জ্বলদর্চি

দূর দেশের লোকগল্প— ২৮০/বুদ্ধির গুণে মোড়লের বউ সোমালিয়া (পূর্ব আফ্রিকা)/চিন্ময় দাশ


দূর দেশের লোকগল্প— ২৮০

বুদ্ধির গুণে মোড়লের বউ 

সোমালিয়া (পূর্ব আফ্রিকা)

চিন্ময় দাশ


[সোমালিয়া। পূর্ব আফ্রিকার একেবারে উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থান। দেশটার গড়ন লম্বাটে। বাম দিকে ইথিয়োপিয়া আর কেনিয়ার ভূভাগ। ডান দিকে খানিকটা আডেন উপসাগর। আর, বাকি সবটা জুড়ে ভারত মহাসাগরের জলরেখা।

বিচিত্র প্রকৃতি দেশটার। উত্তরে নানান নামের পাহাড়-পর্বতমালা। দক্ষিণে কয়েকটা নদীবিধৌত উর্বর উপত্যকা। 

আর, মাঝখান জুড়ে মালভূমি এলাকা। খটখটে শুকনো মাটি আর বালুকার প্রান্তর। বাতাস ভারি উষ্ণ। বৃষ্টিপাত একেবারে অনিয়মিত। মরুভূমি আর আধা-মরুভূমি এলাকা। আমাদের এবারের গল্পটি এই এলাকার একটি গ্রামের।]


গ্রামের মোড়ল মারা গিয়েছিল। তার ছেলেকে মোড়ল করা হয়েছে। সেটাই এলাকার নিয়ম। 

শক্ত সুঠাম চেহারা সে ছেলের। নিপুন শিকারী।। ভাল  যোদ্ধাও। গাঁয়ের লোকজন ভারি নিশ্চিন্ত। কিন্তু হলে কী হবে। নিত্য নতুন ভাবনা পাখা মেলে দেয় সেই ছেলের মাথায়। তাই তো আড়ালে-আবডালে তাকে ‘পাগলা ছেলে’ বলে ডাকে গাঁয়ের লোকেরা। 

একটু ফুরসৎ পেলেই, ছেলেটা সাগরের পাড়ে গিয়ে বসে থাকে। কী যে করে বসে বসে, কারও মাথায় ঢোকে না সেটা। আসলে কবির স্বভাব সেই ছেলের। 

লোকেরা বলে, হবে না কেন? বিয়ে-থা না করলে, এমন ভাবুক আর উড়নচণ্ডী তো হবেই। ওর আর দোষ কী? মুরুব্বিরা বলে মোড়লকে—এবার একটা বউ নিয়ে এসো। সংসারী হও। এভাবে কতদিন চলবে?

--কেন, খুড়ো? বেশ তো চলে যাচ্ছে। 

--চলে তো যাচ্ছে। সবাই দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু কতদিন চলবে? বয়সটাও তো চলে যাচ্ছে। 

মোড়ল মশাই হেসে বলে—দেখি, কতদিন চালানো যায়। 

সমবয়সী জনাকয়েক ইয়ারবন্ধুও আছে মোড়লের। তারাও মাঝে মাঝে চেপে ধরে—আর দেরী ভালো নয়। এবার একটা বউ ঘরে নিয়ে আয়।

একটাই জবাব সে কথার—যুৎসই কাউকে পাই। তবে না ঘরে আনব। 

এভাবেই দিন চলে যায়। মোড়ল আছে মোড়লের মত।

একদিন কী যে ভূত চাপল মানুষটার মাথায়। গাঁয়ের লোকদের হুকুম করে দিল—প্রত্যেক গেরস্তকে এক টুকরো করে পশুর মাংস আনতে। দেখি, কে কী মাংস আনে। যার মাংসে বিবেচনার চিহ্ন থাকবে, পুরষ্কার দেওয়া হবে তাকে।🍂

সবাই ঘরে ফিরে গিয়েছে। কেউ বাড়ির ছাগল জবাই করছে। কেউ ভেড়া, কেউ গরু, কেউ বা উট বেছে নিয়েছে। 

গাঁয়ের একেবারে একটেরে এক গরীবের বাড়ি। বাড়ি ফিরে, সেও মোড়লের ফরমানের কথা জানিয়েছে বাড়িতে। গরিবের বারি। তেমন জুৎসই কিছু নাই, মনে ধরবার মত। 

একটা মেয়ে ছিল লোকটার। সে বলল—তুমিএক কাজ করো, আব্বা। রোগা দেখে একটা ছাগল জোগাড় করে আনো। তারপর দেখো, কী হয়। 

লোকটা তো অবাক। ভুরু কুঁচকে বলল—রোগা ছাগল? বলছিসটা কী তুই, বেটি? 

--আব্বা, য বলছি, তাই করো। ভাবতে হবে না তোমাকে। বেরিয়ে পড়। তবে, মনে রেখো। ছাগল যেন একেবারে হাড্ডিসার রোগা হয়। 

অনেক খুঁজে তেমনই একটা ছাগল জোগাড় করেছে লোকটা। মেয়ে ভারি খুশি ছাগলের শুকনো চেহারা দেখে। বলল— সুন্দর হয়েছে। গলাটা কেটে নিয়ে চলে যাও। কোনও খচখচানি রেখো না মনে।

পঞ্চাশ-ষাটটা বাড়ি গ্রামে। লোকটা যখন মোড়লের ঘরে পৌঁছল, আর সবাই গিয়ে হাজির হয়ে গিয়েছে। লাইনের একেবারে শেষে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। 

মনে কিন্তু ভয় মানুষটার। মেয়ের কথা শুনে যা নিয়ে এসেছে, সেটা কী করে মোড়লের সামনে দাখিল করবে, বুক দুরুদুরু করছে তার। 

এক সময় এসেও গেল তার পালা। কতজন কত কিছু এনে জমা দিয়ে দিয়েছে। সব সাজানো আছে মোড়লের পাশটিতে। আড়চোখে সে সবের দিকে দেখে নিল লোকটা। ভয়ে ভয়ে তার হাতের সামান্য জিনিষটা তুলে ধরল মোড়লের সামনে। 

গ্রামের লোকগুলো সবাই দেখল মাংসটা। একেবারে সুঁটকি মাংসের মতো লাগছে দেখতে। ভেতরের হাড্ডির উপরে চামড়াটুকুই জড়িয়ে আছে যেন। মাংসের বালাই নেই বললেই চলে। হো-হো করে হেসে উঠেছে অনেকে।   

মোড়লের ভুরু কুঁচকানো। মাংসটা দেখবার পর, লোকটার দিকে তাকাল। পা থেকে মাথা পর্যন্ত জরীপ করে নিল ভালো করে। 

এটা মাংস, না মাংসের ছিবড়ে হে? এটা এনেছ কেন? লোকটা ভড়কে গেল এমন প্রশ্ন শুনে। মেয়েটাকে গালমন্দ করল মনে মনে। ভুল হয়ে গেছে বুঝতে দেরী হল না। 

অজুহাত দিতে গিয়ে সত্য কথাটা বলে ফেলল—এটা আমার কাজ নয়, বাবা। আমার মেয়ের বুদ্ধিতে করতে হয়েছে। 

--এমন একটা রুগ্ন ছাগল জোগাড়ই বা করলে কোথায়? 

--সে আর বোল না। সারা দিন ঘুরে ঘুরে পাশের গাঁ থেকে পেয়েছিলাম। 

মোড়ল গম্ভীর হয়ে কেবল একটা হুঁ বলল। একটু চুপ করে থেকে বলল—মেয়ের এমন কথা তুমি শুনতে গেলে কেন? তোমার নিজের ঘটে বুদ্ধি ছিল না?

এ কথার কী জবাব হয়? লোকটা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল। মোড়ল এবার আরও গম্ভীর। বলল—বাড়ি যাও। মেয়েকে ডেকে আনো। তার কাছেই জবাব শুনতে চাই।

বাড়ি ফিরছে আর নিজেকেই দোষ দিচ্ছে লোকটা—কেন যে মেয়ের কথা কানে তুলতে গেলাম। এখন মেয়েটাকেই না সবার সামনে হেনস্থা হতে হয়। 

বাপ-বেটি ফিরে এসেছে মোড়লের বাড়ি। ভীড় এক্টুও কমেনি তো বটেই। উলটে লোক আরও বেড়েছে। এমন ঘটনা কার না নিজের চোখে দেখতে ইচ্ছা হয়। 

মোড়ল মেয়েকে জিজ্ঞেস করল—তুমি এমন চিমড়ে ধরা ছাগল জোগাড় করে আনতে বলেছিলে তোমার আব্বাকে? 

--হ্যাঁ, বলেছিলাম তো। 

--এমন ছাগল বেছেছিলে কেন তুমি? 

মেয়েটা জবাব দিল— একটাই তো পেট মানুষের। কতটুকু মাংসই বা ধরে তাতে? তাছাড়া, বেশি লোভে বেশি ক্ষতি, বেশি বিপদ। পেটটা ভরলেই তো দিন চলে যাবে।

মোড়ল বলল—এটাই তোমার ভাবনা? 

--অভাবী মানুষ আমরা। চিন্তাভাবনাও আমাদের এমনই। তাতে তুমি মারতে চাইলে মারো। কাটতে চাইলে কাটো। যেটা ঠিক বলে ভেবেছি, সেটাই করেছি। এবার তোমার বিচার।  

গোটা গ্রাম দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। সবাই শুনছে। দু’একজন মুরুব্বি মানুষ মাথাও নেড়ছে।

মোড়লের মুখে আলো ফুটে উঠেছে—খুব খাঁটি কথা বলেছ তুমি। আমাদের সমাজে লোভ হোল বড় বিপদের কারণ। গ্রামের মধ্যে তুমিই সবচেয়ে বুদ্ধিমতী মেয়ে। তোমারই জিত হয়েছে। মনে মনে এমন একটা কিছুই চাইছিলাম আমি। 

হই-হই করে উঠল সকলে। এক মুরুব্বি বলল—তা, তুমি তো সেরাকে পুরষ্কার দেবে বলেছিলে। তার কী হবে? দাও বেটিকে পুরষ্কার। 

মোড়ল মেয়েটিকে বলল—তুমি বিবেচনার পরিচয় দিয়েছ। তুমিই বল, কী পুরষ্কার চাও তুমি। 

জিতে গিয়েছে, সে তো ভারি খুশি। পরিষ্কার গলায় বলল—কাজ করেছি আমি । পুরষ্কার তুমি দেবে। আমি কেন বলতে যাব? 

মোড়ল আর রাখঢাক না রেখে, মেয়ের বাবার দিকে তাকাল—একটা জিনিষ চাই তোমার কাছে। দিতে হবে কিন্তু। না করলে চলবে না।

বিড়ম্বনার হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেছে। হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে এ যাত্রা। সে হাসি মুখ করে বলল—দেবার ক্ষমতা থাকলে, নিশ্চয় দেব। বল, কী চাইছ তুমি? 

হাসি মুখ করে, মোড়ল বলল—তোমার বেটিকে শাদি করতে চাই আমি। তুমি অনুমতি দাও আমাদের। এমন একজন বিবি ঘরে থাকলে, সংসার নিয়ে চিন্তা করতে হবে না আমাকে। 

জমায়েত শুদ্ধ সবাই হইহই করে উঠল। 

গ্রামশুদ্ধ সবাই কব্জি ডুবিয়ে ভোজ খেল মোড়লের বাড়িতে। 


Post a Comment

0 Comments