জ্বলদর্চি

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ (রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায় উপন্যাসে এলা চরিত্র)/অজিত দেবনাথ

তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ (রবীন্দ্রনাথের চার অধ্যায় উপন্যাসে এলা চরিত্র)

অজিত দেবনাথ 

উপন্যাসের তৃতীয় অধ্যায়ে অতীন দেশভাবনার একটা খসড়া নিজের মনে তৈরি করে নিয়েছিল। সেই ভাবনার কথা এলাকেও জানিয়েছিল,
 "দেশের আত্মাকে মেরে দেশের প্রাণ বাঁচিয়ে তোলা যায় এই ভয়ংকর মিথ্যে কথা পৃথিবীসুদ্ধ ন্যাশনালিস্ট আজকাল পাশবগর্জনে ঘোষণা করতে বসেছে, তার প্রতিবাদ আমার বুকের মধ্যে অসহ্য আবেগে গুমরে গুমরে উঠছে--এই কথা সত্যভাষায় হয়তো বলতে পারতুম, সুরঙ্গের মতো লুকোচুরি করে দেশ-উদ্ধারচেষ্টার চেয়ে সেটা হত চিরকালের বড়ো কথা। কিন্তু এ-জন্মের মতো বলবার সময় হল না। আমার বেদনা তাই আজ এত নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছে।"
উপরের কথোপকথন থেকে অতীনের দেশপ্রেম সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথের কালান্তরের সেই কণ্ঠস্বর-সত্যিকারের দেশপ্রেম সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বোধকে ছাপিয়ে যায়। এই একই দর্শন আমরা ঘরে বাইরে উপন্যাসে নিখিলেশের জীবনদর্শনের মধ্যে খুঁজে পাই। কিন্তু ইন্দ্রনাথ সে পথের পথিক নয়। সংকীর্ণ স্বজাত্যবাদ যে এক ধরনের নেতিবাচক দেশপ্রেম তা ইন্দ্রনাথ বুঝতে পারেনি। বুঝতে পারলেও সে এই পথকেই পাথেয় করে নিয়েছিল। এভাবেই তার বিপ্লববাদ মানবতাবাদ থেকে আলাদা হয়ে যায়। জাতীয়তাবাদের চেয়েও বড় বিষয় হল মনুষ্যত্ব। এলাকে বিপ্লবী দলে যোগদানের পিছনে ইন্দ্রনাথের যে কৌশল আমরা দেখতে পাই তা যেন অনেকটা ছেলে ধরার ফাঁদ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। নারীর মোহিনীশক্তিকে দলের কর্মী সংগ্রহের কাজে লাগানো তার বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। অতীনও  ঠিক একই উদ্দেশ্যে নিয়ে দলে এসেছে।এলাকে আপন করে নেওয়ার অদম্য বাসনা তার মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই এলা শেষপর্যন্ত প্রেমের কাছে, মানবতার কাছে কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়েছিল। অতীনকে জীবনসঙ্গী করে সে এই স্নিগ্ধ সুন্দর পৃথিবীতে বাঁচতে চেয়েছিল। অন্যদিকে অতীন নিজের আদর্শে অনড় ছিল।এলা  অতীনের ভালোবাসার পাত্রী হওয়া সত্ত্বেও শেষপর্যন্ত  মৃত্যু উপহার দেবে এ কথা উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন। অতীন ইন্দ্রনাথের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সে বুঝতে পারে এই বিপ্লববাদ কোনওদিন বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে না। তবু সে বিশ্বাস ভঙ্গ করতে চায়নি।এটাই এই উপন্যাসের ট্রাজেডি।
🍂

নারী সৃষ্টির আধার। পৃথিবীকে রক্ষা করতে তার ভূমিকা অপরিসীম। সে মনমোহিনী ও রহস্যময়ী। কিন্তু সংসারের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে দিতে সে নিজের অজান্তেই দুর্বল হয়ে পড়ে। অসহায়বোধ করে। তখন একজন জীবন সঙ্গীর প্রয়োজন হয়। এলার চরিত্রের মধ্যে এই পরিবর্তন আমরা লক্ষ্য করি। দেশ সেবার ব্রত নিয়ে এলেও সে ক্রমশ অতীনের ভালোবাসার চিলেকোঠায় নিজেকে সমর্পণ করে। অতীনও ভেসে যায় এলার মায়াবিনী ভেলায়।
রবীন্দ্রনাথ এলার জীবনযাত্রা গভীর মমত্ববোধের ভিতর দিয়ে ফুটিয়ে তুললেও তার মধ্যে একটা প্রতিবাদের সুর সৃষ্টি করেছেন। এলার মা ছিল অত্যন্ত আচারনিষ্ঠ মহিলা। মায়ের অন্ধ প্রভুত্বচর্চা সে মেনে নিতে পারেনি। ফলে এলার মনে  এক তীব্র বিরাগ জন্ম নেয়। সে উপলব্ধি করে অন্যায়কে নীরবে সহ্য করাও অন্যায়। তাই বাবার “...অতিমাত্র ধৈর্য অন্যায় বলে এলা অনেক সময় তার বাবাকে মনে মনে অপরাধী না করে থাকতে পারে নি” । শান্ত স্বভাবের নরেশবাবু যেখানে সংঘাত এড়িয়ে চলতে চাইতেন, সেখানে এলা প্রতিবাদকে বেছে নেয়। অন্যায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাকে প্রকাশ্যে দেখিয়ে দেওয়া যেন তার স্বভাবজাত দায়িত্ব। মায়ের চোখে এই স্পর্ধা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ হলেও এলার সত্যনিষ্ঠা কখনও দমে যায়নি। অবিচারের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ অন্তরে তুষের আগুনের মতো জ্বলেছে।
শৈশবের স্নেহবঞ্চনা এলার মনকে এক অদ্ভুত স্বাধীনতাবোধের দিকে ঠেলে দেয়। ভালোবাসার অভাব তাকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে সাহায্য করে। সে মনে করে নিজেকে বন্ধনমুক্ত রেখে, আত্মনির্ভর হয়ে বাঁচাই শ্রেয়। তাই সংসার ও সম্পর্কের প্রতি তার এক ধরনের সংশয় শৈশবেই জন্মায়। এই স্বাতন্ত্র্যলিপ্সাই তাকে নির্বন্ধন জীবনের দিকে আকৃষ্ট করে।
এলার মুক্তিচেতনার দুটি দিক লক্ষ্য করা যায়। প্রথমত, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে তার অনড় অবস্থান-নিজের জন্য যেমন, তেমনি অন্যের পক্ষেও। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তিস্বাধীনতার সাধনা। প্রথমটি তাকে রাষ্ট্রীয় আন্দোলনের আবর্তে নিয়ে যায়, আর দ্বিতীয়টি দাঁড়ায় তার ও অতীন্দ্রের মাঝখানে এক অদৃশ্য প্রাচীর হয়ে।
ইন্দ্রনাথের আহ্বানে দেশের কাজে যোগ দেওয়া এলার জীবনে কোনও আকস্মিক  ঘটনা নয়।  অনেকদিন ধরেই সে মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছিল।সংসারযন্ত্রণা ও বিবাহ-সম্পর্কিত আশঙ্কা তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিবাহকে সে মনে করত আত্মসম্মানের অন্তরায়, এক ধরনের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। তাই যখন ইন্দ্রনাথ তাকে বলে, আমি লোক চিনি। তোমাকে বিশ্বাস করতে আমার মুহূর্তকাল বিলম্ব হয়নি, তোমাকে দেখাবামাত্রই মনে হয়েছে, তুমি নবযুগের দূতী, নবযুগের আহ্বান তোমার মধ্যে।"
তাছাড়া দেশের কাজে দীক্ষিত হওয়ার মতো মানসিক শক্তিও এলার ছিল। তাই সে এক নতুন আত্মসম্মানের স্বাদ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়। দেশের জন্য আত্মনিবেদন তার কাছে কঠিন নয়, কারণ এতে তার প্রতিবাদ ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা-উভয়ই পূর্ণতা পায়।" 
... নিশার আঁধারস্রোতে 
মুছে ফেলে দিয়ে যায় সৃষ্টিপট হতে
 এই ক্ষীণ অর্থহীন অস্তিত্বের রেখা-"
কিন্তু পাঁচ বছর পর দেখা যায়, সেই অঙ্গীকারই তার মনে এক ধরনের  সংশয়ের জন্ম দেয়। এই মানসিক পরিবর্তনের কারণ নিহিত আছে তার মনের ভিতরের অঙ্কুরিত ভালবাসার উর্বর ভূমিতে। এলা একসময় ভাবত প্রেম হৃদয়ের দুর্বলতা, বন্ধনের নিঝুম সংকেত । সে গর্ব করে বলতে পেরেছিল, “কিন্তু চঞ্চলতা জয় করে খুশি হয়েছি নিজের শক্তির গর্বে।" তবু অবচেতনে এক দোসরের প্রতীক্ষায় তার মন উদগ্ৰীব   ছিল। এখানে এলার প্রেম-চেতনার মধ্যে দু'টি দিক লক্ষ্য করা যায়। একদিকে দেশের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করা, অন্যদিকে অতীনকে নিজের অন্তরের স্থান দেওয়া। অতীন্দ্রের আকস্মিক আবির্ভাবে সে যেন “অতি বিপুল ব্যাকুলতায়” জেগে ওঠে। প্রথম দর্শনের অভিজ্ঞতা সে নিজেই স্বীকার করেছে “ওগো, কতবার বলেছি  অনেকক্ষণ ধরে ডেকের কোণে বসে তোমাকে চেয়ে চেয়ে দেখছিলুম... জীবনে সেই আমার সব চেয়ে আশ্চর্য এক চমকের চিরপরিচয়।" অতীনের কাছ থেকে দূরে সরে গেলেই যে বিরহ যন্ত্রণা বৃদ্ধি পায়, তা এলা ভালো করেই বুঝতে পেরেছিল। তাই বিরহদশার যন্ত্রণার চেয়ে অতীনের সহচরী হয়ে তার সঙ্গে ঘোরা  তার কাছে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছিল।
অতীন তার কাছে সাধারণ পুরুষ নয়। অতীন যেন তার কাছে পাহাড়ি ঝরনার মতো  “মন বললে, কোথা থেকে এল এই অতিদূর জাতের মানুষটি, চার দিকের পরিমাপে তৈরি নয়, শ্যাওলার মধ্যে শতদল পদ্ম।" এই উপলব্ধি তার অন্তরে প্রেমের নবজাগরণ ঘটায়। তার ভেতরে নারীত্বের ঝংকার বেজে ওঠে। সে যেন ভালোবাসায় সুষমাসিক্ত হতে চায়। সে স্বীকার করে,“একটা মন্ত্রপড়া বেড়ার মধ্যে ছিলুম, কিন্তু তোমাকে দেখামাত্র মন উৎসুক হয়ে উঠল, বললে, ভাঙুক সব বেড়া।" চোখের সামনে থেকে ধূলো-মাখা ধূসরতা ধীরে ধীরে কেটে যায়।এলার মনের এসরাজে মুক্তির রাগ বেজে ওঠে। এখানেই এলার নতুন জন্ম। সে নিজেকে অন্য আঙ্গিকে আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়। মানবিকতা ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে। মুহূর্তে রক্ত মাংসের শরীরটি রহস্যময়, প্রাণময় হয়ে ওঠে। তবে কর্তব্য ও প্রেমের সংঘাতে সে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ইন্দ্রনাথের আদর্শ তার কাছে ব্রত, আর অতীন্দ্র তার হৃদয়ের দাবি। একদিকে বিপ্লবের চারণক্ষেত্র, অন্যদিকে অতীনের প্রতি ভালোবাসার দুর্নিবার আকর্ষণ । 
সে জানে,“আপনার কাছে মিথ্যে বলব না, বুঝতে পারছি আমার ভালোবাসা দিনে দিনেই অন্য সকল ভালোবাসাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।" মনের পাপড়িগুলো একে একে ফুটে উঠছে।  তবু পণভঙ্গের সাহস দেখাতে পারি না। দেশের কাছে নিজেকে বাগদত্তা বলে সে ঘোষণা করে।
ইন্দ্রনাথ তাঁর শিষ্যদের সামনে যে আদর্শ স্থাপন করেন, তার মূল কথা—সংবেদনশীলতার কোমল ভুবন পেরিয়ে কঠোর বাস্তবের মাটিতে এসে দাঁড়ানো। তাঁর ভাষায়, “দয়ামায়ার জলাজমি পেরিয়ে গিয়ে শক্ত ডাঙায়” অবস্থান নিতে হবে। সেই দৃঢ় ভূমিতে করুণা, প্রেম, স্নেহ বা মমতার মতো হৃদয়ের কোমল অনুভূতিগুলির কোনও স্থান নেই। এখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভালোবাসা নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক। কারণ, কর্তব্যপালনের পথে আবেগ বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। আবেগের নেশায় কোনমতেই মেতে উঠলে চলবে না। প্রয়োজন হলে নিষ্ঠুরতা নয়, কিন্তু নির্দয় নির্লিপ্ততা অপরিহার্য-এই ছিল তাঁর শিক্ষা। এই তত্ত্বের সমর্থনে ইন্দ্রনাথ গীতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে এলাকে বোঝায়, “শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই কথাটাই বুঝিয়েছিলেন। নির্দয় হবে না কিন্তু কর্তব্যের বেলা নির্মম হতে হবে।" অর্থাৎ ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, কর্তব্যই হবে চূড়ান্ত নির্দেশক। যা কিছু আবেগ, উচ্ছ্বাস সবটুকুই দেশের কাজে নিয়োজিত করতে হবে।জীবনযুদ্ধে বিপদ যে কোনও মুহূর্তে, যে কোনও দিক থেকে এসে আঘাত করতে পারে। তাই তাঁর কঠোর নির্দেশ, “সমস্ত নিদারুণ সম্ভাবনা প্রত্যহ কল্পনা করে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে।" এইভাবে সে দেশপ্রেমের ঘুঁটি সাজিয়ে ছিল।
এই প্রস্তুতির চরম পরীক্ষা হল
 যা কিছু হৃদয়ের নিকটতম, প্রয়োজনে তাকেও নির্লিপ্তভাবে বিসর্জন দেওয়া। ব্যক্তিগত ভালোবাসা বা সম্পর্ক যদি বৃহত্তর উদ্দেশ্যের পথে অন্তরায় হয়ে ওঠে, তবে তাকে উৎখাত করার  সাহস থাকতে হবে। এলার দৃঢ় মানসিকতা পরখ  করেই  ইন্দ্রনাথ সরাসরি প্রশ্ন তোলে অতীন্দ্রকে কেন্দ্র করে,“যদি কখনো সে আমাদের সকলকে বিপদে ফেলে, তাকে নিজের হাতে মারতে পার না?”
এলার চিন্তাভাবনায় নারীত্বের এক কঠোর আত্মসমালোচনা রয়েছে। সে মনে করে, নারীরা প্রাকৃত অস্ত্র ও মন্ত্র নিয়ে পুরুষকে নিচে নামায়। প্রেমের চিরাচরিত সংলাপে তার বিন্দুমাত্র ভরসা বা বিশ্বাস কোনওটাই ছিল না। তাই সে মনে করে প্রেমের সার্থকতা সম্ভোগে নয়, ত্যাগে। সে অতীন্দ্রকে বোঝায়, “তোমার নিজের চেয়ে তোমাকে আমি বেশি জানি অন্তু... আমার সমস্ত দাবি তুলে নিয়েছি, সম্পূর্ণ মনে সঁপে দিয়েছি তোমাকে দেশের হাতে।" এই ত্যাগে তার আত্মশ্লাঘা থাকলেও অন্তরে জমে থাকে অপূর্ণতার হাহাকার। না পাওয়ার বেদনা। আর অনুচ্চারিত অনুরাগের রক্তিম গোলাপ।অতীন্দ্র তার আত্মপ্রবঞ্চনাকে নির্মমভাবে ভেঙে দেয়। যখন সে বলে,“অধার্মিক তোমার পণগ্রহণ...” , তখন এলার বিশ্বাসভূমি কেঁপে ওঠে। মানসপটে আছড়ে পড়ে এক অবিশ্বাসী ঝোড়ো হাওয়া।আরও কঠিন আঘাত আসে, “কেন তুমি আমাকে সে কথা ভুলিয়ে দিলে।" এই অভিযোগ এলাকে আত্মসমীক্ষায় বাধ্য করে। তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। জীবনের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াতে হয়। চোখের সামনে ভেঙে পড়ে অভিমানের তুষাঝড়।
তৃতীয় অধ্যায়ে আমরা এক নতুন এলাকে আবিষ্কার করি। সে আর আত্মগর্বিনী নয়; অনুতাপে নম্র।সে উপলব্ধি করে এক মুঠো ভালোবাসা পেলেই তার জীবন কেটে যাবে। সে স্বীকার করে, “যখন তোমাকে চিনতুম না তখন তোমাকে এই রাস্তায় দাঁড় করিয়েছি।" অতীন্দ্রকে ফিরে পাওয়ার জন্য তার মিনতি, “ফিরে এসো, অন্তু... ভুল করেছি আমি। আমাকে মাপ করো।" এই হাহাকার তাকে পীড়িত করে। সে মনে মনে দুর্বল হয়ে পড়ে। দৃঢ়তার প্রাচীর এক এক করে খসে পড়ে। এমনকি সে বলতে পারে, “আমি স্বয়ম্বরা, আমাকে বিয়ে করো অন্তু।" কিন্তু সময় তখন ফুরিয়ে গেছে। সূর্য পশ্চিম পাড়ে ঢলে পড়েছে। পাখিরাও ঘরে ফিরে যাচ্ছে। প্রকৃতিও অন্য সাজে নিজেকে সাজাতে ব্যস্ত। ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে আত্ম-সমর্পণের অর্ঘ্য। কিন্তু এলার জীবন ক্রমশ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। প্রাণ প্রদীপের সলতেও টিপটিপ করে জ্বলছে।
অবশেষে মৃত্যুর  কাছেপিঠে  দাঁড়িয়ে এলা  উপলব্ধি  করে  এই জীবনে আর প্রেমের কোমল উত্তাপটুকু বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। সে জানে,সে অতীন্দ্রের, অতীন্দ্র ছাড়া পৃথিবীতে অন্য কেউ নেই। অতীন যেন মেঘে আঁকা এক রহস্যময় চিত্রকল্প। এলা অতীনের পা জড়িয়ে ধরে বললে, “মারো আমাকে অন্তু, নিজের হাতে। তার চেয়ে সৌভাগ্য আর আমার কিছু হতে পারে না। নিজের থেকে  উঠে দাঁড়িয়ে অতীনকে বারবার চুমু খেয়ে বললে, মারো এইবার মারো।"ছিঁড়ে ফেললে বুকের জামা। মৃত্যুকে সে মোহমুক্তির পথ বলে গ্রহণ করে। শেষ নিবেদন, “অন্তু, অন্তু আমার, আমার রাজা, আমার দেবতা সেই ভালোবাসার দোহাই, মারো, আমাকে মারো।" দেহ, যা একদিন তার কাছে ছিল কেবল জীবপ্রকৃতির বাহন, শেষ মুহূর্তে হয়ে ওঠে পবিত্র অর্ঘ্য। এক দূরতর বন্দরের মায়াবী জ্যোৎস্না।
অতীন এমন গভীর সংকটের মুখোমুখি জীবনে আর কখনও হয়নি। তার ভিতরেও এক ধরনের অনিবার্য দ্বন্দ্ব পরিলক্ষিত হয়। জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাকে কর্তব্যের আদর্শ নির্ধারণ করতে হয়। প্রেম ও কর্তব্যের সংঘাত তাকে স্থির থাকতে দেয় না। সে অস্থির হয়ে পড়ে। অবশেষে সে সংকটমুক্ত হয়ে আমাদেরকে জীবনের এক মহান দর্শনের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। হ্যামলেটের সংলাপের মধ্যে অতীনের আত্মোপলব্ধি ধরা দেয়-
"To be, or not to be, that is the question:
Whether 'tis nobler in the mind to suffer
The slings and arrows of outrageous fortune,
Or to take arms against a sea of troubles
And by opposing end them. To die—to sleep,
No more; and by a sleep to say we end
The heart-ache and the thousand natural shocks"

ইন্দ্রনাথের  কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অতীনকে রক্ষা করতেই হবে। আবার এলার দাবীকেও মান্যতা দিতে হবে। এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যেই সে যেন মৃত্যুর  পথই বেছে নিল। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায়,
"হায় এ কী সমাপন!
অমৃতপাত্র ভাঙিলি,
করিলি মৃত্যুরে সমর্পণ;
এ দুর্লভ প্রেম মূল্য হারালো
কলঙ্কে, অসম্মানে।"
এভাবেই এলার চরিত্র বিদ্রোহ থেকে প্রেম, অহংকার থেকে আত্মসমর্পণ, আদর্শবাদ থেকে মানবিক সত্যের দিকে অগ্রসর হয়। তার জীবনে নিষ্ফলতার বেদনা যেমন আছে, তেমনি আছে আত্মোপলব্ধির দীপ্তি। রবীন্দ্রনাথ এলার মাধ্যমে দেখিয়েছেন স্বাধীনতার অহংকার ভেঙে যে প্রেম জাগে, তার পরিণতি কখনও করুণ, কখনও মহিমান্বিত।কিন্তু তা নিঃসন্দেহে গভীর ও মানবিক। মৃত্যুর অনুরণন যেন ভালোবাসার উপত্যকায় আজও প্রতিধ্বনিত হয়। রবীন্দ্রনাথ নিজেই তো লিখেছেন, "এ সংসারের নিত্য খেলায় প্রতিদিনের প্রাণের মেলায়
বাটে ঘাটে হাজার লোকের হাস্য-পরিহাস–
মাঝখানে তার তোমার চোখে আমার সর্বনাশ।"

Post a Comment

1 Comments

  1. কমলিকা ভট্টাচার্যFebruary 18, 2026

    ভালো লাগলো।

    ReplyDelete