বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১০৯
ঝিন্টি
ভাস্করব্রত পতি
'মুখে তার লোধ্ররেণু, লীলাপদ্ম হাতে,
কর্ণমূলে কুন্দকলি, কুরুবক মাথে,
তনু দেহে রক্তাম্বর নীবীবন্ধে বাঁধা,
চরণে নূপুরখানি বাজে আধা আধা।'
-- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বপ্ন (কল্পনা)
কবির লেখনীতে এই কবিতায় উজ্জয়িনীপুরের শিপ্রানদী তীরের এক স্বপ্নমেদুর পরিবেশে তাঁর প্রিয়ার রূপের বর্ণনায় মাথায় কুরুবক ফুল বা ঝিন্টি ফুল গোঁজা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতে ঝিন্টি ফুল হল 'ডিসেম্বরের ফুল'। এখানকার মহিলাদের মাথার খোঁপায় এই ঝিন্টি ফুলের মালা লাগানো থাকে নিজেদের মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য।
সাদা ঝিন্টি
ঝিন্টিকে কুরুবক, কুরবক ছাড়াও বৃন্দাবন কলি, কেতকী, কুরচি, রক্তঝিন্টি, সাদাঝিন্টি, ঝাঁটি, জান্তি, ঝুঁটি, বনপাথালি নামেও ডাকা হয়। গ্রামবাংলার অতি পরিচিত এই ঝিন্টি বা ঝাঁটি ফুলকে সংস্কৃতে ঝিন্টি, ঝিন্টিকা, মারাঠিতে করোন্টা, হিন্দিতে ফটসরৈয়া, পিয়াবাসা, তেলুগুতে গোরেণ্ডু, ওড়িয়াতে কাঁটা অসেলিয়ো, কোঙ্কনিতে পৈঝুটী (শীতপুষ্প), কন্নড়ে গোরটে বলে। ইংরেজিতে ঝিন্টি হল Philippine Violet, Crested Philippine Violet, Bluebell Barleria ফুল। ফিজিতে এর নাম 'টমবিথি'।
পীত ঝিন্টি
ক্রান্তীয় এবং উপক্রান্তীয় এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে ঝোপ জাতীয় ভেষজ উদ্ভিদ ঝিন্টি গাছের ফুল বেশ দৃষ্টিনন্দন। ফুলটি পুষ্পপ্রেমীদের বাগানের শোভাবর্ধনকারী Ornamental plant হিসেবে বেশি সমাদৃত। ভারত ছাড়াও দক্ষিণ চিন, বাংলাদেশ, মায়ানমার, ফিলিপাইন, নেপালে প্রচুর জন্মাতে দেখা যায়। বর্ষার শুরুতেই বীজ থেকে নতুন চারা জন্মায়। এ রাজ্যে অঘ্রাণ মাসে আয়োজিত রাসপূর্ণিমার সময় থেকে ফুটতে শুরু করে এই ফুল। তাই এই উৎসবের নামেই ফুলটির নামকরণ হয়েছে 'রাসফুল'। উল্লেখ্য যে, ঠিক এই সময় মালাকার সম্প্রদায়ের লোকজন রাসোৎসবকে কেন্দ্র করে শুকনো শোলা কেটে যে ফুল তৈরি করে, তার নামও 'রাসফুল'।
নীল ঝিন্টি
যাইহোক, এই ঝিন্টিই কোনও এক সময় শিলাজিতের গানের একটি নারী চরিত্র হয়ে ওঠে। তখন তিনি গেয়ে ওঠেন --
'ঝিন্টি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস
এই মেঘলা দুপুরে
কত কাছাকাছি থাকতাম
ঝিন্টি তুই বৃষ্টি হতে পারতিস
ঝরে পড়তিস টিপ
টুপ টাপ গায়ে মাখতাম।'
এই গাছের ক্ষেত্রে চার রঙের ফুল দেখা যায়। একসাথে অনেক ফুল গুচ্ছাকারে ফোটে। সাদা ঝাঁটি বা শ্বেতঝিন্টিকে সংস্কৃতে সৈরেয়েক, সৌরেয় বলে। Acanthaceae পরিবারের সাদা ঝিন্টির বিজ্ঞানসম্মত নাম Barleria dichotoma। এদের ফুলের রঙ সাদা। তবে গাছে কোনো কাঁটা হয়না।
পীতঝিন্টি বা স্বর্ণঝিন্টি গাছের ফুলের রঙ হলুদ। সংস্কৃতে যার নাম কুরন্টক ও কিঙ্কিরাত। যদিও সহচর, পীতপুষ্প, সহচরী, দাসী নামেও চেনা যায় পীতঝিন্টিকে। এই গাছের অবশ্য কাঁটা রয়েছে। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Barleria priorities।
উজ্জ্বল নীল রঙের ফুল হয় নীলঝিন্টি গাছে। যাকে সংস্কৃতে আর্তগল এবং দাসী নাম দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও একে বানা, বাণ, সহচর, নীলকুরন্টক নামেও নামকরণ করা হয়েছে। এর বিজ্ঞানসম্মত নাম Barleria coerulea এবং Barleria cristata।
রক্ত ঝিন্টি
আবার রক্তঝিন্টির বিজ্ঞানসম্মত নাম Barleria ciliata। একে সংস্কৃতে কুরবক, অরুণঝিন্টি, লাল ঝিঁটি বলে। মোটামুটি এক হাতের মতো উঁচু হয়। যবের মতো ফল ধরে গাছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সঞ্চয়িতা' কাব্যগ্রন্থের 'মেঘদূত' কবিতায় পাই এই 'কুরুবক' ফুলের প্রসঙ্গ। কবি লিখেছেন --
'মঞ্জুলিকা মঞ্জরিণী ঝংকারিত কত।
আসত তারা কুঞ্জবনে চৈত্রজ্যোৎস্নারাতে,
অশোক শাখা উঠত ফুটে প্রিয়ার পদাঘাতে।
কুরুবকের পরত চূড়া কালো কেশের মাঝে,
লীলাকমল রইত হাতে কী জানি কোন কাজে'।
--- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মেঘদূত (সঞ্চয়িতা)
সর্পদংশনের প্রতিষেধক হিসেবে ব্যবহৃত হয় ভেষজ উদ্ভিদ ঝিন্টি গাছের বিভিন্ন অংশ। এর মূল এবং পাতার রস কফ কাশি, রক্তাল্পতা, ফুলে যাওয়া কমাতে সহায়ক খুব। তাছাড়া এটি মূত্রবর্ধক এবং রক্ত পরিশোধকও বটে। পূজার ফুল হিসেবে এটির ব্যবহার হচ্ছে ইদানিং।
🍂
1 Comments
কেতকী আলাদা। মাটিতে লুটায়। ঝিন্টিকে কুরচি বলে না। ভালো প্রয়াস।
ReplyDelete