জ্বলদর্চি

মিড ডে মিল/কমলিকা ভট্টাচার্য

প্রাসঙ্গিক
মিড ডে মিল
কমলিকা ভট্টাচার্য


নতুন বউ বলল,
—মাসি, কয়েকটা ফল একদম শুকিয়ে যাচ্ছে। তুমি নিয়ে যেও।
মাসি বলল,
—ঠিক আছে নতুন বউ, নাতিটার জন্য নিয়ে যাব। ভালোমন্দ পুষ্টিকর তো সেরকম কিছু দিতে পারি না। এই তুমি, মিত্তির বাড়ির বৌদি কিছু দেয়—ফল দাও তাই দিই। নিজে কিনে দেবার ক্ষমতা কোথায়? দু’মুঠো ভাত-ডাল দুবেলা দিই, এই যা।
নতুন বউ অবাক হয়ে বলল,
—কেন? স্কুলে তো মিড ডে মিল দেয়! পুষ্টিকর খাবার।
মাসি একটু হেসে মাথা নাড়ল।
—সে কথা আর বোলো না মা। ওসব সরকারি যোজনা শুনতে ভালো লাগে। চেষ্টা যে খারাপ, বা দেয় না—সেকথা বলব না। কিন্তু কী দেয়, কেমন করে দেয়—সেটাও তো দেখা দরকার।
কোনো কোনোদিন দুধের নামে দুধ ফাটা জল। খিচুড়ি খেসারির ডাল দিয়ে। তাও পরিষ্কার করে বানায় না। আরশোলা, টিকটিকি, ব্যাঙ—কত কী পাওয়া যায় তাতে! খবরে তো দেখায় মাঝেমধ্যেই। সেদিন আবার দেখাচ্ছিল—কোনো একটা স্কুলে প্লেট নেই, মাটিতেই খাবার দিয়েছে।
কতটা সত্যি জানি না। তবে এটুকু জানি—যেদিনই আমার নাতি স্কুলে খায়, সেদিনই শরীর খারাপ করে। আবার ডাক্তার, আবার ঔষধ। তার চেয়ে আমি বলেছি,
“তোকে বাবা স্কুলে খেতে হবে না। বাড়ি ফিরে দুটো গরম ভাত আর আলু সেদ্ধ করে দেব, তাই খাস।”
নতুন বউ বলল,
—তোমরা কমপ্লেন করো না?
মাসি একটু হেসে বলল,
—গরিবের আবার কমপ্লেন! শোনো তবে—আমি নিজে কানে শুনেছি, চোখেও দেখেছি। ওই পার্টির ছেলে হরেন মিড ডে মিলের চাল এলেই বস্তা বস্তা চাল নিয়ে যায়। বলে, সরকার বাড়ির কুকুর খাবে।
🍂
তুমিই বল মা, যে চাল বড়লোকের বাড়ির কুকুর খায়, সেই চাল বাচ্চাদের কী পুষ্টি দেবে?
সব নীতির দোষ নয়। মানুষের লোভ। তহবিলের টাকা মেরে বড় বড় পাকা বাড়ি উঠছে। জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে তো আর লড়াই করা যায় না।
—আমি আজ যাই নতুন বউ।
নতুন বউ বলল,
—কি মাসি, আজ খবর শুনবে না?
—না বৌমা। আজ ওর দাদু ঘরে নেই। একটা রাজমিস্ত্রির কাজ পেয়েছে। নাতিটা ঘরে ফিরবে—কেউ নেই তাকে দেখার।
নতুন বউ বলল,
—কেন? ওর মা কোথায়? তোমার বউমা?
মাসি একটু থেমে বলল,
—না মা, তোমায় বলা হয়নি। এবার ছেলে ঘরে ফিরলে ছেলের সঙ্গে বৌমাকে চেন্নাই পাঠিয়ে দিয়েছি। এ শহরে তো কিছু কাজ পেল না। ছেলেটাকে কষ্ট করে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়িয়েছিলাম। মাথা ছিল ওর। আগে আর পড়াতে পারিনি।তবে আগে পড়েই বা কি হতো এম এ ,বি এ পাশ দিয়ে সব রাস্তায় ধরনা দিচ্ছে,কাজ নেই।
তাও এখানে অনেককে বলেছিলাম কাজের জন্য। কিন্তু সবাই বলে—“পার্টির কাজ করুক কিছু দিন, তারপর একটা ব্যবস্থা করে দেব।”
কিন্তু জানো বৌমা, ও বড় বাজে কাজ—দেশের মানুষের উপকারের নামে মানুষ ঠকানো। আর কিছু ক্ষমতালোভী মানুষের পা চাটা।
একজনের মাধ্যমে চেন্নাইতে একটা কারখানায় কাজ পেয়েছে এখন।
নতুন বউ বলল,
—তা এত ছোট বাচ্চা মা-কে ছেড়ে থাকবে?
—মা থাকতেই বা কত দেখত! সারাদিন মোবাইল নিয়ে পাশের ঘরের পল্টু বলে একটা ছেলের সঙ্গে রিল বানাত। খালি সারাদিন সে ঘরে “বৌদি, বৌদি” করে হাজির।
সমত্ত বয়স—কোনদিন কি একটা অঘটন ঘটবে কে জানে! চারদিকে শেয়াল-কুকুরের অভাব নেই। সবাই সুযোগের অপেক্ষায় বসে আছে।
তাই ওকে ছেলের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলাম। কম বয়স—স্বামীর সঙ্গে ঘর সংসার করুক সেখানে।
—নতুন বউ, আজ আমি চলি। অনেক দেরি হয়ে গেল।
নতুন বউ শুকনো ফলের প্যাকেটটা মাসির হাতে দিয়ে বলল,
—নাতিকে দিও।
মাসি বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
—বৌমা, কদিন আগে যে একটা ইলেকট্রিক দিয়ে খাবার বানানোর মেশিন কিনেছিলে না, সেটা বার করে রেখো।
—কোনটা মাসি?
—কাল থেকে কিছু রান্না—ভাত তরকারি—ওতেই করব। যুদ্ধ কবে থামবে কে জানে! গ্যাসের আকাল পড়তে পারে। সব সময় সরকারকে দোষ দিয়ে কী হবে? নিজেদেরও একটু সচেতন থাকতে হবে। আমাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। ওতলা হয়ে কি হবে?
কথাগুলো বলে মাসি দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।
পাশের ফ্ল্যাটের দেবিকাকে দেখলাম—সিলিন্ডার নিয়ে ডেলিভারি করতে আসা মানুষটার সঙ্গে দু’দিন দেরি হয়েছে বলে খুব চিৎকার করছে।
সিঁড়ির ধাপগুলো তখনও যেন মাসির কথার প্রতিধ্বনি ধরে রেখেছে—
অভিযোগ করার অধিকার সবার সমান নয়।

Post a Comment

0 Comments