জ্বলদর্চি

পুরুষতন্ত্র: ক্ষমতার রাজনীতি ও আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস/পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী

পুরুষতন্ত্র: ক্ষমতার রাজনীতি ও আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাস

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী


পুরুষতন্ত্র কোনো প্রাকৃতিক বা জীববৈজ্ঞানিক (Biological) বিষয় নয়, বরং এটি একটি সমাজ-নির্মিত ব্যবস্থা বা ধারণা যা শুধু নারীকে অবদমিত করে না, বরং পুরুষকেও এক ধরণের কৃত্রিম বীরত্বের খাঁচায় বন্দি করে ফেলে। এটি দীর্ঘকাল ধরে পরিবার, ধর্ম এবং রাষ্ট্রের মাধ্যমে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় টিকে থাকে।
সহজ কথায়, পুরুষতন্ত্র হলো এমন একটি সামাজিক কাঠামো বা ব্যবস্থা যেখানে ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত এবং শ্রেষ্ঠত্ব থেকে যায় পুরুষের হাতে, আর নারীকে সবসময়েই দেখা হয় দুর্বল এক সত্ত্বা হিসেবে। 

আমাদের মনে হতে পারে যে কেবল পুরুষরাই এটি টিকিয়ে রেখেছে, কিন্তু বাস্তবে আমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সমাজের সবাই কমবেশি এই ব্যবস্থার বাহক। পুরুষতন্ত্র  নারী ও পুরুষের জন্য যেমন আলাদা কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করে দেয় তেমনি পুরুষ ও নারীর মধ্যে একটি  সামাজিক  বৈষম্যও টিকিয়ে রাখে। 

পুরুষতন্ত্রের শিক্ষা আমরা আমাদের পরিবার ও প্রিয়জনের কাছ থেকেই প্রথম পাই । একটি শিশু যখন বড় হয়, সে তার মা-বাবা বা বড়দের আচরণ দেখে শেখে। মা-বাবারাই  ছেলেদের হাতে খেলনা বন্দুক আর মেয়েদের হাতে রান্নাবাটির সরঞ্জাম তুলে দেয়। অনেক সময় পরিবারের নারী সদস্যরাও যেমন মা, ঠাকুমা, দিদা এই পুরুষতন্ত্রের ধারক হয়ে ওঠেন। তারা যখন ছেলেকে বলেন ‘কাঁদতে নেই, তুমি ছেলেমানুষ তোমার কান্না করা চলে না’ আবার মেয়েকে বলেন ‘ধৈর্য ধরো, মেয়েদের সবকিছুই মানিয়ে নিতে হয়’ , তখন তারা আসলে অবচেতনভাবেই এই বৈষম্যকে এক প্রজন্ম  থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে দেন।

যুগ যুগ ধরেই বিভিন্ন ধর্ম ও শাস্ত্রের দোহাই দিয়েও নারীকে ঘরের কোণে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে অসংখ্য বিধিনিষেধ । নারীকে চিত্রিত করা হয়েছে প্রলুব্ধকারিনী বা পুরুষের সেবাদাসী হিসেবে।
সমাজ এই নিয়মগুলোকে ‘পবিত্র’ বা ‘অপরিবর্তনীয়’ বলে নিয়ম করে প্রচার করেছে। মানুষ এর বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পায়, আর এভাবেই সমাজ একদিন পুরুষতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়ায়। অনেক ক্ষেত্রেই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নিজের সুবিধামতো শাস্ত্রের নিয়মগুলোকে সাজিয়ে নিয়েছে, যাতে নারীর স্বাধীনতা ও অধিকারকে সংকুচিত করে রাখা যায়। পাশাপাশি আমাদের পাঠ্যবই বা চারপাশের ভাষাও অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে এই পুরুষতন্ত্রের ছায়া বহন করে। বইয়ের উদাহরণে যখন দেখি বাবা কাজ করেন আর মা রান্না করেন, তখন শিশুর মনে গেঁথে যায় যে এটাই স্বাভাবিক। এমনকি আমাদের কথোপকথনের 'গালিগালাজ' বা প্রবাদ-প্রবচনেও নারীকে তুচ্ছ করার প্রবণতা কাজ করে। আমরা যখন কাউকে দুর্বল বোঝাতে ‘মেয়েলি’ বলি, তখন আমরাও আসলে পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক হিসেবেই কাজ করি।

রাষ্ট্রের অনেক আইন এবং নিয়ম সরাসরি পুরুষকে বেশি ক্ষমতা দিয়েছে। জমির মালিকানা থেকে শুরু করে বড় কোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পুরুষের অগ্রাধিকার আজও অনেক বেশি। রাষ্ট্র যখন নারীর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং তার বদলে নারীর চলাফেরা বা পোশাককে দোষারোপ করে, তখন রাষ্ট্র নিজেই পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে বড় রক্ষক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে
আজকের যুগে বিজ্ঞাপন বা সিনেমাও পুরুষতন্ত্রের ধারক হয়ে উঠেছে। সিনেমায় হিরো মানেই মারপিট করা এক ‘শক্তিশালী পুরুষ’, আর নায়িকা মানেই কেবল সুসজ্জিতা এক নারী। বিজ্ঞাপনগুলোতে নারীকে প্রায়ই পন্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই প্রবণতাটিকে সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় 'অবজেক্টিফিকেশন' (Objectification) বলা হয়। অনেক সময়েই পণ্যের সাথে কোনো সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও কেবল পুরুষ ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে নারীকে আবেদনময়ী রূপে দেখানো হয়।
এর মাধ্যমে সমাজের মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যে,  সুন্দর থাকা এবং পুরুষের মনোরঞ্জন করাই হলো নারীর একমাত্র কাজ । আজও রান্নার মশলা বা পরিষ্কার করার দ্রব্যের বিজ্ঞাপনে নারীকে কেবল 'গৃহিণী' বা 'সেবিকা' হিসেবেই বেশি দেখানো হয়, যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত মেধা বা পেশাদারী পরিচয় অন্তরালেই থেকে যায়।

পুরুষতন্ত্র আসলে একটি বিষাক্ত অভ্যাসের মতো। এটি পুরুষকে শিখিয়েছে ‘আবেগহীন শাসক’ হতে আর নারীকে শিখিয়েছে ‘অধীনস্ত’ হতে। এই ব্যবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের প্রত্যেকের ভেতর থেকে পরিবর্তন শুরু করতে হবে। যখন আমরা বুঝতে পারব যে নারী বা পুরুষ হওয়ার চেয়ে ‘মানুষ’ হওয়াটা জরুরী, একমাত্র তখনই এই অদৃশ্য শৃঙ্খলটি ভেঙে পড়বে। এটি কেবল নারীর একার লড়াই নয়, বরং সুন্দর এক সমাজের জন্য নারী-পুরুষ উভয়েরই এক সম্মিলিত লড়াই। আশার কথা , এই লড়াই স্বল্প পরিসরে হলেও ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে।

Post a Comment

0 Comments