তারাশংকর দে
নামহীন হৃদয়ের নোটবুক
কিছু অনুভূতি আসে—
চুপচাপ, ভোরের কুয়াশার মতো;
ধরা দেয় না তালুতে,
শুধু চোখের কোণে ভিজে থাকে।
শব্দ খুঁজি, অথচ শব্দরা
সবসময় সত্যের পাশে দাঁড়ায় না—
কখনো তারা ভারী,
কখনো অতিরিক্ত হালকা।
একটি দীর্ঘশ্বাসের ভেতর
যে আর্তি লুকিয়ে থাকে,
তার ব্যাকরণ নেই,
তার কোনো পূর্ণচ্ছেদ হয় না।
তাই বুঝে নিই ধীরে ধীরে—
সব অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যায় না,
কিছু কথা নীরবতাই ভালো বলে দেয়,
কিছু ব্যথা চুপ থাকলেই সম্পূর্ণ।
রাতের শেষে যেমন ভোর আসে,
কোনো ঘোষণা ছাড়াই—
তেমনি হৃদয়ের গভীরে
অর্থ তৈরি হয়, শব্দ ছাড়াই।
🍂
নীরবতার সিন্দুক
সব কথা উচ্চারণের জন্য জন্মায় না,
কিছু শব্দ অন্ধকারেই স্বস্তি পায়।
হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে ক্ষত,
সব আলো চোখে সহ্য হয় না—মন জানে।
ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়েও একলা থাকা যায়,
কারণ সবার কাছে সব কথা বলতে নেই,
কিছু স্বীকারোক্তি কেবল
নিজের ছায়ার সঙ্গেই মানায়।
বিশ্বাসেরও স্তর থাকে—
সব দরজায় একই চাবি চলে না।
যে কান শোনে, সে সব সময় বোঝে না;
যে বোঝে, সে সব সময় প্রশ্ন করে না।
তাই অল্প কথা, গভীর নীরবতা—
এই নিয়মেই বাঁচি আমরা।
ভেতরের সিন্দুকে রেখে দিই সত্য,
যতক্ষণ না সময় নিজে এসে খুলে দেয় তালা।
ঠিকানাহীন ঠিকানা
পথ চলতে চলতে বুঝেছি ধীরে—
মানচিত্র শুধু কাগজের অভ্যাস,
পা রাখলেই মাটি আপন হয়ে ওঠে,
চেনা-অচেনার ভেদ মুছে যায় বাতাসে।
কখনো স্টেশনের বেঞ্চে রাত নামে,
কখনো পাহাড়ের ছায়ায় দুপুর থামে;
এক মুঠো আকাশ, এক চুমুক জলেই
জীবন বলে—থাকতে শেখো, থেমে থেমে।
মানুষের চোখে চোখ রাখলে দেখি
অপরিচিত নয়, একই ক্লান্তি, একই আশা;
তখনই বুঝি—পৃথিবীর সবখানে আমাদের ঘর,
কারণ হৃদয় সবখানেই মানিয়ে নেয় ভাষা।
দেয়াল নয়, দরজা চাই বলেই
আমরা চলি—খোলা প্রশ্নের দিকে;
আজ যে পথ, কাল সে ঠিকানা হবে,
এই ভরসাতেই ঘর বানাই প্রতিটি দিকে।
অর্থহীনতার প্রান্তে ভাষা
সব শব্দ ভাষা হতে চায় না,
কিছু শব্দ কেবল অস্তিত্ব—
না বলা, না লেখা,
শ্বাসের আগের শূন্যতা।
তারা ভেসে থাকে
চিন্তার ও অনুভূতির মাঝখানে,
যেখানে মানে এখনো জন্মায়নি,
আবার হয়তো মরেও যায়নি।
ভাষা সেখানে দেরিতে পৌঁছায়,
হাত বাড়িয়ে দেখে—
কিন্তু ধরা পড়ে না কিছুই।
যেন সময় নিজেই নিজেকে ভুলে গেছে,
ভাবনা দাঁড়িয়ে আছ প্রশ্নচিহ্নের ছায়ায়।
এখনও লিখি অর্থ খোঁজার জন্য নয়,
বরং হারিয়ে যাওয়ার ভয় থেকে।
কারণ নীরবতা জানে—
সব সত্য বলা যায় না, কিছু সত্য কেবল
অনুভবের মতো থাকে, সংজ্ঞার বাইরে।
যখন একটি বাক্য জন্ম নেয়,
কিন্তু শেষ হতে অস্বীকার করে;
সে ঘোরে চেতনার প্রান্তে প্রান্তে,
যেখানে ভাবনা নিজের প্রতিচ্ছবি
আর চিনতে পারে না।
সেখানে ভাষা থেমে যায়,দর্শন শুরু হয়।
সব লেখা কবিতা নয়,
কিছু লেখা কেবল অপেক্ষা—
অর্থ আসবে কি না,
এই অনিশ্চয়তার দীর্ঘশ্বাস।
শব্দেরা বসে থাকে
নিজেদের অর্থহীনতাকে মেনে নিয়ে,
কারণ অর্থও একদিন ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
তবু কবিরা চিরকাল লিখি কারণ -
না লিখলে বিরাট শূন্যতা জমাট বাঁধে।
চিন্তা পাথর হয়, অনুভব হয়ে যায় ভারী।
আর মানুষ ধীরে ধীরে নিজের কাছেই
অব্যাখ্যাত থেকে যায় আদি-অনন্তকাল।
ডাকনামের আয়ু
ভিড়ের ভেতরেও সে আলাদা হয়ে থাকে,
নীরব চোখে জমে থাকা আলো—
প্রেম কখনো হারায় না তার ডাকনাম ,
চুপচাপ সে ফিরেও আসে স্মৃতির পথে।
সময় পাল্টায়, ঠিকানাগুলো ঝরে পড়ে,
কথারা অভিমানী হয়ে যায়,
তবু রাতের গভীরে কেউ ডাকে ধীরে—
প্রেম কখনো হারায় না তার ডাকনাম ।
ভাঙা ক্যালেন্ডারের পাতায় পাতায়
একই হাতের লেখা খুঁজে পাই,
মুছে গেলেও স্বাক্ষর, মন জানে—
প্রেম কখনো হারায় না তার ডাকনাম ।
শেষ পর্যন্ত কিছুই সঙ্গে থাকে না,
না দাবি, না প্রাপ্তির হিসেব,
তবু বুকের গভীরে লেখা থাকে—
1 Comments
সব কটি কবিতাতেই একই ভাবনা ফিরে ফিরে এসেছে ভিন্ন আঙ্গিকে,ভালো লাগলো।
ReplyDelete