এলফ্ ইন গ্রীন সালোয়ার নিয়ে আলোচনা করলেন
তপনজ্যোতি মাজি
শুরুতেই বলে নিতে হয়, কাব্যগ্রন্থটির শিরোনামে ব্যবহৃত এলফ্ শব্দটি রূপব্যাঞ্জনাময়।
এই উল্লেখ বাহুল্য মনে হতে পারে যে শব্দটির আভিধানিক অর্থ পরী। রূপকথার আধুনিকতম পর্যবেক্ষণ হলো কল্পিত এডভেঞ্চার ও সৌন্দর্যের মিশেলে মনোমুগ্ধকর গল্প। রূপকথার পথ অতিক্রম করেই বালকবয়স প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠে। 'এলফ্ ইন গ্রীন সালোয়ার' কবি সুমন রায়ের সেই নিহিত সৌর্ন্দয্যবোধের তন্ময় প্রকাশ। শিরোনামটি যতখানি কল্পরূপময়,ততখানিই কাব্যিক।
কৃশ এই কাব্যগ্রন্থটিতে একুশটি কবিতা মুদ্রিত হয়েছে। কবি ঋত্বিক ত্রিপাঠী অলংকৃত প্রচ্ছদটি শিল্পগুণ-সমন্বিত এবং নান্দনিক। শ্রীলিপি প্রকাশনের অক্ষর বিন্যাস সুন্দর এবং দৃষ্টিনন্দন।
এই পর্যবেক্ষণ অনস্বীকার্য যে কলোনিয়াল হ্যাং ওভার কাটিয়ে সব ভাষাই এখন সমান্তরাল সারিতে বসে কফি খাচ্ছে মসগুল ভঙ্গিতে। ভাষা অধিকার ( পড়ুন Right to write or speak in any language) সর্বজনস্বীকৃত স্বাধিকার।
🍂
এই সংক্ষিপ্ত উপক্রমণিকাটুকুর প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন নির্ভর। এবার প্রবেশ করা যাক কবিতাগুলির অন্তর্লোকে।
সমসাময়িকতাই আধুনিক। আধুনিকতার কোনও নির্দিষ্ট কালরেখা নেই। তবুও সাহিত্যে পোস্ট মডার্ন তত্ত্বটি বিদিত এবং গৃহীত।
কবিতা কবিতাই। কবির পর্যবেক্ষণ ও সৃজন একান্তই কবির। পাঠকের পরিসর হলো সেই কবিতার সঙ্গে একাত্ম বোধ করা কিংবা তাঁর মধ্যে যে সুপ্ত চেতনা ও সৌন্দর্যবোধ থাকে তাকে কিছুক্ষণ কিংবা দীর্ঘ সময়কালের জন্যে জাগিয়ে তোলা। একজন আলোচকের বৃত্তটি এই দুই অনুভূতির মাঝখানে সেতু রচনা করে এবং সাহিত্য
শিল্পের বিস্তৃত অঙ্গনে কবিতাগুলির অনুষঙ্গ ও অভিনেবেশ কতখানি ঋদ্ধ তার ইঙ্গিত দেওয়া। এই প্ল্যাটফর্মের উপর দাঁড়িয়ে একটি কথা প্রথমেই ব্যক্ত করে নেওয়া দরকার,কবিতাগুলি সুখপাঠ্য এবং দোলকের মতো আন্দোলিত করে কবিতাবোধ কিংবা রূপতৃষ্ণাকে। এখানেই সৃষ্টির সার্থকতা।
কবিতার অন্তরঙ্গে আমাদের অন্তরের বিন্যাসগুলি স্থান করে নিয়েছে সহজিয়া সমীকরণে। এই সারল্য শিল্পের উজ্জ্বল অভিমুখ।
কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা 'Break Journey' time place এবং action এর বিন্যাসে একটি অনবদ্য রচনা। শব্দের চলনের সঙ্গে মনের চলন এবং জীবন, প্রেম ও সংকট কবিতাটিকে বিশিষ্টতা দিয়েছে। কাব্য গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য দিক হলো শব্দের সংগত এবং নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার। দ্বান্দ্বিক আধুনিক মন। অস্ত্বিতও দ্বান্দ্বিক। এই
দ্বান্দ্বিকতা কি সংঘাত? প্রাত্যাহিক দ্বান্দ্বিকতাই বহু কবিতার বিষয়বস্তুতে স্থান করে নিয়েছে। আবার এই দ্বান্দ্বিকতা কিন্তু কবিতার মৌলিক নির্মিতিতে কোনও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি। এখানেই কবিতা জয়ী হয়েছে। সফল হয়েছেন কবিও।
বহুত্ববাদ এবং নিরপেক্ষ ধর্ম-চিন্তন এই সময়ের রাষ্ট্রীয় পরিসরে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। ভালো
লাগে কবিমনের প্রেমজ উচ্চারণের মধ্যেও উঠে এসেছে বহুত্ববাদের অমল আলো যা রবীন্দ্র মননের অনুসারী। Our Brearh Their Breath কবিতাটি এই দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করে।
প্রকৃতি এবং স্থানিক উল্লেখ কবিতার বৈশিষ্ট্য। এ-নিয়ে মতের বিভিন্নতা থাকলেও,আধুনিক এবং অধুনিক-পূর্ব কবিতার শরীরে স্থান করে নিয়েছে নদী,অরণ্য, সরোবর উপমা এবং চিত্রকল্পের অনিবার্য নিরিখে।
এই কাব্যগ্রন্থেও উল্লেখিত হয়েছে লোকচিত্র, লোক উৎসব এবং কুবাই ও তমাল নদীর নাম। এই উল্লেখ ভিন্ন আবেশ সৃষ্টি করে। করেছেও।
এভাবেই এগিয়েছে কবিতাগুলি। চিত্রিত করেছে জীবন, সম্পর্ক ও যাপনের বহুমাত্রিক বিন্যাস। পড়তে হয়। পড়তে হয়েছে। মুগ্ধ হয়েছি। মুগ্ধ করেছেন কবি। বেড়েছে প্রত্যাশা। কবিতার দিগন্ত আরও প্রসারিত
0 Comments