জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র : শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি/পর্ব ১/প্রীতম সেনগুপ্ত

ব্রহ্মসূত্র : শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি

পর্ব ১

প্রীতম সেনগুপ্ত 


( রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের পরম পূজনীয় দশম সঙ্ঘগুরু স্বামী বীরেশ্বরানন্দ রচিত ‘BRAHMA SUTRAS’ গ্রন্থটি ভিত্তি করে এক সনিষ্ঠ অন্বেষণের উদ্দেশ্যে নিয়েই শুরু হল এই ধারাবাহিক। )

‘ব্রহ্মসূত্র’ গ্রন্থটি রচনার ক্ষেত্রে মূল উদ্দেশ্য হিসেবে শঙ্করাচার্যের মতানুসারী ‘প্রস্থানত্রয়ে'র প্রকাশ সমাপনকেই নিরূপণ করেছেন গ্রন্থটির লেখক রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের দশম সংঘগুরু পরম পূজনীয়  স্বামী বীরেশ্বরানন্দ মহারাজ। আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে ( ১৯৩৬ সাল ) এই গ্রন্থ রচিত হয়। এই গ্রন্থটির বিষয়বস্তু হল ব্রহ্মসুত্রের মূল, অন্বয়, ইংরেজিতে অনুবাদ এবং শাঙ্কর মতানুযায়ী ব্যাখ্যা ও নির্দেশিকা। পরবর্তীকালে ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদ কর্মটি সুসম্পন্ন করেন ড. সচ্চিদানন্দ ধর মহাশয়। এই প্রস্থানত্রয় হল --- ভগবদগীতা, উপনিষদ  ও ব্রহ্মসূত্র। এই গ্রন্থটি প্রকাশের পূর্বে মায়াবতী অদ্বৈত আশ্রম কর্তৃক প্রকাশিত স্বামী স্বরূপানন্দ কৃত ভগবদগীতা এবং রামকৃষ্ণ মঠ মাদ্রাজ কর্তৃক প্রকাশিত স্বামী সর্বানন্দ কৃত- ‘Eight Major  Upanisads’  (মুখ্য অষ্ট--উপনিষদ) গ্রন্থ দুইটি পাঠকের সমাদর লাভ করে।

ভূমিকাতে অতি স্বল্প পরিসরে বেদের রূপকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। গ্রন্থাকার লিখছেন --‘যে কোন সম্প্রদায় বা মতবাদেরই অন্তর্ভুক্ত হউন না কেন হিন্দুমাত্রেরই  শাস্ত্রগ্রন্থ হইল বেদ। বেদই হইল আধুনিককাল পর্যন্ত জানা প্রাচীনতম ধর্মগ্রন্থ এবং ভারতীয় আর্য-সংস্কৃতি -সৌধের মূল ভিত্তি। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন বেদ অনাদি আপৌরুষেয় এবং ইহা কোন ব্যক্তি  বিশেষের মুখনিঃসৃত বাণী নহে। ইহা কোন ব্যক্তি - বিশেষের কৃত নহে --- ইহা স্বয়ং ঈশ্বরেরই নিঃশ্বাস। এই বেদ দুই ভাগে বিভক্ত --- কর্মকাণ্ড এবং জ্ঞানকাণ্ড। কর্মকাণ্ডের বিষয়বস্তু হইল যাগযজ্ঞাদির অনুষ্ঠান এবং জ্ঞানকাণ্ডের বিষয় হইল ব্রহ্ম-সম্পর্কিত জ্ঞান । জ্ঞানকাণ্ডকে বেদান্তও বলা হয়। কারণ ইহা বেদের অন্ত বা শেষ ভাগ এবং বেদ প্রতিপাদ্য সত্যের নির্যাস। বেদ কল্পনবিলাসের প্রকাশমান নহে, ইহা সমগ্র জাতির বহু শতাব্দীর অতীন্দ্রিয় আধ্যাত্মিক প্রত্যক্ষ অনুভূতির প্রামাণ্য ইতিহাস।’ ( ব্রহ্মসূত্র --- মূল, অন্বয়, বঙ্গানুবাদ, শাঙ্কর মতানুযায়ী ব্যাখ্যা ও নির্দেশিকা --- স্বামী বীরেশ্বরানন্দ, উদ্বোধন কর্তৃক প্রকাশিত, পৃঃ ১ )

বেদ বিষয়ে স্বামী বিবেকানন্দ বলছেন ---‘বেদ- নামক শব্দরাশি কোন পুরুষের উক্তি নহে। উহার সন-তারিক এখনও নির্দিষ্ট হয় নাই, কখনও নির্দিষ্ট হইতে পারে না। আর আমাদের (হিন্দুদের) মতে অনাদি অনন্ত। একটি বিশেষ কথা তোমাদের স্মরণ রাখা উচিত, পৃথিবীর অন্যান্য ধর্ম ---ব্যক্তিভাবাপন্ন ঈশ্বর অথবা ভগবানের দূত বা প্রেরিত পুরুষের বাণী বলিয়া তাহাদের শাস্ত্রের প্রামাণ্য দেখায়। হিন্দুরা কিন্তু বলেন, বেদর অন্য কোন প্রমাণ নাই, বেদ স্বতঃপ্রমাণ; কারণ বেদ অনাদি অনন্ত, তেমনি ঈশ্বরের জ্ঞানও অনাদি অনন্ত। ...

বেদ-নামক গ্রন্থরাশি প্রধানতঃ দুইভাগে বিভক্ত -- কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ড। কর্মকাণ্ডের মধ্যে নানাবিধ যাগযজ্ঞের কথা আছে; উহাদের মধ্যে অধিকাংশই বর্তমান যুগের অনুপযোগী বলিয়া পরিত্যক্ত হইয়াছে এবং কতকগুলি এখনও কোন না কোন আকারে বর্তমান। কর্মকাণ্ডের প্রধান প্রধান বিষয়গুলি যথা সাধারণ মানবের কর্তব্য -- ব্রহ্মচারী, গৃহী, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাসী এই-সকল বিভিন্ন

আশ্রমীর বিভিন্ন কর্তব্য এখনও পর্যন্ত অল্প-বিস্তর অনুসৃত হইতেছে। দ্বিতীয় ভাগ জ্ঞানকাণ্ড --- আমাদের ধর্মের আধ্যাত্মিক অংশ। ইহার নাম ‘বেদান্ত’ অর্থাৎ বেদের শেষ ভাগ --- বেদের চরম লক্ষ্য। বেদজ্ঞানের এই সারভাগের নাম বেদান্ত বা উপনিষদ্। আর ভারতের সকল সম্প্রদায় --- দ্বৈতবাদী, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী, অদ্বৈতবাদী অথবা সৌর, শাক্ত গাণপত্য, শৈব ও বৈষ্ণব --- যে - কেহ হিন্দু ধর্মের অন্তর্ভুক্ত থাকিতে চাহে, তাহাকেই বেদেরই উপনিষদ্ ভাগকে মানিয়া চলিতে হইবে। তাহারা নিজ নিজ রুচি-অনুযায়ী উপনিষদ্ ব্যাখ্যা করিতে পারে; কিন্তু তাহাদিগকে উহার প্রামাণ্য স্বীকর করিতেই হইবে। এই কারণেই আমরা ‘হিন্দু’ শব্দের পরিবর্তে ‘বৈদান্তিক’ শব্দ ব্যবহার করিতে চাই। ভারতে সকল প্রাচীনপন্থী দার্শনিককেই বেদান্তের প্রামাণ্য স্বীকার করিতে হইয়াছে --- আর আজকাল ভারতে হিন্দুধর্মের যত শাখা প্রশাখা আছে, তাহাদের মধ্যে কতকগুলিকে যতই বিসদৃশ বোধ হউক না কেন, উহাদের উদ্দেশ্য যতই জটিল বোধ হোক না কেন, যিনি বেশ ভাল করিয়া উহাদের আলোচনা করিবেন, তিনিই বুঝিতে পারিবেন --- উপনিষদ হইতে উহাদের ভাবরাশি গৃহীত হইয়াছে।’ ( স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, পঞ্চম খণ্ড, ১৬-১৭ পৃষ্ঠা ) (ক্রমশ) 

🍂

Post a Comment

0 Comments