জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকারতৃতীয় খণ্ডপর্ব ৮: উত্তরাধিকার কমলিকা ভট্টাচার্য

বাঁচার উত্তরাধিকার
তৃতীয় খণ্ড
পর্ব ৮: উত্তরাধিকার 

কমলিকা ভট্টাচার্য 


শরতের সকালটা অদ্ভুত শান্ত। এই শান্তি নিস্তব্ধ নয়—বরং যেন ঝড়ের পরে বেঁচে যাওয়া পৃথিবীর মতো, যেখানে সবকিছু ধ্বংস হয়েও অদ্ভুতভাবে টিকে থাকে। জানলার পাশে বসে নাতাশা আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। সাদা মেঘগুলো ধীরে ভেসে যাচ্ছে, যেন সময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে ধীরে চলতে শিখেছে। সে অনেকদিন পরে আকাশ দেখছে—একজন বন্দীর মতো নয়, একজন ফিরে-আসা মানুষের মতো। তার শরীর এখনও দুর্বল। হাতের শিরাগুলো স্পষ্ট, ত্বক ফ্যাকাশে, চোখের নিচে ক্লান্তির গভীর ছায়া। তবু সে বেঁচে আছে। এটাই সবচেয়ে বড় সত্য। বেঁচে থাকা কখনও কখনও জয় নয়—কিন্তু সম্ভাবনা। আর সম্ভাবনাই মানুষকে আবার ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে শেখায়।অনির্বাণ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছিল। এই দৃশ্যটা সে বহুবার কল্পনা করেছে—কিন্তু বাস্তবটা কল্পনার থেকেও বেশি ভঙ্গুর, বেশি বাস্তব, বেশি ব্যথাময়। তার মনে হচ্ছিল—সে যেন কাঁচের তৈরি একটা মুহূর্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যা সামান্য স্পর্শেই ভেঙে যেতে পারে। সে ধীরে এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে ছিল দ্বিধা, অপরাধবোধ আর ভালোবাসার ভার। নাতাশা তার উপস্থিতি টের পেয়ে তাকাল। তাদের চোখ মিলল। সেই দৃষ্টিতে ছিল হাজারটা না-বলা কথা। কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলল না। এই নীরবতার ভিতরে ছিল ক্ষমা, অভিযোগ, ভালোবাসা আর এক গভীর অজানা ভবিষ্যৎ।
“তুমি এখনও আকাশ দেখো,” অনির্বাণ ধীরে বলল। তার গলায় একটা অদ্ভুত কম্পন ছিল। নাতাশা হালকা হাসল। “আকাশই একমাত্র জিনিস যা বন্দী হয় না,” সে বলল। তার কণ্ঠস্বর নরম, কিন্তু তার ভিতরে একটা অদ্ভুত দৃঢ়তা। যেন সে জানে—সব হারিয়েও কিছু জিনিস কখনও হারায় না। অনির্বাণ তার পাশে বসল। সে বুঝতে পারছিল—আজ কিছু একটা বদলাবে। আজকের এই সকাল শুধু একটা সকাল নয়—এটা একটা সত্যের জন্মের মুহূর্ত।
নাতাশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তার আঙুলগুলো ধীরে ধীরে কাঁপছিল। যেন সে নিজের ভিতরের শক্তিটুকু জড়ো করছে। তারপর সে ধীরে বলল—“আমি তোমাকে একটা সত্য বলতে চাই।” অনির্বাণের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। সে জানত—এই সত্য সহজ হবে না। তবু সে প্রস্তুত হতে চাইল। কারণ কিছু সত্য এড়িয়ে গেলে মানুষ বাঁচে না—শুধু অস্তিত্ব টেনে নিয়ে যায়।
“যেদিন তুমি আমাকে তাদের হাতে তুলে দিয়েছিলে…” নাতাশার গলাটা কেঁপে উঠল। অনির্বাণ চোখ নামিয়ে নিল। এই অপরাধবোধ তার প্রতিটি শ্বাসের সঙ্গে মিশে আছে। সে নিজেকে কখনও ক্ষমা করতে পারেনি। প্রতিটি রাত, প্রতিটি নিঃশব্দ মুহূর্ত তাকে সেই দিনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। “সেদিন,” নাতাশা বলল, “আমি একা ছিলাম না।” অনির্বাণ ধীরে তার দিকে তাকাল। তার চোখে প্রশ্ন, ভয়, আর এক অদ্ভুত অজানা আশার ঝলক।
নাতাশার চোখ ভিজে উঠেছে। তার ঠোঁট কাঁপছে। “আমি তখন তোমার সন্তানের মা হতে চলেছিলাম।” এই কথাটা সময়কে থামিয়ে দিল। পৃথিবী যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। অনির্বাণের শরীর জমে গেল। তার শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল। তার সন্তান। তাদের সন্তান। যে অস্তিত্বের কথা সে কখনও জানত না, অথচ যে অস্তিত্ব তার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে উঠল এক মুহূর্তে। “না…” তার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে এল। এই “না” শব্দের ভিতরে ছিল অবিশ্বাস, অনুতাপ আর ভেঙে পড়া এক মানুষের কান্না।
“ওরা এটা জানতে পেরেছিল,” নাতাশা বলল। “তাদের কাছে এটা একটা সুযোগ ছিল।” অনির্বাণের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল। তার ভিতরে একটা ভয় জন্ম নিল, যে ভয় মানুষকে ভিতর থেকে ভেঙে দেয়। “ওরা কি… করেছে?” সে ভয়ে জিজ্ঞেস করল। নাতাশা চোখ বন্ধ করল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল পড়ে গেল। “ওরা তাকে হত্যা করেনি।”
এই কথাটা শুনে অনির্বাণের বুক ধক করে উঠল। তার ভিতরে হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল। “ওরা embryo-টা আমার শরীর থেকে আলাদা করে নিয়েছিল,” নাতাশা বলল। “একটা বিশেষ মেডিকেল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে…” ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। প্রতিটি শব্দ যেন দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছিল। “ওরা বলেছিল,” নাতাশা ফিসফিস করে বলল, “এই শিশুটি শুধু একটি শিশু নয়।” অনির্বাণের চোখ বড় হয়ে গেল।
“ওরা embryo-টাকে cryogenic preservation-এ রেখে দিয়েছে,” নাতাশা বলল। “একটা কাচের চেম্বারে… সময়ের বাইরে… জীবিত… কিন্তু জন্মায়নি…” অনির্বাণের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তার সন্তান মৃত নয়। বেঁচে আছে। কোথাও। অপেক্ষা করছে। হয়তো অনুভব করছে না, হয়তো জানে না—তবু সে আছে।
“ওরা বলেছিল,” নাতাশা বলল, “একদিন এটা তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হবে।” অনির্বাণের ভিতরে আগুন জ্বলে উঠল। অস্ত্র? তার সন্তান? না। সে কখনও সেটা হতে দেবে না। “কারণ,” নাতাশা ধীরে বলল, “সে আমাদের দুজনের উত্তরাধিকার। তোমার মস্তিষ্ক। আর আমার শরীর।”
ঠিক তখন ঋদ্ধিমান ঘরে ঢুকল। সে সব শুনেছে। তার চোখে বিস্ময়, কিন্তু তার ভিতরে ছিল বিজ্ঞানীর ঠান্ডা দৃঢ়তা। “Cryogenic embryo হলে,” ঋদ্ধিমান বলল, “তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।” অনির্বাণ তাকাল। তার চোখে নতুন আলো। “আজকের মেডিকেল সায়েন্স তাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে,” ঋদ্ধিমান বলল। “সঠিক সময়ে… সঠিক পরিবেশে… সে জন্ম নিতে পারে।”
নাতাশার চোখে জল এল। কিন্তু এবার সেই জলে শুধু দুঃখ ছিল না। ছিল আশা। অনির্বাণ ধীরে জানলার বাইরে তাকাল। আকাশ অসীম। তার ভিতরে একটা নতুন অনুভূতি জন্ম নিচ্ছে। একজন বাবার ভালোবাসা। একজন যোদ্ধার প্রতিজ্ঞা। সে ধীরে বলল—“আমি তাকে ফিরিয়ে আনব।”
নাতাশা তার হাত ধরল। এই স্পর্শ একটা প্রতিশ্রুতি। একটা ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
আর দূরে কোথাও, অজানা এক স্থানে, একটা ঠান্ডা, নিঃশব্দ ঘরে সারি সারি কাচের চেম্বার দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি চেম্বারের ভিতরে নিঃশব্দ সম্ভাবনা। তারই একটিতে, অতি ক্ষুদ্র এক আলো নিঃশব্দে অপেক্ষা করছে। সময়ের বাইরে। মৃত্যুর বাইরে। এক নতুন জীবনের সীমান্তে।
একটা স্ক্রিনে লেখা—
EMBRYO ID: A-N-01
STATUS: PRESERVED
PROJECT NAME: UTTARADHIKAR
এবং সেই নিঃশব্দ আলো—
অপেক্ষা করছে—
তার বাবা-মায়ের জন্য।

সমাপ্ত

Post a Comment

2 Comments

  1. এক উত্তরণের আলেখ্য। শেষ হবার পরও রেশ রয়ে গেল। বিজ্ঞানভিত্তিক এ লেখার মানবিক ছোঁয়া উপভোগ্য। নিশ্চয়ই অনির্বাণ আর নাতাশা তাদের সন্তানকে ফিরে পাবে। সে গল্প শোনার অপেক্ষায় রইলাম।

    ReplyDelete