জ্বলদর্চি

ব্রহ্মসূত্র -- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি/পর্ব ৫/প্রীতম সেনগুপ্ত


ব্রহ্মসূত্র -- শঙ্কর মতানুসারী প্রস্থানত্রয়ের একটি

পর্ব ৫

প্রীতম সেনগুপ্ত 


বেদের সুপ্রাচীন অংশের কয়েকটি সূক্তের মধ্যে ( যেমন -- নাসদীয় সূক্ত ইত্যাদি ) বৈদান্তিক ভাবনার সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু এটা স্বীকার করে নিতে হবেই যে, প্রাচীন আর্য ভারতীয়রা জাগযজ্ঞ ও অনুষ্ঠানাদির প্রতিই গুরুত্ব দিতেন বেশি। নাসদীয় সূক্তকে উপনিষদের প্রাথমিক ভিত্তি বলে ধরা যেতে পারে। নাসদীয় সূক্ত হল ( ঋগ্বেদ ১০.১২৯ ) মহাবিশ্বের সৃষ্টি তত্ত্ব নিয়ে ঋকবেদের একটি বিখ্যাত বিখ্যাত দার্শনিক স্তোত্র। এটি সৃষ্টির পূর্বের অবস্থা -- ‘সৎ’ ( অস্তিত্ব ) বা ‘অসৎ’ ( অনস্তিত্ব ) কোনওটাই ছিল না --- তা ব্যাখ্যা করে। নাসদীয় সূক্ত ঋকবেদের দশম মন্ডলের ২৯ তম সূক্ত। এটির অন্তর্নিহিত বস্তুর ধারণাটি এইরকম ---

                                  সৃষ্টি রহস্য 

( ঋগ্বেদ ১০ম মন্ডল, ১২৯ সূক্ত, প্রজাপতি পরমেষ্ঠি ঋষি )

প্রত্যক্ষ এ জগতের ছিল বস্তুরাশি/ অস্তি যাহা -- সেই কালে ছিল না উদভাসি/আপনার দেহ লয়ে। অগোচর যাহা/ প্রত্যক্ষের নাস্তি রূপে, সেই কালে তাহা/আপনার অস্তিত্বের করিতে প্রমাণ/ সৃষ্টিরূপে কোথাও ছিল না ভাসমান/ এ জগতে। সমুদ্র-মেখলা পরিবৃত/ বসুন্ধরা, অতিদূর অনন্ত বিস্তৃত/ সর্বব্যাপী এ আকাশ --- আদি-অন্তহীন,/ ছিল না নিজের মাঝে নীরব নিলীন/ শব্দগ্রাহী গুণ লয়ে।

 🍂

ছিল কি তখন/ বাঙ্ময় প্রকাশযোগ্য কোন আবরণ?/ যাহা নাই, শুধু নাই, কিছু নাই রূপে/ বিরাজ করিতেছিল অব্যক্ত অরূপে;/সেই কালে কোথায় রহিবে কার স্থান/ করিবারে আপনার অস্তিত্ব প্রমাণ/ স্থূলরূপে? গহন গভীর বারিরাশি/ সূক্ষ্মরূপে সমুদয় জগতেরে গ্রাসি/ ছিল কি তখন? মৃত্যুরূপী অন্ধকার,/ অমৃতের অথৈ, আনন্দ-পারাবার/কালের নির্ণয়কর্তা দিবস, শর্বরী/ সব কিছু শূন্য ছিল। শুধুমাত্র করি/ অখণ্ডৈক অবিনাশী আত্মায় নির্ভর/ একীভূত বস্তুরাশি মহাশূন্য 'পর ---/না লইয়া মরুতের কোন সহায়তা;/আপনার অস্তিত্বের পরম সূক্ষ্মতা/ রেখেছিল সঞ্জীবিত। সেই একাকার, ---/ জগৎ সৃষ্টির সেই আদি অন্ধকার/ ছিল ঢাকা সূচীভেদ্য গূঢ় অন্ধকারে/ অনন্ত আচ্ছন্ন করি। মনে হ'ত যেন/কোন দিন কোন কালে; রয়েছে কেবল/ প্রত্যক্ষের অগোচর চিহ্নহীন জল/চতুর্দিকে। অবিজ্ঞেয় তুচ্ছ বস্তুরাশি/আবৃত করিয়াছিল সবকিছু গ্রাসি/ সেই কালে।

সর্ব অগ্রে মনের উপর/ জাগ্রত হইল ধীরে কামনা-লহর/ বীজরূপে; সেই সূক্ষ্ম ইচ্ছাশক্তি হ'তে/ প্রথম উঠিল জাগি অন্ধকার স্রোতে/ সৃষ্টির প্রথম রূপ। সূক্ষ্মদর্শিগণ/ আপন অন্তর লোকে করিয়া মনন/ লভেছেন অনুভবে হেন সত্য জ্ঞান,/অনাদি সৃষ্টির সেই প্রথম বিজ্ঞান/ কঠোর তপস্যাবলে।

সৃষ্টির কারণ/ রেতোধারী দীপ্তিমন্ত সুপুরুষগণ) উৎপন্ন হইল ক্রমে। মহিমা সকল/ দেখা দিল তারপর। প্রখর উজ্জ্বল/ রশ্মিরাশি বিস্তৃত হইল সর্বদিকে;/ স্বধা নিয়ে, প্রযতি রহিল ঊর্ধ্ব দিকে।/ কে জানে প্রকৃত সত্য? যথার্থ বর্ণন/কে করিবে এ সৃষ্টির প্রথম কারণ?/ কোন গূঢ় উৎস হতে কেমন করিয়া/ নভোলোক, সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রে ভরিয়া/ এলো সৃজনের ধারা? 

স্বর্গবাসিগণ/ পারে কি বর্ণিতে কভু সৃষ্টির কারণ/ আদি মূল রহস্যের? হায়! তারা সবে/ অব্যক্ত সে আঁধারে স্পন্দন-উৎসবে/ নাহি ছিল বপুষ্মান্। বহু কালস্তর/ জমিয়াছে একে একে, তারও বহু পর/ দেবতার আবির্ভাব। কে বলিবে তবে/ কোথা হ'তে এই সৃষ্টি। কোন কালে কবে/ জাগিল প্রথম উর্মি, কোন উৎস হতে/ নামিল প্রবাহ ধারা সৃজনের পথে/ অনন্ত গগনমাঝে। কেহ রয়েছে কি/ স্বয়ং প্রেরণাবলে! অথবা কি তিনি/ সৃষ্টির নির্মাণ-কার্যে নিরপেক্ষ, ---

যিনি অনন্ত এই জগতের সর্বেশ্বর রূপে/ বিরাজেন দিব্যধামে আপন স্বরূপে,/ হয়তো জানেন তিনি এই বিশ্বস্রোতঃ/ কোথা হতে, হয় তো বা তাঁহারও অজ্ঞাত। 

( বেদস্তুতি, শ্রী কালীপদ ভট্টাচার্য )

Post a Comment

0 Comments