সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে 'রমজান' : এক উন্মুক্ত নান্দনিক শিল্প
পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী
রোজার মাসকে সবাই 'রমজান' বলেন । রমজান কেবল একটি উপবাসের মাস বা ধর্মীয় আচার নয় এটি আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ এবং মানবিক সৌন্দর্যের এক জীবন্ত উৎসব। 'রমজান' শব্দটি এসেছে আরবি শব্দ 'রমদ' থেকে যার অর্থ প্রখর উত্তাপ বা জ্বলন্ত রোদে পুড়ে যাওয়া। রমজান মাস 'পাপ' মুক্ত করে ব্যক্তির 'দোষ' পুড়িয়ে দেয়-এমনটাই বিশ্বাস।
এমন এক সংস্কৃতি স্বাভাবিকভাবেই
ভারতীয় উপমহাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও তার প্রভাব বিস্তার করেছে, যোগ করেছে একটি বিশেষ নান্দনিক মাত্রা। ধর্মীয় বিধানের গণ্ডি পেরিয়ে আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রোজা হয়ে উঠেছে এক উন্মুক্ত নান্দনিক শিল্প, যা আধ্যাত্মিকতা এবং মানবিক সম্পর্কের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি করেছে।
যুগ যুগ ধরে কবি ও সাহিত্যিকেরা রমজানের দিনগুলোকে তাঁদের লেখায় আরও অর্থবহ করে তুলেছেন ।
রমজানের মূল সুরটি নিহিত রয়েছে আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধিতে । ভারতীয় শিল্প ও সাহিত্যে এই আধ্যাত্মিক দিকটি নানাভাবে ফুটে উঠেছে। বিশেষ করে সুফি সাহিত্যের ভাবধারায় রমজানকে দেখা হয়েছে স্রষ্টার সাথে মিলনের এক অনন্য সোপান হিসেবে। মধ্যযুগীয় পারস্য সাহিত্যের প্রভাব যেমন ভারতীয় সাহিত্যে স্পষ্ট, তেমনি জালাল উদ্দিন রুমি বা ইবনে আরাবীর মরমী ভাবধারা রমজানের কাব্যিক গভীরতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ। ভারতীয় মুসলিম লেখকেরাও আদর্শবাদ ও বাস্তববাদের সংমিশ্রণে রমজানের মাহাত্ম্যকে শুরু থেকেই সাহিত্যে বর্ণনা করেছেন।
বাংলা সাহিত্যে রমজান ও ঈদের বর্ণনা একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্যেরই অংশ। মধ্যযুগের সুলতানি আমলে মুসলিম কবিদের হাত ধরে যে সাহিত্যচর্চার শুরু হয়েছিল, সেখানে ইসলামের বিধি বিধানের পাশাপাশি রমজানের পবিত্রতাও স্থান পেয়েছে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকেই ঈদ নিয়ে লেখালেখির সূচনা হয়। ১৯০৩ সালে সৈয়দ এমদাদ আলীর সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক ‘নবনূর’ পত্রিকায় তাঁরই লেখা ‘ঈদ’ কবিতাটিই সম্ভবত বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম কবিতা । সেই কবিতাতে তিনি লিখেছিলেন -
“ধর্ম ও কর্মরে জীবনের মাঝে
প্রতিষ্ঠিত করি আজ
জীবনের আবহে হও অগ্রসর,
নাহি তাতে কোন লাজ।
যে চেতনা থাকে একদিন জাগি,
দীর্ঘ নিদ্রা তার পরে,
সে তো আনে শুধু ঘন অবসাদ
জীবনে ঢালে অনন্ত বিষাদ
দেও তারে দূর করে।”
এখানে কবির কাছে ঈদ ছিল এক আত্মজাগরণের উৎসব । বিষাদ ও আলস্য দূর করে কর্মতৎপরতায় নিজেকে বিকশিত করার প্রেরণা হিসেবেই ঈদের আগমন। তাই ঈদকে সর্বান্তকরণে বরণ করে নিয়েই নিজেকে পরিশুদ্ধ করার পথে এগিয়ে যেতে হয়।
যুগে যুগে বাংলা সাহিত্য এই ধারাতেই ঈদকে ধারণ করেছে।
কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় রমজান পেয়েছিল এক বিদ্রোহী ও উৎসবমুখর রূপ -
“মাহে রমজান এসেছে যখন আসিবে শবে কদর,
নামিবে রহমত এই ধূলির ধরার পর।
এই উপবাসী আত্মা, চিরকাল রোযা রাখিবে না-
আসে শুভ এফতার ক্ষণ।”
তাঁর লেখা "ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এল খুশির ঈদ" গানটি তো আজ বাংলার ঘরে ঘরে এক অবিচ্ছেদ্য লোকগাথা এবং ঈদ উৎসবের নান্দনিক সূচনা হিসেবে গণ্য হয়। এটি কেবল একটি ধর্মীয় সংগীত নয়, বরং এটি আত্মত্যাগ এবং ভ্রাতৃত্বের এক ঐতিহাসিক দলিল। নজরুল রমজানকে দেখেছিলেন এক বিপ্লবী ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। তিনি মনে করতেন, দরিদ্রের ঘরে ঈদ না এলে ঈদের আনন্দ হবে একেবারেই অর্থহীন। ঈদের দিনেও গরিব-দুঃখী ও অসহায়দের কষ্টের শেষ থাকে না। কবি শাহাদাত হোসেনও এই অবস্থা দেখেই ‘বাংলার ঈদ’ কবিতায় লিখেছিলেন —
“বাংলার মুসলমান শুধু চেয়ে রয়—
মৌন ম্লান ক্লিষ্ট মুখ নির্বাক নিশ্চল।
ফিত্রার খুশী কোথা তার?
কি দান সে দিবে ক্ষুধিতেরে?
নিজেই কাঙাল রিক্ত—
ভিক্ষা মাগি ফিরে দ্বারে দ্বারে।”
ফররুখ আহমদ, পল্লী কবি জসীম উদ্দীন এবং আধুনিক যুগের অনেক কবিই রমজানের মাহাত্ম্য ও এর সাথে জড়িত লোকজ আবেগকে তাঁদের বিভিন্ন লেখায় ফুটিয়ে তুলেছেন।
ফল্গুধারার মতো প্রবাহমান ইসলামী ঐতিহ্য এবং রমজানের আধ্যাত্মিক গাম্ভীর্য কবি ফররুখ আহমদের কাব্যে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে। তাঁর কাব্যে রমজান কেবল একটি মাস নয়, বরং এটি একটি হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার এবং আত্মশুদ্ধির মাস হিসেবে চিহ্নিত। 'রমজান’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-
এলো রমজান মাস—
আসমান হতে ঝরে রহমত, জাগে যে প্রাণের আশ।"
এখানে তিনি উপবাসের কৃচ্ছ্রসাধনকে আধ্যাত্মিক উন্নতির সোপান হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁর বর্ণনায় সেহরি ও ইফতারের দৃশ্যগুলো নিছক ধর্মীয় আচার নয়, বরং এক স্বর্গীয় প্রশান্তি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবেই বর্ণিত হয়েছে। তাঁর কাছে রমজানের রোজা হলো অলসতা ও পঙ্কিলতা থেকে মুক্তি পেয়ে নতুন এক সোনালি ভোরের দিকে যাত্রা করা। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় আরবি ও ফারসি শব্দের সার্থক ব্যবহারের মাধ্যমে একটি ধ্রুপদী আবহ তৈরি করেছেন। কবি জসীম উদ্দিনের কবিতাতেও আছে নামাজের আমেজ।
' তারাবি ' কবিতায় তিনি লিখেছেন -
‘নামাজ পড়িতে যাইব মোল্লাবাড়িতে আজ,
মেনাজদ্দীন, কলিমদ্দীন, আয় তোরা করি সাজ।
চালের বাতায় গোঁজা ছিল সেই পুরাতন জুতা জোড়া,
ধুলাবালু আর রোদ লেগে তাহা হইয়াছে পাঁচ মোড়া।
তাহারি মধ্যে অবাধ্য এই চরণ দুখানি ঠেলে,
চল দেখি ভাই খলিলদ্দীন, লণ্ঠন-বাতি জ্বেলে।
ঢৈলারে ডাক, লস্কর কোথা, কিনুরে খবর দাও।
মোল্লাবাড়িতে একত্র হব মিলি আজ সার গাঁও।’
কবি আজিজুর রহমান তাঁর রোজা কবিতায় উল্লেখ করেছেন-
“রোজা রেখে করো অনুভব, ক্ষুধার কেমন তাপ,
দেহমনের সেই সাধনায়, পুড়িয়ে নে তোর পাপ।”
কবি বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর ‘ঈদের চাঁদ’ কবিতায় লিখেছেন-
“ওই উদিল গগনে সুন্দর শিশু চাঁদ
আমিন। আমিন। রাব্বুল আলামিন করে সবে মোনাজাত।”
এই মোনাজাত শুধু সাহিত্যে নয়, বাস্তব জীবনেও লক্ষ করা যায়।
রমজান কেবল উপবাস হিসেবে নয়, একটি সামাজিক সংহতির প্রতীক হিসেবেও তাঁদের সাহিত্যে উঠে এসেছিল। গোলাম মোস্তফা এই কারণেই ঈদকে মানবতার বাঁধন হিসেবেই দেখেছিলেন। সাম্য আর প্রেমের এরকম উৎসব আর কোথায় আছে? ‘ঈদ উৎসব’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“কণ্ঠে মিলনের ধ্বনিছে প্রেম-বাণী, বক্ষে ভরা তার শান্তি,
চক্ষে করুণার স্নিগ্ধ জ্যোতিভার,বিশ্ব-বিমোহন কান্তি
প্রীতি ও মিলনের মধুর দৃশ্যে
এসেছে নামিয়া যে নিখিল বিশ্বে
দরশে সবাকার মুছেছে হাহাকার বিয়োগ-বেদনার শ্রান্তি।”
কবি কায়কোবাদও মহামিলনের উৎসব হিসেবেই ঈদকে দেখেছিলেন। ঈদের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য এবং আধ্যাত্মিক ও সামাজিক অবদানের কথা মাথায় রেখেই কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“এই ঈদ বিধাতার কি যে শুভ উদ্দেশ্য মহান,
হয় সিদ্ধ, বুঝে না তা স্বার্থপর মানব সন্তান।
এ ত নহে শুধু ভবে আনন্দ উৎসব ধুলা খেলা।
এ শুধু জাতীয় পুণ্যমিলনের এক মহামেলা।”
কবি সাহাদাত হোসেন লিখেছেন- "তোমারে সালাম করি নিখিলের হে চিরকল্যাণ/ জান্নাতের পূর্ণ অবদান। "
রমজানের সাথে জড়িত নানা উপাদান ভারতীয় সাহিত্যে শিল্প হিসেবে গণ্য হয়েছে। সেহরির ডাক, ইফতারের মিলনমেলার আবেগঘন মুহূর্তগুলো সাহিত্যিকদের কলমে এক নান্দনিক চিত্রকল্প তৈরি করেছে।
আধুনিক সাহিত্যে রমজানকে দেখা হয় আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের এক ভারসাম্যের রূপ হিসেবে। দিল্লির মতো ঐতিহাসিক শহরগুলোতে রমজানের দৃশ্যকল্প আজ এক শৈল্পিক দর্শনে পরিণত হয়েছে।
রমজান ভারতীয় সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ একটি নির্দিষ্ট ধর্মের উপাসনা হিসেবে আবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি হয়ে উঠেছে মানবিক প্রেম ও ত্যাগের এক চিরন্তন প্রতীক। সৃজনশীল লেখকদের মাধ্যমে এটি একটি বিবর্তনশীল শিল্প হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে, যা মানুষকে অনুপ্রেরণা ও আত্মিক সংযোগের শিক্ষা দেয়। ভারতীয় সাহিত্যের বিশাল ক্যানভাসে রমজান এক উন্মুক্ত ও শাশ্বত নান্দনিক শিল্পেরই বহিঃপ্রকাশ।
0 Comments