ব্রহ্মসূত্র --- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি
পর্ব ৪
প্রীতম সেনগুপ্ত
একদিন গঙ্গাস্নানে যাওয়র সময় শঙ্কর দেখলেন, এক যুবতী স্বামীর মৃতদেহ পথের মধ্যস্থানে রেখে তার সৎকারের জন্য সাহায্য প্রার্থনা করছে। গমনাগমনের অসুবিধা হচ্ছে দেখে শঙ্কর যুবতীকে শবদেহ একপাশে সরিয়ে দিতে বললেন। যুবতী বলল, ‘ওকে সরতে বোলো না বাবা!' যুবতীর নির্বুদ্ধিতায় বিরক্ত হয়ে শঙ্কর বললেন, ‘এই মৃতদেহে কি নড়বার শক্তি আছে? ওটা সরিয়ে রাখ।’ যুবতী আগের মতোই গাম্ভীর্য বজায় রেখে উত্তর দিল, ‘শক্তি না থাকলে কি একটুও সরা যায় না?’ শঙ্কর বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কি অসম্ভব কথা বলছ?’ তখন যুবতী বলল, ‘অসম্ভব কেন হবে বাবা? আদি-অন্ত-রহিত এই প্রকৃতি যদি শক্তিহীন, চৈতন্যহীন হয়েও নড়তে চড়তে পারে, তবে এতটুকু শবদেহ সরতে পারবে না কেন?’ এই কথা শুনে শঙ্কর রীতিমতো চমকে উঠলেন। তার মনে শাস্ত্রে উক্ত সগুণ ব্রহ্মের কথা যে কখনও উঠত না তা নয়, কিন্তু নির্গুণ ব্রহ্মানুভূতির দিকে তাঁর প্রবণতা এতদিন এত বেশি পরিমাণে ছিল যে সে বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারেননি। সগুণ ব্রহ্মের চিন্তায় তিনি তন্ময় হলেন। আকস্মিক সেই শব ও যুবতী অদৃশ্য হয়ে গেল। নব রূপে শঙ্করের জ্ঞানচক্ষুর উন্মেষ ঘটল। তিনি দেখলেন সেই নির্গুণ ব্রহ্ম এক বিরাট মূর্তিতে সগুণ অবস্থায় বিরাজমান! এই অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড হল তাঁর অবয়ব, লীলাচ্ছলে তিনি সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ে রত।
🍂
শঙ্কর ভক্তিসাগরে ডুবে গেলেন, তার শরীর কন্টকিত হল, প্রবল অশ্রুপাতের মধ্য দিয়ে তিনি আদ্যাশক্তিকে অনুভব করলেন এবং ‘মা,মা’ বলে ব্যাকুল হয়ে উঠলেন! এ যেন সেই দক্ষিণেশ্বরের নরেন্দ্রনাথ তথা স্বামী বিবেকানন্দের মা কালীর অস্তিত্বকে মেনে নেওয়ার মতো। ঠাকুর ( শ্রীরামকৃষ্ণ ) আনন্দ করে বলেছিলেন, ‘নরেন কালী মেনেছে।’ এইভাবে শঙ্কর সগুণ-নির্গুণ উভয় রূপই প্রত্যক্ষ করলেন। কিন্তু যিনি বেদ উদ্ধারের জন্য অবতীর্ণ হয়েছেন, তাঁকে জ্ঞানের চরমসীমায় পৌঁছাতে হবে। যেতে হবে নিরন্তর ব্রহ্মানুভবের দশায়। এই বিষয়ে স্বয়ং দেবাদিদেব মহাদেব শঙ্করকে শিক্ষা দিতে প্রয়াসী হলেন। একদিন গঙ্গাতীরে যাওয়ার পথে শঙ্কর এক চণ্ডালের সম্মুখীন হলেন। চণ্ডাল চারটি কুকুর নিয়ে মাতাল অবস্থায় পথ জুড়ে আসছিল। কুকুর ও চণ্ডালের স্পর্শর ভয়ে সঙ্কুচিত শঙ্কর পথের একপাশে সরে দাঁড়িয়ে চণ্ডালকে পথ ছেড়ে দিতে বললেন। কিন্তু চণ্ডাল আগের মতোই চলতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে বলতে লাগল বেদান্তের সব উচ্চ তত্ত্ব। সে বলল, ‘কে কাকে স্পর্শ করবে? এক ছাড়া দুই বস্তু কোথায়? তুমি কার স্পর্শভয়ে সঙ্কুচিত হচ্ছ? আত্মা তো কাউকে স্পর্শ করেন না, তাঁকেও কেউ স্পর্শ করতে পারেনা।’ চণ্ডালের মুখে এরকম জ্ঞানের কথা শুনে শঙ্কর অদ্বৈতবোধের সঙ্গে তাঁর ব্যবহারের অসঙ্গতি লক্ষ্য করে লজ্জা পেলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ গুরু জ্ঞানে চণ্ডালের চরণে প্রণত হলেন। সেই মুহূর্তে চণ্ডাল তার স্বরূপ প্রকাশ করল। সে শ্বেতকায় মহাদেবের রূপ গ্রহণ করল। শঙ্করের দৃষ্টি তাঁর প্রতি নিবদ্ধ হওয়া মাত্রই তিনি সমস্ত জগৎ শিবময় দেখতে লাগলেন। মহাদেব শঙ্করকে আশীর্বাদ করলেন এবং বেদান্ত প্রচারে প্রয়াসী হওয়ার উপদেশ দিয়ে অন্তর্হিত হলেন। গুরু ও মহাদিদেবের আদেশে শঙ্কর সবার আগে বেদান্তশাস্ত্রের ব্যাখ্যা রচনা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন, কিন্তু কাশীতে এত জনসমাগমের মধ্যে গ্রন্থ রচনা অসম্ভব, তাই নিভৃতে নির্জনে শাস্ত্র চিন্তা ও ব্যাখ্যা প্রণয়নার্থে তিনি সশিষ্য বদরিকাশ্রম চলে গেলেন। সেখানে গিয়ে উপনিষদ, গীতা ও ব্রহ্মসূত্রের ‘ভাষ্য’ নামক ব্যাখ্যা রচনা করলেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ‘ভাষ্য’ ব্যাপারটা ঠিক কী? শ্রীইন্দ্রদয়াল ভট্টাচার্য (স্বামী প্রেমেশানন্দ ) স্পষ্টভাবে এই বিষয়ে জানাচ্ছেন ---‘শাস্ত্রব্যাখ্যা উপলক্ষে স্বীয় দার্শনিক মতস্থাপনের জন্য অন্য পক্ষ সমূহের মত খণ্ডন এবং স্বপক্ষের যুক্তি ও বেদাদিশাস্ত্রের সমর্থক প্রমাণ প্রদর্শন করিলে সেই ব্যাখ্যাকে ভাষ্য বলে, যেমন -- শাঙ্কর ভাষ্য, রামানুজভাষ্য। সাধারণভাবে শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করিলে তাহাকে বলে টীকা, যেমন --- শ্রীধর স্বামীর টীকা, আনন্দগিরির টীকা।
(তথ্যসূত্রঃ শঙ্কর চরিত -- শ্রীইন্দ্রদয়াল ভট্টাচার্য, উদ্বোধন কার্যালয়)
0 Comments