বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১২১
উলটকম্বল
ভাস্করব্রত পতি
"ওলোটুকম্বলমিত্যাখ্যং বন্যং বনেচরৈঃ প্রিয়ম্।
লালাক্ষার প্রমেহেষু গর্ভদোষ প্রশান্তিকৃৎ।
অগ্নিসোমগুণৈর্যন্তং মূলং পত্রং চ শস্যতে।
দাহ চিত্তভ্রমাক্ষেপ রজোরোধ নিবর্ত্ত কম্।।
মূত্রকৃচ্ছ্যাশ্মরীহ রসায়ন গুণোত্তরম্।
দিব্যৌষধমিদং গোপ্যং ন দদ্যাৎ যস্যকস্যচিৎ।।"
গ্রামবাংলার অতি পরিচিত একটি আপাদমস্তক ভেষজ উদ্ভিদ হল উলটকম্বল বা ওলটকম্বল। ক্যারোলাস লিনিয়াস ১৭৬৮ সালে সর্বপ্রথম এই প্রজাতিটির কথা লেখেন। তখন তিনি এর নাম দিয়েছিলেন Theobroma augustum বা Theobroma augusta। যদিও পরবর্তীকালে উদ্ভিদবিজ্ঞানের পরিভাষায় এর অন্য ল্যাটিন নাম হয় Abroma augusta। যা Malvaceae পরিবারভুক্ত। এছাড়াও উলটকম্বলের আরও যেসব প্রজাতির খোঁজ মেলে, সেগুলি হল --
Abroma alatum
Abroma angulatum
Abroma angulosum
Abroma commune
Abroma denticulatum
Abroma elongatum
Abroma fastuosum
Abroma javanicum
Abroma molle
Abroma obliquum
Abroma sinuosum
উলটকম্বলের ডাঁটা
কোনো কোনো দ্রব্যগুনের গ্রন্থে উলটকম্বলকে বলে পিবরী, যোষিনী। এই নাম দুটি অবশ্য চরক, সুশ্রুত কিংবা বাগভটের বইতে পাওয়া যায়না। আবার কেউ একে বলে Devil's cotton বা শয়তানের তুলা। পিশাচ কার্পাস নামেও পরিচিত। আসলে উলটকম্বলের ফলের ভিতর তুলার মতো আঁশ থাকে। এগুলি গায়ে লাগলে চুলকানি হতে থাকে।
আমরা সচরাচর একে 'উলটকম্বল' বলে থাকলেও আসলে এর নাম 'উলটকমল'। এর ফুলগুলি দেখতে ওলটানো কমল বা পদ্মফুলের মতো। বিচিত্র রকমের গঠন।
উলটকমল > উলটকম্বল
উলটকম্বলের ফুলের পাঁপড়িগুলিতে গাঢ় লাল কালো রঙের মিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। অনেকটা ঠিক মেরুন রঙের হয়। তবে আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য এই উলটকম্বল বা ওলটকম্বল নামকরণের উৎপত্তি সম্পর্কে লিখেছেন, "ওল শব্দটি বাংলায় বহুদিনের পরিচিত শব্দ। ওল থেকে ওলাও হয়। যা নিঃসৃত হয় বেগের সঙ্গে। তাই মুন্ডারি বা আদিবাসীদের ভাষায় ওল। তা থেকে হ'য়েছে ওলোট। আর বীজকোষের আধারের অভ্যন্তরভাগ যেন কম্বল কেটে তৈরী। সেইজন্যই এর নাম ওলোটকম্বল হয়নি তো? আর কম্বল তো প্রাচীন শব্দ। এটার উল্লেখ মহাভারতের বনপর্বের তৃতীয় অধ্যায়ের ৫১ শ্লোকে আছে। তাছাড়া রামায়ণে অযোধ্যা কান্ডের ৮৩ অধ্যায়ের ১৪ শ্লোকেও দেখা যায়।"
মোটামুটি ৮-১০ ফুট লম্বা হয়। খুব একটা ঝোপঝাড় ধরনের হয় না। বাগানের মধ্যেই বেড়ে ওঠে। বেশ নরম ধরনের গাছ। রোমশ। বেশি মোটা হয়না। স্থলপদ্ম গাছের মতোই গঠন। কিন্তু গাছে ফুল এলে পাতাগুলো বাসকের পাতার মতো হয়ে যায়।
পাঁচকোনা বীজাধার বা বীজকোষগুলি প্রথমে সবুজ এবং পেকে গেলে ধূসর রঙের হয়। বীজকোষ ফেটে গেলে তার মধ্যে কালোজিরার মতো ছোট ছোট বীজ সাজানো অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। বীজ থেকেই চারাগাছ হয়। বর্ষায় প্রচুর নতুন চারা জন্মায়।
উলটকম্বলের নরম সবুজ ডাঁটা চিরে জলে ভিজিয়ে রাখা হয় সারারাত। সকালে দেখা যাবে ঐ ডাঁটা থেকে পিচ্ছিল রস বেরিয়ে জলের সাথে মিশে থাকে। সেই জল খাওয়া হয়। কোষ্ঠকাঠিন্য, রক্ত আমাশা, হাঁপানি, গনোরিয়া, বন্ধ্যাত্ব, কুষ্ঠ, কাশির নিরাময়ের জন্য খুব উপকারী। এটি মহিলাদের জন্য সত্যিকারের একটি উপকারী ভেষজ উদ্ভিদ। মহিলাদের গুচ্ছের রোগ প্রতিরোধ করতে একমেবাদ্বিতীয়ম। তাই এটিকে বলে 'প্রাকৃতিক গাইনি' উদ্ভিদ। মহিলাদের স্তন্যবহ স্রোতে এবং শুক্রবহ স্রোতে কাজ করে। মূলতঃ মহিলাদের রজোনিঃসরণের স্বল্পতা, অধিক স্রাব, অনিয়মিত স্রাব, শ্বেতস্রাব, অধিক রক্তস্রাব, দুর্গন্ধ স্রাব ইত্যাদি কারণে গর্ভসঞ্চার না হলে উলটকম্বল খুব কার্যকরী।
0 Comments