অন্তরা ঘোষ
শিলাবতীর একটি ছোট্ট উপনদী কুবাই।সেই কুবাই নদীকে কেন্দ্র করে কিছু অভিজ্ঞতা,কিছু অনুভূতি মিলিয়ে মিশিয়ে কবি সুমন রায় লিখেছেন,তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'বুকে ধরে তোমার রুমাল'।
পঞ্চাশটি কবিতা নিয়ে গড়ে উঠেছে কাব্যের শরীর।যার মধ্যে বেশ কয়েকটি কবিতায় কুবাই এসেছে সশরীরে।রয়েছে প্রিয়তমার রুমাল বুকে ধরে রাখার কবিতাও।শুধু নদী ও নারী নয়,পুরাণ,প্রকৃতি মহাবিশ্বসহ জীবন ও জগতের অনেক আলো ও অন্ধকারের ছবি ধরা পড়েছে আলোচ্য কাব্যে।
কাব্যটির শুরু ও শেষ কবিতা কুবাইকেন্দ্রিক।জীবনের বহমানতাকে কুবাইয়ের মতোই এখানে প্রকাশ করেছেন কবি। কখনো সে তীব্র গতি,কখনো ক্ষীণস্রোতা।নদীর চঞ্চলতা ও নির্বাকতা যেন মানুষ মানুষীর সম্পর্কের ধারাপাতের মতো।কুবাইকেন্দ্রিক কবিতা গুলি হল―'ঘূর্ণি', 'সিঞ্চনে মুখর', 'সে কুবাই সে কুবাই', 'তোমরা জানো না','অন্তর','কুহকী কুবাই', 'পূর্ণিমা এলে','সুধাংশু বাবুর গাণিতিক বোধ','অদৃশ্য দৃশ্যমান' এবং 'জীবনের মানে।' 🍂
সমস্ত কবিতায় কুবাই এসেছে তার প্রবহমানতা নিয়ে। ঋতুচক্রের আবর্তন আর মানুষের সামাজিক সংকীর্ণতার যূপকাষ্ঠে ভরভরন্ত কুবাই কখনো কখনো হয়ে উঠেছে শীর্ণকায়া। কিন্তু কবি অপেক্ষায় থাকেন কুবাইকে পূর্ণতায় দেখার জন্য।
'তোমরা জানো না' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন এক জীবনে মানুষের জানা হয় কম। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ সবার সমান হয় না।আর হয় না বলেই,একটা ছোট্ট নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মানুষের যাপন বিস্তার পায় না সেভাবে। তাই কবি আক্ষেপ করেন, "তোমরা কখনো কুবাই নদীতে যাওনি
তার মায়াবী পাড়ে আলো আঁধারে বসোনি কখনো।"
আলোচ্য কাব্যের অন্য একটি কবিতা 'প্রেম প্রেম'। নশ্বর প্রেমে বিচ্ছেদের যন্ত্রণা স্বাভাবিক।সেই বিচ্ছেদ দূর করতে কবি চিঠি লিখেন তাঁর প্রিয়তমাকে।তবে সব চাওয়া পাওয়া হয় না।কবি বলেন,
" আসলে তা পরাকাষ্ঠা নয়, প্রেম প্রেম।"
আর একটি প্রেমের কবিতা 'পূর্ণশশী'।চাঁদের অনুষঙ্গে নারী নায়িকার রূপের প্রকাশ ঘটিয়েছেন কবি।কখনো সে ঘোমটা পরা বধূ,কখনো বা ক্লাসের একটি উছ্বল মেয়ে।যে আবার প্রয়োজনে অমাবস্যার অন্ধকারে হয়ে উঠতে পারে অভিসারিকা।
অপর একটি প্রেমের কবিতা 'প্রেমের ক্লাশরুম'।ফুল,পাখি, তারা,সমুদ্র আর দিগন্তের সান্নিধ্য কল্পনায় কবি এখানে জীবনের লিপিকে আত্মস্থ করতে চান।যতি,ছন্দ,লয়ের পাঠ নিতে চান প্রেমের ক্লাসরুমে।
অন্য একটি কবিতা 'বাসা খুঁজছি'।এখানে ঘরের সন্ধানে কবির যাত্রা। ঘরণীর অনুষঙ্গতেও কবি যত্ন কল্পনায় প্রকাশ করেছেন,
"বসবার একটু জায়গা থাকবে সুবাসিত
হাতের তালুতে চিবুক বসবে কখনো।"
অপর একটি প্রেমের কবিতা 'তোমার রুমাল'।অনেক প্রতিশ্রুতি সাথে নিয়ে কবি পথ হেঁটেছেন বুকে ধরে তোমার রুমাল।রুমাল এখানে আক্ষরিক অর্থের সীমানা পেরিয়ে ব্যঞ্জনায় মূর্ত হয়েছে যেন।এখানে প্রতিটি প্রতিশ্রুতির অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে চাপা অভিমান।
আর একটি কবিতা 'খোয়াব'। নারী নায়িকার স্বপ্নিল উপস্থিতির অনুষঙ্গে কবি এই কবিতাটি লিখেছেন।
একটি অন্যরকম কবিতা হলো 'মেটাফরিক'।এই কবিতায় আকাশের রূপাঙ্গনে জীবনের অনুভবকে তুলে ধরেছেন কবি। কবির মনে হয়েছে,
"যেন সাজি উপচে সদ্য গজানো পাতা কটা ঝরে
পড়েছে
পূজারিণীর আলগোছ থেকে।"
এখানে মহাকাশের বিশালতাকে রূপকের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন কবি।
শব্দব্রহ্ম। এই শক্তিকে ধ্রুব সত্যি বলে মানেন তাঁরা,যাঁরা শব্দের কারিগর।কখনো কখনো জীবন যখন নানা সমস্যায় জর্জরিত,অন্তরমহল জুড়ে যুগজরার তীব্র দহন চলছে,তখন ঘটে শব্দ সংকট। সেই সংকটে বসে কবি ভাবেন, "অনেকদিন ধরে গদ্য ধরা দিচ্ছিল না।
অনেকদিন কোন কথামুখ দেখিনি।"
সবকিছুর পরেও কবি খোঁজ করেন শৈশবের বর্ণপরিচয়। একইভাবে 'লিখুন আঁকুন' কবিতায় কবি খোঁজ করেছেন বর্ণমালার।কবি বলেন,
" সবাই পড়বেনা, তবু লিখুন কিছু
......................................
লিখতে হলে বর্ণমালা
আসুক নেমে অবাধ্য সব অশ্রুধারা,যেমন ছিল
বাক্সে ভরা।"
'একা' কবিতায় জীবনের আলো পথে ফেলে আসা শৈশব কিভাবে বুকের বাম পাশে চিরন্তন জায়গা করে নেয়,তার কথা বলেছেন কবি। 'একটা চড়ুই' কবিতায় চড়ুই কেবল একটা পাখি নয়, প্রত্যেক আমির গভীরে যে একটা নিজস্ব আমি বেঁচে থাকে,সেটাই চড়ুই পাখির রূপকে এখানে প্রকাশিত। যে চড়ুই পাখির কাছে অকপট হয়ে উঠতে হয় মাঝে মাঝে। বলে ফেলতে হয় সব।ভেতরের যন্ত্রণা বয়ে যায় তাতে করেই,শাব্দিক অনুভবে।
কবির লেখা এক অন্যরকম কবিতা 'গৌতমী'।মহাপ্রজাপতি গৌতমীর ত্যাগ ও প্রয়াসকে আলোচ্য কবিতায় প্রকাশ করেছেন কবি। কবি বলেছেন,
"সহস্র যোজন দূরে চলে যাচ্ছে ভালোবাসার সূর্য
প্রতিশ্রুতির ছায়াপথ পেরিয়ে অভিমানী বিকেল।
সেই আয়োজনে সুখ ছিল অহেতুক সুখ তবু
হে গৌতম।
তোমার গৌরবগাথায় স্নাত হল
সন্ন্যাসলোক।
অঞ্জলির আলো জ্বলে রইলো অন্তরে তবু
অন্তরায়ের মতো।"
কবির কাব্যে বৃষ্টি বেশ খানিকটা জায়গা নিয়েছে।'আয় বৃষ্টি', 'বৃষ্টি শেষে', 'বর্ষা' কবিতায় তার পরিচয় রয়েছে।বর্ষার আগমনে বিশ্বকবির মন যেখানে গেয়ে ওঠে,
"এমনও দিনে তারে বলা যায়,
এমনও ঘন ঘোর বরিষায়।" সেখানে কবি সুমন একেবারেই কাব্যিক রোমান্টিসিজিম বাদ দিয়ে গদ্য ছন্দে বর্ষার রূপকে প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেছেন
"এই অবিরাম বারিধারা আসলে নিরীহ রোদন না।
ভেঙে, মুড়ে, খুঁড়ে, ছুঁয়ে
দেখার উল্লাস
প্রতিদিনের নিভৃতবেলায় একে পাই।
একা।এর নাম বর্ষা।"
'শহীদ মিনারে' কবিতাটি একজন অভিমানী কবি বা প্রেমিকের উচ্চারণ,
"যে চলে যায়,সে তো চলেই যায়।"
বাকি সব কিছু থেকে যায় আগের মতই।তাই চলে যাওয়া বুকের ভেতরের কান্নাকে চেপে রাখে।বলা না বলার দোলায় কবি একা থেকে যান,
"নির্নিমেষ, নির্বাক
শহীদ মিনারে।"
কবির 'আমার শরীর' কবিতাটিতে যৌবনের আবেগ উষ্ণতা সঞ্চার করেছে।শরীরী বিভঙ্গের প্রকাশে এখানে যেন অতৃপ্ত পিপাসা ও স্বাদ না মেটার ক্ষোভ দৃশ্যময় হয়ে উঠেছে। কবির কথায়,
"সেই নীল জোছনা স্নাত অস্থির চিবুক,
উদ্ধত উরু অথবা পূর্ণাবয়ব সেই অমানিশা
নিবিড় আভিজাত্যে
অবরুদ্ধ।"
কবির আরেকটি আশ্চর্য রকমের শরীরী বিভঙ্গের কবিতা 'সাঁকো'।কবির চেতনার দৃষ্টিতে সাঁকো ধরা পড়েছে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে। কখনো সাঁকো মানে মিলনসুখ কখনো বা প্রেমিকার বিভাজিকায় অসংখ্যবার চুমু।
সমাজ মাধ্যমকে ঘিরে মানুষের জীবন পর্যায়ের কয়েকটি কবিতা লিখেছেন কবি।সেগুলি হল,'জীবন যেমন','ভাইরাল' ইত্যাদি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সুমন লিখেছেন একটি সুন্দর কবিতা 'কবির জন্মদিন।'
কবির 'বসন্ত লালন' কবিতাটিকে একটি সফর কবিতা বলা চলে।দুরন্ত রোলস রয়েস নিয়ে নিজের সাথে হারিয়ে যাওয়া যেন।কবির ভাষায়,
" আছে লক্ষ্য হীন আবেগ
সানবার্ণ তামাটে ঠোঁট
ভাবসংক্ষেপে
প্রেমদগ্ধ বসন্ত লালন।"
কবি সুমনের পঞ্চাশটি কবিতার বেশির ভাগই গদ্য ছন্দে লেখা।কিন্তু গদ্য তাঁর কবিতার অবলম্বন হলেও ছড়ার ছন্দেও অল্প কয়েকটি কবিতা তিনি লিখেছেন।বহু কবিতায় কবি ছেদ,যতি ব্যবহার করেননি। ভাবের প্রবাহমানতা এখানে যেন কুবাই নদীর মতই বাধাহীন এক স্রোতস্বিনী।ভাষা ব্যবহারে কবি মার্জিত শব্দের পাশাপাশি আটপৌরে শব্দও ব্যবহার করেছেন।তৎসম শব্দের পাশাপাশি বেশ কিছু দেশি ও বিদেশি শব্দও ব্যবহার করেছেন কবি, যার মধ্যে উর্দু ও ফার্সি শব্দ বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। যৌনতাকে কাব্যের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার না করলেও কবিতার প্রয়োজনে যৌনতাকে ব্যবহার করেছেন কবি।আক্ষরিক অর্থকে ছাপিয়ে ভাষার গুণে ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে কবির কবিতা।
0 Comments