুহূর্তটা দারুণ মজার ছিল। সেই মুহূর্তে আমরা আবিষ্কার করেছিলাম আমাদের চিরপরিচিত রসিক সাহিত্যিক শ্রী সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়-কে—যেভাবে উনি বিপ্লবকে সেলফি তোলার জন্য গাইড করছিলেন।
আমি আমার লেখা দুটি বই উপহার দিলাম। উনি বললেন—
“নিশ্চয়ই পড়ব। আর তোমাকে জানাব।”
সেই মুহূর্তে উনি আমার বইয়ের পাতায় কলম দিয়ে আমার একটি চিত্র এঁকে নিজের হাতে লিখে দিলেন—
এই বাক্য আমার কাছে এক আজীবন চালিকাশক্তি হয়ে থেকে যাবে। আর থেকে যাবে ওনার মনে আঁকা আমার সেই ছবি।
এ আমার জীবনের এক বড় উপলব্ধি।
ওনার বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় আমার মন গেয়ে উঠল—
“আজ ম্যায় উপর, আসমান নিচে…”
জীবনের এই মুহূর্তটির স্নেহভরা আবেশ আমাকে সব সময় ঘিরে থাকবে। ওনার দীর্ঘ জীবনদর্শনের যে উপলব্ধি উনি আমাদের সঙ্গে ভাগ করে নিলেন, তা এই স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। শুধু ওনার এই জীবনদর্শনের জ্ঞান আমরা আমাদের চেতনায় ভরে নিলাম।
4 Comments
বড় আনন্দ পেলাম সাক্ষাৎকার এর বিষয়ে পড়ে
ReplyDeleteধন্যবাদ।🙏
Deleteখুব ভালো লাগল আমার কাছের একজনের এই সাক্ষাৎকার পড়ে।আরো অনেক সমৃদ্ধ হোক তোর লেখা।
ReplyDeleteধন্যবাদ।🙏
Delete