জ্বলদর্চি

স্বপন কুমার মণ্ডল (শিক্ষক, গবেষক, লেখক, খেজুরী) /ভাস্করব্রত পতি

মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ১৯৬

স্বপন কুমার মণ্ডল (শিক্ষক, গবেষক, লেখক, খেজুরী) 

ভাস্করব্রত পতি

আজও তাঁর কলম থামেনি। আজও তিনি সমানভাবে চঞ্চল। অবসরকালীন জীবনেও তিনি সমানভাবে কর্মকুশলী। এখনও তিনি লিখে চলেছেন অসংখ্য তথ্যসমৃদ্ধ বর্ণময় প্রবন্ধ। আকর গ্রন্থ। তিনি 'শিক্ষারত্ন' স্বপন কুমার মণ্ডল। 

খেজুরীর ভূমি সন্তান স্বপন কুমার মন্ডল লিখেছেন অজস্র বই। যেগুলি মেদিনীপুরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অন্যতম আকর। তাঁর লেখা ব ইয়ের সংখ্যা ১৮ টি। যেগুলি বিধৃত করে মেদিনীপুরের গর্বের বিষয়গুলি। তাঁর লেখা বইগুলি হল 'বরণীয় জীবন কথা'(২০০৫), 'খেজুরীর সেকাল একাল' (২০০৯), 'নানারঙের দিনগুলি' (২০১১), 'চেতনার নাটক' (২০১০), 'সার্ধ শতবর্ষে আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র' (২০১১), 'বরণীয় মনীষা' (২০১৩), 'বরণীয় মহাজীবন' (২০১৪), 'শিক্ষাব্রতী গিরিশচন্দ্র মাইতি' (২০২০), 'মনীষী নিকুঞ্জবিহারী' (২০২১), 'বরণীয়া মহীয়সী' (২০২২), 'কিংবদন্তী প্রধানশিক্ষক হরিপদ শাসমল' (২০২২), 'কৃতী প্রধানশিক্ষক, হরিপদ মণ্ডল' (২০২২), 'ইতিহাসকার মহেন্দ্রনাথ করণ' (২০২২), 'মহেন্দ্রনাথ করণ রচনা সংগ্রহ' (২০২৩), 'জাগরণ' (২০২৪), 'ক্যানভাসে নানারঙ' (২০২৫), 'স্বাধীনতা সংগ্রামে মেদিনীপুর, প্রথম খন্ড' (২০২৫) এবং 'দর্পণে নানারঙ' (২০২৬)। এইসব বইয়ের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে রয়েছে নিদারুণ পরিশ্রম আর নিবিড় ক্ষেত্রসমীক্ষার নির্যাস। নিজের মাতৃভূমির প্রতি অমোঘ ভালোবাসার সরস নির্যাস। 

১৯৫৪ এর ১০ ই অক্টোবর পূর্ব মেদিনীপুরের খেজুরী থানার চিঙ্গুড়দন্যা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন স্বপন কুমার মণ্ডল। পরবর্তীতে চলে আসেন এখানকার পূর্বচড়া গ্রামে। বাবা প্রণবেশ মণ্ডল ও মা ভক্তিমতী মণ্ডল। প্রণবেশবাবুও ছিলেন শিক্ষক। ফলে বাড়িতে একটা বলীষ্ঠ শিক্ষার পরিবেশ লেপটে ছিল। প্রাথমিক পাঠ সারেন খেজুরীর এক প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। এরপর কলাগেছিয়া জগদীশ বিদ্যাপীঠ হয়ে তাম্রলিপ্ত মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। এখান থেকে চলে যান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন অ্যাকাউন্টেন্সিতে। বলতে গেলে হিসাবশাস্ত্রকে আঁকড়ে ধরেই জীবনের হিসাব করতে শুরু করেন তখন। কিন্তু হিসাবের 'ইন্টিগ্রেশন ডেরিভেটিভ' থেকে একসময় আরও অনেক পথ এগিয়ে গিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন নিজের বাসভূমির অন্দরে লুকিয়ে থাকা মনিমুক্তোর খোঁজে। অতি সাধারণ সিঁড়িভাঙা অঙ্ক কষতেই বুঁদ হয়েছিলেন 'ডেভিড ক্রেডিটে'র বাতাবরণ থেকে মুক্ত হয়ে। 
নেতাজী পাঠচক্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে

প্রথমে চাকরি করতেন ডাক বিভাগে। আসলে তাঁর যেখানে জন্ম, সেই খেজুরীতেই একসময় গড়ে উঠেছিল ভারতের প্রথম ডাকঘর। স্বাভাবিকভাবেই এই ডাকবিভাগের প্রতি আত্মিক দুর্বলতা ছিল। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ভারতীয় ডাক বিভাগের কর্মী। তাঁর এই প্রাথমিক কর্মজীবন ছিল বর্ণময়। কিন্তু সেই চাকরি ছেড়ে দেন পাঁচ বছরের মধ্যে। মনের মধ্যে সাধ শিক্ষকতার জীবনে প্রবেশ করতে হবে। একজন আদর্শ শিক্ষক হতে হবে। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে। 

তাই শিক্ষকতাকে ভালোবেসে ডাক বিভাগের চাকরি ছেড়ে চলে আসেন খেজুরীর অন্দরমহলে। নিজের প্রিয় বিদ্যালয় কলাগেছিয়া জগদীশ বিদ্যাপীঠে ছাত্র ছাত্রীদের পড়াতে চলে আসেন। ১৯৮১ সালে এখানে সহশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। শুরু হয় শিক্ষক জীবন। চক ডাস্টার কালি কলম আর কচিকাঁচাদের সঙ্গে থাকতে থাকতে তিনি হয়ে ওঠেন আরও বেশি মাত্রায় শিক্ষানুরাগী। 

ইতিহাস ও সংস্কৃতির এলাকা খেজুরীর বুকে থাকা এই মানুষটি পারেননি নিজের জন্মভূমির গর্বের ইতিহাস থেকে দূরে থাকতে। সেইসব অকথিত ইতিহাসের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ জানতে এবং জানাতে অগ্রণী ভূমিকা নিতে থাকেন। খেজুরীর অন্দরমহল থেকে একটার পর একটা গবেষণাধর্মী গ্রন্থ উপহার দেওয়া শুরু করেন পাঠকদের। একদিকে বিদ্যালয়ে পাঠদান, অন্যদিকে আঞ্চলিক ইতিহাসের নিবিড় গবেষণায় বলীয়ান হয়ে ওঠেন স্বপন কুমার মন্ডল। 

শিক্ষকতার সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে পড়েন মানুষটি। ২০০১ সালে এই কলাগেছিয়া জগদীশ বিদ্যাপীঠে সহকারী প্রধানশিক্ষকের পদে আসীন হন। ২০১৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। যদিও তার আগেই তাঁর দীর্ঘ কর্মতৎপর শিক্ষক জীবনের রঙিন কাজের দরুন পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে 'শিক্ষারত্ন' পুরস্কার দেয়। ২০১৭ সালে 'খেজুরীর মুখ' পত্রিকা থেকে তাঁকে 'ঈশ্বরচন্দ্র প্রামাণিক স্মারক সম্মানে' সম্মানিত করা হয়। 
সেইসাথে তিনি বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কাজের বিস্তৃতি শুধু খেজুরীর বুকে নয়, মেদিনীপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রসারিত। এই মুহূর্তে তিনি মেদিনীপুর আঞ্চলিক ইতিহাসচর্চা কেন্দ্র, ভারতীয় রেডক্রশ সমিতি, নেতাজী পাঠচক্র, খেজুরী ইতিহাস সংরক্ষণ সমিতি, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞানমঞ্চ, কলাগেছিয়া প্রগতি পরিষদ পাঠাগার ও মেদিনীপুর সমন্বয় সংস্থার আজীবন সদস্য। সেইসাথে তিনি খেজুরীর লায়ন্স ক্লাবের সদস্য, খেজুরী প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও খেজুরী হেরিটেজ সুরক্ষা সমিতির সদস্য। বলতে গেলে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত এবং যুক্ত এইসব সংগঠনের সঙ্গে। 'কাজ'ই তাঁর নেশা। 'কাজ'ই তাঁর ভালোবাসা। বাহাত্তর বসন্তের কোকিলের ডাক শোনা এই কাজপাগল 'বাহাত্তুরে থুড়থুড়ে' প্রাণচঞ্চল মানুষটি যথার্থই মেদিনীপুরের গর্ব। মেদিনীপুরের মানুষ রতন।

🍂

Post a Comment

0 Comments