দূর দেশের লোকগল্প— ২৭৬
কুমির কেন জলেই থাকে
সাভানা (আফ্রিকা)
চিন্ময় দাশ
আফ্রিকার সাভানা এলাকা খুব বিখ্যাত। সাধারণভাবে বনভূমি আর মরুভূমির মাঝে প্রশস্ত এলাকাকে সাভানা বলা হয়। সবুজ ঘাসে ঢাকা এলাকা। মাইলের পর মাইল বিস্তৃত তৃণভূমি অঞ্চল। হাতি সিংহ জেব্রা এমন এসব বড় বড় প্রাণীদের বিচরন ভূমি।
এক বছর সাভানা এলাকায় ভীষণ খরা। দীর্ঘকাল বৃষ্টি নাই। বড় গাছের কথা বাদ দাও। সাভানা জুড়ে যে সবুজ ঘাসের গালিচা বিছানো, সেগুলোও শুকিয়ে খড় হয়ে গিয়েছে। মাটি ফুটো ফাটা। জলের ভয়ানক অভাব। বড় বড় প্রাণীদের বিপদ হয়েছে সবচেয়ে বেশি।।
এটা এমন সময়ের কথা, যখন কুমিররাও অন্য সব প্রাণীদের সাথে ডাঙাতেই থাকতো। এক সাথে থাকলে কী হবে, কুমির যে অতি ধূর্ত আর বদমাইশ-- সেটা জানতো সবাই। কুমিরও তার স্বভাব অনুযায়ী সাবধানে থাকে। অন্যরা যখন লড়াই করে, সে দূর থেকে মজা দেখতে থাকে।
এখন এই খরার সময়ে মওকা হয়ে গেল কুমিরের। সে ভাবল, সবাই তো জলের সমস্যায় পড়েছে। আমাকে এবার এই সুযোগটা নিতে হবে। খবরদারি করতে হবে সবার উপরে।
শুকনো খটখটে মাঠের মধ্যে একটা ডোবা মত জায়গা ছিল। এখনো সামান্য কিছু জল টিকে আছে তাতে। কুমির আগেভাগে গিয়ে সেটিকে দখল করে বসে আছে। একদিন অন্য সব প্রাণীরা সেখানে এসে জড়ো হয়েছে, এক ঢোক জলের আশায়।
কুমির চেঁচিয়ে বলল-- জল খাওয়ার ধান্দা ছেড়ে দাও। এইটুকুন মাত্র জল। এ আমি কাউকে মুখ লাগাতে দেব না।
হাতি বলল-- অন্তত এক ঢোক করে জল খেতে দাও নইলে মারা পড়বো যে সবাই।
কুমির বলল-- জল আমি দেবো না, সে তো তোমরা ভালো করেই জানো। তবে মারা যাতে না পড়তে হয়, তার একটা পথ আমি দেখাতে পারি।
সবাই বললো, বল কি তোমার পথ।
কুমির মনে মনে ভাবল, হয়রাণ করবার এই সুযোগ। হাত ছাড়া করা যাবে না। বলল-- ঘন জঙ্গলের ভেতরে একটা জায়গা আমি জানি। যথেষ্ট জলও আছে এখনো। খাওয়া-দাওয়াও সেখানে পাওয়া যাবে। সব কষ্ট লাঘব হয়ে যাবে তোমাদের। আমার কথা মানতে চাও, তো চলো আমার সাথে।
দলের মধ্যে অনেকেই ভাবল, এতদিনে একজন উদ্ধারকারী পেয়েছি। যে আমাদের কষ্ট অনুভব করতে পারে। এমন পরোপকারী সহজে পাওয়া যায় না। কিন্তু তারা যেটা জানতো না, সেটা হলো অন্যদের উপকার করা কুমিরের আদৌ ইচ্ছে নয়। সে কেবল সবাইকে হয়রান করে প্রতারিত করতে চাই মাত্র।
কুমির আগে আগে চলেছে। বাকি সবাই দল বেঁধে চলেছে তার পেছন পেছন। কিন্তু যে রাস্তায় চলেছে, ভারি দুর্গম। খানা-খন্দ, এবড়ো-খেবড়ো। খরায় ভুগে ভুগে সকলেরই শরীর কাহিল। এমন রাস্তায় চলতে হয়রান হয়ে যাচ্ছে সবাই। কিন্তু জল না হলে যে চলে না। কুমির বলেছে, খাবারও নাকি সেখানে পাওয়া যাবে। সেই আশায় সবাই তার পিছনে চলেছে।
একদিন গেল। দু’দিন গেল। সকলেরই অবস্থা একেবারে কাহিল। আর একটা পা-ও নড়ে, এমন অবস্থা কারও নাই। কেউ কেউ ভাবতেও শুরু করেছে, কুমির কি সত্যি কথা বলেছে তাদের? না কি, বদমাইশি করছে। মেরে ফেলতে চায় এতগুলো প্রাণীকে।
হাতিটাও ছিল সেই দলে। সে অবশ্য ভীড়ের মধ্যে ঢোকেনি। একটু দূরত্ব রেখে আড়ালে আড়ালে চলছিল। প্রথম থেকেই কুমিরের কথা তার বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু আর সবাই তখন এক ঢোক জলের জন্য কাতর। তারা সবাই বিশ্বাস করেছিল কুমিরকে।
দু’দিন যখন কেটে গেল, জল তো দূরের কথা, একটা ডোবারও কোন দেখা নেই। খানাখন্দ পাথর কাঁটায় ভরা রাস্তা। এই রাস্তার কোথায় শেষ, তাও বোঝা যাচ্ছে না। হাতির সন্দেহ পাকা হলো।
হাতির বুঝতে দেরি হোল না। কুমির আসলে ফন্দি করে তাদের বিপদের মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে এবার গলা তুলে বলল—শোনো, বন্ধুরা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সবাই আমরা ভুল পথে চলেছি। ভুল জনকে বিশ্বাস করেছি আমরা। কুমির আমাদের ঠকাচ্ছে। আর এক-দু’দিন গেলে, মারাও পড়তে পারি আমরা।
হাতির উঁচু গলা। সবাই চেনে ভালোমানুষ হাতিকে। তারা বলল—মনে হয়, ঠিকই বলছ তুমি।
হাতি বলল—আমার কথা শোন। আর একটাও পা-ও এগোব না আমরা। এখানেই থেমে যাওয়া দরকার আমাদের।
অনেকেরই বিশ্বাস হল কথাটা। জানতে চাইল, এখন তাহলে আমরা কী করব?
হাতি বলল-- প্রথম কাজ শয়তানকে চেনা। তার সঙ্গ ছেড়ে দেওয়া। আমরা যেখানে ছিলাম, কষ্ট হলেও সেখানেই ফিরে যাওয়াই আমাদের পক্ষে মঙ্গল।
সবাই মাথা নাড়তে লাগল। সঠিক কথাই বলছে হাতি। হাতি বলল-- এটা আমাদের জায়গা নয়। এবং এই জায়গা আমাদের টিকে থাকার উপযুক্তও নয়। ভুল জায়গায় নিয়ে এসেছে আমাদের। চলো, সবাই আমরা ফিরে যাই।
দোনামনা ভাব কাটিয়ে, হাতির কথা মেনে নিল সবাই। কিন্তু সিংহ এগিয়ে এলো সামনে। বলল-- বেশ বুঝতে পেরেছি ।ও হতভাগা বদমাইশি করেছে আমাদের সঙ্গে। খুব ঠকিয়েছে। বিপদের মধ্যে ঠেলে দিচ্ছিল সবাইকে। ওকে শাস্তি না দিয়ে, আমাদের ফিরে যাওয়া ঠিক নয়।
সকলেই সায় দিল সিংহের কথায়-- মেরে ফেলো ব্যাটাকে। বেঁচে থাকার কোনও হক নাই ওর আর।
সবাই দল বেঁধে তেড়ে যাচ্ছে কুমিরকে। এতক্ষণে কুমিরও বুঝতে পেরেছে, বেমালুম ভুল হয়ে গেছে। সবাই চিনতে পেরে গেছে তাকে।বদমাইশি ধরে ফেলেছে তার।
হাতি এগিয়ে এসে বলল-- আমাদের বিপদ আমরা বুঝতে পেরেছি, সেটাই যথেষ্ট। কাউকে মেরে ফেলা ঠিক কাজ নয়। বিধাতার জীব আমরা সবাই। নিজেদের মধ্যে হানাহানি করা, মারামারি করা সঠিক কাজ নয়। ওটা আমরা করব না।
সিংহ বলল—তা অবশ্য ঠিক। কিন্তু এমন একটা বদমাইশকে ছেড়ে দেবো? আবার কবে না কবে ঠকাবে আমাদের।
হাতি বলল-- ও যাতে আর কখনোই ঠকাতে না পারে, কোনও বিপদ ডেকে আনতে না পারে-- সেই ব্যবস্থাটা আমাদের করে নিতে হবে এখনই।
সব্বাই বলল-- তাহলে তুমিই বল, কী ব্যবস্থা করা যাবে কুমিরের।
🍂
হাতি বলল-- এই হতভাগাকে এখানে ছেড়ে যাওয়া যাবে না। ওকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে চলো আমাদের সামনে সামনে। তারপর ওকে দূরে কোথাও নদীতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কোনদিন আর ডাঙায় উঠতে পারবে না ও। ডাঙ্গায় যদি উঠতে না পারে, তাহলে আমাদের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও আর হবে না ওর। ভুল বুঝিয়ে বিপদে ফেলে দেওয়ার কোনো সুযোগই থাকবে না ওর হাতে।
হাতি রায় দিয়ে দিল-- আজ থেকে কুমিরের সঙ্গে ডাঙার আমরা কেউ মেলামেশা করব না। জলেই ০
সবাই মেনে নিল হাতির কথা। সবাই তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে চলল কুমিরকে। যে জায়গা থেকে রওণা হয়েছিল সবাই, সেখানে হাজির হলো। এবার কুমিরকে তাড়াতে শুরু করলো সিংহ। সে হাতিকে বলল-- তোমার কথা আমরা শুনেছি। ওর গায়ে হাত তুলিনি। এবার আমার কথা তুমি শোনো। আমি ওকে তাড়িয়ে নিয়ে যাব নদী পর্যন্ত। নদীতে জলে ফেলে, তবে আমি ফিরে আসবো। কথা দিচ্ছি, আজ কুমিরের কোন বিপদ আমি ঘটাবো না। তোমার পরামর্শ মাথা পেতে নেব। তবে হ্যাঁ একটা কথা আছে আমার।
হাতি হাসি মুখ করে বলল—বল, তোমার কী কথা।
সিংহ বলল-- আজকে ছেড়ে দিলাম। এর পরে কিন্তু আমি ছাড়বো না ওকে। যেদিনই নাগাল পাব, ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবো হতভাগাকে। এই আমি বলে রাখলাম।
সেদিন থেকে সেই ব্যবস্থা চলে আসছে। আর সব্বাই থাকে ডাঙা এলাকায়। শুধু কুমির থাকে না। সে থাকে আফ্রিকার নদীতে। ডাঙায় উঠলেই, সিংহ যে তাকে ছিঁড়ে খাবে, এটা খুব ভালো করেই জানে কুমির।
0 Comments