জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ২৭৯/পণ্ডিতের বোকামি/আর্জেন্টিনা (দক্ষিণ আফ্রিকা)/চিন্ময় দাশ


দূর দেশের লোকগল্প— ২৭৯

পণ্ডিতের বোকামি

আর্জেন্টিনা (দক্ষিণ আফ্রিকা)

চিন্ময় দাশ


[আরমাডিলো (Armadillo) হোল এক ধরণের ছোট, অদ্ভূত দর্শন, স্তন্যপায়ী প্রাণী। এদের পিঠ, মাথা, লেজ এবং পা শক্ত হাড়ের প্লেট বা বর্ম দ্বারা আবৃত থাকে। সেই বর্ম ভীষণ শক্ত। এমনকি গুলি ছুঁড়লেও, গুলি এদের বর্ম ভেদ করতে পারে না। সেই গুলি উলটে শিকারির দিকেই ছুটে আসে। কিছু কিছু প্রজাতির আরমাডিলো আবার বিপদ বুঝতে পারলে, নিজেদের গোল বলের মতো গুটিয়ে নিতে পারে। 

মূলত দক্ষিণ এবং মধ্য আমেরিকার উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে এদের পাওয়া যায়। এরা গর্ত খুঁড়ে বসবাস করে এবং মূলত নিশাচর। 

এই গল্পের আরমাডিলোটি স্ত্রীজাতীয়। সেজন্য এই গল্পে আমরা একে ‘কুইন’ নাম দিয়েছি।]


বহু ব-হু-কা-ল আগের কথা। এক শেয়াল আর কুইন থাকে এক বনের মধ্যে। দুজনের মধ্যে ভারি ভাবসাব। অনেকটা সময় একসাথে থাকে দুজনে। হাজার রকম গল্পগুজব। নানান আলোচনা। হাসি-ঠাট্টার বিরাম নাই। বেশ সুন্দর সময় কেটে যায় দুটির। 

একদিন কুইন ভাবল, এভাবে গল্পগুজব করে কি সারা জীবন চলবে? কিছু কাজকর্মও করা দরকার। অনেক ভেবে ঠিক করল, কিছু চাষবাস করলে মন্দ হয় না। কাজটায় কিছু ঝামেলা আছে বটে, খাটাখাটুনি করতে হবে। তবে, তার ফলও তো পাওয়া যাবে। ফসল উঠবে যখন, তখন কতো মজা।  পায়ের উপর পা তুলে, বসে বসে খাওয়া যাবে।

মন যখন বলছে, দেরি করে কাজ কী? কাজে লেগে পড়লেই হয়। বনের ঠিক বাইরে অনেকটা ফাঁকা জমি। ছোট একটা নদী বয়ে গেছে পাশ দিয়ে। জলের অভাব হবে না এখানে।

ঘুরে ঘুরে জায়গাটা পরখ করে নিল ভালো করে। এবার মনে পড়ল খরগোশদের কথা। ফসল ফলাব আমি। আর হতভাগাগুলো এসে সব সাবাড় করে যাবে। আঁটোসাটো করে একটা বেড়া দেওয়া দরকার। 

এ সময়টা তাদের আড্ডা দেওয়ার সময়। শেয়াল এসে হাজির। কিন্তু ব্যাপার দেখে, তার তো চোখ উঠে গেল কপালে। এসব কী করছে তার বন্ধু? মাথায় ঢুকছে না কিছু। কী সুন্দর নরম রোদ্দুর। নদীর পাড়ে বসে গল্প করবার সেরা সময়। আর এ মেয়ে কি না কাজ করতে লেগে গেছে!

--কী হোল, বন্ধু? সক্কাল সক্কাল বেড়া বাঁধতে লেগেছ কেন?

কুইন বলল—চাষবাস করব ঠিক করেছি। পেটও ভরবে। হাটে বেচে দিলে, দুটো পয়সাও আসবে হাতে। 

শেয়াল একটু অবাক হয়ে গেল। ব্যাপারটা ঠিকঠাক মাথায় ঢুকছে না তার। হঠাৎ টাকা করতে চাইছে কেন তার বন্ধু? নিশ্চয় বড়লোক হবার ধান্দা। টেক্কা দিতে চায় আমাকে। তার মানে, বনের মধ্যে কেউকেটা হয়ে উঠতে চাইছে। সবাই তখন বেশ মান্যগণ্য করবে ওকে।

শেয়াল অতি ধুরন্ধর জীব। হোলই বা বন্ধু। কুইনের ভালো, সে কোন মতেই সইবে না। সাথে সাথেই ফন্দী এঁটে নিল শেয়াল। এই চাষবাস থেকে তার নিজের টাকা করে নিতে হবে। খাটাখাটুনি করবে কুইন। ফায়দা তুলব আমি। দেখতে দেখতে আমিই বড়লোক হয়ে যাব কুইনের চেয়ে। 

সোজা কুইনের কাছে গিয়ে হাজির শেয়াল। সে বেচারি তখন ঘেমে নেয়ে অস্থির। শেয়াল বলল—এই জমি কিনতে, আর বেড়া দিতে তোমার নিশ্চয় অনেক খরচ হয়েছে?

--সে তো হয়েছেই। ঘাম মুছতে মুছতে জবাব দিল কুইন। 

--এক কাজ করি এসো। চাষবাসটা দুজনে মিলে করি। এবার তো বীজ জোগাড় করতে হবে। তবে, ভালো জাতের বীজ না হলে, ফসল কিন্তু ভালো পাওয়া যাবে না।

🍂

কুইন বলল—সে তো ঠিক। ভালো বীজ মানে বেশি ফসল, বেশি লাভ। 

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শেয়াল বলল—সেটাই তো বলছি। এতো খরচাপাতির পর, ভালো জাতের বীজ কেনা কি সম্ভব হবে তোমার? আর ভালো বীজ না হলে, পুরোটাই জলে যাবে তোমার।

--তুমি কী বলছ, শুনি।

শেয়াল তো এই মওকা খুঁজছিল। বলল-- কিছু টাকা আমারও আছে। ভালো বীজের দামও ভালো। সে টাকা আমি দেব। তবে, একটা শর্ত আছে আমার।

--বলো, তোমার কী শর্ত?

--বীজ যেহেতু আমি আনাচ্ছি, আমিই ঠিক করব ফসলের কোন দিকটা আমি নেব। খুব অন্যায্য বললাম কি?

শেয়ালের অনেক বুদ্ধি, কুইন সেটা ভালো করেই জানে। তবে, এটাও জানে, শেয়াল ভারি ধুরন্ধরও। তাই বলে, কুইনও খুব একটা বোকা নয়। কিছু একটা ফন্দী যে শেয়াল এঁটেছে, এটা অনুমান হচ্ছে তার। 

তবে, কুইন এটাও জানে, ভালো জাতের বীজ জোগাড় করতে হলে, শেয়ালকে কাজে নিতেই হবে তার। সে রাজি হয়ে গেল—অবশ্যই তাই হবে। তাছাড়া, তোমার মত বন্ধুর সাথে মিলেজুলে চাষ করলে, আমারও তো লাভ। সবটা কী আমার একার হাতে হোত ভালো করে?

শেয়াল মনে মনে ভারি পুলকিত। প্যাঁচে পড়ে গেছে বোকাটা—এই ভেবে, বলল—তাহলে এবারের চাষে মাটির তলায় যা থাকবে, সেটা তোমার। আর উপরের যা কিছু, সেসব আমি নেব। রাজি? 

শেয়াল যে ভয়াণক কিছু ফন্দি এঁটেছে, অনুমান করতে অসুবিধা হোল না। কুইন মনে মনে বলল—দাঁড়া, হতচ্ছাড়া। বন্ধুর সাথে চালাকি করতে নেমেছিস। মজা দেখাচ্ছি। কত ধানে কত চাল, বুঝিয়ে ছাড়ব। মুখ আলো করে বলল—কেন রাজী হব না? তুমি কি আমার পর? 

শেয়াল ভারি খুশি। আর একটা কথা বলি, বন্ধু। বয়স হয়েছে। ছোটাদৌড়া করতে হাঁফিয়ে উঠি আজকাল। হাটেবাটে যাওয়াটা ধকল হয়ে যাবে আমার পক্ষে। বীজটা তুমিই আনবে। ভালো জিনিষ নিও। পয়সা যা লাগবে, আমি দিচ্ছি।

হাতে স্বর্গ পেয়ে গেল কুইন। মুখে বলল—ওঃ ঠিক আছে। বন্ধুর জন্য এটুকু করতে গতর ক্ষয়ে যাবে না আমার। বীজ আনার ভার তুমি আমার হাতে ছেড়ে দাও। দেখে নিও, হাটের সেরা বীজই জোগাড় করে আনব আমি।

পর দিন। সকাল হয়েছে । ফুরফুরে মন মেজাজ। বাজারে গিয়ে বেছে বেছে সেরা জাতের আলুবীজ কিনে আনল কুইন।

চাষ শুরু হয়েছে। গাছ বাড়ছে ততরতরিয়ে। আনন্দ ধরে না শেয়ালের। কিছুদিন বাদে ফুল এসেছে গাছে। সবুজ রঙের গোল-গোল ফলও হোল কিছু। শেয়ালের যেন পা পড়ে না মাটিতে। আর দেরি সইছে না শেয়ালের। সব গাছ কেটে নিয়ে চলে গেল সে। 

আসল ফসল তো ছিল মাটির নীচে। সমস্ত আলু পেয়ে গেল কুইন।

শেয়াল যে ঠকে গিয়েছে এবার বুঝতে পারল। রাগ করে বলল—তুমি সব পেয়ে গেলে। আর, এক বোঝা গাছই কেবল জুটল আমার কপালে। এবার কিন্তু ওটি হবে না। এবার মাটির তলার যা কিছু, পুরো অংশ আমি নেব। উপরের অংশ তোমার।   

কুইন বলল—তোমার পয়সায় বীজ আসবে। তোমার শর্ত তো মানতেই হবে, বন্ধু। তাই হবে।

কুইন জানে কী করতে হবে। মাটি চষল ভালো করে। সেচ দিল নদী থেকে জল তুলে। বীজ বোনা হয়েছে। সবুজ গাছে সারা মাঠ ভরে উঠেছে। মনে হয়, কেউ যেন মখমল বিছিয়ে রেখেছে মাঠ জুড়ে। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। 

দেখতে দেখতে গাছে হলুদ রঙ ধরল। শেয়ালের আর ধৈর্য ধরল না। কুইনকে বলল—এবার তোমার গাছ তুমি কেটে নাও। আমি ফসল তুলব।

এবারে মাঠে গম বুনেছিল কুইন। মনের ফূর্তিতে ফসল তুলে নিয়ে চলে গেল সে। আবারও বেমালুক ঠকে গেল শেয়াল। 

রেগে কাঁই হয়ে গেল বেচারা। চেঁচিয়ে বলল—দু’বারই ঠেকে গেলাম আমি। কিছুই জুটল না আমার কপালে। একবোঝা গাছপালা আর শেকড়-বাকড়। এদিকে পয়সা-কড়ি যা ছিল, সব শেষ হবার মুখে। তুমি রুটি বানিয়ে খাচ্ছো। সাথে মিষ্টি মিষ্টি আলুর দম। আর আমি হাওয়া খেয়ে বেড়াচ্ছি। 

কুইন নিরীহ মুখে জবাব দিল—আমার কী দোষ, তুমিই বল। শর্ত যা দিয়েছ, আমি মেনে নিয়েছি। রা-টিও কাড়িনি। কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব বুঝে নিয়েছ তুমি। আমাকে কিছু বলতে পারবে না। 

শেয়াল বলল—ওসব বলাবলির কথা ছাড়। আমি কিছু বলতেও যাচ্ছি না। তবে, এবার একটা কথা বলব।

--বলো, কী বলবে? আমি সবেতেই রাজি আছি। 

শেয়াল বলল—এবার চাষে যা ফলবে, তার উপরের অংশ আমার, নীচের অংশও আমার।

কুইন বলল—এ কথার অর্থ? জমি আমার, সেচের জল আমার। চাষও করব আমি। আর, আমি কিছুই পাব না? এ কেমন বিচার?

পাবে না কেন? মাঝের সব অংশ তুমি পাবে। 

কুইন ফন্দি এঁটে নিল মনে মনে। কী করতে হবে, ঠিক করে নিয়েছে সাথেসাথেই। কিন্তু মুখে বিরস ভাব দেখিয়ে বলল—কী আর করা যাবে? আমার তো আর টাকা-পয়সা নাই। তুমি যা বলবে, মেনে নিতেই হবে। 

--ঠিক আছে, বন্ধু। চাষের কাজে নেমে পড়। কদিন আমি একটু বেয়াই বাড়ি বেড়িয়ে আসি। ফসলে পাক ধরলে ডাকবে আমাকে। তবে হ্যাঁ, একটা কথা বলে রাখি। আমি আসবার আগে, একটা গাছও কিন্তু তুমি তুলবে না।

এবারেও নিরিহ ভাবে মাথা নেড়ে দিল কুইন—তুমি যা বলবে, তাইই হবে। চিন্তা কোর না। 

শেয়াল গেল তার বেয়াই বাড়ি। কুইন গেল মাঠে ফসল বুনতে। শেয়াল শর্ত দিয়ে গিয়েছে মাটির ওপরের নেবে, নীচেরও নেবে। শয়তানটাকে কীভাবে বোকা বানাতে হয়, ভালই জানা আছে তার।

হাটে গিয়ে এক চক্কর ঘুরে নিল সে। সমস্ত দোকান জরীপ করা হয়ে গেল। মনে মনে বেছে রাখা জিনিষটা চোখে পড়ছে না। যখন একেবারে হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থা, তখন এক বুড়ির দিকে চোখ গেল। কয়েক ছড়া ভুট্টা নিয়ে বসেছে বুড়ি মানুষটা। হাটের একেবারে এক টেরে বসে আছে। তাই এতক্ষণ চোখে পড়েনি তার। 

ভুট্টা দেখে চোখ নেচে উঠল কুইনের। এটাই হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছিল এতক্ষণ। বুড়ির সব ভুট্টা কিনে, বাড়ির পথ ধরল কুইন। 

পণ্ডিতকে বোকা বানাতেই হবে আবারও। ভারি যত্ন করে চাষ করছে এবার। মকমকিয়ে বাড়ছে প্রতিটা গাছ। ফল এসে গেল দেখতে দেখতে। ফসল পুরুষ্টু হতে শুরু করেছে এবার। কুইন হুঁশিয়ার হয়ে গেল। ভুট্টাগাছের পাতা লম্বা লম্বা। প্রত্যকটা ফলকে পাতায় জড়িয়ে মুড়ে দিল। কারও চোখ না পড়ে যেন। 

গাছের পাতায় বাদামী রঙ ধরতে শুরু করেছে। খবর পেয়ে, শেয়াল ফিরে এসেছে বেয়াইবাড়ি থেকে। ফসল তোলা হবে। কুইন বলল— তোমাকে গতর খাটাতে হবে না। আমি ফসল তুলে দিচ্ছি। 

শেয়ালের চোখ গাছের দিকে। প্রত্যেকটা গাছের মাথায় গোছা গোছা কিছু ফলে আছে। চোখ চকচক করে উঠল শেয়ালের। মনে ভাবল--ভাগ্যিস মাথা খাটিয়ে ওপর-নীচ দুটো অংশই নেব বলে রেখেছিলাম। ওপরে যখন এতো, নীচেও কিছু আছে নিশ্চয়।

ফসল তুলছে কুইন। প্রতিটা গাছ উপড়ে তুলছে। গোড়া আর ডগা কেটে, যত্ন করে গুছিয়ে রাখছে এক দিকে। সেগুলো শেয়ালের ভাগ। 

আসল ফসল তো আছে গাছের মাঝের অংশেই। পাতায় জড়ানো পাকা ভুট্টা সব। পুরুষ্টু দানায় ঠাসা। শেয়াল জানতেও পারল না। মাঝের অংশগুলো আর এক দিকে ছুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিতে লাগল কুইন।

ফসল তোলা শেষ হোল। ভাগাভাগিও। পাতার মোড়ক খুলে ভুট্টা বের করতে লাগল কুইন। দেখতে না দেখতে ঝুড়ি ভরে উঠছে তার। 

শেয়াল দেখল, লাভের লাভ কিছুই হয়নি তার। শুধু গোছা গোছা শেকড় আর কয়েক ঝুরি শুকনো ফুল। কোনটাই মুখে তুলবার জিনিষ নয়। 

বার বার তিন বার। বেমালুক ঠকে গেছে শেয়াল পণ্ডিত। কিন্তু কিছু করবার নাই তার। নিজেই শর্ত দিয়ে রেখেছিল সে। ধূর্তামিটা করেছে কুইন। 

রাগে শেয়ালের মাথা গরম। মাটিতে পা আঁচড়াতে লাগল। চিৎকার করে বলল—এই শেষ। চাষবাস তো করবই না। তোর সাথে আর ভাবসাবও রইল না আমার। আজই আমাদের বন্ধুত্বের শেষ দিন।

কুইন কোন জবাব দিল না। মনে ভাবল, ভালোই হোল। আপদ বিদায়। তিন বার চাষ করা হয়ে গেছে। কিছু পয়সা তো জমেছে হাতে। নিজের জমির বীজ এখন নিজেই কিনতে পারব আমি। ভাগিদারীর চাষ আর করতে হবে না আমাকে। 

সেই তখন থেকে শেয়াল আর আরমাডিলোর মধ্যে কোনও সম্পর্ক নাই। 

Post a Comment

0 Comments