জ্বলদর্চি

দর্শনের আলোকে/দশম পর্ব/স্বাতী ভৌমিক


দর্শনের আলোকে
দশম পর্ব

স্বাতী ভৌমিক

            
(কাম্যবিষয়ের প্রকৃত স্বরূপ জানলে এতো চাহিদা কি থাকতো!)

"মানুষ" তাকে বলা হয় যার মান এবং হুশ রয়েছে। এ কথা আমরা প্রায়শঃই শুনে থাকি। মান অর্থাৎ আত্মসম্মানবোধ এবং হুশ অর্থাৎ সচেতনতা। এবার প্রশ্ন হল, আত্মসম্মানবোধ তখনই আসা সম্ভব যখন ব্যক্তি আত্ম তথা নিজেকে জানবে। আর সচেতনতা তখনই তো আসবে যখন ব্যক্তি সুচেতনাসম্পন্ন হবে।

 আত্মার সাথে আত্ম কথাটি বিজড়িত। আত্মা সম্পর্কিত বিষয়ই আত্ম বা নিজের।এই জড়শরীর তো কর্মসম্পাদনের জন্য নিমিত্ত মাত্র। ব্যক্তির বেশিরভাগ কামনাই হয় জড়জগতকেন্দ্রিক অথবা দেহকেন্দ্রিক বিষয়সম্পর্কিত- যেগুলো অস্থায়ী-পরিবর্তনশীল।

 ব্যক্তি জীবনের বেশিরভাগ সময়ই "চাই চাই"- এর জয়ধ্বনির মধ্যেই কাটিয়ে দেয় । পায় কতটা তার হিসেব হয়তো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রশ্নচিহ্ন বা বিস্ময়চিহ্ন হয়েই থেকে যায়। এই জয়ধ্বনির পুরস্কারস্বরূপ ব্যক্তি অধিকাংশ ক্ষেত্রে পায়- হতাশা, উৎকণ্ঠা আর দুঃখরাশি। তবুও ওই যে চাহিদার  অভ্যেসে চাওয়া আর শেষ হয় না। আর এভাবে চলতে চলতে কবে যে জীবনের সীমানা ছাড়ানোর সময় এসে যায়, ব্যক্তি বুঝতেও পারে না। তখন সারাংশ দাঁড়ায়- জীবন দুঃখময়। কিন্তু প্রশ্ন হল, দুঃখের বীজ বপন করে তার পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকলে তা তো একদিন বৃক্ষ হয়ে  দুঃখরূপ 
ফল-ই প্রদান করবে- এটাই তো স্বাভাবিক। আর না হলে একটা উপায় অবশ্য আছে- দুঃখের মাঝেই সুখকে খুঁজে নিতে হবে- দুঃখবিলাসী মনে। কিন্তু তা তো হয় না।

" সচেতনতা" অর্থে চেতনা যুক্ত থাকা। ব্যক্তির সমস্যা হোলো, সে জীবন্ত তথা প্রাণযুক্ত থাকাকেই মনে করে সচেতন থাকা। কিন্তু নিজের সম্পর্কে জ্ঞাততা-ই হোলো সচেতনতা। কিন্তু এই জ্ঞান আছে ক'জনের! আর থাকলেও তার অনুসারী হয়ে নিজেকে তথা নিজের জীবনকে চালনা করেই বা ক'জন!

  জড়দেহের জীবনকাল সীমিত, আর জড়দেহ সম্পর্কিত চাহিদার জিনিস অনন্ত। এই অন্তহীন চাহিদার খোরাক জোগাতে জোগাতে ব্যক্তি বিপর্যস্ত হয়ে যায়। বৈরাগ্য যে মনে আসে না, তা নয়। কিন্তু জড়জগতের চাকচিক্যের অদম্য আকর্ষণকে অগ্রাহ্য করে প্রকৃত শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। চিত্তের তথা মনের ক্ষিপ্ত, বিক্ষিপ্ত এবং মূঢ় অবস্থা সামাল দিতেই এই জীবনকাল প্রায় শেষ করে ফেলে জীব।

  মানুষমাত্রেই ভুল করে- এটা ঠিক। কিন্তু মানুষের মনুষ্যরূপের অন্তরালে আত্মজ্ঞানলাভের যে ক্ষমতা মানুষের রয়েছে- এটাই তো তাকে সমস্ত দুঃখের সাগর থেকে ত্রান করে শান্তির অসীম আলোকে পৌঁছে দিতে পারে। এই জড়বিষয় এবং জড়শরীর-ই শেষ কথা নয়- এই জ্ঞানের আক্ষরিক উপলব্ধি নয়, মর্মোপলব্ধির মাধ্যমেই ব্যক্তি সকল দুঃখসাগর পার হয়ে যেতে পারে।


 এই জাগতিক বিষয়সমূহ ব্যক্তি -মনে কামনা-বাসনার সঞ্চার করে। আর মূঢ় মন তার সমস্ত দরজা- জানালা খুলে স্বাগত জানায় এই কামনা বাসনাকে। তারপর এর মায়াজালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলে নিজেকে। অজ্ঞানতার ঠুলিপরা চোখে বিবেক জ্ঞান হয় আবৃত। তারপর প্রকৃতির পরিবর্তনশীলতার নিয়মে যখন ওই জড়বিষয় পরিবর্তিত হয়, তখন ব্যক্তি মন তা সহজে মেনে নিতে পারে না। শুরু হয় দুঃখের পটভূমি। চাওয়া না থাকলে হারানোর ব্যাপারও থাকতো না। ব্যক্তিকে অযাচিত দুঃখ-কষ্ট পেতে হোতো না। তাই কাম্য বিষয়ের স্বরূপ জানলে কে-ই বা কাম্য বিষয়কে এত নিঃসংকোচে মনের ঘরে অন্তহীন অপরিবর্তনীয় মনে করে পোষণ করত!

 মন জড়বিষয়ের কামনা তৃপ্তির মাধ্যমে শান্তি পেতে চায়। ব্যক্তির সব চাহিদার মূল হলো শান্তি লাভ করা। কিন্তু শান্তি লাভ তো মিথ্যা ভরসার মাধ্যমে আসতে পারে না। শান্তি মানে একটি অবর্ণনীয়  স্থিতাবস্থা। বিষয় চাঞ্চল্য থাকলে স্থিরতা আসবে কোথা থেকে ? আর স্থিরতা না থাকলে শান্তি কখনোই আসতে পারে না।

 ব্যক্তি অন্যকে বোঝাতে জীবনের যে সময় অতিবাহিত করে, তার এক সিকি সময়ও যদি নিজেকে বোঝাতো তাহলে ব্যক্তির এতো দুঃখ থাকত না। বাস্তব বুঝেও অবাস্তবের কল্পনাকে বাস্তবে খুঁজতে গিয়ে ব্যক্তি মন হতাশার অন্ধকারে ডুবে যায়। এই জগতে চাহিদার পরিমাণ যত কম থাকবে, ব্যক্তির হারানোর তালিকাও ততো কম হবে। দুঃখের অঙ্করাশিও তখন কমে যাবে। ব্যক্তি ধীরে ধীরে শান্তি লাভ করবে। চেতনাময় জীবনযাপন করে ব্যক্তি জীবন্মুক্তির আনন্দ অনুভব করতে পারবে।।

ক্রমশঃ..

Post a Comment

0 Comments