৩৪ পর্ব
চিত্রা ভট্টাচার্য্য
নজরুল সঙ্গীতের বিশাল মহাসাগরে এক ভাঙা তরী ভাসিয়ে দিয়েছি। দিক ভ্রান্ত নাবিকের মত সে ভাসছে সাগরের অন্তহীন ঢেউয়ের উজানে , 'কোন কূলে যে ভিড়বে আমার এ তরী-- কোন সোনার গাঁয় '? -- কূল কিনারা হারানো পথ হারা পথিক। খুঁজে ফিরছি কবির জীবনের অলি গলি থেকে স্রষ্টা ও শিল্প চেতনায় তার অবিনশ্বর কীর্তি। সমগ্র জীবনের চরম সত্য কাহানি নিয়ে যে আলোচনা সভার অবতারণ করেছি তার পরিপূর্ণ চিত্র তুলে ধরা বা নিটোল নিখুঁত রূপ দেওয়ার ক্ষমতা আমার বোধহয় আমার নেই। আসলে প্রতি মুহূর্তে বুঝতে পারি এত বিশাল প্রতিভা কে সাজিয়ে গুছিয়ে মনের মত প্রকাশ করা 'সে বড়ো কঠিন কাজ। আমার মত সাধারণের পক্ষে তাকে নিখুঁত ক্রমানুসারে সাজানো এ জীবনে সম্ভব হবে না ।
তবু ও এই অবসরে নজরুল চর্চায় অনুসন্ধানী মন যতটুকু সংগ্রহ করেছে তারই পরিপূর্ণ রূপ রেখে দিতে চাই।মনে পড়ে এখনো আমার অনুসন্ধানে , নজরুলের সাঙ্গীতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বেতার জগৎ নিয়ে আলোচনা করা হয়নি । চঞ্চল মন খুঁজে ফেরে সঙ্গীতে নিবেদিত প্রাণ অগোছালো এলোমেলো কবির জীবন খাতার পাতায় লেখা যত হিসাব নিকাশ ।
১৯০০ সাল নাগাদ গান শোনার যন্ত্র বা কলেরগান এলো কলকাতায় এবং ১৯০২ সালে প্রথম বাংলা গানের রেকর্ড হয়, তখনকার থিয়েটার দলে সখীর নাচের দলের দুই বালিকাকে দিয়ে। তখন বাংলা গান বলতে চালু ছিল কিছু রাগাশ্রয়ী গান, চটুল দেহতত্বের গান, কীর্তন,ভজন ইত্যাদি । পরিশীলিত গায়ন রুচি তৈরী হতে লেগে গেছে আরো বিশ/পঁচিশ বছর । তখন নজরুল বেশ প্রতিষ্ঠিত তরতাজা প্রাণের হিল্লোলে সোচ্চার এক নবীন ভাবনার যুবক কবি ।
🍂
কলকাতায় বেতার ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়েছে ১৯২৭এর ১৬ই অগস্ট, তখন ও বাংলা চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগ। ফিরে তাকাই বিগত তিরিশের দশকে --- যেখানে নজরুলের সাংগীতিক প্রতিভার উপর নির্ভর করেই গ্রামফোন কোম্পানী বাংলা গানের বিপণন ব্যবসার প্রথম সুদৃঢ়ভিত্তি স্থাপনা করেছিল। সেই সময় নজরুল রচিত গান ও সুর এতই জনপ্রিয় ছিল যে তাঁর প্রশিক্ষণে গান রেকর্ড করার চাহিদা ছিলো আকাশছোঁয়া। যে শিল্পী নজরুল গীতি গাইবেন সেই শিল্পীর অবধারিত সাফল্য সুনিশ্চিত ছিল। ঠিক এই সময়েই গ্রামফোন কোম্পানীর ব্যবসায়ী মানসিকতা অসামান্য সাঙ্গীতিক প্রতিভার অধিকারী নজরুলকে ‘শিকার’ করে তাঁকে নিংড়ে নিতে ও সামান্য কসুর করেনি। কবির তখন সাংসারিক দায় দায়িত্বের ভার প্রচুর হওয়ায় স্থায়ী উপার্জনেরও বিশেষ প্রয়োজন ছিল।
১৯২৮এ নজরুল কাব্যজগৎ থেকে স্বেচ্ছা-নির্বাসন নিয়ে নিজেকে উজাড় করে দিলেন গানের ভুবনে, সঙ্গীত সৃষ্টির সাধনায় রাগ রাগিনীর সুরলোকে। গ্রামফোন কোম্পানীর মাসমাইনের চাকরি।গীতিকার – সুরকার-কম্পোজার-ট্রেনার সব দায়িত্ব এবং তিনি গ্রামফোন কোম্পানীর বাংলা গান রেকর্ডিং এর প্রধান।
১৯৩৩এ প্রকাশিত রুবাইৎ-ই-ওমর খৈয়াম’ গ্রন্থের ভুমিকায় নজরুল জানালেন “ কাব্যলোকের গুলিস্তান থেকে সংগীতলোকের রাগিনী দ্বীপে আমার নির্বাসন হয়ে গেছে” । সংগীতের সবক’টি বিভাগই নজরুলের জাদু স্পর্শের ঐশ্বর্য পেয়েছিল । নানান বাদ্যযন্ত্রের পারদর্শিতা, গান গাওয়া, গান লেখা, সুর করা, থিয়েটার ও সিনেমার সংগীত পরিচালনা এমনকি একটি সিনেমায় ভক্ত ধ্রুব চরিত্রে অভিনয় ও করেছিলেন । মাত্র এগারো বছরের সাংগীতিক জীবনে অবিশ্বাস্য তিনহাজারেরও বেশি গান লিখেছিলেন আর তাঁর গানের রেকর্ডের সংখ্যা ১৭০০। রাগাশ্রয়ী আধুনিক গান, প্রেম সংগীত, ছোটদের গান, কীর্তন, আগমণি, শামা সংগীত, গজল, কাওয়ালি, ইসলামি গান – সব ধরণের গান। নজরুলের সৃষ্ট বিভিন্ন শ্রেণীর গান প্রসঙ্গে এই ধারাবাহিকের প্রায় প্রতিটি পর্বে তার বিস্তৃত ভাবে আলোচনা করার চেষ্টা করেছি।
এই প্রসঙ্গে পুনরায় স্মরণ করি তৎকালীন আধুনিক বাংলা গানের পঞ্চ প্রধান মহান ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ (১৮৬১-১৯৪১), দ্বিজেন্দ্রলাল (১৮৬৩-১৯১৩), রজনীকান্ত (১৮৬৫-১৯১০), অতুলপ্রসাদ (১৮৭১-১৯৩৪) এবং কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। বিশ শতকের প্রথম চার দশকের মধ্যে এ পঞ্চরত্ন আধুনিক বাংলা গানকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। বিশেষত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল ছিলেন একাধারে কবি ও সঙ্গীতজ্ঞ। তাঁদের অবদান ছিল সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। গানের ক্ষেত্রে তাঁরা আবার একই সঙ্গে গীতিকার ও সুরকার। তবুও এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, রবীন্দ্রসংগীতের বাইরে আধুনিক বাংলা রেকর্ডের গানে কাব্যের লাবণ্য ও পরিশীলিত গায়ন ভঙ্গি প্রথম নিয়ে এসেছিলেন কবি নজরুল।
তিরিশের দশকে গ্রামাফোন কোম্পানীর গানের সার্থক শিল্পী রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন সংগীতকার নজরুল এবং তাঁর প্রশিক্ষণে গ্রামফোনে গান গেয়ে আজো সুপ্রসিদ্ধ হয়ে আছেন যাঁরা – আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কমলা ঝরিয়া,কাশেম মল্লিক,আব্বাসউদ্দীন, যুথিকা রায়, মৃণালকান্তি ঘোষ,ধীরেন দাস, ফিরোজা বেগম, সুপ্রভা সরকারের মতো এবং আরো অনেক বিখ্যাত সংগীত শিল্পী। নজরুলের সঙ্গীত রচনার চতুর্থ ধারাকে আধুনিক ও লোক-ঐতিহ্যভিত্তিক সঙ্গীত সৃষ্টির পর্বরূপে চিহ্নিত করা যায়। ১৯৩২-৩৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিরিশের দশকের শেষ অবধি তিনি যেসব আধুনিক গান রচনা করেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান হলো:
১ /
‘গানগুলি মোর আহত পাখীর সম’/
লুটাইয়া পড়ে তব পায়ে প্রিয়তম।
( রাগ ভৈরবী ,তাল দাদরা )
২/
‘বিদায়-সন্ধ্যা আসিল ঐ’ঘনায় নয়নে অন্ধকার ,
হে প্রিয় ,আমার যাত্রা -পথ অশ্রু - পিছল ক'রোনা আর -(-রাগ; ভীমপলশ্রী ,তাল একতাল )
৩। ‘হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ-পথে’,
কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি
তুমি কেন হায় আসিলে হেথায় --
(-রাগ ; বাগেশ্রী , তাল; লাউনি )
এমনি আরো কত নজরুল গীতি বা আধুনিক গান যা আজো সংগীতের আসর মাতিয়ে রাখে।শ্রোতা কে মুগ্ধ করে হৃদয়ে এক অনির্বচনীয় পরশ জাগায়। আজো কান পেতে শুনি ---
পাষাণের ভাঙালে ঘুম’, ‘পথ চলিতে যদি চকিতে’, ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’, ‘ধীরে যায় ফিরে ফিরে চায়’, ‘আধো আধো বোল’, ‘দূর দ্বীপ-বাসিনী’, ‘মোমের পুতুল মমির দেশের মেয়ে’, ‘যবে সন্ধ্যা বেলায় প্রিয় তুলসী তলায়’ ইত্যাদি আরো অজস্র মনে রাখা কথা দিয়ে সাজানো হৃদয় স্পর্শ করা গান । একই সময়ে রচিত লোকসঙ্গীতের ঐতিহ্যভিত্তিক গানসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো: ‘আমি ভাই ক্ষ্যাপা বাউল’, ‘আমার গহীন জলের নদী’, ‘ও কূল ভাঙা নদীরে’, ‘কুচ বরণ কন্যারে’, ‘পদ্মদীঘির ধারে ঐ’, ‘পদ্মার ঢেউরে’ প্রভৃতি। লোক-ঐতিহ্যভিত্তিক গানের মধ্যে নজরুলের ঝুমুর গানগুলি এক অপূর্ব সৃষ্টি। এ সময়ে তিনি বেশ কিছু হাসির গানও রচনা করেছিলেন। তাঁর বিভিন্ন ধারায় রচিত গান ও সুর রাগরাগিণীর নিরন্তর নবনব সৃষ্টির মাধ্যমে আধুনিক বাংলা গানের ভিত্তিকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে সৃষ্টিশীলতার নান্দনিক প্রকাশে নজরুল রেখে গেছেন বাংলা গানের এক সমৃদ্ধ ভান্ডার। বাংলা আধুনিক সঙ্গীতের ধ্রুপদী ধারার তিনিই কান্ডারী। বাংলা সঙ্গীতের ক্রমবিবর্তনের ধারায় নজরুল সঙ্গীত তথা নজরুলের আধুনিক পর্যায়ের গান সার্বিকভাবে সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে একটি প্রভাব ফেলেছে। বাংলা গানের পর্যায়ক্রমিক সূচি তে নজরুলের আধুনিক গান, বৈচিত্র্যে বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ।
আধুনিক বাংলাগানের ক্ষেত্রে তিনি জনপ্রিয়তার শিখরে উঠলেন আর এই সূত্রেই বাংলার বিদগ্ধ মহল ও তাঁর কবি বন্ধুদের কাছ থেকে পেলেন উপেক্ষা।তাঁরা অনেকেই ক্রমশঃ দূরে সরে গেলেন । তাঁর গানে রবীন্দ্রনাথের গানের মত আলোক সামান্য নান্দনিক স্পর্শ ছিল না। বাংলা সংগীতের ভান্ডারকে নজরুল ঐশ্বর্যমন্ডিত করেছেন, কিন্তু গ্রামফোন কোম্পানীর বানিজ্যিক স্বার্থ মেটাতে গিয়ে তাঁকে প্রতিটি পদক্ষেপে বিশেষ মূল্য দিতে হয়েছিল। যারফলে সেই মূল্য তাঁর সমাজসচেতন গণমুখী কাব্যচেতনার সঙ্গে চির বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল।সাংসারিক বিভিন্ন দায়দায়িত্ব নিত্য অভাবে জর্জরিত কবি কোম্পানীর বেতনভোগী চাকুরে, বণিক কোম্পানীর নির্দেশমত হালকা চটুল গানের নির্মাণ ও কবি করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
যারফলে সেই মূল্য তাঁর সমাজসচেতন গণমুখী কাব্যচেতনার সঙ্গে চির বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল। ইসলামী গান, বাংলা গজল গানের জন্য বিরূপ হয়েছিলেন হিন্দুরা, তাঁর কবিবন্ধুরা আর শ্যামা সংগীত গান রচনার জন্য বিধর্মী আখ্যা পেয়েছিলেন মৌলবাদী মুসলিমদের কাছ থেকে ।
আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ , পুত্র বুলবুলের অকাল মৃত্যু,স্ত্রী প্রমীলার পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে থাকা, নিকটজন ও কবিবন্ধুদের দূরে সরে যাওয়া, মরমীকবি ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত, বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন । কিন্তু সেই ক্লান্তি, বিষাদের বিন্দুমাত্র ছায়াপাত তাঁর সংগীত সৃষ্টিতে পড়েনি । ভেতরের ক্ষয় গোপন করে শুধু রাশি রাশি গানের সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা গানের অফুরন্ত ভান্ডার । তাঁর বন্ধুদের দূরে সরে যাওয়া বা রেকর্ড কোম্পানীর দাসত্ব মেনে নেওয়া নজরুলকে গ্লানিবোধে আক্রান্ত ও চরম বিষাদগ্রস্ত করেছিল।
এইসময় রবীন্দ্রনাথকে লেখা একটি পত্রে নজরুল লিখেছিলেন “গুরুদেব, বহুদিন আপনার শ্রীচরণ দর্শন করিনি । আমার ওপর হয়তো প্রসন্ন কাব্যলক্ষী হিজ মাস্টার্স ভয়সের কুকুরের ভয়ে আমাকে ত্যাগ করেছেন । কাজেই সাহিত্যের আসর থেকে আমি প্রায় স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছি । ... আমার এক নির্ভিক বন্ধু আমাকে উল্লেখ করে একবার বলেছিলেন যাকে বিলিতি কুকুরে কামড়েছে তাকে আমাদের মাঝে নিতে ভয় হয় । সত্যি ভয় হবারই কথা, তবু কুকুরে কামড়ালে লোকে নাকি ক্ষিপ্ত হয়ে অন্যকে কামড়াবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে । আমার কিন্তু সে শক্তি নেই, আমি হয়ে গেছি বীষ জর্জরিত নির্জীব” । (সূত্র – ‘অঞ্জলী লহ মোর সংগীতে’ / অরুণ কুমার বসু , ‘পুরশ্রী’ পত্রিকা, জুলাই ১৯৯৯ ) ।
চল্লিশ থেকে ষাট দশক পর্যন্ত যে সময়কালকে বাংলা গানের স্বর্ণযুগ বলে অভিহিত করা হয় সেই স্বর্ণযুগের গানের জলসায় নীরব তখন কবি। কিন্তু নিঃসন্দেহে বলা যায় সেই স্বর্ণযুগের প্রস্তুতি পর্বের স্থপতিকার ছিলেন আত্মভোলা কবি নজরুল।গানের জগতে নজরুল ছিলেন মাত্র বারো বছর, আর এই অল্প সময়কালেই, বিপণনযোগ্য বাংলা গানের ভুবনকে নির্দ্বিধায় শাসন করেছেন তিনি একচ্ছত্র সম্রাটের মত , তার সমকক্ষ কেউই ছিলেন না। তাঁর গান ছিল স্বতস্ফূর্ত, সরল, আবেদনে প্রত্যক্ষ আর তাই শিক্ষিত, অশিক্ষিত সকলের হৃদয় স্পর্শ করে 'নজরুলগীতি ' সুদীর্ঘদিন ধরে গানে গানে ভুবন ভরিয়ে দিল। শ্রোতার মন মাতালো নজরুল গীত সঙ্গীতে।
তথ্য সূত্র :---১)নজরুল জীবনী / করুণা ময় গোস্বামী
২)নজরুল গবেষক ও অনুবাদক / পীযুষ ভট্টাচাৰ্য
৩)নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ মালা
৪) নজরুল রচনাবলী, বাংলা একাডেমি (২০০৭)।
৫) নজরুল / রফিকুল ইসলাম
0 Comments