জ্বলদর্চি

কবি অরুণ দাস বিরচিত"চূর্ণীকে লেখা চিঠি "গ্রন্থ সম্পর্কে কিছু কথা/স্বাতী ভৌমিক

কবি অরুণ দাস বিরচিত "চূর্ণীকে লেখা চিঠি " গ্রন্থ সম্পর্কে কিছু কথা

স্বাতী ভৌমিক 

 কোন কবি বা লেখক যখন কিছু লেখেন,সেই লেখায় ওনার গভীর হৃদয়োপলব্ধি ও নিবিড়ভাবে অনুভূত জীবনদর্শনের মর্মস্পর্শী ছোঁয়া থাকে। কোন্ অনুভূতি থেকে তিনি শব্দ চয়ন করে কবিতামাল্য বা কাব্যমাল্য রচনা করেন তা একদম সঠিকভাবে আলোচকের শব্দ চয়নে ব্যাখ্যা করা সব সময় সম্ভব হয় না।

 তবু প্রচেষ্টা থাকে মোটামুটি ভাবে কিছুটা হলেও ওনার রচনার মর্মকথা উপলব্ধি করার ও সে সম্পর্কে নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু উপলব্ধি আলোচনা করার। আমিও সেই প্রচেষ্টাই করছি। এ প্রসঙ্গে কোন ভুল ত্রুটি হলে তা ক্ষমা সুন্দর কাব্যিক হৃদয়ের কাছে আমি আশাবাদী যে তা অবশ্যই মার্জনীয় হবে।

 কবি অরুণ দাস চেতনার পরম স্তরকে অনুভব করেছেন ও সেই উপলব্ধিকে ব্যক্ত করেছেন শব্দ চয়নে সুনিপুণভাবে। দৃশ্যমান জগতের তুলনায় উপলব্ধির জগত অনেক বৃহৎ। আমাদের দৃষ্টিপথে একই সময়ে একটার বেশি দর্শনীয় বিষয় থাকতে পারে না। কিন্তু আমাদের মনোরাজ্য হলো উপলব্ধির- অনুভূতির বিস্তৃত অঙ্গন।

 "হৃদয়লীনা"কথার অর্থ সম্ভাব্যভাবে বলা যায়, যা হৃদয়ে লীন হয়ে রয়েছে। কবি হৃদয়ে যা লীন হয়ে রয়েছে সে প্রকৃতি স্বরূপা। দৃশ্যমান রূপের অদৃশ্য অনুভূতির মর্মকথা না বলা ভাষায় নিঃশর্তে ঠাঁই নেয় মন রাজ্যে। পৃথিবীর যত না বলা কথারা মনের নিভৃত ঘরে নিরালায় বিরাজ করে। কবি অরুণ দাসের ভাষায় বলা যায় "নিভৃত ডানায় লুকিয়ে রাখি অভিমানী পৃথিবীর সব অন্ধকার "।
🍂

 না হারালে কখনো কোন কিছুকে তার যথার্থ রূপে খুঁজে পাওয়া যায় না। কোন কিছুর পূর্ণ স্বরূপ উপলব্ধি করতে গেলে তার মাঝে নিজেকে হারাতে হয় -একাত্ম হতে হয়। তাকে উপলব্ধি করতে হয় তার মত করে। কায়া আবছা হলে, ছায়া পড়ে থাকে- তা স্মৃতির ছায়া হোক্ বা আলোর রেখা দর্শন।

 সময় প্রবাহমান -স্পর্শাতীত। সময়ের পরিসরে সংঘটিত ঘটনা প্রবাহের উপলব্ধির ছোঁয়া যখন মন ফিরে পেতে চায় তখন সেই সময় কিন্তু অনন্ত প্রবাহের পথ বেয়ে অধরার দেশে হারিয়ে যায়। কারণ জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত প্রতিটা মুহূর্তের থেকে ভিন্ন -একই রকম কখনো কিছু মনে হলেও মিল হয়তো থাকে, কিন্তু পরিবর্তনশীল এই বিশ্বজগতে কোন কিছু পরের মুহূর্তের সাথে কখনোই এক থাকে না। কিন্তু কবি সাহিত্যিকরা সেই বহমান সময়ের স্পর্শ অমলিন ভাবে স্পর্শ করতে চান তার সৃষ্টির মাধ্যমে "শব্দের কালো ঝরনারা ছুঁতে চায় সময়ের গাছ।" কবি দিশেহারা পৃথিবীর খেয়ালী জোনাকি রূপে চাঁদকে চিহ্নিত করেছেন যা হয়তো নিকষ অন্ধকারে স্বপ্নময় আশার আলো।

 অন্তরের আলোক প্রজ্জ্বলিত করে সহজেই পথহীন পথও অতিক্রম করা যায়। মানব হৃদয় এক বিচিত্র রাজ্য। কবির বিমুর্ত ঝর্ণারা হয়তো সময়ের অবারিত জীবন প্রবাহ। শূন্যের মাঝেই পূর্ণতা পায় মানব হৃদয়। কবি অরুণ রায়ের এই উপলব্ধি এক অনন্য উপলব্ধি যে,আমরা ভুলতে ভুলতে একসময় নিজেকেই ভুলে যাই। এটা অনেক বড় দার্শনিক উপলব্ধি। জন্ম-জন্মান্তরের চক্রে আবর্তিত হতে হতে আমরা প্রকৃত আমি- কেই ভুলে যাই, শুধু পরিবর্তনের প্রবাহ স্রোতে ভাসতে থাকে আমাদের প্রকৃত উপলব্ধি। এক সময় উচ্ছলতারাশি প্রশমিত হয় শান্ত জীবন উপলব্ধির মাঝ সমুদ্রে- যেখানে না থাকে ঢেউ, না থাকে তরঙ্গ -শুধু থাকে উপলব্ধির গভীরতা।

 হৃদয়ের লেখা অমলিন। ভালোবাসা তো হৃদয়স্পর্শী। হৃদয় না স্পর্শ করলে ভালোবাসা হয় না। কবি অরুণ দাসের চূর্ণী সম্ভবত কবি মনের গভীরতা, প্রজ্ঞার প্রতীকি নাম। যার কাছে কবিহৃদয় তার অনুভূতি- আবেগ অকুণ্ঠিত ভাবে প্রকাশ করেছেন। বাইরের পৃথিবী থেকে বিমুখ হয়ে মানুষ যখন অন্তর্মুখী হয়, তখন সে নিজেকে জানতে পারে। কবি যখন বলেন,"এক জীবনে কত শত মৃত্যু জমলে সত্যি সত্যি চেনা যায় নিজেকে?"এই মৃত্যু হয়তো আশার বিলীনতা নিরাশায়। আঘাত মানুষকে ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী করে তোলে- নিজেকে কোন এক ক্লান্ত অবসরে সে আবিষ্কার করে নতুনভাবে। 

 কবি হৃদয়ের এ যেন গভীর দার্শনিক উপলব্ধি "কোন কিছুই থেমে থাকে না কারো জন্য।"
প্রতিহত আশা হয়তো পথ চলার ইচ্ছেটাকে দমিয়ে দেয় কিন্তু জীবন ঠিক জীবনের পথে বয়ে চলে বিরামহীনভাবে।

 কবি যে বলেছেন "শরীর মানে পোশাকি সফর "প্রকৃত অর্থে শরীর তো আত্মার পোশাক-ই। আমরা যেমন ইচ্ছে হলে বা জীর্ণ হলে পোশাক পরিবর্তন করি , আত্মাও সেভাবে সময় হলে এক শরীর ছেড়ে অন্য শরীর ধারণ করে। যাকে আমরা বলি জন্মান্তর। এগিয়ে যাওয়াই জীবন। "ফেরার পথ নেই জেনে"আমাদের সামনের পথে এগিয়ে যেতে হয়। অক্ষয় অক্ষরে সময়ের কোনো ঠিকানাহীন ডাকঘরে সব কাহিনী জড়ো হয় একে একে আর জীবন চলে চলার স্রোতে জীবনের পথে।

 পার্থিব সকল অনুভূতি স্থায়ী হয় অপার্থিব এর উপলব্ধিতে। স্মৃতির পাতায় স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয় জীবনের বয়ে যাওয়া সব আবেগ। মন কখনো নিরালাতে উল্টে দেখে সেই পাতা। কবি অরুণ দাস প্রকৃতিপ্রেমী। প্রকৃতির বিস্তৃত অঙ্গনে কবি হৃদয় নানা রঙে রঙিন হয় প্রকৃতির বিচিত্র প্রকাশে। নীল আকাশ, রাতের ভাব গম্ভীর রহস্যময় নীরবতা, মৃদু হাওয়ার রেশমী স্পর্শ, মেঘমেদুর আকাশ নানা কল্পনার রং তুলি নিয়ে কবি হৃদয়ে বিচিত্র ক্যানভাস সৃষ্টি করে। আর তাতেই উদ্বেল কবিহৃদয় সাড়া দেয়-সার্থক অক্ষরের বিনিসূতোয় গাঁথা হয়"চূর্ণীকে লেখা চিঠি"রূপ সুদৃশ্য কাব্যমাল্য।।

Post a Comment

0 Comments