জ্বলদর্চি

অরুণ দাসের "চূর্ণীকে লেখা চিঠি"― রাতপাখিদের চুপকথা/অন্তরা ঘোষ

অরুণ দাসের "চূর্ণীকে লেখা চিঠি"― রাতপাখিদের চুপকথা

অন্তরা ঘোষ

বাংলা কবিতার জগতে নবভাবনার অন্যতম পথপ্রদর্শক কবি অরুণ দাস।পরমচেতনার কবিতার পরম পথের স্রষ্টা তিনি।Z- জেন প্রজন্ম নতুনত্বে বিশ্বাসী।মননে,অনুধ্যানে,ভাবনায় বিস্তারে সেই নতুনত্বকে পাথেয় করে কবি অরুণের সৃষ্টি এক অনন্য অনুভব হয়ে উঠেছে।আলোচ্য "চূর্ণীকে লেখা চিঠি" কাব্যগ্রন্থটিতে তার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়।
কবির মতে,পঞ্চভূত সমস্ত সৃষ্টির মূল এবং সব সৃষ্টিই এই পঞ্চভূতে বিলীন হয়।তাঁর মতে,পরমচেতনার জ্ঞানকে উপলব্ধি করতে গেলে ইন্দ্রিয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য।আর মনকে আমাদের ষষ্ঠ  জ্ঞানেন্দ্রিয়ের স্থান দেওয়া হয়েছে।সেক্ষেত্রে প্রেমের অন্তহীন সাধক হিসেবে কবি অরুণ তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রেমের গভীর দর্শন।প্রেম ও প্রকৃতি যেন তাঁর কবিতার অন্যতম চরিত্র হয়ে উঠেছে।তাঁর শৈল্পিক জীবনের অন্যতম মানদণ্ড হয়ে উঠেছে এই প্রেমচেতনা।যে প্রেমচেতনার প্রকাশে তিনি তাঁর কবিতাকে বাংলা তথা বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন অভিমুখ দান করেছেন।তাই 'চূর্ণীকে লেখা চিঠি' কাব্যটি রূপকথা লেখা রাতপাখিদের চুপকথা হয়ে উঠেছে।🍂
   কবি কাব্যটিকে তিনটি সূচিতে বিভাজন করেছেন–
প্রথম,'না বলেছে হৃদয়লীনা'।
দ্বিতীয়,'হৃদয়ে লেখা ডায়েরি'।
তৃতীয়,'চূর্ণী,সে সব মুগ্ধদিন,মুগ্ধ রাত।'
'না বলেছো হৃদয়লীনা' শীর্ষক পর্যায়ে রয়েছে আটটি কবিতা।কবিতাগুলি শুরুর আগে দুটি পংক্তিতে শব্দ দিয়ে যেন ছবি এঁকেছেন কবি।কথামুখ হিসেবে যে ছবিতে প্রকৃতি ও নারী পরস্পরের কণ্ঠলগ্ন হয়ে এক ডোরে বাঁধা পড়েছে যেন।যেখানে প্রকৃতির পৃথক পৃথক সত্ত্বার প্রকাশ ঘটেছে রঙের বিলোল স্রোতে।সাথে এসেছে পৌরাণিক অনুষঙ্গ।আর সমস্ত কিছুকে ছাপিয়ে উপস্থিত হয়েছে 'শেষ বসন্তের নারী'।
প্রথম পর্যায়ের প্রথম কবিতার সূচকে কবি বলেছেন,
"তোমাকে নির্মাণ করি
অভিমানী জোৎস্নায়।"
এখানে কবির উপলব্ধি তাঁর অন্তরচারিণীকে অনুভব করে প্রকাশিত।যাঁর মায়াময় মনের কাছে কবি নির্দ্বিধায় সমর্পিতপ্রাণ হয়ে ওঠেন।প্রথম কবিতার রেশ ধরে আসে দ্বিতীয় কবিতা।যেখানে কবি তাঁর লীনাকে নির্মাণ করেন আদরচাঁদে।কবিতার শেষ লক্ষ্য ভালোবাসা।সেই ভালোবাসার নারীকে অন্য একটি কবিতায় কবি অবসরের ঝর্ণায় নির্মাণ করেন।যেখানে কবি হয়ে যান,'নষ্ট প্রজাপতি'।আর কবির দয়িতা হয়ে যান 'দিশেহারা পৃথিবীর খেয়ালী জোনাকি।'এভাবেই কবির নির্মাণ চলে, শান্ত শিশিরে, পরিযায়ী মেঘে,কুমারী পাতায়,শব্দহীন সন্ধ্যায় আবার কখনও বা সমুদ্রের শূন্যতায়।এভাবেই দয়িতাকে নির্মাণ করতে গিয়ে প্রকৃতির অনুষঙ্গে প্রেমের চিত্র এঁকেছেন কবি।শব্দ দিয়ে এঁকেছেন পেতে চাওয়ার অভীপ্সা,না পাওয়ার ধূসর বিষাদ।কবি তাঁর স্বপ্ন-স্বপ্নহীনতা,প্রেম-অপ্রেম,সান্নিধ্য-একাকীত্বকে প্রথম পর্যায়ের আটটি কবিতায়,কাব্যিক অনুষঙ্গে স্তরে স্তরে ফুটিয়ে তুলেছেন।
দ্বিতীয় পর্যায়ে কবি,'হৃদয়ে লেখা ডায়েরি'র প্রথম কবিতায় এক শব্দহীন সন্ধ্যার ছবি এঁকেছেন।অপার্থিব আকাশ ও চাঁদভেজা সবুজের মাঝে কবির আকাঙ্ক্ষা,
"চূর্ণী তোকে ছুঁয়ে একডুব  জংলী চুপকথা।
আজ বৃষ্টি নামুক খেয়ালী ঠোঁটে।"
এক দ্বিধাগ্রস্ত অনুভবে সিন্ধুডুব, ছমছমে জ্যোৎস্নায়, আগুন শরীরে শীতসাঁতারের কথা বলেন কবি।শরীরী জীবনের স্বাদ গন্ধময় বেঁচে থাকার কথা বলেন কবি।প্রকৃতির উদার আলিঙ্গনে নারীকে পাওয়া না পাওয়ার দ্যোতনায় এ পর্যায়ের কবিতা গুলি অনন্য হয়ে উঠেছে। কবি বলেন,―
"তোর লাজুক ঠোঁটের আলতো বাতাসে...
 লিখে রাখি,ফেরারী রোদের গন্ধ...
ঝুলন্ত চাঁদে ঝরা পাতার ছন্দ দুরন্ত প্রাণ
ক্লান্ত জ্যোৎস্নায় গভীর
গোপন স্নান।"
মায়াময় রাত,মায়াবী বর্ষা এখানে মনখারাপের চাদর মেলে দেয় যেন।এই পর্যায়ের কবিতায় জ্যোৎস্নার ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায়।ক্লান্ত জ্যোৎস্না,হাসিমুখ জ্যোৎস্না,ছমছমে জ্যোৎস্না,উদাস জ্যোৎস্না।কবির প্রকৃতি প্রীতি হিসেবে শুধু নয়,কবিমানসের বিশেষ বিশেষ ভাবনার বাহক হিসেবেও চাঁদ,জ্যোৎস্না,অন্ধকার এবং সূর্যকে ব্যবহার করা হয়েছে।এই পর্যায়ে মানসপ্রিয়াকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে, আছে না পাওয়ার শূন্যতাও।ভুল স্বপ্নের হাতছানিতে হারিয়ে যাওয়ার আফসোস যেমন রয়েছে,তেমনি রয়েছে প্রেমহীন পাথরে একে রাখা সবুজ আঘাত।আদরও।চিরন্তনতা নয়, আপেক্ষিকতায় কবি বিশ্বাস রেখেছেন।
কবি বলেন সেই সব রাত পাখিদের চুপকথা,
" চূর্ণী কোন কিছুই থেমে থাকে না কারো জন্য।
এই যে শূন্যতা,মায়া,ছেড়ে যাওয়া,যত্নকোল।
 কাঁচা মাটির অহংকারের মতো তাও একদিন
হারিয়ে যায়।অজানা দেশ, অজানা সমুদ্র।"

 'চূর্ণী, সেসব মুগ্ধদিন, মুগ্ধরাত'― তৃতীয় পর্যায়ের এই লেখা শুরু করেছেন কবি এভাবে―
"তৃতীয় চোখে জ্বলছে
আগুন
মনের মাঝে শুধুই
ফাগুন।"
এই পর্যায়ে দেহের সৌন্দর্যের আধারেই কবি প্রেমের প্রতিষ্ঠা করেছেন।এখানে চূর্ণী যেন 'অনঙ্গ বিহার ভূমি।,তুমি মূর্তি মর্ত্যকামনার।' অরুণের কবিতাগুলিতে প্রকৃতি হয়ে উঠেছে মানুষের আত্মার আত্মীয়।চূর্ণীর অনুষঙ্গে বুকের পাহাড়, নীল নাভির গন্ধ, গুপ্ত গিরিখাত,স্নেহময় স্তন,চুম্বন, মেঘেদের মৈথুন,আদিম গুহাচিত্র ইত্যাদির উল্লেখে এক ইন্দ্রিয়ঘন যৌনতার অনুভূতি নিয়ে এসেছেন কবি।যেখানে প্রকৃতি ও নারীর ভেদ রেখা মুছে গিয়েছে। কবি বলেন,
"বুক ছোঁয়া দুপুর।রোদ খুলে দিই তোর কপালে।ঘামের মধ্যে চিনে নিই
 টুকরো নারীদের তৃষ্ণা।আগুন ছুঁয়ে যাওয়া কুমারী রোদ। মাতাল পথ ভাসে
মুগ্ধ বাতাসে।
গুপ্ত গিরিখাত
সতর্ক সোহাগ মাখে
সোনালী ডানার বুকে।"
কবি আরও বলেন,
"সূর্য ফেরত আড্ডায় তোকে দেখি চূর্ণী।
রহস্যময় গুহার অন্ধকারে চেনা বুকের শৃঙ্গ।"
চূর্ণীকে ঘিরে আদিম আকাঙ্ক্ষাকে প্রয়োজনে প্রশ্রয় দিতে কবি দ্বিধাবোধ করেননি।চূর্ণীকে পাওয়া না পাওয়ার দ্বন্দ্বে লেখা চিঠির পরতে পরতে রয়েছে বেদনা।আর প্রেমের মধ্যে বেদনা আছে বলেই তাকে ভুলে থাকা অসম্ভব।কবি অরুণের কবিতায় রাত, অন্ধকার, চাঁদ,নীলাকাশ, তুষারপাত,মগ্ন শীত, সহজ সূর্যোদয় সবকিছুর অনুষঙ্গে এসেছে স্বপ্ন।এই স্বপ্নই রাত পাখিদের নিঝুম গানে নরম সুরে লিখে যায় প্রেমকথা।যা ক্রমে হয়ে ওঠে রাত পাখিদের চুপকথা।প্রেমের ভিন্নভিন্ন রেখাপথকে কবি তাঁর কবিতায় এক আশ্চর্য আলোকে উত্থাপন করেছেন।যেখানে প্রেম হল এক অপেক্ষা। আর,
  "অপেক্ষার নামই যেন উৎসব।"
 অন্বেষণ আশাহীন জেনেও কাকভোরে কবি শেষ নিঃশ্বাস লেখেন।

আলোচ্য কাব্যে কবি আঙ্গিক সজ্জাকে নতুনভাবে উপস্থাপিত করেছেন।
১)প্রতিটি কবিতার শুরুতে দুটো বা চারটে লাইন যেন কবিতাটির কথামুখ।
২)বিষয়বস্তুর অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও রূপের প্রকাশ ঘটেছে এই কবিতাগুলিতে।
৩)সমস্ত কবিতায় প্রকাশ ঘটেছে বস্তুদৃশ্যের বহুরূপতার।
৪)প্রতি কবিতার শেষ দুটো লাইন কবিতার অবয়বের একপাশে জায়গা নিয়ে যেন আলাদাভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

পরিশেষে বলা যায় যে, চেনা ছকের কবিতা থেকে অনেকটা সরে এসে এই জেড জেনের কবিতাগুলি অভিনব হয়ে উঠেছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের নিরিখে।কবি অরুণ চেনাজানা অভিজ্ঞতার রঙে তুলি ডুবিয়ে সংকেতে,ব্যঞ্জনায়,চিত্রকল্পে, উপমায় ছবি এঁকেছেন।তাঁর কাব্যশৈলী,চেতনা,দৃঢ়প্রত্যয় 'চূর্ণীকে লেখা চিঠি' কাব্যটিকে এক নতুন ভাবনার দিশারী করে তুলেছে।এখানেই কবির অনন্যতা।

Post a Comment

0 Comments