জ্বলদর্চি

দানপত্র/পুলককান্তি কর

দানপত্র

পুলককান্তি কর


জানলা দিয়ে নীচে তাকিয়ে অরিন্দম দেখল মস্ত একটা নদী কেমন যেন রুপোলি রেখার মত বয়ে গেছে দূরে। সবে ভোর হচ্ছে এখন। গতকাল শিকাগোতে যখন ফ্লাইটে উঠেছিল তখন প্রায় রাত এগারোটা। ঘুম থেকে উঠতে না উঠতেই আবার একটা রাত্রি অপেক্ষা করে আছে তার আগামী যাত্রাপথে। কলকাতা পৌঁছুতে পৌঁছুতে প্রায় দুটো রাতের অন্ধকার পাড়ি দিতে হবে তাকে। ফের কলকাতাতে পৌঁছে আবার এক রাত্রি। মানুষ ঘুমোবে তো কত ঘুমোবে? টানা অন্ধকার ভালো লাগে? বিরক্তিতে আবার চোখ বন্ধ করে নিল সে। পাশে এক অ্যাফ্রো আমেরিকান ভ্রদ্রলোক প্রায়ই ঘাড়ের উপর এসে পড়ছেন। সারারাত তার থেকে গা বাঁচিয়ে রাখাটাও একটা সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছে তার। একটু ঘুমের মধ্যেই অদ্ভুত একটা স্বপ্ন দেখলো সে আধো তন্দ্রায়। সে ফিরে গেছে তার শৈশবে। এমনি একটা খালের পাশে গুচ্ছ গুচ্ছ কাশবন। তার পাশ দিয়ে দৌড়োচ্ছে সে, সন্দীপ, দুলু, আরও দু-একজন – তবে তারা কে মনে করতে পারছে না সে এখন। ঐ দূরে সোনারপুরের রেললাইন। দূর থেকে একটা ট্রেন আসছে। আকাশে শরতের গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ। তারা দৌড়চ্ছে তো দৌড়াচ্ছেই… অপু দুর্গার মতো, ট্রেনের কাছে আর যেতে পারছে না।

🍂

   হঠাৎ ওদের ফ্লাইটটা একটা ঝাঁকুনি খেতেই তন্দ্রটা ভেঙে গেল তার। বোধ হয় এয়ার টারবুলেন্স। হঠাৎ সে এমন স্বপ্ন দেখলো কেন? সে তো সচেতন ভাবে শৈশবের কথা ভাবে না। সন্দীপের সাথে তার মাঝে মাঝে কথা হয়, তবে দুলু মানে মৃদুলার সাথে তো তার বহু বছর কথা হয়নি। ওরা সব ছোটবেলার বন্ধু ছিল। গড়িয়ার দিকে ছিল অরিন্দমের বাড়ী আর একটু দূরে নরেন্দ্রপুরের দিকটায় দুলু আর সন্দীপের বাড়ী। ওদের দুজনের বাড়ীটা এক পাড়ায়, অরিন্দমেরটা একটু দূর। একই স্কুল, একই টিউশন টিচারের কাছে ওরা কাটিয়েছে সেই বারো ক্লাস পর্যন্ত। তারপর আই. আই. টি তে চান্স পেয়ে অরিন্দম চলে গেল কানপুর, আর সন্দীপরা থেকে গেল কলকাতায়। সন্দীপ ইঞ্জিনিয়ারিং এ চান্স না পেয়ে বি.এস.সি নিয়ে ভর্তি হল সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে, দুলু ইংলিশে অনার্স নিয়ে যোগমায়া দেবী কলেজে। যতদিন গেছে অরিন্দমের সাথে যোগাযোগ ক্ষীণই হয়েছে। দুলুর যখন বিয়ে হল অরিন্দম তখন নিউইয়র্কে। আসা হয়নি। সন্দীপের বিয়েতেও আসা হয়নি। তবে সন্দীপের সাথে নিয়মিত যোগাযোগটা হয়। ছোটবেলার স্মৃতিটা মাথায় আসতে মনটা উদাস হয়ে গেল তার। পূজোর সময় এবার বাড়ী যাচ্ছে বলে হয়তো স্বপ্নটা মাথায় এসেছে তার। পনেরো বছর পর পূজোর কলকাতা দেখতে চলেছে সে। 

সন্ধে আটটায় কলকাতা এয়ারপোর্টে পৌঁছালো অরিন্দমের ফ্লাইট। চেকআউট, লাগেজ ইত্যাদি করে যখন বাইরে এলো তখন প্রায় নটা। ও অনলাইনে হোটেল বুক করে রেখেছে, ওদেরই গাড়ি পাঠাবার কথা। এদিক ওদিক চাইতে চাইতে যখন সে একজিটের সামনে এলো হঠাৎ করে চমকে উঠল এক ভদ্রমহিলাকে দেখে – তার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসছে আর হাত নাড়ছে। দুলু না? অনেকদিন দেখেনি ওকে, একটু মোটাসোটা হয়েছে, কপালে টিপ। ও যবে লাস্ট দেখেছে তখন ওর কত বয়স? কুড়ি কি একুশ। এ কখনও হতে পারে? কাল রাতেই স্বপ্নে দেখালো আর এখন এখানে সশরীরে? টেলিপ্যাথি কি সত্যি হয়? ও এসে বলল ‘দুলু’? 

– কেন রে? চিনতে অসুবিধা হচ্ছে? তোকে তো দেখেই চিনতে পেরেছি। একটু যদিও চুলটা পেকেছে – তবু গড়ন সেই আগের মতো। 

– তা তুই এখানে কী করে? তোর তো জানার কথা নয় আমি আসব? নাকি অন্য কাউকে রিসিভ করতে এসেছিস? 

– না রে। সন্দীপ বললো তো। ও কী একটা কাজে দিল্লি গেছে, নইলে ওই তোকে রিসিভ করতে আসতো। 

– এর জন্য তুই রাতে চলে এলি আমায় নিতে? এভাবে একা একা তোকে আসতে দিল তোর বাড়ীর লোক? 

– আমার আসার জন্য পারমিশান লাগে না রে। আর তাছাড়া তোকে আমি নিতে আসিনি। তোর তো হোটেলে থাকার কথা, ওরাই ড্রাইভার পাঠাবে শুনলাম। আমি তোর সাথে দেখা করতে এসেছি। 

– তা ফোন করলি না কেন? 

– প্রথম কথা, সারপ্রাইজ। আর দ্বিতীয়, তুই কি আমাকে তোর ফোন নাম্বার দেওয়ার যোগ্য মনে করিস? তুই এত বড় সায়েন্টিস্ট। পৃথিবী জোড়া নাম। আজ না হয় কাল নোবেল পাবি। আমি এক মুখ্যু সুখখু গাঁয়ের মানুষ। ছেলেবেলার খেলার সাথী বলে তোর ফোনের বন্ধু তো হতে পারি ন।। 

– এভাবে লজ্জা দিস না দুলু, জানিসই তো জীবন একটা অনিশ্চিত স্রোত – কখন কোন দিকে বইয়ে নিয়ে যায়। যে ভাসতে জানে সে দুকূলই বজায় রাখে, যে পারে না সে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। 

– তুই এত বড় বিজ্ঞানী, তুই ভাসতে জানিস না? 

– জানি না বললে ভুল হবে দুলু। ভাসতে চাই না নিজের মতো। বরং সময় যেভাবে ভাসিয়ে নিয়ে যায় সেভাবেই ভাসতে ভালোবাসি। 

– বড় কঠিন কথা বলছিস তুই। ঠিক আছে এসব চর্চা কাল হবে। তুই টায়ার্ড, দ্যাখ তোর গাড়ী এলো কিনা? 

অরিন্দম দেখলো তার নাম লেখা একটা পোস্টার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন ড্রাইভারের পোষাক পরা লোক। ওর সাথে কথা বলে অরিন্দম ফিরে এল দুলুর কাছে। বলল, ‘চল, তোকে নামিয়ে দিয়ে যাব’ ।

– তুই কোথায় নামাবি আমাকে? 

– যেখানে যাবি। কোথায় যাবি বল। 

– আমার এক বান্ধবী থাকে বিরাটিতে, আমি আজ ওখানে যাবো; তুই চলে যা। বরং কালকে বাড়ীতে আয়। আমি থাকবো। 

– কাল হবে না রে দুলু। তুই জানিস না বোধ হয় আমাদের বাড়ীটা প্রোমোটিং হয়ে গ্যাছে। বাবা মা মারা যাওয়ার পর তো ভূতের বাড়ীর মতোই পড়েছিল বাড়ীটা এতদিন। তো পাড়ারই একজন প্রোমোটিং করছে বাড়ীটার। আমাকে একটা ফ্ল্যাটও দেবে। কালই ওখানে এগ্রিমেন্ট ইত্যাদি সাইন করার ব্যাপার আছে। 

– ক’টায় তোর অ্যাপয়েন্টমেন্ট?

– এই ধর দশটা নাগাদ। 

– তুই তো ওই পাড়াতেই যাবি। একঘন্টা-দু ঘন্টা কাজ সেরেই আয় না। আমি অপেক্ষা করব তোর জন্য। 

পরের দিন খুঁজতে খুঁজতে যখন অরিন্দম দুলুর বাড়ীর সামনে এলো, তখন প্রায় বেলা বারোটা। এ পাড়া এখন আর চেনাই যায় না। বাড়ীর সংখ্যা কত কমে গেছে। খালি ফ্ল্যাট আর ফ্ল্যাট। এদিকে কত বড় বড় গাছ ছিল – সেসব একটাও নেই। দুলুদের বাড়ির সামনের কৃষ্ণচূড়া গাছটা এখনও আছে। বাকী রাস্তার এপাশের শিরীষ গাছ, জারুল – কিছুই নেই। এদিকেও সেই ‘লৌহ লৌস্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর!’ মনটা খারাপ হয়ে গেল তার। ও গিয়ে কলিংবেলে হাত দিতে না দিতেই খুট করে খুলে গেল দরজা। সামনে দাঁড়িয়ে দুলু। একটা লাল কালো শাড়ি পরে আছে। কপালের ছোট্ট একটা টিপ। এছাড়া আর কোনও প্রসাধন নেই মুখে। ওর হাতে ছোট্ট একটা মিষ্টির বাক্স দিয়ে বলল, ‘নে দরজা থেকে সরে দাঁড়া। আমায় ঢুকতে দে’। 

– ওঃ স্যরি রে! আয় আয় ভিতরে আয়। কোথায় বসতে দিই বলতো? চারদিকে বড় অগোছালো। 

সত্যি অরিন্দম এবার ভালো করে ঘরটা দেখল। জানালাগুলো সব বন্ধ বলে বোধহয় ঘরটা বেশ অন্ধকার। চারিদিকে মাকড়সার ঝুল, সোফাটার ওপরও পরত হয়ে ধুলো জমে আছে। একেবারেই লক্ষ্মীশ্রী নেই। কিন্তু মাসীমা তো খুবই গোছানো স্বভাবের ছিলেন। দুলু হাত দিয়ে সোফাটা একটু ঝেড়ে দিয়ে বলল, ‘এখানে বোস। জল খাবি?’ 

– না রে। 

– তোদের তো আবার বাইরের পেট। এখানকার জল খেলে শরীর খারাপ করবে। 

– না রে দুলু, আমার অত বিলিতি বাই নেই। আমি এই জলই খাই, তবে এখুনি খাব না। মাসিমা মেসোমশাই কই রে? 

– ওঁরা তো মারা গেছেন ভোলা। 

– কবে? 

– এই তো তিন সপ্তাহ হ’লো। সেজন্যই দেখছিস না ঘরগুলো নোংরা হয়ে আছে। আমি তো এখানে থাকি না। 

– তোর শ্বশুরবাড়ী কোথায়? 

– ট্যাংরা। 

– তা কে আগে গত হয়েছেন, বাবা না মা? 

– দুজনেই একসঙ্গে মারা গেছেন। অদ্ভুতভাবে হাসল মৃদুলা, অরিন্দমের মনে কৌতুহল হচ্ছিল, কিন্তু সদ্য শোক পাওয়া একমাত্র মেয়েকে মৃত্যুর কারণ জিজ্ঞাসা করাটাও সমীচিন ঠেকলো না তার। মৃদুলা এই নিয়ে কথা বললো না। মৃদুলা বললো ‘বোস একটুখানি, আমি মিষ্টিটা রেখে আসি। তুই বরং একটু তোর আনা মিষ্টিটা খা, চা করে খাওয়াতে পারবো না কিন্তু। গ্যাস ফ্যাস কী অবস্থায় আছে জানিনা। 

– তুই বোস তো চুপটি করে। ওই প্রোমোটার ভদ্রলোক ভালোমতো চা জলখাবার খাইয়েছে। আজকে লাঞ্চটাই স্কিপ করতে হবে – এত খেয়েছি। 

– তা ভালোই হয়েছে। 

– তুই কী খাবি দুলু? 

– আমি আর কী খাব? পরে কিছু খেয়ে নেব। বলেই ঘরের ভেতরে চলে গেল। অরিন্দম বসে থেকে নেটটা অন করল। 

– কী করছিস রে ভোলা? 

– এই তো হোয়াটসঅ্যাপ করছি। 

– কাকে রে? 

– মারিয়া-কে, মানে আমার তৃতীয় পক্ষের বউকে। 

– তৃতীয় পক্ষ? আগের গুলো কী হলো রে? 

– ডিভোর্স আর কী! 

– কেন? 

– দ্যাখ দুলু, ওদেশ তো আমাদের মতো নয়। সামান্য একটু মুখ কালাকালি হয়েছে কি হয়নি, দুম করে ডিভোর্স। উকিলগুলো ওদেশে সবচেয়ে বড়লোক জানিস? হয় ডাক্তারদের এগেনস্টে কেস করছে, নইলে ডিভোর্স। 

– তোর খারাপ লাগে না ভোলা? 

– প্রথমটায় খুব খারাপ লেগেছিল রে। আমার তো এদেশের মানুষ। অত ডিভোর্স ফিভোর্স এ অভ্যস্ত নই। মা বাবা মারা যাওয়ার পর তো বিয়ে নিয়ে খিচখিচ করার কেউ ছিলও না। একটা সময় ভেবেছিলাম বিয়েই করব না। কিন্তু বিধি বাম। আমার পোস্ট ডক্টরেট এর সময়ের এক সহকর্মী ছিল অ্যানা, কানাডার মেয়ে। একদিন গোধূলির আলোয় চার চোখের মিলন হয়ে গেল, বিয়েও করে ফেললাম। তারপর লাফড়া বেড়েই চললো। মা ঠাকুমাকে দেখে দেখে বউ নিয়ে আমাদের যা এক্সপেক্টেশন – ও দেশে কি তা করলে চলে? অতখানি না হলেও কিছুটা চাহিদা তো আমার ছিলই। বউ অন্তত অল্প হলেও রান্নাটা করবে, দিনে একবার তো অন্তত চা-ফা করবে! অ্যানা একদমই এসবের ধার ধারতো না। সারাদিন কাজ করে আমাকেই সব করতে হত। রাগ বেড়েই যাচ্ছিল, দিলাম একদিন চড় কষিয়ে। ব্যস – থানা পুলিশ, ডিভোর্স এ গিয়ে শেষ হ’লো। 

– ছেলেপুলে হয়নি? 

– ও তখন ক্যারি করছিল, অ্যাবোর্ট করে নিয়েছে। 

– তা এদেশী বিয়ে করলি না কেন? 

– দ্যাখ এদেশে সম্বন্ধটা করবে কে? থাকি ওখানে, এখানে কি মেয়ে দেখতে আসবো? 

– তা নয়। আসলে আমাদের এক্সপেক্টেশনের সাথে মেলার একটা চান্স থাকতো তাহলে। অবশ্য এখানেই বা ভালো কি? ডিভোর্স, বধূ নির্যাতন এখানে কি কম? 

– সব জায়গাতেই পাশ্চাত্যের ছোঁয়া লাগছে রে দুলু। 

– তা জেনে বুঝে আবার দ্বিতীয় চান্স নিলি কেন তুই? 

– বিয়েটা একটা অভ্যাস বুঝলি। ভালো হোক মন্দ হোক – বাড়িতে ফিরে কারোর মুখ দেখবো না – এখন আর হজম হয় না। বিয়ের আগে এমনটা মনে হ’তো না রে। কিন্তু ইদানীং বড় বোর লাগে। সেজন্যই দ্বিতীয়টা আর বিয়ে করিনি। লিভ টুগেদার – আমার আন্ডারেই একটি মেয়ে কাজ করতো – ক্রোয়েশিয়ার মেয়ে, আমার থেকে অনেকটাই ছোট। ছিল বছর দুয়েক একসাথে। ওর প্রোজেক্ট শেষ হয়ে গেল, সেও চলে গেল। ওর সাথে আমার দাম্পত্য শব্দটা বোধহয় যায় না। সে যা বলিস, ভালোই ছিল। কিন্তু ও দেশে ফিরে যাবে মনস্থ করেই এসেছিল। আমিও জানতাম যাযাবর পাখী, তাই খুব গায়ে মাখিনি। 

– আর তৃতীয়টি? 

– এটি তো সবৎস্যা গাভী রে দুলু।

– কী যে করিস না তুই! জেনে শুনে এর সাথে থাকতে গেলি কেন? 

– দ্যাখ মারিয়ারও ডিভোর্স হয়ে গেল – লোনলি ফিল করছিল – আমিও লোনলি – তা হৃদয় লোন নিয়ে নিলাম। 

– বাচ্চা নিয়ে সমস্যা নেই? 

– বাচ্চাটা ভালো রে। আমার সাথে জমে ভালো। তবে বাচ্চার মা’টা বোধহয় টিকবে না। 

– টিকবে না মানে? 

– মানে ভূতপূর্ব স্বামীর সাথে আজকাল গুজগুজ ফুসফুস করছে দেখছি। 

– তুই কিছু বলিস না? 

– দ্যাখ বাবা, এখন আমি পাক্কা অ্যামেরিকান। এখন বিশ্বাস করতে শিখেছি – যে যার মর্জির মালিক। দুদিন যার সাথে ভালো লাগে থাকবো, যেদিন ভালো লাগবে না থাকবো না। আজকাল সঙ্গে থাকি, হৃদয় দিই না। 

– বিশ্বাসই হয় না ভোলা, তুই এরকম হয়ে যাবি! নম্র লাজুক ছেলে, আমি ছাড়া কোনও মেয়ের দিকে ভালো করে তাকাতেই তো পারতিস না। 

– এখন তো আমি ভেবেই রেখেছি, অন্তত দশটা বিয়ে করব বা লিভ ইন করব দশটা ভিন্ন প্রদেশের মেয়ের সাথে। 

– এ তো কুকুর বিড়ালের জীবন রে! তোর খারাপ লাগে না? 

– না। এখন বরং ভালোই লাগে। লিভ ইন করো, বিয়ের ঝক্কি নেই। যতদিন পোষাবে সঙ্গে থাকো, না পোষালে কিক... 

– যখন সামর্থ্য যাবে? 

– ছেলেদের এত সহজে সামর্থ্য যায় না দুলু। আমার তো যত বয়স বাড়ে, তত কম বয়সী মেয়েকে পটাই। তবে সত্যি যখন বুড়ো হব, একটা জাপানী মেয়েকে বিয়ে করব। শুনেছি তারা স্ত্রী হিসাবে খুব ভালো হয়। শেষ জীবন তার আশ্রয়েই থাকবো রে দুলু। আচ্ছা আমার কথাই তো শুনে গেলি, এবার নিজের কথা বল। 

– আমাদের আর কী কথা ভোলা? বাঙালী মেয়েদের তো একবারই মরণ হয় বিয়ে হয়ে গেলে। 

– এভাবে বলছিস কেন? তোর শ্বশুরবাড়ী কোথায় বললি যেন? 

– ওই তো ট্যাংরার কাছে। 

– আচ্ছা বলতো দুলু, টুয়েলভের পর পর আমাদের সন্দীপবাবু একটু একটু তোর প্রতি দুর্বলতা দেখাচ্ছিল – তার কী হল? 

– ও ছাড় ভোলা, ওসব ভুলে গেছি। 

– না রে, খুব জানতে ইচ্ছে করে। ওর মুখে শুনেছি তুইও নাকি রাজী ছিলি, তো বিয়েটা হল না কেন? 

– সন্দীপ বলেনি? 

– ওর মুখে একটা কিছু তো শুনেছি। তোর মুখ থেকেও শুনতে চাই। 

– কী শুনেছিস বল না! 

–  এই – ওর চাকরি ছিল না তখন, তুই ওয়েট করলি না। 

– ও একেবারে ডরপোক রে ভোলা। আমি বললাম – ঠিক আছে, চাকরী নেই তো নেই – টিউশান কর। আমিও টিউশন পড়াবো। আজকাল টিউশন পড়িয়ে কম রোজগার ভাবছিস ভোলা? বললাম এসে বাবা মা’র সাথে কথা তো বল! কিছুতেই এলো না। বলল ‘মাসীমা মেসোমশাই এর তুই একমাত্র মেয়ে – ওঁদের সামনে কোন মুখে বলব বিয়ের কথা? বেকার জামাই ওঁরা মানবেন?’ 

– তুই কী বললি? 

– বললাম, বলতে যদি না পারিস তো চল তবে রেজিস্ট্রি করে বিয়েটা করে নিই। আমার বাবা মাকে বলতে কোনও অসুবিধা নেই। তুই তোর বাড়ীটা ম্যানেজ কর। 

– সন্দীপ কী বলল? 

– বলল, বাড়ীতে রাজী হবে না। আর লুকিয়ে চুরিয়ে বিয়ে করা তার নিজেরই পছন্দ নয়। দ্যাখ ভোলা, বাবা মা কদিনই বা আর অপেক্ষা করবে? আমার এম.এ পড়া শেষ হয়ে গেছে। চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার বাহানায় আরও দেড় বছর কাটালাম। অবশেষে বাবা একটা স্কুল টিচারের সাথে আমার বিয়ে দিয়ে দিল। 

– সে যাই হোক, প্রজাপতির নির্বন্ধ। শ্বশুরবাড়ী ভালো হয়েছে তো? 

– দ্যাখ, ভালো হোক মন্দ হোক, বাঙালী মেয়ে – মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি আপ্রাণ। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। 

– হল না মানে? ডিভোর্স হয়ে গেল? 

– এটা কি তোদের দেশ ভোলা? এখানে কথায় কথায় ডিভোর্স হয় না। এটা ওটা দাবী নিয়ে নিত্যনতুন গঞ্জনা মারপিট তো ছিলই। শেষমেষ শুরু হল এই বাড়ীটা নিয়ে। 

– বাই দা বাই, তোদের ছেলেপুলে হয়নি দুলু। 

– না। রমেনেরই দোষ আমি জানি। কিন্তু শাশুড়ী সবাইকে বলে বেড়াতো আমি নাকি বাঁজা। আমি আমার সব রিপোর্ট দেখেছি, ডাক্তারকেও জিজ্ঞাসা করেছি, কেউ আমার ত্রুটি বলেনি। 

– তারপর? 

– রমেন সমানে আমাকে শাসাতে লাগলো বাবা যেন এই বাড়ীটা তার নামে লিখে দেয়। বল ভোলা, একথা আমি বাবাকে বলতে পারি? ওরা পেনশনভুক। বাড়ী গেলে থাকবে কোথায়? একদিন খুব জোরাজুরি করছিল ফোন করে বলার জন্য, আমি বলিনি। তখন শাশুড়ী রমেন শ্বশুর – সবাই মিলে আমার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিল। 

– আগুন ধরিয়ে দিল মানে? 

– এই দ্যাখ না। বলেই ফস করে খুলে দিল তার শাড়ী। দ্যাখ কত ফোষ্কা... 

– উফ, কী ভয়ঙ্কর! ঢাক ঢাক দুলু। তুই এভাবে শাড়ী পড়ে ঘুরছিস কী করে? তোর তো হাসপাতালে থাকার কথা রে?

– ছিলাম তো। মরে যেতে মর্গে পাঠালো, কাটাকুটি করে পুড়িয়ে দিল। 

– কী বলছিস দুলু, তুই কি পাগল হয়ে গেছিস। 

– না রে ভোলা, সত্যি সত্যি আমি মরে গেছি। 

অরিন্দমের মাথাটা ঝিমঝিম করে লাগলো। সে একজন বিজ্ঞানী। সে কি সত্যি ভূত দেখছে? না কি দুলুর কোনও মানসিক রোগ হয়েছে? 

– ভয় পাস না ভোলা, আমি তো তোর বন্ধু। আর তো দেখা হবে না কখনও, তাই তোর সাথে দেখা করার ইচ্ছে হল। একটা দরকারও আছে অবশ্য... 

– তোর বাবা মা? 

– আমি মারা গেছি শুনে তারপরের দিনই দুজনে একসাথে আত্মহত্যা করেছে। 

– আর তোর শশুরবাড়ীর লোক? আমি কেস করবো ওদের নামে। 

– কোন লাভ হবে না রে ভোলা। কোন প্রমাণ নেই। ওরা পয়সা খাইয়ে ময়নাতদন্তের রিপোর্টই বদলে দিয়েছে। শশুর পার্টি-ফার্টি করে। কিছু হবে না। আর তাছাড়া তোরই বা সময় কোথায়? তুই তো কদিন পরই আমেরিকা ফিরে যাবি, মামলা কে দেখবে? 

চুপ করে রইল অরিন্দম। সত্যিই তো। আবেগের বশে কথাটা সে বলে ফেলেছে বটে, কিন্তু প্রাক্টিক্যালি ব্যাপারটা সম্ভব নয়। সে বলল ‘দুলু তুই তোর স্বাভাবিক রূপে ফিরে আয়, এই কদর্য ফোস্কা পড়া আমি দেখতে পারছি না।’ 

– ঠিক আছে, এইবার তাকা, দেখ আগের মত হয়ে গেছি কিনা। 

– হ্যাঁ, এইবার ঠিক আছে। তুই এইবার বল কাজের কী কথা আছে? 

– বাবা-মাও এখানেই আছে, ওদের কি ডাকবো নাকি ঝটকটা বেশী লাগবে? 

– এই ঠিক আছে দুলু, তুইই বল। 

– তোকে তো বললাম, রমেনদের এই বাড়ীর প্রতি লোভ ছিল। বাবা-মা আত্মহত্যা করার আগে এই বাড়ী শুদ্ধু জমিটা তোর নামে লিখে দিয়ে গেছে। 

– আমি নিয়ে কী করব দুলু? এই তো নিজের জমিটাই রাখতে পারলাম না, প্রোমোটিং এ দিতে হ’লো। 

– না, এতে লেখাই আছে কোনও ভালো কাজে যদি তুই লাগাতে চাস লাগাতে পারিস; কোনও এন.জি.ও চালাতে পারিস, একান্ত না পারলে মিশন টিশনকেও দান করে দিতে পারিস। 

– আমি দূরে থাকি, এ সামলাবো কি করে? সন্দীপকে দিতে পারতিস? 

– দ্যাখ, সেই অবস্থায় বাবা মা’র মানসিক অবস্থাটুকু ভাব। আমার বাল্যবন্ধু হিসেবে তোদের নামটাই মনে পড়ার কথা। সন্দীপের সাথে আমার রিলেশনটা ওরা নিশ্চই আঁচ করতো। তাই মনে হয় এ ব্যাপারে ওকে আর জড়ায়নি। তোকেই লিখে দিয়েছে। ওই ঘরের আলমারির মধ্যে উইলটা রাখা আছে। চাবিটা দ্যাখ রাখা আছে তুই যে সোফাটায় বসে আছিস তার ঠিক তলায় – একটা ছেঁড়া কাপড়ের পুঁটলির মধ্যে। 

– হ্যাঁ এইখানে আছে তো। অরিন্দম খুঁজে বের করল চাবিটা। 

– তুই আলমারি খুলে উইলটা নিয়ে যা। আমি এতদিন পাহারা দিয়ে বসে আছি এখানে, পাছে রমেনরা এসে সব লোপাট করে দেয়। এইবার আমি নিশ্চিন্তে মরতে পারবো রে ভোলা। 

– কিন্তু আমি সামলাবো কী করে? 

– তুই চাপ নিস না ভোলা। সেরকম হলে তুই একটা উকিল ধরে কোনও মিশনকে দান করে দে না। মিশনদের তো অনেক প্রতিপত্তি। রমেনরা ওদের সাথে পেরে উঠবে না। তোকে অহেতুক কষ্ট দেওয়ার জন্য মাফ করে দিস ভোলা। 

– ছি দুলু! বন্ধুরা কি কেউ কাউকে মাফ করার কথা বলে? তুই নিশ্চিন্ত থাকিস রে দুলু, আমি দেখবো যাতে তোর এই জায়গা বাড়ীর একটা সদগতি হয়। পাড়ায় কথা বলে দেখবো, যদি কোনও এন.জি.ও এখানে কাজ করতে চায়। কোনও কিছু না হলে মিশনকেই লিখে দেব। তুই চিন্তা করিস না। 

– তুই বেরিয়ে যা ভোলা। বিকেলে লোক চলাচল বেড়ে যাবে এ রাস্তায়। তোকে বেরোতে দেখে লোকের সন্দেহ হবে। ফাইলটা সাবধানে নিয়ে যাস। আর দেখা হবে না রে কখনও। 

অরিন্দম মেন দরজার বাইরে এসে পিছন ফিরে দেখল দুলুর চোখটা ছলছল করছে। তবু তারই মধ্যে যেন খুশীর ঝিলিকও লুকিয়ে আছে একটা। অরিন্দম রুমালটা বের করে নিজের চোখের কোণাটা মুছল, দেখল এখন আর চারপাশে কেউ নেই। শুধু একটা হাওয়ার স্রোত বেরিয়ে গেল বন্ধ দরজার পাশ দিয়ে অসীম শূন্যের দিকে…

Post a Comment

0 Comments