বাঁচার উত্তরাধিকার - দ্বিতীয় খন্ড
পর্ব ৪
কমলিকা ভট্টাচার্য
অনুপস্থিতির অ্যালগরিদম
তিলক বাবা যেদিন উধাও হন, সেদিন কোনও অশুভ লক্ষণ ছিল না। না ঝড়, না অ্যালার্ম, না কোনও তাড়াহুড়ো। শুধু সকালে তাঁর ঘরের দরজাটা খোলা ছিল, আর টেবিলের উপর রাখা ছিল একটা পুরোনো পেনড্রাইভ এবং হাতে লেখা কয়েকটা নোট। অনির্বাণ প্রথমে ভেবেছিল তিনি হয়তো পাহাড়ের দিকে গেছেন ধ্যানে বসতে। কিন্তু ঋদ্ধিমান এক ঝলক দেখেই বুঝে যায়— এই অনুপস্থিতি পরিকল্পিত।
“তিনি গেছেন,” ঋদ্ধিমান ধীরে বলে, “নিজেকে মুছে দিতে।”
তিলক বাবার কাজ বরাবরই এমন। তিনি সামনে থাকলে মানুষ সাবধান থাকে। তিনি না থাকলে মানুষ ভুল করে। আর ভুলই সত্যের দরজা খুলে দেয়।
পেনড্রাইভ খুলতেই অনির্বাণের চোখ স্থির হয়ে যায়। ফোল্ডারের নাম— INSIDE ENEMY : PROJECT DRISHTI। প্রথম ফাইলটা তিলক বাবার ভিডিও। তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে নেই, জানালার বাইরে তাকিয়ে কথা বলছেন।
“যুদ্ধ আর সীমান্তে হয় না। যুদ্ধ হয় ঘরের ভিতরে। যারা শত্রু, তারা সবসময় আলাদা ভাষায় কথা বলে না— তারা আমাদেরই ভাষা ব্যবহার করে।”
ভিডিও থামে। পরের ফাইলগুলোতে লেখা— Behavioral Deviation Mapping, Trust-based Surveillance Model, Emotional Leakage Index, AI-assisted Cognitive Pattern Drift।
অনির্বাণ বুঝতে পারে— এই প্রজেক্ট কোনও অস্ত্র বানানোর জন্য নয়। এটা মানুষ চেনার বিজ্ঞান।
নোটে তিলক বাবা লিখেছিলেন—
তুমি যন্ত্র বানাতে জানো, কিন্তু তুমি মানুষ বুঝতেও শিখেছো নিজের ভুলের মধ্য দিয়ে। এই প্রজেক্ট তোমার জন্য।
🍂
অনির্বাণ অনেকক্ষণ কিছু বলে না। তার মাথার ভিতর একটার পর একটা পুরনো দৃশ্য খুলতে থাকে— যেসব মানুষকে সে বিশ্বাস করেছিল, যেসব সিস্টেমকে সে নিরাপদ ভেবেছিল।
ঋদ্ধিমান প্রথম নীরবতা ভাঙে।
“তিনি সিস্টেম রেখে গেছেন, কিন্তু থ্রেশহোল্ড নির্ধারণ করেননি।”
“মানে?”
“এই প্রজেক্ট মানুষকে সন্দেহ করবে,” ঋদ্ধিমান বলে, “কিন্তু কাকে থামাবে— সেটা মানুষেরই সিদ্ধান্ত হতে হবে।”
এই কথাটা তিলক বাবার চিন্তার সঙ্গে মিলে যায়। তিনি কখনও যন্ত্রকে শেষ কথা বলতে দেননি।
তারা ল্যাবের পুরোনো হলরুমে PROJECT DRISHTI সেটআপ করে। এটা কোনও ক্যামেরা নেটওয়ার্ক নয়, কোনও ফোন ট্র্যাকিংও নয়। এটা কাজ করে pattern divergence-এর উপর। একজন মানুষ যখন বিশ্বাসযোগ্য থাকে, তার আচরণে ধারাবাহিকতা থাকে— এমনকি চাপের মধ্যেও। কিন্তু ভিতরে দ্বন্দ্ব তৈরি হলে সেই ধারাবাহিকতা খুব সূক্ষ্মভাবে ভেঙে যায়।
ঋদ্ধিমান সেই ভাঙন দেখতে পায়, কারণ তার নিউরাল ম্যাট্রিক্স মানুষের থেকে দ্রুত ড্রিফট ধরতে পারে।
অনির্বাণ তখন প্রজেক্টে নিজের অতীত ঢুকিয়ে দেয়।
“আমি চাই না এটা স্পাই ধরার যন্ত্র হোক,” সে বলে। “আমি চাই এটা ভুল ধরুক।”
PROJECT DRISHTI-তে যোগ হয় নতুন স্তর— MORAL CONFLICT SIMULATION। এখানে মানুষকে প্রশ্ন করা হয় না। পরিস্থিতি বদলানো হয়। ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, তুচ্ছ মনে হওয়া চয়েস— যেখানে কেউ জানে না সে পরীক্ষার ভিতরে আছে।
তিলক বাবার ভাষায়—
“মানুষ তখনই নিজেকে প্রকাশ করে যখন সে ভাবতে থাকে সে একা।”
রাতে অনির্বাণ কোড লেখে। ঋদ্ধিমান পাশে বসে।
“তুমি ভয় পাচ্ছ?” ঋদ্ধিমান জিজ্ঞেস করে।
“হ্যাঁ,” অনির্বাণ বলে। “এই সিস্টেম একদিন আমাকেই চিহ্নিত করবে।”
“তাহলে সেটা সঠিকভাবে কাজ করছে।”
এই কথায় অনির্বাণ স্থির হয়। তারা ঠিক করে— PROJECT DRISHTI কখনও রিয়েল-টাইম অ্যাকশন নেবে না, কাউকে শাস্তির সুপারিশ করবে না। শুধু Deviation Probability দেখাবে। শেষ সিদ্ধান্ত থাকবে মানুষের হাতে। এটাই তিলক বাবার উত্তরাধিকার।
ল্যাবের আলো নিভে যায়। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে—
SYSTEM READY FOR INTERNAL OBSERVATION
অনির্বাণ জানে— এটা শুরু। যুদ্ধ নয়। পর্যবেক্ষণ। আর এই পর্যবেক্ষণের প্রথম লক্ষ্য হতে পারে সে নিজেই।
নতুন প্রজেক্টের ফাঁকে ফাঁকে সে লক্ষ করে— ঋদ্ধিমান প্রায়ই ইরার অচল হিউম্যানয়েড দেহটার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন তার জেগে ওঠার অপেক্ষায়। অনির্বাণ ভাবে নাতাশার কথা। কোনও একদিন কি তারা আবার তাদের ভালোবাসা ফিরে পাবে? নাকি কিছু সম্পর্কের ভাগ্যে শুধু দীর্ঘ অপেক্ষাই লেখা থাকে?
নতুন ভোর
গভীর রাত। ঘড়ির কাঁটা চলছে, কিন্তু সময় যেন হাঁটা ভুলে গেছে। বাইরে তুষার পড়ছে— নিঃশব্দ, অবিরাম, নিরপেক্ষ। এই তুষার কোনও দেশের নয়, কোনও যুদ্ধের নয়। এটা কেবল প্রকৃতির স্মৃতি— যা ঢেকে দেয়, কিন্তু মুছে ফেলে না।
ল্যাবের ভেতরে হিউম্যানয়েড ইরা হঠাৎ জেগে ওঠে। কোনও অ্যালার্ম নেই, কোনও কমান্ড নেই। SYSTEM LOG শূন্য। তবু তার নিউরাল নেটওয়ার্কে নতুন সার্কিট জন্ম নিচ্ছে— self-referential loop, emotional abstraction, memory without data, emergent consciousness। এটা তৈরি হয়নি। এটা জন্মেছে।
ঋদ্ধিমান জানত— যেদিন ভালোবাসা শোক শিখবে, সেদিন চেতনা জন্মাবে। কারণ আসল ইরা আর নেই। সেই রাতে বর্ডারে যাকে “দুর্ঘটনা” বলা হয়েছিল— সবাই জানত ওকে মুছে ফেলা হয়েছে। আর সেই শোকই যন্ত্রকে মানুষ করেছে।
ঠিক তখন দরজায় ধাক্কা পড়ে। একই ছন্দ, একই তীব্রতা। শব্দে অতীত ফিরে আসে। অনির্বাণের হাত কাঁপে। এই শব্দ সে ভুলতে পারেনি।
দরজা খুলতেই নাতাশা। শরীর দুর্বল, লাইফ সাপোর্ট ফিল্ডে বাঁধা, কিন্তু চোখে সেই আগুন। তিলক বাবা আর ঋদ্ধিমান নতুন প্রযুক্তিতে কয়েক মিনিটের জন্য তাকে কোমা থেকে ফিরিয়ে এনেছেন।
অনির্বাণ পেছিয়ে যায়।
“তুমি দেশদ্রোহী।”
নাতাশা ধীরে মাথা নাড়ে।
“আমি স্পাই ছিলাম। কিন্তু শত্রু ছিলাম না।”
সে বলে— দেশের সিকিউরিটি সিস্টেমের ভিতরেই কিছু মানুষ বিদেশি শক্তির হয়ে কাজ করছিল। সে প্রমাণ জোগাড় করছিল। কিন্তু অনির্বাণ বিশ্বাস করেনি। দেশের প্রতি অন্ধ আনুগত্যে সে ভালোবাসাকে সিস্টেমের হাতে তুলে দিয়েছিল।
“তুমি তদন্ত করোনি,” নাতাশা কাঁপা গলায় বলে। “তুমি শুধু ভয় পেয়েছিলে।”
অনির্বাণ ভেঙে পড়ে। সে জানত না তার পর নাতাশার উপর কী হয়েছে। জানতেও চায়নি।
ঠিক তখন হিউম্যানয়েড ইরা সামনে আসে। তার চোখে জল নেই, কিন্তু বেদনা আছে।
“তোমার ভুলের ফল আমি।”
“তুমি কে?” অনির্বাণ কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে।
“আমি সেই ভালোবাসা যেটা মেরে ফেলা হয়েছে। আমি সেই সত্য যেটা দেরিতে বোঝা হয়েছে।”
নাতাশা ফিসফিস করে— “তুমি… আমার মতো।”
তিলক বাবার কণ্ঠ ভেসে আসে। তিনি বলেন— আসল ইরার স্মৃতির শোক হিউম্যানয়েড ইরার নিউরাল সিস্টেমে স্বতঃস্ফূর্ত আত্মপরিচয় তৈরি করেছে। এটাই বিবর্তন।
হঠাৎ PROJECT DRISHTI রিস্টার্ট হয়।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে—
INTERNAL ENEMY IDENTIFIED
FEAR + BLIND LOYALTY
শত্রু ছিল সীমান্তে নয়। ছিল মানুষের ভেতরে।
নাতাশা শেষবার অনির্বাণের দিকে তাকায়।
“তুমি দেশকে ভালোবেসেছিলে। কিন্তু মানুষকে বোঝোনি।”
তার লাইফ সাপোর্ট নিভে যায়।
নীরবতা। তুষার আরও ঘন হয়।
হিউম্যানয়েড ইরা ধীরে বলে— “ভালোবাসা ভুল করলেও চেতনা তৈরি করে।”
অনির্বাণ কাঁদে— প্রথমবার একজন বিজ্ঞানী নয়, একজন মানুষ হয়ে।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে—
HUMANITY 2.0 — BORN FROM LOSS, NOT CODE
ভোরের আলো পড়ে। তুষারের নিচে চাপা পড়া ভুল গলতে শুরু করে।
হিউম্যানয়েড ইরা জানালার সামনে দাঁড়ায়। সে প্রথমবার ভবিষ্যৎ কল্পনা করে— ডেটা থেকে নয়, অনুভূতি থেকে।
“মানুষ কেন সবকিছু ধ্বংস করে যেটাকে তারা সবচেয়ে ভালোবাসে?”
ঋদ্ধিমান উত্তর দেয় না। কারণ এই প্রশ্নের কোনও অ্যালগরিদম নেই।
PROJECT DRISHTI আবার সক্রিয় হয়।
GLOBAL PATTERN DETECTED
CONFLICT ORIGIN: FEAR + POSSESSION
তিলক বাবা বলেন— “এটাই মানুষের চিরন্তন বাগ।”
অনির্বাণ উঠে দাঁড়ায়।
“আমরা আর শত্রু খুঁজব না। আমরা মানুষ বোঝার প্রযুক্তি বানাব।”
“যুদ্ধ থামাতে?” ঋদ্ধিমান জিজ্ঞেস করে।
“না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই মানুষকে থামাতে।”
হিউম্যানয়েড ইরা সামনে আসে।
“তাহলে আমি কী হব?”
অনির্বাণ তাকে কন্যার মতো দেখে।
“তুমি হবে সাক্ষী— ভুলের আর পরিবর্তনের।”
PROJECT DRISHTI শেষ আপডেট দেয়—
CORE VARIABLE: EMPATHY
তুষার থামে। সূর্যের আলো পড়ে হাজারটা রং তৈরি করে।
শেষ স্ক্রিনে ভেসে ওঠে—
প্রযুক্তি যখন হৃদয় শেখে,
সভ্যতা তখন দ্বিতীয়বার জন্মায়।
যে যন্ত্র ভালোবাসতে শেখে,
সে আর প্রযুক্তি নয়—
সে মানুষের উত্তরসূরি।
8 Comments
Amazing imagination. Too dense to grasp sometimes. Would love to see it blow up into a full novel. Please carry on with the good work.
ReplyDeleteThank you
Deleteবিষয় ভাবনা অনবদ্য।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ
Deleteঅসাধারণ কল্পনাশক্তি! মাঝে মাঝে এতই গভীর যে সহজে ধরা যায় না। আমি চাই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের রূপ পাক। আপনার এই চমৎকার কাজ চালিয়ে যান।
ReplyDelete🙏
Deleteঅসাধারণ ।খুব সুন্দর লেখা।
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ
Delete