আ-মরি বাংলা ভাষা
মায়া দে
“মোদের গরব মোদের আশা
আ-মরি বাংলা ভাষা
মাগো তোমার কোলে, তোমার বোলে
কতই শান্তি ভালবাসা ।
আ -মরি বাংলা ভাষা। “---অতুলপ্রসাদ সেন।
ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয় । এটি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারক বাহক। বাংলা ভাষা হল ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ ,ত্রিপুরা, আসাম অঞ্চল মানুষের মাতৃভাষা। এটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা । যে ভাষা ২৮ কোটির বেশি মানুষের মুখের ।
তো যে ভাষা আমার অহংকার,আমার আশা আমার বিশ্বাস - তার সঠিক পরিচর্যা চাই।কেবল ফেব্রুয়ারির কুড়ি তারিখ মনে পড়া , একুশ তারিখ পালন করা, আর বাইশ তারিখ ফের ভুলে যাওয়া —এসবের অর্থ শূন্য , অবমাননাকর। আমি আমার আমিকে চিনে নেবো আমার ভাষা দিয়ে। বছরে একবার নয়, বারবার , শতাধিকবার হোক ভাষা দিবস। পূর্ণ মর্যাদায় ,মূল্যবোধে , চর্চায়, পরিচর্যায় হোক মাতৃভাষার প্রতি সম্মান নিবেদন। আমি এগোলেই ভাষা এগোক। এক আত্মা থেকে বিশ্বাত্মায়, সীমা থেকে অসীমে -এ আমার অঙ্গীকার।
অপর ভাষার আগ্রাসন যখন বাংলা ভাষায় নেমে আসে, তখন সেই ভাষাকে বাঁচাতে বাঙালি প্রাণ পর্যন্ত দিতে দ্বিধা করেননি। তবু বাংলা ভাষাকে ছাপিয়ে হিন্দি ভাষার আগ্রাসন দেখতে পাই। ভারতবর্ষের রাষ্ট্রর মর্যাদা যাদের হাতে তাঁরা অখন্ড ভারতের নাম করে হিন্দি ভাষাকেই প্রধান জাতীয় ভাষায় পরিচিতি দিয়েছেন। আর কেবল হিন্দি ভাষাকেই শুধু শুধু দোষারোপ করি কেন? ইংরেজি ভাষার দৌরাত্মের কাছে আমারা নতজানু।
বাংলা ভাষাকে সঠিক উপায়ে বহন করতে পারে খোদ কোলকাতা, সিনেমায় সাহিত্যে,সঙ্গীতে। অথচ ,কলকাতা ভিত্তিক বাংলা টিভি চ্যানেল গুলো দেখি হিন্দি গানের সুখ্যাতি। কে কতো ভালো হিন্দি গান পরিবেশন করতে পারে। তার উপরে দাঁড়িয়ে বোঝা হয় তার এগোনোর গতি । গন্তব্য কতদূর! যেন বাংলা আধুনিক গানের আর কোন ভবিষ্যৎই নেই ।
বড়ো লোকীয় বাঙ্গালীদের মধ্যে ছেলেমেয়েদের বাংলা না শেখানোই যেন একটা আভিজাত্যের নমুনা । ভবানী প্রসাদ মজুমদারের সেই অমর সৃষ্টি কবিতায় আজও বাংলার চালচিত্র–
“”জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না
ইংলিশে ও “রাইমস’ বলে’ ডিবেট’ করে পড়াও চলে।
আমার ছেলে খুব ‘পজেটিভ ‘অলীক স্বপ্নে ভাসে না।
জানেন দাদা, আমার ছেলের বাংলাটা ঠিক আসে না
‘ইংলিশ’ ওর গুলে খাওয়া ওটাই ‘ফার্স্ট ল্যাঙ্গুয়েজ’।
হিন্দি ‘সেকেন্ড’ ,সত্যি বলছি হিন্দিতে ওর দারুণ তেজ ।
কি লাভ বলুন বাংলা পড়ে
বিমান ছেড়ে ঠেলায় চড়ে ?
‘বেঙ্গলি থার্ড ল্যাংগুয়েজ’ তাই তেমন ভালো বাসে না।”
যে ভাষার সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক , গর্বের সম্পর্ক ,অনুভূতি সম্পর্ক ,মানুষ লড়াই করে প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছেন সেই ভাষা নিয়ে আজ আর কারোর কোনো ভাবনা নেই। মানুষ দেখছে নিজের স্বার্থ।কোন পথে এগোলে কিছু ফায়দা লাভ হবে। বাংলা ভাষার ভালো হোক –এমন মহৎ ভাবনায় ভাবিত হতে তাদের বয়ে গেছে । কি গীতিকার ,কি সুরকার, কি পরিচালক, লিখিয়ে ,সকল স্তরের মানুষের মনের খবর ঠিক একই । তা নাইলে পথের পাঁচালীর মতো, গীতাঞ্জলির মতো আরো হয়তো কিছু আন্তর্জাতিক মানের সৃষ্টি পেতে পারতাম।
তবে কি বাংলা ভাষা বিপন্ন ?
বাংলা ভাষা সরাসরি বিলুপ্তির মুখে না পড়লেও বিশ্বায়ন ও নগরায়নের যুগে এর ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট উৎকণ্ঠার কারণ আছে।
প্রথমত : বিশেষ করে ইংরেজি ও হিন্দি ভাষার অতিরিক্ত প্রভাব।
দ্বিতীয়ত: শহরাঞ্চলে বাংলা চর্চা কমে যাওয়া।
তৃতীয়ত : মিশ্র ভাষার প্রয়োগ । সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বাংলা ভাষাকে।
এখন পুজো পার্বণ কি অনুষ্ঠানে বাংলা গান বাজানো একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। সকাল হলেই হোয়াটসঅ্যাপ ,মেসেঞ্জারে শুভ সকাল বলে কেউ বলেন না । গুড মর্নিং, রাত্রে গুডনাইট বলাটা জলখাবার হয়ে গেছে।সেই ভূট্টা ভাজাই খাবেন , কিন্তু ভূট্টা নাম বলা যাবে না । বলতে হবে পপকর্ণ। মাছ ভাজা নয় ফিস ফ্রাই।ভাত নয় রাইস।আর বাংলা ভাষাকে ভালো বেসে একটু বাড়াবাড়ি করলেইজুটে যাবে বিচ্ছিন্নতাবাদী নামক সুন্দর তকমা। বাংলা ভাষা আজ কোন ঠাসা। জনবিন্যাস। তবু চোখে পড়ে অচেনা বাংলা,অচেনা কলকাতা। বাঙালির শিকড়ের টান কোথায়? ব্যাংকিং পরিষেবায় বাংলা ভাষা কোথায়?নেই ডাকঘরে ও। হাসপাতালে ইংরেজি প্রেসক্রিপশন, ইংরেজি মাধ্যমে সন্তানদের শিক্ষা দান দিয়ে মা বাবার নিশ্চিন্তি–বিষয় গুলো ভাবায়। ভাববার সময় এসেছে একজন বা দুজন নয়, গোটা প্রজন্ম যেন বাংলা বিমুখ ।স্পষ্টত মনে হয় বাংলার চেয়ে ইংরেজি অনেক বেশি মজবুত পথ । যে পথ ভালো জানা থাকলে আন্তর্জাতিক মানের অনেক দরজা খুলে যেতে পারে।
এখনকার বাংলা গান নিয়ে, কি বাংলা কিছু লেখা নিয়ে বা সিনেমা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের হই হই আর হয় না।সেই স্বর্ণ যুগকে আঁকড়েই পড়ে আছি–সেই রবীন্দ্র, সেই নজরুল ,সেই জীবনানন্দ ,সেই সত্যজিৎ , সেই ঋত্বিক, সেই হেমন্ত , মান্না ,আরতি ,প্রতিমা। বাংলা গান গাওয়া কোন শিল্পীকে ভালো মঞ্চ দেওয়া হয় না ।আর মঞ্চ পেলেও তাকে সাম্মানিক তেমন দেওয়া হয় না। অথচ হিন্দি গান গাওয়া ঢের খারাপ গাইয়ে যথেষ্ট সম্মান,মর্যাদা, সম্মান দেওয়া হয় এই বাংলায়। এটা তো ভাষা বিপন্ন ছাড়া আর কি বলা যেতে পারে ?
এখনকার ক্ষুদে প্রজন্মের কাছে সুকুমার রায়ের ছড়ার বই নয়, সুন্দর মলাট, ঝকঝকে অক্ষরের ইংরেজি রাইমস অনেক অনেক বেশি আকর্ষনের।
আমাদের করনীয় নতুন প্রজন্মের হাতে ঠিক তেমন বই তুলে দেওয়া । যে বই আত্মশক্তিতে বলিয়ান ,যেটা নতুন প্রজন্ম হাতে নিয়ে চমকে উঠবে । তার লেখা যেমন সুন্দর হবে, সুন্দর হবে তার প্রচ্ছদ , তেমন সুন্দর হবে বিষয় সহ সবকিছুই ।একদম ঝকঝকে করে তুলতে হবে। কারন থরে বিথরে বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন বই, সিনেমা, গান রাখা আছে। তো মানুষ কেন সেই ম্যাড় ম্যাড়ে ,অগভীর,একঝোঁকা মূল্যবোধের গূঢ় তত্ত্ব শোনানো বাংলা নিয়ে আঁকড়ে থাকবে? যেখানে বাহ্যিক বাহার ,ঘটনার চমৎকারিত্ব, বুদ্ধিদীপ্ত আবেদন রয়েছে ওর সাথেই কর্ম ব্যস্ত মানুষের আকর্ষণ বেশি থাকবে। তাই ভেবে দেখার সময় হয়েছে। কি সিনেমা জগত! কি সাহিত্য জগত !কি সংগীত জগত বাংলা ভাষা কেন্দ্রিক হলে সেখানে সরকারি উদ্যোগ সহ পুঁজিপতিদের এগিয়ে আসতে হবে। , নিজের স্বার্থ ভাবে বাংলা ভাষার অগ্ৰগতিই লক্ষ্য করে নিতে হবে।এবং পুঁজি বিনিয়োগ করতে হবে।তবেই ভালো মানের সৃষ্টি পাবো।নচেৎ রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ রায়ের মতো ক্ষণজন্মা আন্তর্জাতিক মানের প্রতিভার আবির্ভাব ঘটতে হবে। নইলে বাংলা ভাষা ফের জগৎসভায় কি করে পৌঁছোবে?
ভাষা হারালে সে লজ্জা আমার, আমাদের। মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত সন্তান যেমন অস্বাস্থ্যকর খাদ্য খেয়ে বড়ো হয়। আমাদের দশা তাই হবে। খিচুড়ি ভাষায়, খিচুড়ি ভাবনায় জগা খিচুড়ি জীবন যাপনই হবে আমাদের ভবিতব্য। যেখানে না থাকবে ভাষার ঐতিহ্য, না থাকবে তার মর্যাদা। আর ভাগ্যহীন আমরা আমাদের আশ্রয় , আমাদের বিশ্বাস , আমাদের গর্ব আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে বিশ্বের দরবারে ভূলুন্ঠিত হতে চেয়ে চেয়ে দেখবো। বাংলা ভাষাকে ফের বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে আশু প্রয়োজন -বিরাট পুঁজি ,নয় বিরাট কোনো প্রতিভা।
“বাংলা মোদের শিরায় জড়িনো
তাকে কি ভুলিতে পারি?”
0 Comments