জ্বলদর্চি

মেঘেদের বর্ণপরিচয় - দিলীপ মহান্তী/পর্যালোচনা - মলয় সরকার

মেঘেদের বর্ণপরিচয় - দিলীপ মহান্তী
পর্যালোচনা - মলয় সরকার 


কবি দিলীপ মহান্তী মোট প্রায় বাহান্নটি কবিতার সমন্বয় তুলে ধরেছেন, তাঁর কাব্যগ্রন্থ মেঘেদের বর্ণপরিচয়ে যার মধ্যে প্রথম কবিতাটির নামেই কাব্যের নামকরণ এবং শেষ কবিতা, ‘আমিও আকাশদীপ জ্বালি’ আসলে পঁচিশটি চার লাইনের কবিতার এক মালিকা। ( অবশ্য এর মধ্যে অল্প কয়েকটি কবিতা আছে, যেগুলি  ছোট ছোট কবিতার সমন্বয়ে গঠিত)।

 এগুলি অবশ্যই কাব্যের বাহ্যিক বিবরণ। পাঠক যতই কবিতার ভিতর দিকে এগোতে থাকেন, ততই কবির মনের বা চিন্তার স্বরূপ উন্মোচিত হতে থাকে। 
মেঘেদের বর্ণপরিচয়ে প্রকৃতপক্ষে কবি মেঘেদের বর্ণবৈচিত্র‍্যের যে ছবি প্রতি মুহূর্তে তুলে আনেন, তা পাঠককে অনুভবের বৈচিত্র্যময়তার কথা মনে করিয়ে দেবে। 
কবিতাগুলি যদিও মেঘকেন্দ্রিক, তবু এই মেঘ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রূপে এসেছে, কখনও প্রকৃতি, কখনও নারী, কখনও বা অন্য কিছুর রূপক হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে।
মেঘকে কবি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাব্যময়তার প্রতীক হিসাবে দেখিয়েছেন।
‘’ আকাশে জমেছে মেঘ, আসবে বৈশাখী’  এখানে মেঘ এক আশার নাম, যে আশাকে মানুষ পুষে রাখে আজীবন তার বুকে।
 এই আশাকে সম্বল করেই তার পথচলা, তার দুঃখের দিনের হতাশার বিপক্ষে যে সাহস, তারই দ্যোতক হয়ে ফুটে উঠেছে এখানে।কিংবা,আর এক ক্ষেত্রে আমরা দেখি, ‘পথিক হাঁটছে সুখে বাঁচার আগ্রহে’

কাব্যগ্রন্থটিতে যদিও মেঘকে উপলক্ষ্য করেই এবং মেঘ নিয়েই বেশি কবিতার দেখা মেলে, তবু তার বাইরে গিয়েও কবি নিজেকে মেলে ধরেন সেই উপলক্ষ্যের থেকে ভিন্ন দিকেও। তাঁর চোখে বিভূতিভূষণের আরণ্যকের পটভূমিকাও কবিতার আকার নেয়। কবি আজও খুঁজে পান গনু মাহাতো আর ভানুমতীকে। বিভূতিভূষণের কাব্যিক চোখে চোখ মিলিয়ে দেখতে চান, সেই ফুলডুংরি পাহাড়কে।

কবি তাঁর কবিতায় এক স্বপ্নজগৎ  তৈরীর কল্পনা করেন। বাস্তবকে ছাড়িয়ে অবাস্তবের দরজায় তাঁর আঘাত, তাকে মূর্ত করে তোলার প্রচেষ্টা আমরা অনেক কবিতাতেই পাই।’ পিয়নেরা বয়ে আনে কুমারী রঙের হাওয়া’’,  কবি নিজেই সেখানে আশ্চর্য হচ্ছেন এই ভেবে যে, তা যেন সাত সমুদ্র সেঁচে মুক্তা প্রবাল পাওয়া’।
তবে প্রকৃতির বৈচিত্র‍্যতায় যতই মুগ্ধ হন কবি, তিনি কিন্তু বাস্তব বিমুখ নিছক কাব্যজগতে বাস করতে পারেন না। তিনি অবহেলা করতে পারেন না বাস্তবের রূঢ় কঠোরতা বা নিষ্ঠুরতা। তাই মাঝে মাঝেই তাঁকে ফিরতে হয়েছে কঠিন বাস্তবের পটভূমিতে। সেখানে তিনি ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন, রক্তাক্ত হয়েছেন, যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে উঠেছেন।
‘’ কেবল কান্নার ধ্বনি বাতাস কাঁপায়, চিতা জ্বলে এখানে ওখানে– পৃথিবীর ঘাস পুড়ে যায়’ তাঁর নিজস্ব কান্নার ধ্বনির স্বরূপকেই ব্যক্ত করে।
চলমান জীবনের নিত্যনৈমিত্তিকতায় যে এক ছন্দ আছে মাধুর্য আছে, তা কবির অনুভূতিকে নাড়া দেয়, তার আনন্দ কবিকে অনাস্বাদিত মধুর কাব্যরসে আপ্লুত করে। ‘’ পাহাড়েও বর্ষা নামে--জীবন চঞ্চল- জঙ্গল আনন্দে থাকে শরীরে শরীর’।
কখনও স্মৃতিতাড়িত হয়ে কবি উদাস হয়ে ওঠেন।মেদিনীপুরের গাছপালা, রাস্তা,  বিভিন্ন বিখ্যাত স্থানগুলো এক ধূসর কোলাজের সৃষ্টি করে।কখনও বলে ওঠেন, ‘’ ‘যে রকম বৃষ্টি ছিল স্কুলের বাদলে’
এত কিছু পরাবাস্তবতা কিংবা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের থেকে মাঝে মাঝেই মুখ ফেরান তাঁর আশেপাশে। তাঁর হৃদয় কেঁদে ওঠে যখন তিনি দেখেন, প্রতিমা বানায় যারা, ফুলের বাগান যার, মাঠে শস্য ফলায় যারা, তাদের মনে মেঘের পাহাড় আর ঋণের টিপসই তাদের জীবন যন্ত্রণাকে দুর্বিষহ করে তোলে।
কিংবা দেখি, মস্তিষ্কে পুরে দেয় জ্বলন্ত পেরেক, ক্ষুধার্তের মুখ থেকে কেড়ে নেয় মাটি,তৃষ্ণার্তকে ধাক্কা দিয়ে বসায় রাস্তায়’।
এ সবই বর্তমান সভ্যতায় আমাদের আশেপাশে ঘটতে থাকা এক জ্বলন্ত বাস্তব।🍂

কবিতার মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে বুঝতে পারি কখনও কখনও যেন কবি ব্যথার ধাক্কায় মূহ্যমান হয়ে কাব্যসৌন্দর্য রক্ষার চেয়েও যন্ত্রণার পরিস্ফূটনের দিকে একটু বেশি মনোযোগী হয়ে পড়েছেন। অবশ্য এতে কাব্যের অঙ্গহানি হয়েছে মনে হয় না। আমরা সবাই জানি ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ ঝলসানো রুটি হয়ে যায়।
প্রতিবেশীর চরিত্র কেমন তাও তাঁর কলমে সুন্দর ভাবে চিত্রিত হয়।
তিনি লক্ষ্য করেছেন,’’ জঙ্গল বিক্রি হয় জ্যোৎস্নাভেজা রাতে’,কিংবা ‘’ হিসাবের খাতায় টাকার অঙ্ক বাড়ে লাশের সংখ্যা কমে, সংবাদমাধ্যম দেখায়  সুস্থতার হার (করোনা সময়ের ছবি)৷আবার, হাসপাতালে অসুখ সারে না, অনেক অসুখ নিয়ে মেঘ নিয়ে ফিরে,আসি ঘরে’। এগুলো আমাদের সমাজের অন্ধকার এবং কালো দিকগুলোকেই ন্যক্কারজনকভাবে তুলে আনে।এ সমস্ত অনেক ক্ষেত্রেই মেঘ কোন বাস্তব মেঘ নয়, কোন অবস্থার দ্যোতক।সে জন্যই আগে উল্লিখিত হয়েছে, এখানে মেঘ নানা রূপে নানা পরিচয়ে নানা বর্ণে উপস্থাপিত হয়েছে।
কবির কবিতাগুলিতে অহেতুক যতিচিহ্নের বাড়াবাড়ি নেই, তা যথেষ্ট সংযত।
কবির প্রতিটি কবিতাই আলোচনার দাবী রাখে। নবসভ্যতার আগ্রাসী আক্রমণে সাধারণ মানুষের আনন্দের সীমা না থাকলেও, যে ছেলেটি পথ ভুলে জঙ্গলে হারায়, তার মনের খবর তুলে আনতেও কবি ভুলে,যান না।
কবি যে কেবল বাস্তব পরান্মুখ হয়ে কাব্যজগতের মধ্যেই লীন হয়ে থাকেন না, তার প্রমাণ রেখে যান প্রতি পদক্ষেপে।
আমরা তাঁর অনেক কবিতাতেই লক্ষ্য করি, এক উদাসী বাউলের হারিয়ে যাওয়ার মনোবৃত্তি। এই মনোবৃত্তি আসলে পলায়নপর নয়, এটি আসলে সুন্দরকে খোঁজার প্রচেষ্টায় আরও বেশি সমর্পণমুখী। আরও বেশি করে আত্মনিমগ্নতায় ডুবে থাকার প্রচেষ্টায় তিনি নিজেকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে রাধাকৃষ্ণের প্রেমের পথের পথিক করে তুলতে চান। 
সব শেষ কবিতাগুচ্ছটিতে তিনি তাঁর জ্বালা যন্ত্রণাকে তুলে এনেছেন,  একটি একটি করে ফুলের মালা গাঁথার মত গেঁথেছেন এবং সকলের দুঃখের সাথে সহমর্মী হয়ে আকাশদীপ জ্বেলে  রাখতে চেয়েছেন।

সার্বিকভাবে কবিতাগুলি আমাদের ভাবায়, চিন্তা করার পরিসর দেয়। আমরা আগামীদিনে আরও ভাল কবিতা তাঁর কাছে পাব এই আশা রাখি।

Post a Comment

0 Comments