জ্বলদর্চি

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি/ ৩৩ পর্ব /চিত্রা ভট্টাচার্য্য

ঘুমিয়ে গেছে গানের পাখি 
৩৩ পর্ব 

চিত্রা ভট্টাচার্য্য

(নজরুল সৃষ্ট রাগরাগিনী ও তাল )     

বাংলার সাহিত্য ও সঙ্গীতের এক বিস্ময়কর প্রতিভা ‘বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জনপ্রিয় বাঙালি কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, সংগীতস্রষ্টা, দার্শনিক, যিনি বাংলা কাব্যে অগ্রগামী ভূমিকার সঙ্গেসঙ্গে প্রগতিশীল প্রণোদনার জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তিনি বাংলা ভাষার অন্যতম সাহিত্যিক, দেশপ্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় কবি। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ – দুই বাংলাতেই তাঁর কবিতা ও গান সমানভাবে সমাদৃত।' বঙ্গভূমির সংগীতের আসরে তাঁর  আকাশছোঁয়া অবদান। তাঁকে পাওয়া যায় একজন জনপ্রিয়, সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত গীতিকার, সুরকার রূপে।

 কবি শুধু শব্দ সৃষ্টির জাদুতেই নয়,সুর তাল ও ছন্দের বৈচিত্র্যে ও এক অভূতপূর্ব উদ্ভাবক হয়ে নিঃসন্দেহে তিনি  বাংলা গানের বিশাল জগৎটির স্বর্ণসিংহাসনে এক অনন্য শ্রেষ্ঠ শিল্পী রূপে চিরকাল বিরাজ করবেন। তাঁর সৃষ্ট তালগুলি বাংলা সঙ্গীতকে দিয়েছে নতুন মাত্রা ও জীবন , যেখানে প্রতিটি সুরের মূর্ছনায় মিশে আছে মুক্তির জয়গান, প্রেমের কোমলতা, এবং সংগ্রামের দৃপ্ত আহ্বান। নজরুলের তালের বিন্যাসে যেমন পাওয়া যায় প্রাচীন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ছোঁয়া, তেমনই রয়েছে আধুনিক যুগের সাহসী ছন্দের প্রতিচ্ছবি। তাঁর সৃষ্ট তালের প্রতিটি ছন্দে যেন ধ্বনিত হয় মানুষের জাগরণ,মুক্তির আহ্বান ,প্রেমের উচ্ছ্বাস, এবং স্বাধীনতার স্পন্দন।

  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ রাগসংগীত, লোকসংগীত, কীর্তনাঙ্গ, টপ্পা এবং অন্যান্য দেশি-বিদেশি সংগীতকে আত্তীকরণের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গীত কে সুললিত ও মধুর রূপে প্রকাশ করেছেন। রবীন্দ্রসঙ্গীতে একটি নিজস্ব স্টাইল বা শৈলী পরিলক্ষিত হয় যার দ্বারা অনায়াসে রবীন্দ্রনাথের বাণী বর্জিত গানের সুর শুনলে ও সহজেই চেনা সুরটি মনের মাঝে  গুনগুন করে বেজে ওঠে গানটি হৃদয়ে মর্মে অনুভব করাযায়। কিন্তু নজরুলগীতি তে তাঁর গানের সংগীত শৈলির ব্যবহার শুনে সবসময় নজরুলের গান বলে চিহ্নিত করা যায় না। ফলে নজরুল গীতির শিল্পী বা বিভিন্ন গায়কের কণ্ঠে নজরুলের গান প্রায়ই বিকৃত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যায়। নজরুলের গান ও নানা শাখায় পল্লবিত। যদিও রবীন্দ্রনাথের গানের সাংগীতিক শৃঙ্খলা, দার্শনিক ভাবের গভীরতা কথা ও সুরের মূর্ছনা এবং সহজ প্রকাশ ভঙ্গির মাধ্যমে জনসাধারণের কাছে আজও বিশেষ ভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে আছে। কিন্তু সেই বিশেষ ভাবের প্রকাশ নজরুলের গানে সেই অর্থে না পাওয়া গেলে ও বলা যায়  রবীন্দ্রনাথের পরের প্রজন্মের বাংলা গানকেবিভিন্নভাবে পরীক্ষা করার যে দুঃসাহসিকতা তিনি এই সময়টিতে দেখিয়ে ছিলেন তা এককথায় অনবদ্য।  
🍂

  কবি নজরুলের শাস্ত্রীয়সঙ্গীতের প্রতি সহজাত আগ্রহ থাকায় বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী জমির উদ্দিন খান সাহেবের শিক্ষায় প্রভাবিত হয়ে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীত বা রাগ সংগীতে  নিবিড় মনোনিবেশ করে শিখেছিলেন। তার রচনাতেও শাস্ত্রীয় সংগীতে মূলত খেয়াল, ঠুংরী ও গজল এর সর্বাধিক প্রভাব দেখা যায় ।এই কারণে নজরুলের গানে রাগ সঙ্গীতের আভাস মিললেও রাগ ভিত্তিক নজরুলগীতি বিশেষ আলাদা করা যায় না। কাব্যগীতি, ভক্তি গীতি, দেশাত্মবোধক, এহেন বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা গেলে ও এর মূল  শিকড় নিহিত রয়েছে খেয়াল ও ঠুংরিতে। ' তাই নজরুল ভিত্তিক গান বলতে তার খেয়াল ধর্মী গানই সর্বাধিক প্রাধান্য পেয়েছে। এবং এটি একটি আধুনিক গানের ধারা। তৎকালীন কলকাতা কেন্দ্রিক গ্রামোফোন কোম্পানিগুলিতে বিভিন্ন ধরনের সাঙ্গীতিক গবেষণার পরিসর বিস্তৃত হওয়ায়  রাগ সঙ্গীতের প্রাঙ্গণ এবং পরিধি ও ছিল বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। 

নজরুল সংগীতের একনিষ্ঠ শ্রোতা হলেও সংগীতের ব্যাকরণ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ আমি তাঁর সুরের সাগরের রাগরাগিণী তাল লয় ছন্দের খোঁজ নিতে পেয়েছি ''নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ মালা'। নজরুল তিরিশটির মত নতুন রাগ সৃষ্টি করেছিলেন। যদিও শুধুমাত্র সতেরোটির সন্ধান  কিছু লক্ষণ গীত রচনা করেছিলেন যাতে রাগ বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। 

  সঙ্গীত প্রাণ কবি নিজেকে স্বল্প পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখেন নি বরং সঙ্গীতের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে পুরনো রাগসঙ্গীতগুলোর ও সমধিক প্রসার ঘটালেন। মূলত খেয়াল ধর্মী ধারায় রচিত তাঁর গানে খেয়ালের সৃষ্টিশীলতা ও বাংলা গানের কাব্যময়তার সংমিশ্রণ ও ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। তিনি বেশ কিছু নতুন রাগ ও আবিষ্কার করলেন যার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। এই প্রসঙ্গে তাঁর রচিত গানে তাঁরই সৃষ্টি তালের আলোচনায় দেখাগেল তালের বৈচিত্র্যতার জন্যে ৬টি তাল তিনি সৃষ্টি করলেন,যেমন  ১.) প্রিয়াছন্দ তাল ২) স্বাগতা, ৩)মন্দাকিনী, ৪)মঞ্জু ভাসিনি, ৫)মনিমালা ও ৬)নব নন্দন। হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতে নজরুল যে বিশেষ দক্ষতা লাভ করেছিলেন তার ফলস্বরূপ বিভিন্ন ধারায় সংগীত রচনা করে গেছেন তিনি। কাজরী, হোলি, ঝুলা, শাওনি, শাওন এর আধারেও বহুগান তিনি রচনা করেছেন। 

১. প্রিয়াছন্দ তাল---:বাংলা তালের ভাণ্ডারে এক ব্যতিক্রমী সংযোজন, যা তাঁর ছন্দ ও সংগীতচর্চার এক উজ্জ্বল নিদর্শন।‘প্রিয়া ছন্দ তাল’ কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্ট প্রিয়া ছন্দ বা প্রিয়া তাল হলো একটি তবলার তাল, যা ৭ মাত্রার একটি বিষমপদী তাল। যার ছন্দবিভাগে ৩টি তালি রয়েছে [৭]। এই ছন্দের জনপ্রিয়গানের উদাহরণ হলো নজরুল গীতি: "নীল যমুনার ঢেউ খেলে যায়"। এটি একটি মধ্যম লয়ের তাল, যেখানে ফাঁক নেই।তালটির ছন্দোবিভাজন ২।৩।২ এই রূপে গঠিত, যা একে অন্যান্য প্রচলিত তালের তুলনায় স্বতন্ত্র করে তোলে। তালটির বোল বিন্যাস এইরূপ : ধিন না | ধিন ধিন না | তিন না।    

২. মনিমালা ছন্দ তাল:--একটি বিশিষ্ট তাল, যা সংস্কৃত ছন্দ 'মন্দাকিনী' অবলম্বনে তৈরি (১২ অক্ষর, ত-য-ত-য গণ) অবলম্বনে তৈরি [২, ৩]। এই ছন্দে মোট ২০টি মাত্রা রয়েছে, যা আটটি ভাগে বিভক্ত। প্রতিটি ভাগে নির্দিষ্ট সংখ্যক মাত্রা রয়েছে, যা কবিতার ছন্দময়তাকে নির্ধারণ করে। এই ছন্দের বৈশিষ্ট্য হলো এর সুনির্দিষ্ট মাত্রা বিন্যাস, যা কবিতায় একটি নির্দিষ্ট ছন্দগত গতি ও সুর প্রদান করে। এটি মূলত নজরুল সঙ্গীতে ব্যবহৃত হয় এবং এর উদাহরণ হলো "মঞ্জু মধু ছন্দা নিত্যা তব সঙ্গী" গানটি [১]। এই তালটি খুব দ্রুত লয়ে বা লঘু মেজাজে গাওয়া হয় [১, ৫]।

৩. মঞ্জু ভাষিনী ছন্দ :
মঞ্জু ভাষিনী ছন্দ হলো নজরুলের উদ্ভাবিত একটি ছন্দের ধরন, যা স্বাতন্ত্র্যপূর্ণ মাত্রা ও তাল কাঠামোর দ্বারা চিহ্নিত। এ ছন্দে ব্যবহৃত মাত্রা সংখ্যা হলো ১৮, যা ভেঙে দেয়া যায় নিম্নরূপ:

মাত্রার সংখ্যা: ১৮ (বিভক্তি: ২। ৩। ৫। ৩। ৩(২))
এখানে “২”, “৩”, “৫”, “৩”, “৩(২)” মানে, মোট ১৮ মাত্রাকে বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত করে ছন্দ তৈরি হয়েছে। এর প্রতিটি ভাগ নির্দিষ্ট মাত্রার সমন্বয়ে গঠিত, যা পাঠক বা শ্রোতাকে একটি সুরেলা ও স্বাভাবিক তালবদ্ধতা দেয়।
৪. স্বাগতা ছন্দ 
:নজরুল সঙ্গীতে ছন্দ ও তাল প্রায়শই রাগ ও ছন্দের সাথে মিলিত হয়ে একটি দারুণ সুরের সৃষ্টি করে। তাঁর কাব্যে তাল শুধুমাত্র ছন্দের মাপকাঠি নয়, এটি আবেগ ও ভাবের বহিঃপ্রকাশে ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
গান : স্বাগতা নককচম্পক বর্ণা।
“স্বাগতা ছন্দ” নজরুলের রচনায় ব্যবহৃত একটি ছন্দ যা মাত্রা ও ছন্দ বিন্যাসের মাধ্যমে গঠিত। এই ছন্দের মাত্রা সংখ্যা মোট ১৬, যা ভেঙে পড়ে ৩, ৫, ৪, ২, ২ মাত্রায়।  
এটি একটি জটিল এবং সুষম ছন্দ, যা কবিতায় সুর ও গতি প্রদান করে।
 এই ছন্দ বিন্যাস কবিতাকে একটি নির্দিষ্ট সুর ও ছন্দের ধারা প্রদান করে যা পাঠক ও শ্রোতার মনে ছাপ ফেলে।নজরুলের সঙ্গীত ও কবিতায় তালের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রচুর রাগিনীতে তাল ও ছন্দের বিভিন্ন রূপ আবিষ্কার করেছেন। “স্বাগতা ছন্দ” ছাড়াও তিনি অনেক নতুন ছন্দ ও তালের উদ্ভাবন করেছেন যা বাংলা কাব্য ও সঙ্গীতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
নজরুল সঙ্গীতে ছন্দ ও তাল প্রায়শই রাগ ও ছন্দের সাথে মিলিত হয়ে একটি দারুণ সুরের সৃষ্টি করে। তাঁর কাব্যে তাল শুধুমাত্র ছন্দের মাপকাঠি নয়, এটি আবেগ ও ভাবের বহিঃপ্রকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 ৫. মন্দাকিনী ছন্দ:
“মন্দাকিনী” শব্দটি মূলত একটি নদীর নাম, যা প্রাচীন কালের কবিতায় মিষ্টি সুর ও স্নিগ্ধতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। নজরুলের এই ছন্দের নামকরণ হয়েছিলো সেই নদীর নাম অনুসারে, যার ধারায় যেমন মাধুর্য ও কোমলতা প্রবাহিত হয়, তেমনি এই ছন্দের গতি ও মাত্রার ধরণ পাঠকের হৃদয়ে সুমিষ্ট সংগীতময় ছন্দ প্রবর্তন করে।মন্দাকিনী ছন্দের মাত্রা সংখ্যা হলো ১৬। অর্থাৎ, কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতে মোট ১৬ টি মাত্রা বা মেট্রিক্যাল ইউনিট থাকে। এই মাত্রাগুলি ছন্দবদ্ধভাবে বিন্যস্ত হয়, যা নিম্নরূপ:
মাত্রার গঠন: ৬াত।হাত।২ (৬ মাত্রার একত্রে, তার পর ১ মাত্রার হাত, এবং শেষে ২ মাত্রার অংশ)
 
নজরুল মন্দাকিনী ছন্দ ব্যবহার করে যে কবিতা ও গানে গভীর ছন্দসঙ্গীত এবং বাণীবহুলতা সৃষ্টি করেছেন, তা বাংলা কবিতার ধারায় এক অনন্য সংযোজন। মন্দাকিনী ছন্দের মাধ্যমে তিনি প্রথাগত ছন্দের বাইরেও গীতিময় এবং গরিমাময় কবিতা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। মন্দাকিনী ছন্দের বৈশিষ্ট্য হলো এই ছন্দের মাধুর্য পাঠক ও শ্রোতাদের হৃদয়ে একটি বিশেষ ধরনের সুরেলা অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। ছন্দের মাত্রাগুলি সুনির্দিষ্টভাবে বিন্যস্ত থাকায় এটি পড়তে ও গাইতে সহজ এবং মাধুর্যময় হয়। নজরুল এই ছন্দে নানা রকম ভাব প্রকাশ করেছেন, যা বিভিন্ন ধরণের কবিতা ও গানের জন্য উপযুক্ত। মন্দাকিনী ছন্দের লয় ও গতি নির্দিষ্ট মাত্রার পুনরাবৃত্তির কারণে ছন্দের একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ সৃষ্টি হয়, যা শুনতে খুব মনোমুগ্ধকর।
 ৬. নবনন্দনঃ
বাংলা সংগীত-সাহিত্যের অমর কীর্তি কাজী নজরুল ইসলামের গানগুলোতে তাল এবং ছন্দের এক অনন্য ছাপ রয়েছে। তাঁর সৃষ্ট তাল ও ছন্দবিন্যাস বাংলা গানের ধারাকে বৈচিত্র্যময় ও গতিশীল করেছে। এর মধ্যে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ তাল হলো “নবনন্দন”, যা নজরুল সঙ্গীতে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।
  এটি একটি বিশেষ ছন্দের তাল যেখানে মোট মাত্ৰা বা তালবিন্দু সংখ্যা ২০। এই তালের মাধ্যমে কবিতায় ছন্দের ছন্দোবদ্ধতা, তালবদ্ধতা এবং স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা হয়।এটি নজরুলের নিজস্ব আবিষ্কার এবং তাঁর সৃষ্টিশীলতার এক সুন্দর উদাহরণ। নবনন্দন তাল মূলত কাব্যিক ছন্দের নিরিখে সাজানো হয়েছে, যা বাংলা গানের সুর ও ছন্দের সঙ্গে অত্যন্ত সুসঙ্গত।
  
কয়েক হাজার নজরুলসঙ্গীতে শতাধিক রাগ রাগিনীর ব্যবহৃত হয়েছে।  এ এক বিস্ময়কর নজীর রাগভিত্তিক বেশ কিছু নজরুলসঙ্গীত বাংলাগানের শ্রোতাদের কাছে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে। যেমন  ছায়ানট রাগে 
‘শুন্য এ বুকে পাখি মোর’ আয় ফিরে আয় ফিরে আয় / 
 কৌশিকী রাগে গাইলেন “শ্মশানে জাগিছে, শ্যামা’  , 
আহির ভৈরব রাগে অরুণকান্তি কে গো যোগী ভিখারী’    
খাম্বাজ রাগে কুহু কুহু কোয়েলিয়া’  
কণটী সামন্ত রাগে কারেবী নদীজলে কে গো বালিকা 
‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’ (মান্দ), 
‘আজি ও শ্রাবণ নিশি’ (মিয়া মল্লার), 
ভোরের হাওয়ায় এলে’ (রামকেলি), 
গুঞ্জমালা গলে’ (মালগুঞ্জি), 
‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি (হিজাজ ভৈরবী), 
‘রুমঝুম রুমঝুম’ (পিলু) প্রভৃতি।
সঙ্গীত-শিক্ষক নজরুলের অভিনব শিক্ষা পদ্ধতিতে কোনো গোঁড়ামি ছিল না। তিনি শিল্পীর গান শুনে তার গায়ন-রীতি বা অধিকারটুকু বুঝে নিয়ে তার উপযোগী গান দিতেন। শিল্পীর সবটুকু উৎকর্ষ তিনি গানের মধ্যে আদায় করে নিতেন।জ্ঞানেন্দ্রপ্রসাদ গোস্বামী, শচীন দেববর্মণ, মৃণালকান্তি ঘোষ, শ্রীমতী ইন্দুবালা, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র প্রমুখ শিল্পীরা স্ব-স্ব রীতির গায়কীধারায় বিশেষ উজ্জ্বল হয়ে আছেন । নজরুল এঁদের প্রত্যেকের গানে অলঙ্করণ পদ্ধতির বিভিন্নতায় তাঁদের শিল্পী মেজাজের স্বাধীনতাকে সুযোগ দিয়েছেন পরিপূর্ণ গায়কী আদায়ের জন্য। 

মনেপড়ে শচীন দেব বর্মনের কণ্ঠে  ‘পদ্মার ঢেউরে’ বা ‘কুহু কুহু কোয়েলিয়া’ গানটির আজো জনপ্রিয়তার চরম কথা। শ্যামা সংগীতের গায়ক মৃণালকান্তির ‘বলরে জবা বল’ বা ‘মহাকালের কোলে এসে’ এবং শ্রীমতী ইন্দুবালার ‘কেন আন ফুলডোর’ ‘অঞ্জলি লহ মোর সঙ্গীতে’ গানের চালে দুস্তর ব্যবধান। নজরুলের সৃষ্টি এ গানের ডালা চমৎকারিত্বে ভরা মন  কে 
      উদাস করে ভাবে বিভোর করে রাখে।

তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ মালা
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি (২০০৭)।
৫) নজরুল / রফিকুল ইসলাম
৬)- নজরুল জীবনী, /অরুণকুমার বসু,( আনন্দ পাবলিশার্স)

Post a Comment

0 Comments