জ্বলদর্চি

দর্শনের আলোকে /অষ্টম পর্ব /স্বাতী ভৌমিক

দর্শনের আলোকে 
অষ্টম পর্ব 
 
স্বাতী ভৌমিক 

              
( দর্শনের আলোকে মুক্তি বা মোক্ষ)

 ভারতীয় দর্শনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হোলো মুক্তি বা মোক্ষ। ভারতীয় দর্শন আলোচনার লক্ষ্য হোলো জাগতিক দুঃখ- দুর্দশাক্লিষ্ট জীবন থেকে চিরনিষ্কৃতি লাভ।

 মুক্তি হল দুই প্রকার- জীবন্মুক্তি ও বিদেহমুক্তি। জীবন্মুক্তি হল জীবিত কালে মুক্তিলাভ করা। বিদেহ মুক্তি বলতে বোঝায়, মৃত্যুর পর যে মুক্তিলাভ হয়। মুক্তি কথার সাধারণ অর্থ হোলো,  কোন কষ্টকর অবস্থা থেকে নিঃষ্কৃতিলাভ বা স্বাধীনভাবে থাকা।

 মুক্তি সবারই কাম্য। সবাই বন্ধনক্লিষ্ট অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি চায়। কিন্তু প্রশ্ন হোলো, এই বন্ধন আসে কোথা থেকে? এই বন্ধন দশা থেকে মুক্তির উপায়-ই বা কি?

 এই জগত মায়াময়। জাদুকর জাদুপ্রদর্শনের সময় যেমন স্বীয় জাদুবিদ্যার পারদর্শিতায় মায়াজাল সৃষ্টি করে, দর্শকের প্রকৃত দৃষ্টি ক্ষমতার অন্তরালে নিজ জাদুপটিয়সীয়তাকে রেখে তিনি দর্শককে অন্য কিছু প্রদর্শন করান, প্রকৃত জিনিস দৃষ্টির অগোচরেই থেকে যায়, ঠিক তেমনি মায়া- মোহও সেই রকম ভাবে ব্যক্তির সচেতন বোধ- ক্ষমতাকে আবৃত করে দেয় এবং জগতের বিষয়ের প্রকৃত স্বরূপ বুঝতে দেয় না। ডানালব্ধ পিপীলিকা যেমন প্রজ্জ্বলিত অগ্নির দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে তাতে পড়ে দগ্ধ হয় অথবা দগ্ধন জ্বালা সহ্য করে ছটফট করে, সেখান থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য, তেমনি জড়কামনা- বাসনা তাড়িত হয়ে ব্যক্তি জড়চেতনায় নিমগ্ন হয়ে পরিণতিতে প্রাপ্ত দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য ছটফট করে। 

 পার্থিব জগতে থেকেও এর ঘেরাটোপে নিজে আবদ্ধ না হওয়াই হোলো জীবন্মুক্তি। মুক্ত চেতনার অধিকারী ব্যক্তির পক্ষেই তা সম্ভব। জাগতিক বিষয়ে ব্যবহারিক জ্ঞানের সাথে সাথে বিষয়ের প্রকৃত স্বরূপের জ্ঞান তথা অস্থায়ী অবস্থার জ্ঞান থাকলে, ব্যক্তি কখনো জাগতিক প্রাণঘাতী বন্ধনের জালে জর্জরিত হয় না। 
🍂

 চেতনা যেখানে মুক্ত থাকে, চিত্তও সেখানে মুক্ত থাকে। আর জগতের হাজারো বন্ধনের মধ্যে থেকেও ব্যক্তি মুক্তির স্বাদ অনুভব করতে পারে, এটাই হল জীবন্মুক্তি।

 জীবিত কালে মুক্তির স্বাদ পেতে সবাই সক্ষম হয় না। কারণ জাগতিক ভোগ্য বিষয়ের চাকচিক্যে বা সাড়ম্বর আয়োজন উপস্থাপনায় ব্যক্তি যা সুখের উপকরণ বলে মনে করে, পরিণতিতে তা-ই তার দুঃখের কারণ হয়। আসল কথা হোলো, জ্ঞানের আলোক যদি না লাভ করা যায় তাহলে অজ্ঞানতার অন্ধকার জীবনকে ভুল পথে পরিচালিত করে, দুঃখ বিলম্বনাময় জীবনে নিক্ষেপ করে।

 সঠিক পথ নির্বাচন করা ব্যক্তির পক্ষে অনেক সময়ই দুর্বোধ্য হয়ে পড়ে। মরীচিকা যেমন তৃষ্ণার্ত পথিককে প্রাণদায়ী জলের আশায় মরুভূমিতে প্রতারিত করে, ঠিক তেমনি মোহাবিষ্ট ব্যক্তি সেই ভাবে বৃথা সুখের অন্বেষণে শুধু দুঃখের পটভূমি রচনা করে চলে। এইভাবে ভ্রমময় পথে চলতে চলতে অনেক সময় ব্যক্তি বুঝতে পারে তার বৃথা সুখ অন্বেষণ এর ব্যর্থ প্রচেষ্টার ইতিহাস আর তখনই সে মুক্তির জন্য হাহাকার করে।

 এবার আলোচনায় আসা যাক্, মুক্তির জন্য কি করনীয়? মুক্তির জন্য প্রথমেই যা প্রয়োজন তা হোলো, নিজসত্তার জ্ঞান। নিজেকে ভালো করে বোঝা, জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা,সেই লক্ষ্য লাভের জন্য যথাযথ কর্ম প্রণালী স্থির করা ও তাতে একনিষ্ঠভাবে প্রচেষ্টারত থাকা। দৈনন্দিন কর্মের সাথে সাথে জ্ঞানার্জন করা ও জ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত থাকা খুবই প্রয়োজন। কারণ জ্ঞান-ই আনে চেতনা আর চেতনা আনে হৃদয় আকাশে মুক্তির মুক্ত আকাশ। ব্যক্তি তখন প্রকৃত শান্তি লাভ করে। উচ্চতর শান্তির খোঁজ পেলে ব্যক্তি তখন আপনা থেকেই তার কর্তব্যকর্ম নির্ধারণ করতে পারে। এবং বিবেকের প্রত্যাদেশে জীবনের ভ্রমময় বিক্ষিপ্ত সুখ অন্বেষণ থেকে বিরত হয়।

 এই প্রকৃত কর্তব্যকর্ম নির্বাচনের জন্য চাই, সঠিক বিচারক্ষমতা। এই বিচারক্ষমতা আসে, সঠিক আত্ম উপলব্ধি তথা জীবন উপলব্ধির মাধ্যমে। এই জগতে চির সুখ লাভ কখনই সম্ভব হয় না। কর্মময় পৃথিবীতে জীব বিষয় বাসনায় সদা ব্যাপৃত থেকে কর্ম করে চলে।এই কামনা- বাসনা জর্জরিত কর্মই ব্যক্তিকে জাগতিক কর্মবন্ধনে আবদ্ধ করে- সুখ-দুঃখের ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত হয় জীবনের চাকা। ব্যক্তি নিজের আনন্দময় শাশ্বত সত্তাকে ভুলে গিয়ে অস্থায়ী সুখের চিরস্থায়িত্বের আশায় বাইরের জগতের মোহে দুঃখ দুর্দশার শিকার হয়। এই দুঃখ সাগরে নিমজ্জিত হয়ে দম বন্ধ করা অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ব্যক্তি উদ্গ্রীব হয়ে ওঠে। কিন্তু এই দুঃখ দুর্দশা থেকে নিষ্কৃতি পেতে হলে চাই কর্তব্যের জন্য কর্তব্যকর্ম অনুষ্ঠিত করা, যে কর্মফল লাভের বাসনার মোহ ব্যক্তিকে কর্মবন্ধনে আবদ্ধ করবে না। কর্মফল যা-ই হোক না কেন, ব্যক্তিকে তা দুঃখ- দুর্দশাক্লিষ্ট পরিস্থিতির মধ্যে আবদ্ধ করবে না। কারণ ব্যাক্তি এক্ষেত্রে কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে কর্ম অনুষ্ঠিত করে।।

 ক্রমশঃ...

Post a Comment

0 Comments