জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা /অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী

গুচ্ছ কবিতা 
অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী 

১. 
নখ বিষয়ক 

তোমরা নখে দর্পণ খোঁজো 
আমি দেখি অর্ধেক চাঁদ 

তোমরা চাঁদে গর্তই দেখ
আমি দেখি মসৃণ ফাঁদ 

আমাদের নখে জ্যোৎস্না নামলে তবেই 
আমরা বুঝতে পারি চাঁদ আসলে সেই ফাঁদ 

যেখানে আটকে পড়ে আমরা সতত
নখ কাটি দাঁতে চেপে দাঁত 

২. 
পোষা নদী 

বুকের উপলচিত্র ঘরের দেওয়ালে সাজিয়ে রাখি 

একটি নদী তোমার ফ্রকের মতো নীল বয়ে যাচ্ছে 
পর্বতের জঘন থেকে জঙ্গলের কটিদেশ পার হয়ে 
বাদামী ঊরুভূমি সংযমে পাশ কাটিয়ে তীক্ষ্ম পায়ের দিকে 

একটি ত্রিতাল লহরার মতো সুদূর তেহাইয়ে 
দুরন্ত কায়দায় — শব্দনূপুরে 

ক্লান্তির ওপারে সমে ভিড়ে যাওয়ার মুহূর্তে তবুও 
অনিবার্য দ্বিধা — একটি ব দ্বীপে আমাকে বন্দি রেখে 
সমুদ্রপুরুষে মিশে গেল নীলবর্ণা পোষা নদীটি 

ভূগোলে ভালোবাসা নামের এমন কোনও নদী নেই 
অথচ ইতিহাসে অজস্র 

৩. 
কুয়াশা 

শীতরাত দীর্ঘ হতে হতে ক্ষয়িত চাঁদের কাছে 
ওড়নার মতো পড়ে ছিল 

সেই সাদা শরীর ভেদ করে বাদুড়ের ডানা 
কদম ফুলের কাছে ভেসে গিয়েছিল 

সব কুমারী নক্ষত্র চোখ তুলে চেয়েছিল 
এ মাটির উৎসাহী বুকে — সেও জানি 

শুধু পরকীয়া নির্দোষ ভেবে অবশ মুখে 
চুপ করে জড়ো হয়ে শুয়েছিল কুয়াশাযোনি 

 ৪. 
মধ্যবর্তী 

পূর্ববর্তী যা কিছু হাওয়ায় নিয়ে গেছে 
সেগুলো ভাগ্যিস নথিপরীক্ষক চেয়ে বসেনি 

না হলে কী করে দেখাতাম বাংলার খাতা জুড়ে 
তোমার নামে পোষ্টার আর হারিয়ে যাওয়া 
কালি কলমের বুক থেকে উঠে আসা শুদ্ধ ভাষা !

এখন হাওয়ারও বয়স হয়েছে সময়ের মতো 
আমরা কেউই পূর্ববর্তী নেই আর ।
শুনেছি আমাদের সময়কার কলমগুলো গলিয়ে 
প্লাস্টিক টব তৈরি করা হয়েছে ।

ভাগ্যিস আমরা ততদূর পরবর্তী হয়ে যাইনি 
না হলে টবের গাছ হয়ে বাংলার খাতার পাতা 
শরীরে সাজিয়ে বোবা হয়ে যেতে হত ।
                 
🍂
৫. 
মুঠোয় পারদ 

মুঠোয় এই মুহূর্তে বিশ্ব জাতীয় কিছু নেই 
অথচ যা আছে তা দিয়ে আরও একটা বিশ্ব 
সাজিয়ে ফেলা যায় 

ভাবছো এ কোন নির্মাণকুশলী এলো আবার !

এই দেখো — মুঠোর ভিতরে শূন্যতা 
শূন্যতার ভিতর স্মৃতির অজস্র প্রজ্ঞা 
আর প্রজ্ঞার ভিতরে এই চেনা বিশ্ব 

হাতের মুঠোয় এই রকম পারদ ধরা থাকলে 
বাজারে অনেক সুদর্শন নিন্দুক জড়ো হবে 
ওটুকুই সুসংবাদ।

৬. 
মাঞ্জা 

আমারও ঘুড়ি ছিল একদিন 
মাঞ্জা ছিল না।
যথারীতি আমার ঘুড়ি খুন হয়েছে বারবার ।

এখনও ওদের পরম্পরা মাঞ্জা নিয়ে মশগুল 
যে আনন্দ একটু আকাশ খোঁজে আকাশে 
ওরা তারই পিছনে মাঞ্জা লেলিয়ে দেয় 

যথারীতি আবারও নির্দোষ খুশির লাশ পড়ে ।

ওদের এই জিতে যাওয়াটা বড় কথা নয় 
কিন্তু ওদের উল্লাসে সাথ দেয় যে গুনীসমাজ 
তাদের অদৃশ্য মাঞ্জা বড় ভাবায় ।

সবচেয়ে বড় শোক হল — এরা একবার এসে 
পৃথিবীকে ধন্য করে চলে যায় না 
এরা বারবার এসে ধন্য হওয়ার সংস্কৃতিকে 
গুলিয়ে দিয়ে যায় ।
        
৭. 
ডুব 

সারাদিন গভীর নীল সবুজের দ্রবণে 
ডুবে থাকতে ইচ্ছে হয় 
যারা বলে জলের কোনও রঙ নেই 
জলের হত্যাকারী তারা ।

এমনি করেই অনেক বসন্ত আগে 
আমারই বন্ধু সেজে আমাকে বুঝিয়েছিল ওরা
তোমার ভালোবাসার ভিতরে কোথাও 
আমার কোনও রঙ লেগে নেই !

সেই মিথ্যেগুলোকে পাড়ে রেখে 
আমি তোমার লাজুক সরোবরে নামি 
গভীর নীল সবুজের স্বচ্ছ দ্রবণে 
মগ্ন ডুবটুকু আত্মস্থ করি ।

তুমি শালুক ফুলের মালা পরিয়ে দেবে বলে 
আমার ডুব আর ভাসা নিয়ে বয়ে যাচ্ছে 
গভীর নীল সবুজের এই আশ্চর্য দ্রবণ । 

সংগ্রহ করতে পারেন। হোয়াটসঅ্যাপ -৯৭৩২৫৩৪৪৮৪

Post a Comment

0 Comments