জ্বলদর্চি

‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, অর দ্যা মডার্ন প্রমিথিউস’: সৃষ্টির নিঃসঙ্গতায় স্রষ্টার জীবনালেখ্য/সুমনা পাল

ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন, অর দ্যা মডার্ন প্রমিথিউস’: সৃষ্টির নিঃসঙ্গতায় স্রষ্টার জীবনালেখ্য

সুমনা পাল 


সেদিন দুজনে

সময়টা ঊনবিংশ শতকের একেবারে প্রথমের দিক। লন্ডন শহরের এক সুন্দরী তরুণীকে প্রায়শই বাড়ির লাইব্রেরিতে সময় কাটাতে দেখা যায়। আর মাঝেমধ্যে দেখা যায় মৃত মায়ের সমাধিস্থলের পাশে চুপচাপ বই হাতে বসে থাকতে। তিনি নিঃসঙ্গ, একাকী, স্নিগ্ধ শিশিরের মতো। তরুণীর বিখ্যাত বাবার কাছে দেশ-বিদেশের নানান বিখ্যাত মানুষের আনাগোনা লেগে থাকে। কত কথা, কত গল্প, কত তাত্ত্বিক আলোচনা; সেই সব আলোচনায় উঠে আসে নানান জীবন দর্শন। একদিন বাবার সূত্রে তাঁর দেখা হল ২২ বছরের দীর্ঘদেহী, সুদর্শন, এলোমেলো চুলের এক তরুণ প্রতিভাবান কবির সাথে। ক্রমে ক্রমে বাড়ল আলাপচারিতা। পরিচয় গভীর থেকে গভীরতর হল; হল প্রেম। কিন্তু ঘটনাচক্রে সেই কবি ছিলেন বিবাহিত। সেই সঙ্গে সন্তানের পিতাও বটে। তাঁদের সম্পর্কের কথা জেনে তরুণীর দার্শনিক বাবা ভীষণ বিরক্ত হলেন। বারবার সাবধান করলেন দুজনকে। কিন্তু প্রেমে পড়া অবাধ্য হৃদয় কবে কার কথা শুনেছে? একদিন সকলের অগোচরে বাড়ি ছাড়লেন তাঁরা। দিনটি ছিল ২৮শে জুলাই, ১৮১৪। লক্ষ্য ফ্রান্স। শুরু হল জীবনের এক নতুন অধ্যায়। বলা বাহুল্য এই তরুণী হলেন বিখ্যাত নারীবাদী লেখিকা মেরি উইলস্টোনক্রাফ্‌ট (২৭শে এপ্রিল, ১৭৫৯- ১০ই সেপ্টেম্বর, ১৭৯৭) এবং দার্শনিক উইলিয়াম গডউইনের (৩রা মার্চ ১৭৫৬-৭ই এপ্রিল ১৮৩৬) কন্যা মেরি গডউইন (৩০শে আগস্ট ১৭৯৭-১লা ফেব্রুয়ারি, ১৮৫১); আর তাঁর প্রেমিক মানুষটি হলেন বিখ্যাত ইংরেজ কবি পার্সি বিশি শেলি (৪ঠা আগস্ট ১৭৯২-৮ই জুলাই ১৮২২)।


পথে যেতে যেতে

তখন সমগ্র ইউরোপ জুড়ে চলছে তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতা। ফ্রান্স সেসময় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত। ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরগুলিতে কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে আছে পোড়া ঘরবাড়িগুলো; পচাগলা মৃত গবাদি পশুর স্তূপে ভনভন করছে মাছি; ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে রক্তাক্ত মানুষের বেওয়ারিশ লাশ। ক্ষুধার্ত শিশুদের কান্না, ধর্ষিতা নারীদের আর্তনাদ আর সর্বহারা মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ফ্রান্সের বাতাস ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। তবু যুদ্ধবাজদের রক্ত পিপাসা মেটেনি। সভ্য মানুষের তৈরি করা মহাশ্মশানের উপর দিয়ে যেতে যেতে ব্যথিত মেরি যাত্রাপথে লিখে রাখছেন জীবনের অভিজ্ঞতার কথা। বাহিরের পৃথিবী সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ষোড়শী মেরি বাস্তব জীবনের ভয়াবহতায় হতবাক। এদিকে হাতের টাকা ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। মেরি বুঝতে পারছিলেন যে মানুষটার হাত ধরে তিনি বাড়ি ছেড়েছেন, সে মানুষটা বড্ড বেশি লাগামছাড়া আর বেহিসেবি। সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার, তখন তিনি অনুভব করতে পারছিলেন তাঁর শরীরে নড়াচড়া করছে একটি ছোট্ট ভ্রূণ এবং সে প্রবলভাবে বেড়ে উঠতে চাইছে। বাধ্য হয়ে আবার ইংল্যান্ডে ফিরে আসতে হচ্ছে তাঁদের। এখানে একটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়, বাড়ি ছেড়ে পালানোর সময় শেলি এবং মেরির সাথে এক তৃতীয় ব্যক্তিও যোগ দিয়েছিলেন; তিনি মেরির সৎবোন ক্লেয়ারমন্ট (২৭শে এপ্রিল, ১৭৯৮- ১৯শে মার্চ, ১৮৭৯)। এই কয়েকটা মাস ক্লেয়ারমন্ট তাঁদের ছায়াসঙ্গী হিসেবেই ছিলেন। ফিরে এসে তাঁরা বুঝতে পারলেন তাঁদের সম্পর্কে কী ভয়ঙ্কর কুৎসা তৈরি হয়েছে সমস্ত শহর জুড়ে।   
🍂

একটি স্বপ্নের মৃত্যু

ফিরে আসার পরে এই প্রেমিক যুগল একসাথে থাকার জন্য বাড়ি ভাড়া নিচ্ছেন। সঙ্গে থাকছেন সেই সৎবোন ক্লেয়ারমন্টও। এদিকে ঋণে জর্জরিত শেলিকে পাওনাদারেরা হন্যে হয়ে খুঁজছে, আর শেলি পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। বাধ্য হয়ে মেরি চিঠি লিখতে বসলেন বাবা গডউইনকে। কিন্তু মুখ ফিরিয়ে নিলেন গডউইন। এই দুই মেয়ের কীর্তিকলাপে শহরে তাঁর মুখ দেখানোই দায় হয়ে উঠেছে। এক পয়সাও দিলেন না তিনি। উচ্চবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা মেরি অপুষ্টিতে ভুগতে ভুগতে ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে জন্ম দিলেন একটি প্রিম্যাচিওর কন্যা সন্তানের। কিন্তু জন্মের দুসপ্তাহের মধ্যে মৃত্যু হল নবজাতিকার। মেরি নিজে জন্মের মাত্র ১১ দিনের মাথায় প্রসব সংক্রান্ত জটিলতায় মাকে হারিয়েছিলেন। এখন হারালেন জীবনের প্রথম সন্তানকে। হোক সে বিবাহ বহির্ভূত, হোক সে সমাজের চোখে অবৈধ।
সদ্যোজাত সন্তানকে হারিয়ে বিষনণ্ণতার চূড়ান্ত গভীরে তলিয়ে যাচ্ছেন সেই স্নিগ্ধ, শিশিরের মতো নারীটি; ধীরে ধীরে ধূসর-বিবর্ণ হয়ে উঠছে তাঁর মন। সেই অবস্থাতেই আবার গর্ভবতী হচ্ছেন, দ্বিতীয় সন্তানকে জন্ম দিচ্ছেন ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে জানুয়ারিতে। এই সন্তানকে আঁকড়ে ধরে প্রথম সন্তানের শোক ভুলতে চাইলেন মেরি। কিন্তু প্রথম সন্তান হারানোর ঘা শুকোলেও হৃদয়ে দাগ থাকল আজীবন। 


একটি দুর্যোগের রাত ও দানবের জন্ম

পুত্র সন্তান উইলিয়ামের জন্মের পর এই অবিবাহিত প্রেমিক যুগলের জীবনে সাময়িক ভাবে স্বস্তি এল। সেই বছর মেরির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য শেলি তাঁকে নিয়ে গেলেন সুইজারল্যান্ডের লেক জেনেভায়। সেখানে সঙ্গী হিসেবে পেলেন কবি লর্ড বায়রন এবং তাঁর চিকিৎসক বন্ধু জন পলিডরিকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তখন জেনেভায় চলছে তুমুল প্রাকৃতিক বিপর্যয়। বাইরে বিচ্ছিরি পরিবেশের কারণে প্রায় গৃহবন্দী হয়ে কাটাতে হচ্ছে তাঁদের, তিতিবিরক্ত হয়ে উঠছেন সবাই। বিরক্তি কাটাতে গল্পগুজবই একমাত্র ভরসা। একদিন রাতে নিজেদের মধ্যে ভূত নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা-গবেষণা। মোমবাতির মৃদু-শীর্ণ শিখা ঘরটিকে আলো আঁধারে ভরিয়ে রেখেছে। ক্রমশ রাত বাড়ছে। হঠাৎ প্রস্তাব দিলেন বায়রন-----সকলে একটা করে ভূতের গল্প লিখলে কেমন হয়‌‌? সানন্দে এই প্রস্তাব মেনে নিলেন সবাই।‌ সেদিন রাতের ঘটনায় চারজন প্রতিভাবান মানুষের কলমে জন্ম হল চারখানা ভৌতিক গল্পের। কবি লর্ড বায়রন লিখলেন ‘এ ফ্যাগমেন্ট’, বায়রনের চিকিৎসক-বন্ধু জন পলিডরি লিখলেন ‘দা ভ্যাম্পায়ার’, শেলি লিখলেন ‘ফ্র্যাগমেন্ট অফ দি ঘোস্ট’। কিন্তু মেরি সেসবের ধারেপাশে গেলেন না। তিনি লিখলেন এক বীভৎস-কদাকার-নিঃসঙ্গ দানবের গল্প যাকে পরীক্ষাগারে মানুষই সৃষ্টি করেছে। গল্পের নাম ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’। গল্প পড়ে সকলে তখন অবাক। তিনজনই একবাক্যে স্বীকার করলেন মেরির কলমে জাদু আছে। সেই সঙ্গে ছোট্ট গল্পটিকে ভবিষ্যতে উপন্যাসে রূপদান করার অনুরোধ করলেন তাঁরা। আশ্চর্য ব্যাপার এই যে, একটি ঝড় জলের রাতে মজার ছলে লিখে ফেলা গল্প থেকে সৃষ্টি হওয়া উপন্যাস একদিন সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম আধুনিক ‘Science Fiction’ বা ‘কল্পবিজ্ঞান  কাহিনি’ অভিধায় ভূষিত হবে। 



দুটি অমীমাংসিত আত্মহত্যা

লেক জেনেভায় বেশ কয়েকদিন কাটিয়ে তাঁরা আবার ফিরে আসছেন নিজেদের চেনা শহরে। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ই সেপ্টেম্বর, লন্ডনের মাটিতে পা রাখলেন তাঁরা। নতুন শিশুপুত্রটিকে অবলম্বন করে  নতুন ভাবে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন দুজনে। হঠাৎ খবর এল আত্মহত্যা করেছেন মেরির সৎবোন ফ্যানি ইমলে (১৪ই মে, ১৭৯৪-৯ই, অক্টোবর, ১৮১৬)। অতিরিক্ত ‘লডেনাম’ সেবনই তাঁর মৃত্যুর কারণ বলে জানা গেল। ফ্যানির মৃত্যু নিয়ে সে সময়ে কম কাটাছেঁড়া হয়নি। সৎমায়ের সাথে মতানৈক্য, অশান্তিকর গৃহপরিবেশ আর মেরির বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়াই ছিল ফ্যানির বিষণ্ণতার মূল কারণ। আবার কিছু মানুষের মতে তিনি নাকি মনে মনে শেলির প্রতি অনুরক্ত ছিলেন; কিন্তু শেলির শীতল ব্যবহার তাঁকে ব্যথিত করে তোলে। যাইহোক এই মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলেন মেরি।
ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আর একটি মৃত্যু সমগ্র লন্ডন শহরকে কাঁপিয়ে দেয়। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ই ডিসেম্বর। সার্পেন্টাইন নদীর জলে ভেসে ওঠে এক যুবতী নারীর লাশ। তিনি আর কেউ নন, কবি শেলির প্রথম পক্ষের স্ত্রী হ্যারিয়েট ওয়েস্টব্রুক। সে সময় হ্যারিয়েট আবার গর্ভবতী ছিলেন। অথচ বিগত দুবছরের বেশি সময় ধরে স্বামী শেলির সাথে কোনো রকম সম্পর্কই ছিল না তাঁর। ভদ্রমহিলার মৃত্যুতে শহর জুড়ে তুমুল হইচই হলেও, ঘটনার মাত্র কুড়ি দিনের মাথায় প্রেমিকা মেরিকে বিয়ে করে ফেললেন শেলি! দিনটা ছিল ৩০শে ডিসেম্বর, ২০১৬। এই বিয়ে মেরিকে সামাজিকভাবে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু কোথাও যেন অবচেতনে অপরাধবোধে ভুগছিলেন তিনি।


গল্প থেকে উপন্যাসে

বিয়ের পর মেরি মন দিলেন লেখালেখিতে। শেলির সাথে ইউরোপ ভ্রমণের স্মৃতির উপর ভিত্তি করে রচনা করলেন ভ্রমণ কাহিনি ‘History of a Six Weeks’ আর সেই ঝড়ের রাতের ছোট্ট গল্পটিকে রূপ দিলেন উপন্যাসে। নাম দিলেন ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন, অর দ্যা মডার্ন প্রমিথিউস’।  উপন্যাস লেখা শেষ হল, এবার সময় হল প্রকাশের। কিন্তু আত্মপ্রচারবিমুখ, তীব্র অন্তর্মুখী, নির্জনে থাকতে চাওয়া এই নারী কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না তা নিজের নামে ছাপতে। শেষমেষ বেনামেই ছাপা হল। উপন্যাসের ভূমিকা লিখলেন স্বয়ং তাঁর স্বামী কবি পি.বি.শেলি। প্রকাশিত হল ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ১লা জানুয়ারি। উপন্যাস পড়ে প্রায় সকলেই ভেবেছিলেন এ নির্ঘাত শেলির লেখা। কিন্তু অল্প কিছু দিনের মধ্যে মানুষের ভুল ভাঙে। কারণ মেরি পরের সংস্করণে নিজের নামে বই প্রকাশের অনুমতি দেন। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগের সাহিত্য রসিকরা এক ভিন্ন স্বাদের সাহিত্য রস আস্বাদন করলেন, যার নাম ‘Science Fiction’ বা ‘বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি’ বা ‘কল্পবিজ্ঞান কাহিনি’। এই উপন্যাসের মাধ্যমে এক অষ্টাদশীর কলমে স্থাপিত হল আধুনিক কল্পবিজ্ঞান কাহিনির ভিত্তিপ্রস্তর। আর মেরি শেলি বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে আধুনিক কল্পবিজ্ঞান কাহিনির জনক রূপে হিসাবে ভূষিত হলেন।


নিঃসঙ্গ স্রষ্টার নিঃসঙ্গ সৃষ্টি

‘ফ্র‌্যাঙ্কেনস্টাইন: অর দ্যা মডার্ন প্রমিথিউস’ উপন্যাসের মূল চরিত্র একজন তরুণ প্রতিভাবান সুইস বিজ্ঞানী, নাম তাঁর ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন। মধ্য-ইউরোপের তুষার-শৈলে ঘেরা এক নির্জন শহর; তারই দূরতম প্রান্তে লম্বা-লম্বা পাইন আর চেরির ঘন জঙ্গলে ঘেরা উঁচু পাহাড়ের উপরে  ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ল্যাবরেটরি। তিনি মানব শরীর নিয়ে গবেষণারত। “কী করে মৃতে জীবন সঞ্চার করা যায়, কী করে নতুন মানুষ সৃষ্টি করা যায় যে মানুষ জ্ঞানে, বুদ্ধিতে কর্মশক্তিতে সাধারণ মানুষের চেয়েও বড় হবে। যাকে দিয়ে নতুন এক সুন্দর পৃথিবী সৃষ্টি করা যাবে...” এই চিন্তায়  ফ্র‌্যাঙ্কেনস্টাইন দিনরাত মগ্ন। অসাধ্য সাধনের তপস্যায় তিনি পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে গবেষণাগারে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভুলেছেন সমাজ-সংসার-পরিবার-পরিজনকে। শহরের সমাধিস্থল থেকে একটার পর একটা মৃতদেহ চুরি করে পরীক্ষা চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে। এ কাজে তাঁর সঙ্গী ডক্টর নীল। একদিন সত্যি সত্যি মৃতদেহে কৃত্রিম উপায়ে প্রাণ দান করে তিনি জন্ম দিলেন এক অতিকায় অতিমানবের। এতদিনের স্বপ্ন বোধ হয় সত্যি হল। আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু হায়! এ কী হল! তিনি চেয়েছিলেন একটি তীব্র ক্ষমতাশালী, উচ্চ মেধার অতি মানব____কিন্তু হল এক বীভৎস দানব। স্রষ্টা নিজেই সহ্য করতে পারলেন না তাঁর সৃষ্টিকে। ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলেন। সেই অবুঝ দানব যতই তার জন্মদাতার কাছে আসতে চাইল ততই তাঁর ঘৃণা বাড়তে লাগল। তাকে আঘাত করলেন, অত্যাচার করলেন, চাবুকে চাবুকে রক্তাক্ত করলেন, অনাহারে রাখলেন। এমনকি পিপাসার জল পর্যন্ত দিলেন না। কোথাও আশ্রয় না পেয়ে শেষ পর্যন্ত সেই অসহায় দানব হয়ে উঠলো খুনি, তীব্র আগ্রাসী, ভয়াল-ভয়ংকর। একটার পর একটা মানুষ হত্যা করে সে তার নিঃসঙ্গ জীবনের শোক ভুলতে চাইল। একদিন স্রষ্টার চোখে চোখ রেখে আঙুল তুলে উত্তর চাইল- 
‘আমি একলা, একেবারে নিঃসঙ্গ। আমার প্রাণ দিয়েছ, কিন্তু রূপ দিলে না কেন? কেন আমায় এত কুৎসিত করে গড়ে তুললে?, আর তোমার সৃষ্টিকে কেন তুমি ভালবাসতে পারলে না? প্রাণ দিলে, রূপ দিলে না। প্রাণ দিলে, সঙ্গী দিলে না।’
কী বুকফাটা আকুল তীব্র আর্তি!‌ এ আর্তি নিঃসঙ্গ জীবনের আর্তি; ভালোবাসা না পাওয়ার আর্তি; কুৎসিত শরীরের আড়ালে থাকা এক আদুরে-দিশেহারা মনের আর্তি; জীবনকে ভালোবাসার আর্তি। কাহিনি পড়তে পড়তে অজান্তেই ভিজে যায় আমাদের চোখের পাতা। উপন্যাসের শেষে দেখি মর্মান্তিক মৃত্যুতে শেষ হচ্ছে স্রষ্টা (বিজ্ঞানী ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন) ও সৃষ্টির (ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সৃষ্ট কুৎসিত দানব) জীবনের নিঃসঙ্গতা।


নিঃসঙ্গ দানবে স্রষ্টার জীবনগাথা

উইচ বা ঘোস্ট নয়, ড্রাকুলা বা ভ্যাম্পায়ারও নয়, শেলি ঘরনি মেরি বিজ্ঞান আর কল্পনার রূপকথা মিশিয়ে তৈরি করলেন এক হৃদয় নিংড়োনো আখ্যান। জন্মের মাত্র ১১ দিনের মাথায় আঁতুড় ঘরে মাতৃহারা, সৎ মায়ের উপেক্ষায় আগাছার মতো বেড়ে ওঠা, প্রেমে ঘরছাড়া, সন্তানহারা, সমাজের চোখে এক ভ্রষ্টা নারী; সুগভীর অথচ নিঃসঙ্গ-বিবর্ণ হৃদয়ের এক নারী নির্মাণ করলেন এক নিঃসঙ্গ ধূসর চরিত্রের দানবকে। যে কি না তাঁরই মতো ভালোবাসার কাঙাল, আশ্রয়ের কাঙাল। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দানবের মৃত্যু হয়েছে আজ থেকে ২০০ বছরের বেশি সময় আগে। কিন্তু আজও পাঠকের কানে অনুরণিত হয়_____ আমি তো ভালোবাসায় বাঁচতে চেয়েছিলাম, স্নিগ্ধ শিশিরের মতো।

Post a Comment

0 Comments