কমলিকা ভট্টাচার্য
আজ বুদ্ধদেব বসু-র মৃত্যুদিবস। “জ্বলদর্চি” পড়তে পড়তেই হঠাৎ তাঁর কথা মনে পড়ে গেল। সত্যি বলতে, তাঁর অনেক লেখা আমি পড়েছি—এ কথা বললে তা নিঃসন্দেহে অতিরঞ্জন হবে। পড়লেও আমার এই দুর্বল মস্তিষ্ক সব মনে রাখতে পারে না। আসলে, শুধু তাঁর নয়—যে কোনও লেখাই আমার মনে থাকে তখনই, যখন তা কোনও না কোনওভাবে আমার ভেতরে দাগ কেটে যায়।
তেমনই একটি কবিতা—“পাণ্ডুলিপি”—আমার মনে এক অদ্ভুত অনুরণন জাগিয়েছিল। যেন নিজের সত্তাতেই তাকে অনুভব করেছিলাম। হয়তো পৃথিবীর সব লেখকেরই কোথাও না কোথাও এই একই অনুভূতি কাজ করে, আর সেই কারণেই এই কবিতাটি এত সর্বজনীন হয়ে ওঠে।
পাণ্ডুলিপি
বুদ্ধদেব বসু
অজীর্ণ রোগে শীর্ণ,মগজে
পক্ষপাতী পাটিগণিত ঠাশা;
মাথার অল্প চুল তেলে চিকচিকে,
চোখ দুটো ধূর্ত, লোভে হলদে।
সে তার তেল -চিটচিটে, স্যাঁৎসেঁতে আঙুল দিয়ে
নেড়ে-চেড়ে দেখছে আমার পাণ্ডুলিপির পাতাগুলো,
যা এর আগে আমি ছাড়া কেউ ছোঁয়নি;
আর তার ধূর্ত চোখের ছোটো-ছোটো গর্ত
আমার দিকে মিটমিট ক’রে বলছে—
‘এ -বই আপনার চলবে তো?’
মনে পড়লো সারা রাত জেগে এই বই যখন শেষ করেছিলুম।
নিজেকে মনে হয়েছিল দেবতা,
যেন এই শাদা পাতাগুলো দিয়ে ছোটো একটি সূর্য আমি তৈরি করেছি,
একটি সূর্য, আমারই প্রাণে জ্বলন্ত।
আর সেই কাক-ভোরে
বিছানায় শুয়ে অনেকক্ষণ
ঘুমোতে পারিনি আনন্দে।
যে গাইতে পারে, তার গলা বেয়ে যেমন উঠে গান,
তেমনি আনন্দ উঠেছিলো আমার বুক ঠেলে।
ক্লান্ত শরীর, চোখে ঘুমের তৃষ্ণা,তবু আনন্দে
ঘুমোতে পারিনি।
আর তারপর এই ধূর্ত চোখের ছোটো-ছোটো মিটমিটে গর্ত
আর লোভে চিটচিটে দুটো থাবা
আমার পাণ্ডুলিপিটা চটকাচ্ছে।
ভেবেছিলুম একটা মির্যাকল ঘটবে,ঘটলো না।
ফেটে পড়লো না আমার ছোটো সূর্য, দারুণ বিস্ফোরণে।
সে তার নোংরা স্যাঁৎসেঁতে আঙুলগুলো রাখলো আমার লেখার গায়ে—
তবু বেঁচে রইলো।
অবাক হ'য়ে গেলুম।
আজ সেই কবিতাটিকে নিয়ে দু-একটি কথা লিখতে মন চাইল। তাই লিখে ফেললাম।
কিছু লেখা শেষ করার পর আমার ভিতরে এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসে। যেন বহুদিন ধরে বুকের ভেতর জমে থাকা কথাগুলো একদিন হঠাৎ কাগজে নেমে এসে আমাকে ফাঁকা করে দিয়ে চলে গেল। এই ফাঁকা হয়ে যাওয়ার মধ্যে যেমন একরকম শান্তি আছে, তেমনি আছে এক গভীর একাকীত্বও।
🍂
বুদ্ধদেব বসু-র “পাণ্ডুলিপি” কবিতাটি পড়লে আমি বারবার এই অনুভূতির কাছেই ফিরে যাই। মনে হয়—এই তো, এটাই তো একজন লেখকের সত্যি।
কবিতার সেই ছোট্ট দৃশ্য—এখন কেউ তার পাণ্ডুলিপির পাতা উল্টে দেখছে—বাইরে থেকে খুবই সাধারণ। অথচ সেই মুহূর্তেই লেখকের ভিতরে যে আবেগের ঢেউ ওঠে, সেটাই এই কবিতার আসল শক্তি। কারণ, সেই পাণ্ডুলিপি তার কাছে কেবল কিছু লেখা নয়; সেটি তার নির্ঘুম রাত, তার একান্ত শ্রম, তার গোপন আনন্দের ফসল।
আমি নিজেও যখন ভাবি—কেউ আমার লেখা এভাবে ছুঁয়ে দেখছে, পড়ছে—তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি জেগে ওঠে। মনে হয়, সে কি সেই একই কোমলতা, একই মমতা ও সম্মানে তাকে স্পর্শ করছে?
একটি লেখা তৈরি হওয়ার আগে কত অদৃশ্য পথ পেরোতে হয়! কত রাতের অনিদ্রা, কতবার নিজের সঙ্গে লড়াই, কত অজস্র না-বলা কথা জমে ওঠা—এসব কিছুই তো বাইরে থেকে বোঝা যায় না। এই অদৃশ্য শ্রম আর অনুভূতির স্তরগুলো মিলিয়েই জন্ম নেয় একটি সৃষ্টি। তাই সেই সৃষ্টি আমার কাছে কখনও নিছক ‘লেখা’ হয়ে থাকে না—ওটা হয়ে ওঠে আমার খুব নিজের, খুব আপন কিছু।
সৃষ্টির পরের আনন্দটাও বড় ব্যক্তিগত। এটি কোনও বাহ্যিক স্বীকৃতির উপর নির্ভর করে না। বরং এই আনন্দের উৎস হলো—নিজের ভিতরে কিছু তৈরি করে ফেলার বিস্ময়। অনেক সময় মনে হয়, আমি নিজেই আমার লেখার সামনে দাঁড়িয়ে নতুন করে তাকাচ্ছি—একটু অবাক হয়ে, একটু গর্ব নিয়ে।
কিন্তু এই আনন্দের সঙ্গেই জড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত ভয়, আর এক নীরব অভিমান। কারণ, যে সৃষ্টিকে আমি নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছি, সেটাই যখন অন্যের হাতে যায়, তখন সে আর শুধু ‘আমার’ থাকে না। তখন তাকে বিচার করা হয়, মাপা হয়, কখনও কখনও অবহেলাও করা হয়।
এই জায়গাতেই “পাণ্ডুলিপি” আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দেয়। কারণ, এখানে একজন সৃষ্টিকর্তার অসহায়তা ধরা পড়ে। তার অনুভূতির মূল্য যখন স্বার্থের দাঁড়িপাল্লায় মাপা হয়, তখন বুকের ভিতরে যে অভিমান জমে ওঠে, তার কোনও উচ্চারণ থাকে না—সে নিঃশব্দে থেকে যায়, নিজের ভেতরেই।
আমি নিজেও বারবার অনুভব করি—একটা লেখা শেষ হওয়ার পরও আমি তাকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারি না। ওর প্রতিটা শব্দ, প্রতিটা বিরামচিহ্ন আমার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। যেন আমি আমারই এক অংশকে পৃথিবীর হাতে তুলে দিচ্ছি।
তবু লিখি। কারণ লেখা মানেই তো শুধু প্রকাশ নয়—লেখা মানে নিজের ভেতরের সবচেয়ে সত্য, সবচেয়ে কোমল অংশটুকুকে চিনে নেওয়া। হয়তো কেউ বুঝবে, হয়তো কেউ বুঝবে না—তবু এই লেখার মধ্যেই আমি নিজেকে খুঁজে পাই।
আজ বুদ্ধদেব বসু-র মৃত্যুদিবসে, তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা—শব্দের ভিতর দিয়ে মানুষের এই অন্তর্গত, জটিল, অথচ এত সত্য অনুভূতিগুলোকে এত স্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য।
মনে হয়, একজন লেখক কখনও সত্যিই হারিয়ে যান না। শরীরের মৃত্যু হয়তো ঘটে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিগুলো বেঁচে থাকে—অন্যের অনুভূতিতে, অন্যের লেখায়, অন্যের অনুপ্রেরণায়। হয়তো সেইভাবেই তিনি থেকে যান—নিজের কবিতার শেষ লাইনের মতো, নীরবে, অথচ গভীরভাবে।
4 Comments
অপূর্ব। সাহিত্য আলোচনার সুচারু ধারাটি লেখক সুন্দর ধরেছেন। 🙏❤️
ReplyDeleteধন্যবাদ 🙏♥️
Deleteকমলিকার লেখাটি উঁচুমাপের। আমাদের নিবিষ্ট করে
ReplyDeleteধন্যবাদ।প্রণাম নেবেন।🙏
Delete