জ্বলদর্চি

সত্যজিৎ রায়ের গল্পে বন্ধু প্রসঙ্গ/সালেহা খাতুন

সত্যজিৎ রায়ের গল্পে বন্ধু প্রসঙ্গ
                                              
সালেহা খাতুন

পাঠক চিত্তজয়ী সত্যজিৎ রায় তাঁর গল্প রচনার একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই জমাটি গল্প লিখেছেন। "অ্যাবস্ট্রাকশান" নামে একটি ইংরেজি ছোটোগল্প দিয়েই ১৯৪১-এ তিনি গল্পলেখার জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। এই "অ্যাবস্ট্রাকশান" গল্পটির বাংলা অনুবাদ পরে বিজয়া রায়ের সৌজন্যে ১৪০২ বঙ্গাব্দে "দেশ" পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের রচিত গল্পের সংখ্যা একশোর কাছাকাছি। আনন্দ পাবলিশার্স প্রকাশিত "সত্যজিৎ রায় গল্প ১০১" গ্রন্থে দুটি উপন্যাস 'ফটিকচাঁদ' এবং 'মাস্টার অংশুমান' আর নাটক 'হাউই'কে বাদ দিলে গল্প সংখ্যা দাঁড়ায় ৯৮। এই গল্পগুলির মধ্য থেকে আলোচনার সুবিধার জন্য বেছে নিয়েছি মোট পাঁচটি গল্প - 'সহযাত্রী', 'নতুন বন্ধু', 'দুই বন্ধু', 'বঙ্কুবাবুর বন্ধু', এবং 'ক্লাসফ্রেন্ড'; যেগুলিতে এসেছে বন্ধু প্রসঙ্গ। 

অবশ্য তাঁর রচিত গল্পগুলিকে বিষয় অনুযায়ী বিন্যস্ত করলে আরো বিভিন্ন ধারার সাক্ষাৎ আমরা পাবো  -  গল্পে শিল্পী ও শিল্প প্রসঙ্গ, অভিনয়কেন্দ্রিক গল্প, গল্পের চলচ্চিত্রে রূপান্তর, শিশুসাহিত্য ও শিশুসাহিত্যিক প্রসঙ্গ, গুরু-শিষ্য সংবাদ, অঙ্কভীতি, রূপকথা জীবন ইত্যাদি।

পরিসরের সংক্ষিপ্ততার কারণে আলোচ্য নিবন্ধে আমরা বন্ধুকেন্দ্রিক কয়েকটি মাত্র গল্পের পর্যালোচনায় প্রবৃত্ত হবো।"বঙ্কুবাবুর বন্ধু" গল্পটি “সন্দেশ” পত্রিকায় ১৩৬৮ ব্ঙ্গাব্দের মাঘ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। নিরীহ অমায়িক বঙ্কুবাবু কাঁকুড়গাছি প্রাইমারি ইস্কুলে ভূগোল এবং বাংলা পড়ান। দুষ্টু শিক্ষার্থীরা তাঁকে বিভিন্ন ভাবে জ্বালাতন করে - ব্ল্যাকবোর্ডে তাঁর ছবি আঁকে, বসার চেয়ারে গাবের আঠা মাখিয়ে রাখে, কালীপুজোর রাতে তাঁর পেছনে ছুঁচো বাজি ছেড়ে দেয় ইত্যাদি। কিন্তু বঙ্কুবাবু রাগ করেন না। কেননা ক্লাস ভর্তি দুষ্টু ছাত্রের মাঝেও প্রতি বছরই দু-একজন ভালো ছাত্র থাকে। আর তাদের পড়িয়েই তাঁর মাস্টারি জীবন সার্থক হয়। এক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, শুধু বঙ্কুবাবুর ক্ষেত্রেই নয় ; এমন দু-একজন ভালো ছাত্র সব শিক্ষকরাই পান।

ব্ঙ্কুবাবু এই ভালো ছাত্রদের বাড়িতে ডেকেও বিশ্বজগতের খবরাখবর দেন - আফ্রিকার গল্প, মেরু আবিষ্কারের গল্প, ব্রেজিলের মানুষখেকো মাছের গল্প, সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাওয়া আটলান্টিস মহাদেশের গল্প ইত্যাদি।
🍂

এহেন শিক্ষক বঙ্কুবাবুর একটি আড্ডার ঠেক আছে, সেটি গ্রামের উকিল শ্রীপতিবাবুর বাড়ি। ওই আড্ডার বিভিন্ন আড্ডাধারী বন্ধুরা দুষ্টু ছাত্রদের মতোই বঙ্কুবাবুর পেছনে লাগে, ঠাট্টা তামাশা করে; তবুও সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলেও বঙ্কুবাবুকে সেখানে যেতেই হয়। বঙ্কুবাবুকে বিভিন্নভাবে হেনস্থা করা হয়। তিনি ভূতে ভয় পান না বলে তাঁকে নাস্তানাবুদ করা হয়। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিকরা গবেষণার নতুন নতুন তথ্য দিচ্ছেন জানালে, রাশিয়ান স্যাটেলাইটের খবর দিলে, রকেটের কথা বললে তাঁকে হেয় করা হয়। অন্যগ্রহ থেকে লোক আসার কথা বললে বঙ্কুকে ব্যাঁকা নামে ডাকা হয়। শ্রীপতিবাবু, ভৈরব চক্কোত্তি, নিধু মোক্তার, চণ্ডীবাবু আড্ডার সব সদস্যই তাঁকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেন। আর প্রচণ্ড রাগ হওয়া সত্ত্বেও নির্বিবাদে বঙ্কুবাবু সব সহ্য করে যান।

কিন্তু বঙ্কুবাবু সত্যি সত্যিই একদিন ভিনগ্রহ ক্রেনিয়াসের বাসিন্দা অ্যাংয়ের দেখা পেলেন। অ্যাং তাঁর অপূর্ণ সব ইচ্ছার পূরণের ব্যবস্থা করে সমগ্র বিশ্ব দেখিয়ে দিলেন। ক্রেনিয়াস গ্রহের বাসিন্দা অ্যাং প্লুটোয় যেতে গিয়ে পৃথিবীতে এসে পড়ে বঙ্কুবাবুকে মোটামুটি ভালো মানুষ বলে চিনে নেন। যদিও অ্যাং নিজেদেরই শ্রেষ্ঠ বলে মানেন। তাঁদের কাছে মানুষ নিকৃষ্ট জীব। যে বঙ্কুবাবু ছাত্রদের অত্যাচারে জর্জরিত, বন্ধুদের নিপীড়নে ব্যথিত তিনি অ্যাংয়ের মতো প্রকৃত এক বন্ধুর দেখা পেলেন একদিনই মাত্র। কিন্তু এই ক্ষুদ্র সময়েই অ্যাং তাঁকে প্রতিবাদী করে দিয়ে যান। অ্যাং তাঁকে রীতিমতো ধমক দিয়ে বলেন - " তোমার দোষ হচ্ছে যে তুমি অতিরিক্ত নিরীহ, তাই তুমি জীবনে উন্নতি করতে পারো নি। অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা বা নীরবে অপমান সহ্য করা এসব শুধু মানুষ কেন, কোনও প্রাণীরই শোভা পায় না।" চকিতে আমাদের মনে চলে আসে রবীন্দ্রনাথের "নৈবেদ্য" কাব্যগ্রন্থের "ন্যায়দণ্ড" কবিতাটি, যেখানে উচ্চারিত হয়েছে -
"অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে 
তব ঘৃণা যেন তারে তৃণসম দহে।"
মনে পড়ে আমির খান অভিনীত "পিকে" চলচ্চিত্রের কথা।

অ্যাংয়ের সুপরামর্শে আড্ডাধারী কপট বন্ধুদের কাছে রাগে ফেটে পড়ে বঙ্কুবাবু গম্ভীর গলায় বলেছেন - " বন্ধুগণ ! আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, আজ এই আড্ডায় আমার শেষদিন। আপনাদের দলটি ছাড়ার আগে আমি কয়েকটি কথা আপনাদের বলে যেতে চাই এবং তাই আজ এখানে আসা। এক নম্বর - সেটা সকলের সম্পর্কেই খাটে - আপনারা সবাই বড্ড বাজে বকেন। যে বিষয়ে জানেন না, সে বিষয়ে বেশি কথা বললে লোকে বোকা বলে। দুই নম্বর - এটা চণ্ডীবাবুকেই বলছি - আপনাদের বয়সে পরের ছাতা জুতো লুকিয়ে রাখা শুধু অন্যায় নয়,ছেলেমানুষি।দয়া করে আমার ছাতাটা ও খয়েরি ক্যাম্বিশের জুতোটা কালকের মধ্যে আমার বাড়িতে পৌঁছে দেবেন। নিধুবাবু, আপনি যদি আমাকে ব্যাঁকা বলে ডাকেন তবে আমি আপনাকে ছ্যাঁদা বলে ডাকব, আপনাকে সেইটেই মেনে নিতে হবে। আর শ্রীপতিবাবু - আপনি গণ্যমান্য লোক, আপনার মোসাহেবের প্রয়োজন হবে বইকী। কিন্তু জেনে রাখুন যে, আজ থেকে আমি আর ও-দলে নেই, যদি বলেন তো আমার পোষা হুলোটাকে পাঠিয়ে দিতে পারি - ভালো পা চাটতে পারে। ... ওহো পঞ্চাবাবুও এসেছেন দেখছি- আপনাকেও খবরটা দিয়ে রাখি - কাল রাতে ক্রেনিয়াস গ্রহ থেকে একটি অ্যাং এসে আপনার বাঁশ বাগানের ডোবাটির মধ্যে নেমেছিল, আমার সঙ্গে তার আলাপ হয়েছে। লোকটি থুড়ি, অ্যাংটি - ভারী ভালো।" এই অ্যাংয়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার গল্পটি ঋত্বিক রোশন অভিনীত "কোই- মিল গয়া" চলচ্চিত্রের জাদুকে মনে করিয়ে দিল।

"বঙ্কুবাবুর বন্ধু" গল্পে সুকুমার রায় এবং উপেন্দ্রকিশোরের দৃষ্টিভঙ্গির ধারা বজায় রেখেছেন সত্যজিৎ। "আবোল তাবোল" - এর কবিতায় যেমন সাধারণ বাঙালি জীবনের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রতি ব্যঙ্গ এবং নির্বিষ হুল ছিল এখানেও তেমনি। আবার "গুপী গাইন বাঘা বাইন" - এ গুপীর সঙ্গে বৃদ্ধ মানুষদের ব্যবহারের দৃশ্যটি আমাদের মনে চলে আসে। এ গল্প ছোটোদেরই শুধু বার্তা দিয়েছে তা নয় বড়োরাও যথেষ্ট শিক্ষা পাবেন এ থেকে।বন্ধুরূপী মুখোশধারীদের চিহ্নিত করে প্রকৃত বন্ধুকে চিনিয়ে দেবে। যথার্থ বন্ধু সঙ্গে থাকলে আপাত নিরীহ মানুষও সহ্যের সীমা অতিক্রম করে গেলে সঠিক সময়ে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে পারেন, এ গল্প তারই নিদর্শন। আর বন্ধু নির্বাচনেও সজাগ থাকা শ্রেয়।
 “ক্লাস ফ্রেন্ড”, “দুই বন্ধু”, “নতুন বন্ধু” এবং “সহযাত্রী” গল্প চারটিকে প্রায় একই রেখায় নিয়ে আসা যায়।  যেখানে প্রতিটি গল্পেই স্কুলের পুরোনো বন্ধুরাই নতুনরূপে হাজির হয়েছে, ধরা দিয়েছে। নতুন করে তাদের সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠেছে। “নতুন বন্ধু” আর “সহযাত্রী” গল্পদ্বয় প্রায় একই। আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী ১৪০২-এ প্রকাশিত “সহযাত্রী” গল্প সম্পর্কে সন্দীপ রায় একটি তথ্য দিয়েছেন যে, “ ‘সন্দেশ’ পত্রিকায় “নতুন বন্ধু” নামে বাবার একটি গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে। তার ঠিক দেড় বছর পরের খসড়া খাতা থেকে বেরোল ‘সহযাত্রী’। একই চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করে এই দ্বিতীয় গল্পটি লেখার কারণ যে কী হতে পারে, তা আজ অনুমান করা কঠিন। হয়তো লেখার সময় প্রথমটির কথা উনি ভুলে গিয়েছিলেন, এবং ফেয়ার করতে গিয়ে হঠাৎই মনে পড়ে যায়। সেই জন্যই বোধ হয় ‘সহযাত্রী’ অপ্রকাশিত থেকে গেছে”।
তবে “নতুন বন্ধু” এবং “সহযাত্রী” গল্প দুটি খুঁটিয়ে পাঠ করে আমরা দেখেছি চরিত্র ও পরিবেশ এবং প্রেক্ষাপট রচনায় অনেকটাই ভিন্নতা এনেছেন সত্যজিৎ। নতুন বন্ধুর সঙ্গে দেখা হওয়ার ঘটনা ঘটছে গাড়িতে শান্তিনিকেতনে যাওয়ার পথে, জয়ন্ত এবং বিখ্যাত লেখক অমিয়নাথ সরকারের সাক্ষাৎ - যোগাযোগ - সান্নিধ্য ইত্যাদি ঘটনা শেষে কলকাতায় ফিরে জয়ন্তর চিঠি থেকে আসল সত্যের উদঘাটন হয়েছে- চিঠিটি –
ভাই অমিয়, 
          পঁচিশ বছর পরেও তোকে আমার চিনতে অসুবিধা হয় নি, কিন্তু আমার দাড়ির জন্য তুই বোধহয় আমাকে চিনতে পারিসনি। আমার আসল নামটা আমি তোকে বলিনি, আর সেই সঙ্গে আরও কিছু কথা বানিয়ে বলেছি, কারণ আমার আসল পরিচয়টা জানলে তোর সঙ্গে বন্ধুত্বটা হত না, আর সেইসঙ্গে আমার প্রায়শ্চিত্তটাও হত না। আমি হলাম তোর স্কুলের সহপাঠী কৌশিক মিত্র – ডাকনাম রেন্টু। ... মনে রাখিস, আমরা দুজনেই এখন অন্য মানুষ, স্কুল হল সুদূর অতীতের ব্যাপার। এই নতুন সম্পর্কটাই আসল, পুরনোটা কিছু না।
                                   ইতি তোর বন্ধু
                                        রেন্টু
ছাত্র জীবনে ভালো সম্পর্ক না থাকলেও এখন তারা নতুন করে বন্ধুত্বের গাঢ় বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। আর “সহযাত্রী”-র বন্ধুদ্বয় ত্রিদিব ব্যানার্জি এবং সঞ্জয় লাহিড়ীর দেখা হয়েছে দিল্লিতে ট্রেনে যাত্রাকালে। এরকম একদিনের আলাপ প্রায় ক্ষেত্রেই ঘটে কিন্তু পরে আর তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু এ গল্পে সঞ্জয় লাহিড়ীর উদ্যোগে পুনরায় তাদের দেখা হয়েছে। গল্প করতে করতে ত্রিদিব ব্যানার্জি বুঝতে পেরেছে এই সঞ্জয় তারই ক্লাসমেট। নামও বদলে গেছে দুজনের। তবে ত্রিদিব ব্যানার্জি অতীত চাপা দিয়ে রাখাই ভালো ভেবে বন্ধুকে বুঝতে দিতে চায় না যে তারা একই ক্লাসে পড়তো। 
আর “সন্দেশ” পত্রিকায় পৌষ ১৩৯৬ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত “দুই বন্ধু”র প্রতুল এবং মহিম কিশোর বয়সে ছাত্রজীবনে পরস্পরকে কথা দিয়েছিল যে তারা যেখানেই থাকুক কুড়ি বছর পর লাইটহাউসের বুকিং কাউন্টারের কাছে পরস্পরের সঙ্গে দেখা করবে। অবশেষে সেদিন এলো। দুজনের কেউই সেদিনের কথা ভোলে নি। কিন্তু মহিম অপেক্ষা করেও প্র্তুলের দেখা পেলো না। বরং এক কিশোরের হাতে প্র্তুলের চিঠি পেলো, তাতে প্রতুল মহিমের বাড়ির ঠিকানা চেয়েছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা করবে। মহিমের বাড়িতে প্রতুল এলো এবং শেষ পর্যন্ত উদ্ঘাটন হলো যে বিখ্যাত ঔপন্যাসিক মহিম চট্টোপাধ্যায়ের বন্ধ প্রতুল এখন বিখ্যাত হিন্দি চলচ্চিত্র অভিনেতা কিশোরীলাল। পাড়ার লোকের কাছে মহিমের পরিচয় হয়ে গেলো কিশোরীলালের বন্ধুরূপে। পাড়ার লোকের কাছে এই যে খ্যাতি বেড়ে যাওয়া, এই ঘটনার সাদৃশ্যে আমাদের মনে “বিল্লু বারবার” চলচ্চিত্রের খণ্ডাংশ বার বার উঁকি দিয়ে যায়।
আমরা আলোচনা  শেষ করবো ‘ক্লাস ফ্রেন্ড’ গল্পটির সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিয়ে। ফাল্গুন ১৩৮৫ তে প্রকাশিত ‘ক্লাস ফ্রেন্ড’ গল্পটির মনস্তত্ত্ব এতটাই আকর্ষণ করে যে গল্প শেষে বন্ধুবৎসল পাঠক অশ্রুসজল হবেনই। তিরিশ বছর পরে স্কুলের বন্ধুর সাথে দেখা হলে স্মৃতিরা ভিড় করে আসে। কিন্তু স্কুলজীবনের বাল্য বয়স পেরিয়ে যখন পরিণত বয়সে সবাই পৌঁছে যায় তখন অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক প্রতিপত্তি নিজেদের ভিন্ন করে দেয়। আর্থিক অবস্থান  মনে হয় সব থেকে বেশি পার্থক্য গড়ে দেয়। ধনীবন্ধু দরিদ্র বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে চায় না যদি আর্থিক সাহায্য চেয়ে বসে এই ভয়ে। ‘ক্লাস ফ্রেন্ড’ গল্পে মোহিত  সরকার আর জয়দেব বসু এমনই দুই বন্ধু। স্কুলজীবনের তিরিশ  বছর পর হঠাৎ বড়লোক মোহিত সরকারের গৃহে জয়দেব বসুর আবির্ভাব। স্কুলজীবনে দুজন সমান ব্রিলিয়ান্ট থাকলেও পরবর্তী জীবনের নানান দুর্ঘটনা জয়দেব বসুকে এতটাই হতদরিদ্র করে দেয় যে নিজের তেরো চোদ্দো  বছর বয়সের ছেলের পড়াশোনায় পরীক্ষার ফি টুকু জোগাড় করতে পারে না। লজ্জায় মাথা হেঁট করে মোহিত সরকারের কাছে হাত পাতে এই টাকাটা দেওয়ার জন্য। নানান কৌশল, অবিশ্বাস, বিরক্তি শেষে মোহিত  সরকার জয়দেব বসুর ছেলের হাতে টাকাটা দেয় এবং  তার মধ্যে বন্ধু জয়দেব কে দেখতে পায়। কোটরে বসা চোখ, রোদে পুড়ে যাওয়া গায়ের রং, কাঁচা পাকা দাড়ির অধিকারী জয়দেব সরকারকে চিনতে না পারলেও সঞ্জয় এর মধ্যে তিরিশ  বছর আগের ক্লাস ফ্রেন্ডটিকে দেখতে পেয়ে হালকা এবং প্রসন্ন বোধ করেন। প্রথমে টাকা দিতে অনিচ্ছুক  থাকলেও মোহিত সরকার পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে বন্ধুর আত্মপ্রতিকৃতি লক্ষ্ করে নিজেকে আর কঠোর করে রাখতে পারেনি। অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মত স্নেহ উচ্ছ্বসিত হয়েছে বন্ধুপুত্রটিকে দেখে। এই বোধ এতটাই বাস্তব যে প্রৌঢ়ত্বের কাছাকাছি পৌঁছানো সব ব্যক্তি ‘ক্লাস ফ্রেন্ড’ গল্পটিকে নিজের সঙ্গে রিলেট করতে পারবেন।



Post a Comment

0 Comments