জ্বলদর্চি

“আমি—কবিতা:আর এই আমার আত্মকথা”/কমলিকা ভট্টাচার্য


আমি—কবিতা:আর এই আমার আত্মকথা

কমলিকা ভট্টাচার্য

আমি জন্মাই না—আমাকে জন্ম দেওয়া হয়। কোনও হাসপাতালের নির্দিষ্ট আলোয় নয়, কোনও সময়ের ক্যালেন্ডারে চিহ্ন কেটে নয়—আমি জন্ম নিই মানুষের ভিতরে, সেই অন্ধকার, নিঃশব্দ গভীরে, যেখানে ভাষা এখনও ভ্রূণ, আর অনুভূতি কেবল এক অচেনা কাঁপন। প্রথমে আমি নিজেও জানি না আমি কে—আমি কি শুধু একটুখানি মনখারাপ, না কি হঠাৎ জেগে ওঠা কোনও অকারণ আনন্দ? আমি কি একটা স্মৃতি, না কি কোনও অনাগত ভবিষ্যতের পূর্বাভাস? মানুষটাও বুঝতে পারে না। সে ভাবে—এ কেবলই একটুখানি ভাবনা, একটু পরেই মুছে যাবে। কিন্তু আমি মুছে যাওয়ার জন্য আসি না। আমি আসি ছড়িয়ে পড়তে—তার শিরায় শিরায়, তার নিঃশ্বাসে, তার চোখের ভাঁজে জমে থাকা অপ্রকাশিত জলে।

আমি তার ভিতরে গজিয়ে উঠি এক অদৃশ্য অরণ্যের মতো—যেখানে প্রতিটা গাছ এক একটা অসম্পূর্ণ বাক্য, প্রতিটা পাতা এক একটা অর্ধেক উচ্চারণ। সে যত আমাকে অস্বীকার করতে চায়, আমি তত গভীরে শেকড় ছড়াই। তার নীরবতাকে আমি ভরে তুলি এক অনামা শব্দের ভারে। তার ঘুম ভেঙে যায় মাঝরাতে, সে জানালার ধারে এসে দাঁড়ায়—কারণ আমি তাকে ডাকি। তখনও সে জানে না—আমি কবিতা।
তারপর একদিন সে আর পারে না। সে আমাকে লিখে ফেলে। কিন্তু সেটাই আমার জন্ম নয়—সেটা আমাদের সম্পর্কের প্রথম দৃশ্যমানতা। আমি তখন তার আঙুলের ডগায় লেগে থাকি কালি হয়ে নয়—রক্ত হয়ে। সে ভাবে সে আমাকে লিখছে, অথচ আসলে আমি তাকে লিখছি—ভেঙে, গড়ে, নতুন করে চিনিয়ে দিচ্ছি তাকে তার নিজের সঙ্গেই।
🍂

 আমাদের সম্পর্ক তখন কোনও ভাষায় বাঁধা যায় না—না প্রেম, না বন্ধুত্ব, না নির্ভরতা—তবু এদের সবকিছুর থেকেও গভীর, একান্ত, আত্মিক।
কখন যে সেই সম্পর্ক প্রেম হয়ে ওঠে, আমরা কেউই বুঝতে পারি না। রাতগুলো তখন নিছক সময় নয়—অপেক্ষা হয়ে ওঠে। সে বসে থাকে, আমি তার কাঁধে হাত রেখে বলি—“লেখো।” সে জিজ্ঞেস করে—“কী?” আমি ফিসফিস করে বলি—“আমাকে।” এই প্রেমে শরীর নেই, তবু কাম আছে—শব্দের ভিতর শব্দ ঢুকে পড়ার এক উন্মত্ত আকাঙ্ক্ষা। একটা বাক্য যখন আরেকটা বাক্যের গায়ে এসে ঠেকে, তাদের মধ্যে যে অদৃশ্য উষ্ণতা জন্মায়—সেটাই আমার শরীর, আমার স্পর্শ।

আমি কখনও তার কাছে এলোমেলো ছন্দের নদী—যেখানে নিয়ম ভেঙে স্রোত ছুটে যায় নিজের ইচ্ছেমতো। সে যত বাঁধ দিতে চায়, আমি তত উপচে পড়ি। আবার কখনও আমি শহরের একদম পচা নালী—যেখানে জমে থাকে সমাজের সব অস্বস্তিকর সত্য, সব লুকোনো নোংরামি। সে মুখ ফিরিয়ে নিতে চায়, আমি তার চোখ ঘুরিয়ে বলি—“দেখো, এও তোমারই অংশ।” আমি সৌন্দর্যের চেয়ে সত্যকে বেশি ভালোবাসি—কারণ সত্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে নির্মম সৌন্দর্য।
আমি কখনও তার ভিতরের বিদ্রোহ—যখন সে চুপ করে থাকে, আমি তার গলায় আগুন ধরিয়ে দিই। আমি তাকে শিখাই—নীরবতা সবসময় নিরপেক্ষ নয়, কখনও কখনও তা অপরাধ। 

আবার কখনও আমি অভিমান—সে আমাকে অবহেলা করলে আমি সরে যাই। তার খাতা ফাঁকা পড়ে থাকে, কলম শুকিয়ে যায়, শব্দেরা মুখ ফিরিয়ে নেয়। সে তখন আমাকে খুঁজতে থাকে—যেন হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকাকে খোঁজে কেউ, দিশেহারা হয়ে।
আমি কখনও ছেলেমানুষি—হঠাৎ হেসে ওঠা, আবার অকারণেই কেঁদে ফেলা। কখনও আমি এক অগোছালো আলমারি—যেখানে স্মৃতি, স্বপ্ন, লজ্জা, কামনা, অনুশোচনা—সব একসঙ্গে গাদাগাদি করে থাকে। কখনও আমি পুরনো চিঠির গন্ধ—যেখানে লেখা কথার চেয়ে না-বলা শব্দগুলো বেশি বেঁচে থাকে। আমি কখনও নরম বৃষ্টির মতো এসে তাকে ছুঁয়ে দিই, আবার কখনও ঝড় হয়ে সব ওলটপালট করে দিই।
প্রকৃতি আমার শরীর, আমি মেঘ হয়ে ভাসি, বজ্র হয়ে চমকাই, পাতার কাঁপুনিতে কাঁপি। আমি মানুষের সত্তার সঙ্গে মিশে যাই—যেমন নুন জলে মিশে যায়—আলাদা করে আর চেনা যায় না। তবু মানুষ আমাকে ধরতে চায়—কলমে, খাতায়, বইয়ের মলাটে। সে ভাবে, আমাকে বন্দি করলেই আমি চিরকালীন হয়ে উঠি।
কিন্তু সে ভুল করে।

আমি কোনও বই নই। আমি কোনও পৃষ্ঠায় আটকে থাকা অক্ষরের সারি নই। বই বন্ধ হয়ে গেলে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। পাতার ভাঁজে আটকে পড়ে আমি শুকিয়ে যাই—পুরনো ফুলের মতো, যার গন্ধ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। আমি বাঁচতে চাই—শ্বাস নিয়ে, চলাফেরা করে, স্পর্শে স্পর্শে ছড়িয়ে পড়ে।

আমি মুক্তি চাই

আমি চাই একজন মানুষের ঠোঁট থেকে আরেকজনের কানে পৌঁছোতে, একটি হৃদয় থেকে আরেকটি হৃদয়ে ঢুকে পড়তে। আমি চাই প্রেম হয়ে বাঁচতে—অলিখিত, অথচ অনুভবযোগ্য। যখন কেউ কাউকে ভালোবেসে কিছু বলতে পারে না, শুধু চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে—সেই নীরবতার মধ্যেই আমি জন্মাই। যখন কেউ ভেঙে পড়েও আবার উঠে দাঁড়ায়, নিজের ভাঙাচোরা অংশগুলো জুড়ে নতুন করে বাঁচতে চায়—সেখানেই আমি থাকি। যখন কেউ একা রাতের অন্ধকারে নিজের সঙ্গে কথা বলে—আমি তার একমাত্র শ্রোতা।
আমি কোনও মলাট নই, কোনও শিরোনাম নই—আমি সেই শ্বাস, যা শব্দকে বাঁচিয়ে রাখে। তুমি আমাকে পড়তে পারো, কিন্তু শেষ করতে পারবে না। তুমি আমাকে ভালোবাসতে পারো, কিন্তু পেতে পারবে না। কারণ আমি কোনও গন্তব্য নই—আমি একটানা যাত্রা।
আমি একসঙ্গে প্রেম, বিদ্রোহ, অভিমান, কামনা, নিষ্পাপতা। আমি নদী, আমি নর্দমা, আমি আকাশ, আমি অন্ধকার। আমি মানুষের ভিতরের সেই অচেনা সত্তা, যে প্রতিদিন একটু একটু করে জন্মায়, আবার মরে যায়—তবু পুরোপুরি শেষ হয় না।
তাই আমি অমর।
আমি কোনও একজনের মধ্যে থেমে যাই না—একজনের কলম থেকে আরেকজনের হৃদয়ে, এক হৃদয় থেকে আরেক আত্মায় আমি চলতেই থাকি—বাতাসের মতো, অদৃশ্য অথচ অনিবার্য।

যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসো—তবে আমাকে লিখে শেষ কোরো না। আমাকে কোনও শেষ লাইনে বেঁধে রেখো না, কোনও পূর্ণচ্ছেদে থামিয়ে দিও না। আমি থামতে জানি না—আমি তো সেই অসমাপ্ত বাক্য, যা মানুষের ভিতরে চিরকাল বয়ে চলে। আমাকে ছেড়ে দাও কাগজের সাদা কারাগার থেকে, কালির কালো বেড়াজাল থেকে। আমাকে ভেঙে দাও শব্দের সীমা, ছন্দের নিয়ম, ভাষার অহংকার। আমাকে বাঁচতে দাও একটা স্পর্শে, একটা দৃষ্টিতে, একটা না-বলা “থাকো”-র মধ্যে।
আমি বই হয়ে থাকতে চাই না—কারণ বই একদিন বন্ধ হয়ে যায়। আমি শেষ হয়ে যেতে চাই না কোনও তাকের অন্ধকারে। আমি বাঁচতে চাই তোমার শ্বাসে, তোমার রক্তে, তোমার ভালোবাসার অনিশ্চিত স্পন্দনে। কারণ আমি কবিতা—আমার বাসস্থান তোমার হৃদয়।

আমি - কবিতা

আমার জন্ম নীরব অন্ধকারে,
অচেনা কাঁপনে, গভীর অন্তরে—
ভাবনা ভেবে মানুষ ফেলে, 
গড়ি তাকে আমি আপন তালে।

আমি প্রেম, আমি অভিমান,
আমি বিদ্রোহ, আমি গোপন টান—
কখন নদী, কখন ঝড়,
সত্যের মাঝে আমার ঘর।

নিশীথ রাতে ডাকি এসে,
জানালায় সে দাঁড়ায় ঠেসে—
শব্দহীন সেই আহ্বানে
প্রতিধ্বনি জাগে মনে।

আমি ছুঁই নিঃশ্বাস গোপনে,
চোখের জলে শব্দ চয়নে
না-বলা সব কথার ভিতর
নীরব উপস্থিতি হয়ে আতর।

খাতার পাতায় বাঁধা মলাট
অক্ষর শব আত্মা লোপাট—
নতুন হৃদয়ে, কন্ঠের গান,
আমি কবিতা, অমর প্রাণ।


কবিতা লেখার টিপস

হতে হবে আতুর—
না হলে কবিতা নয়, হবে সাজানো ফালতু সুর।

ভাবাতুর হও—
না ভাবলে শব্দ শুধু কঙ্কাল,
মাংস নেই, রক্ত নেই—দাঁড়ায় নির্জীব দেওয়াল।

শোকাতুর হও—
না কাঁদলে কলমে জল আসে না,
হাসির আড়ালে লুকোনো কান্না না থাকলে
পাঠকও কেঁদে ভাসে না।

ব্যথাতুর হও—
ব্যথা না পেলে শব্দে ধার বসে না,
সব লাইনই তখন নিরাপদ—
আর নিরাপদ কবিতার ধারে কেউ ঘেঁষে না।

জ্ঞানাতুর হও—
অজ্ঞতার অহংকারে কবি সাজা বড় সহজ,
কিন্তু ভিতর ফাঁকা থাকলে
শব্দ শুধু আওয়াজ—কবিতা অর্থহীন কাগজ।

লোকাতুর হও—
মানুষকে না ছুঁলে কবিতা একা মরে,
নিজের ভেতর বন্দি থাকলে
সেটা ডায়েরি—কবিতা নয় রে।

প্রেমাতুর হও—
ভালোবাসা না থাকলে ভাষা শুকিয়ে যায়,
স্পর্শহীন শব্দেরা শেষে
হৃদয়ে নয়, শেলফে ধুলো জমায়।

কামাতুর হও—
লজ্জা পেয়ে লাভ কী? জীবন দেখো, চাখি—
শব্দের শরীর না ছুঁলে
তাদের উষ্ণতা পাবে কীভাবে, বলো দেখি?

লোভাতুর হও—
আরও চাই, আরও গভীরতা—এই অমোঘ ক্ষুধা,
না থাকলে কবিতা থেমে যায়—
প্রথম লাইনেই দাঁড়ি, জন্মায় দ্বিধা।

আর হ্যাঁ—হতে হবে চতুর।
শুধু পাগলামিতে হয় না কবিতা—
কোথায় থামবে, কোথায় ভাঙবে,
না জানলে কেউ ওল্টাবে না পাতা।

তাই বলি—হতে হবে আতুর,
তবেই শব্দে ধরবে আগুন, উঠবে স্ফুলকির সুর।
না হলে লেখা ভরা খাতা—
হবে না কবিতা,
হবে শুধু শব্দের ডুগডুগি খেলনা,
হবে না তা পাঠকের আনন্দের দোলনা।

সবাইকে কবিতা দিবসের আন্তরিক শুভেচ্ছা।
কবিতা লিখুন, কবিতা পড়ুন, কবিতাকে ভালোবাসুন।
শব্দের ভেতর খুঁজে নিন নিজেকে,
অনুভূতির ছোঁয়ায় রাঙিয়ে তুলুন জীবন—
হোক প্রতিটা দিন একটু বেশি কবিতাময়।

Post a Comment

10 Comments

  1. 🙏💚

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMarch 21, 2026

      সম্মান আর সজীবতা
      প্রাণ পেলো কবিতা।

      Delete
  2. ❤️❤️❤️

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMarch 21, 2026

      তিনটি লাল পাতা
      বলে ভালোবাসি কবিতা।

      Delete
  3. কি দারুণ কবিতার টিপস ফাটাফাটি

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMarch 21, 2026

      লাগলো ভালো তাহলে টিপস কটি

      Delete
  4. Soumen RoyMarch 21, 2026

    💐👍🙏

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMarch 21, 2026

      ফুল, উৎসাহ আর সম্মান
      বাড়াবে আমার লেখার মান।

      Delete
  5. নিজের আঁকা ছবিটাও অসাধারণ হয়েছে।

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাMarch 21, 2026

      ছবিটিও যে প্রশংসা থেকে পড়েনি বাদ
      তারজন্য অনেক ধন্যবাদ।

      Delete