খড়ের ভগ্নাংশ মুখে নিয়ে একটি পাখি নির্মিতির গভীর মেধায় যেভাবে একটি নীড় শিল্পীত করে, একজন কবিরও অনুরূপ যাত্রাপথের অভিমুখ প্রেমের খড়কুটো বুকে নিয়ে আশ্চর্য অনুপম এক আশ্রয়ের দিকে ধাবিত হয়। কবির সেই আশ্রয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ; তাঁর মনন । যদিও সব নীড় দৃশ্যত এক নয়, প্রতিটি নীড়ের গন্ধ আলাদা, ভাবনায় অন্য, আয়োজনের গল্পে অনন্য সেই নিরিখেই প্রতিটি কাব্য আশ্চর্য রকমের স্বতন্ত্র।
কবি সুমন রায়ের ' বুকে ধরে তোমার রুমাল ' কাব্যটি বয়ঃসন্ধি পর্বের শুদ্ধ প্রেমের অনুষঙ্গে রচিত তেমনই আশ্চর্য এক কাব্য। পঞ্চাশটি কবিতার ঋদ্ধ এই আয়োজন প্রেমিক কবির অন্তরে প্রবাহিত কুবাই নদীর কাছে নিয়ে যায় আমাদের । নদী আর নারীর কুহক সেখানে অলীক বসন্ত ছড়িয়ে রেখেছে —
' কিশোর স্বপ্ন দেখি এখনও
পুরোনো পাতার কাছাকাছি
এ জন্মের অযৌক্তিক আড়াল
সব বুকের প্রকোষ্ঠে খুলে যায়
অলীক বসন্ত যত। '
— ( কবিতা - বসে আছি )
কৈশোর থেকেই কবির রূপাইমন মুগ্ধতার সহজিয়া পথে সাজুর মন পেতে আকুল হয়েছে। অপাপবিদ্ধ সেই রুমাল চুরি প্রেমকেই মধ্যজীবন অতিক্রান্ত কবি অগাধ আশ্রয়ের মতো আগলে রেখেছেন পাঁজরে। সেই আশ্রয়ও কবিকে আগলে রাখে মথিতবেদনার সুখে। আশ্রয় আর আশ্রয়ীর মধ্যে যে যাপননির্ভরতা থাকে সেই ছবিও এই কাব্যে মূর্ত হয়ে উঠেছে —
' কেউ কেউ তাকে ভাবে ক্ষণিকের বিমূর্ত যাপন এক
আগন্তুকের মতো অহেতুক সংজ্ঞায়িত করা বিশেষ
আবেগ সেখানে মাত্রা পায় অভিধানিকতায় । আসলে
তা পরাকাষ্ঠা নয়, প্রেম প্রেম। '
— ( কবিতা - প্রেম প্রেম ) 🍂
কবি সুমন রায় এই কাব্যে প্রেমের একটি অনন্য দর্শন তুলে ধরেছেন। যদিও বাংলা কবিতায় তা আনকোরা নয় কিন্তু সেই চিরায়ত দর্শনেই তাঁর আস্থা। এই দর্শনটুকু বোঝাতে রবীন্দ্রনাথও ' শেষের কবিতা ' পর্যন্ত হেঁটেছেন। যে প্রেম বিবাহের মর্যাদা বা অমর্যাদার ছোঁয়াচ থেকে দূরে কৌমার্যের অনুভূতিটুকুর মধ্যেই আজীবন অনশ্বর হয়ে থাকে সেই অস্তিত্বের কাছে তাঁর সমর্পণ —
" কথা দিচ্ছি এ বসন্ত পার হয়ে যাবে ঠিক
নদীতীরে অহেতুক ঘুরে
বুকে ধরে তোমার রুমাল ।"
— ( কবিতা - তোমার রুমাল )
সামাজিক বন্ধনের বাইরেই প্রকৃত মুক্তির অবকাশ আকাশ হয়ে ছড়ানো থাকে। অপ্রাপ্তি যখন প্রাপ্তি সংক্রান্ত ভুল অভিজ্ঞানে নির্ণীত হয় তখনই যাবতীয় বুকভার আমাদের পীড়িত করে। কবি তাই এই প্রচলিত ভাবনাবৃত্ত থেকে মেধাবীর মতো সরে গেছেন প্রকৃতির দিকে —
" মনে হল বন্দি নয় আমরা, এক আস্ত খোলা আকাশ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে আমাদের দিকে। এখানে মনখুশি শ্বাস নেওয়া যায়, উড়িয়ে দেওয়া যায় যত চিন্তা, সরিয়ে দেওয়া যায় ব্যস্ততার বাস্তব "
— ( কবিতা - একটা চড়ুই )
এই কাব্যে নারীর সঙ্গে নদীর একাত্মতা কাব্যটিকে শুধু কায়া দান করেনি, কাব্যের আত্মাটিকেও ভাস্বর করে তুলেছে । কুবাই নদীর আসঙ্গে প্রেমের বিবিধ অনুষঙ্গ এই কাব্যের ঐশ্বর্য । কুবাইয়ের সঙ্গে কবির সম্পর্ক শৈশব থেকে আজীবনের। জীবনানন্দের ধানসিঁড়ি নদীটির সঙ্গে সুমনের কুবাইয়ের আশ্চর্য সাদৃশ্য ।
" আমার শৈশব সুখ
সে কুবাই সে কুবাই
........ ..... .....
উচ্ছল তার তারুণ্যে প্রাণিত
দু হাতের দোতারায় কাশফুল
সে কুবাই সে কুবাই
..... ....... ......
পূর্ণপ্রাণে যুবতীর লাজ
বিকেলের রজনীগন্ধা সুখ
হায় তার কনককান্তি মুখ
সে কুবাই সে কুবাই "
পূর্ণিমা থেকে অমারাত , দাবদাহ থেকে বর্ষার মেঘ সর্বত্র প্রেমের বারোমাস্যার অনুবাদ চোখে পড়ে। পূর্ণিমায় কবি দেখেন, বিরাট চাঁদ কুবাইয়ের জলে গলে পড়ছে , কখনও আবিশ্ব সাজিয়ে তোলা পূর্ণিমার বিপরীতে দেখাতে চেয়েছেন একটি নূপুরহীন পায়ের নিঃশব্দ অমারাতের অভিসার। গ্রীষ্মের না নেভা বালির আগুন বুকে গোপন রেখে অন্ধ কানাইকে বলেছেন -গান ধরো, মালা গাঁথো।
তাই সুধাংশুবাবুর অঙ্কের মতো করে কুবাইকে প্রচলিত তত্ত্বে ধরা যায় না । ভালোবাসায় শূন্যতাও যে কতখানি রাকার বিভাস তার সন্ধান এই কাব্য ।
' বুকে ধরে তোমার রুমাল ' কাব্যে কবিতার শরীর নির্মাণে মূলত স্পষ্ট হয়েছে রূপান্তরের শৈলী আর আত্মকথনের শৈলী। কবিতায় সাংকেতিকতার আয়োজনে কবি এনেছেন বিশেষণ প্রয়োগের মৌলিক মেধা। উপমান আর উপমেয়ের বহুদূরকল্পিত সাযুজ্য স্থাপনে কবির মুন্সিয়ানাও মুগ্ধ করে আমাদের।
যেমন —
১)
" ঘুম আর ঘোরের মতন
শান্ত বিপ্লব তার মৈথুন "
২)
" বালিতে আরেক ভ্রম
পেলব মসৃণ
জীবনানন্দের মতো
অযথা রঙিন "
৩)
"
অক্লান্ত হয় না সব অপেক্ষা গলে পড়া আইসক্রিম
যেমন "
একেবারে শেষে এসে সুমন রায়ের কাব্যটির নামকরণ চকিতে মনে করিয়ে দেয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি বহুশ্রুত পঙক্তি —
" বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,
যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালোবাসবে
সেদিন আমার বুকেও এ রকম আতরের গন্ধ হবে। "
কিন্তু সুনীলের কবিতায় যেমন কেউ কথা রাখেনি বলে আক্ষেপ মুখ্য হয়ে উঠেছে সুমনের কাব্যে তা নয়। তিনি কথা না রাখা প্রেমিকার অবহেলাকে বিচারের বাইরে রেখে না পাওয়া শূন্যতার ভিতরেই আশ্রয় খুঁজেছেন কিংবা অন্যতর এক যাপনের সুখে নিজের প্রেমকে শূন্যজয়ী মহত্বে গৌরবান্বিত করেছেন। নারী কিংবা নদী কোনও কিছুরই সবটার প্রতি কবির লোভ নেই। যেন তা প্রেমিকের স্বভাববিরোধী। আপন অন্তরের এই পূর্ণতার শক্তিতেই প্রিয় মানুষীর একটি রুমাল আঁকড়ে ধরে কবি আশ্চর্য প্রেমিক হতে পেরেছেন। কাব্যটি এই নিরিখে সত্যিই অদ্বিতীয়।
0 Comments