জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/কমলিকা ভট্টাচার্য/চতুর্থ খণ্ড/পর্ব ১: অপরাধবোধ

বাঁচার উত্তরাধিকার
কমলিকা ভট্টাচার্য
চতুর্থ খণ্ড
পর্ব ১: অপরাধবোধ

আগের খণ্ডে আমরা দেখেছি—অনির্বাণ, দেশের প্রতিরক্ষা বিভাগের এক অসাধারণ রোবোটিক্স বিজ্ঞানী, নিজের তৈরি humanoid সঙ্গী ঋদ্ধিমানকে নিয়ে এমন এক যাত্রায় পা রাখে, যেখানে বিজ্ঞান আর মানবিকতার সীমারেখা বারবার ভেঙে যায়। ঋদ্ধিমান শুধু একটি যন্ত্র নয়, সে হয়ে ওঠে অনির্বাণের সবচেয়ে কাছের সহযাত্রী, একেবারে ভাইয়ের মতো। সেই পথেই অনির্বাণের জীবনে আসে নাতাশা—প্রথমে একজন spy, পরে ভালোবাসা। কিন্তু সত্য প্রকাশের পর বিশ্বাসঘাতকতার আঘাতে অনির্বাণ তাকে দূরে সরিয়ে দেয়। বহু ঘটনার পর সামনে আসে এক গভীর ষড়যন্ত্র, আর তার মাঝখানে লুকিয়ে থাকা এক নতুন জীবনের সম্ভাবনা—একটি embryo, যা শুধু একটি সন্তানের নয়, বরং ভবিষ্যতের প্রতীক। সেই অসমাপ্ত লড়াই আর অপরাধবোধের ভার নিয়েই শুরু হচ্ছে নতুন খণ্ড।
🍂
রাতটা অদ্ভুত শান্ত ছিল। শহরের ওপর নেমে এসেছে গভীর নীল অন্ধকার। দূরে দূরে অসংখ্য আলো জ্বলছে—কিন্তু সেই আলো যেন আজ অনির্বাণের চোখে পৌঁছোচ্ছিল না। সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তার সামনে ছড়িয়ে থাকা শহরটা যেন এক বিশাল পৃথিবী, যেখানে অসংখ্য মানুষ তাদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। অথচ তার নিজের পৃথিবীটা এই মুহূর্তে সঙ্কুচিত হয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র একটা প্রশ্নে—একটা ছোট্ট জীবন, যে এখনও জন্মায়নি, তবু যার জন্য এত কিছু ঘটেছে।
টেবিলের ওপর একটি স্ক্রিনে ভেসে উঠছে কয়েকটি তথ্য—
Embryo ID: A-N-01
Status: Preserved
অনির্বাণ অনেকক্ষণ ধরে সেই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখের ভিতরে অদ্ভুত এক আলো জ্বলছিল—ভয়, আশা, আর গভীর অপরাধবোধের মিশ্র আলো। “ আমাদের সন্তান…” সে খুব আস্তে বলল।
ঘরের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল ঋদ্ধিমান। মানুষের মতোই তার চোখে চিন্তা, ক্লান্তি আর অনুভূতির ছাপ। অথচ সে মানুষ নয়—একটি উন্নত humanoid robot। ঋদ্ধিমান ধীরে অনির্বাণের পাশে এসে দাঁড়িয়ে শান্ত গলায় বলল, “লোকেশন নিশ্চিত হয়েছে।”
অনির্বাণ তাকাল। ঋদ্ধিমান বলল, “Facility- 47 এর মূল ল্যাব নয়, একটা সেকেন্ডারি cryogenic vault। ভারতীয় সীমান্তে,সেখানে embryo সংরক্ষণ করা হয়েছে।” ঘরের ভিতরে কয়েক সেকেন্ড নিস্তব্ধতা নেমে এল। অনির্বাণ ধীরে বলল, “মানে… ও এখনও বেঁচে আছে তো।” ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। জীবিত। কিন্তু সময়ের বাইরে আটকে আছে।”
ঠিক তখন দরজা খুলে ইরা ঢুকল। তার মুখে ক্লান্তি থাকলেও চোখে দৃঢ়তা ছিল। “আমাদের একটা সমস্যা আছে,” সে বলল। অনির্বাণ ভ্রু কুঁচকাল। “Facility-র ওই vault-এ ঢোকার জন্য একজন মানুষের biometric authorization দরকার।” “কার?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল। ইরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে বলল—“Mr. Timson।”
ঘরের বাতাস যেন এক মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেল। টিমসন—এই নামটা শুনলেই অনির্বাণের মনে পড়ে যায় বিশ্বাসঘাতকতা, ষড়যন্ত্র আর সেই অন্ধকার গবেষণাগারের কথা। অনির্বাণ ধীরে বলল, “সে কখনও সাহায্য করবে না।” ঋদ্ধিমান শান্ত গলায় বলল, “মানুষ সবসময় একই থাকে না।” “তুমি কি তাকে বিশ্বাস করো?” অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল। ঋদ্ধিমান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমি বিশ্বাস করি অপরাধবোধকে।”
সে স্ক্রিনে একটি ফাইল খুলল। সেখানে ভেসে উঠল একটি পুরোনো ছবি—একজন তরুণ বিজ্ঞানী, চোখে উজ্জ্বল স্বপ্ন। “এটাই টিমসন,” ঋদ্ধিমান বলল, “বিশ বছর আগে।” আরেকটা ছবি ভেসে উঠল—একটি ছোট মেয়ে, হাসছে, তার হাতে একটা ছোট রোবট খেলনা। “তার মেয়ে—এলিনা,” ঋদ্ধিমান বলল।
অনির্বাণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। ঋদ্ধিমান বলতে থাকল, “এলিনা জন্ম থেকেই একটি দুর্লভ neurological রোগে আক্রান্ত ছিল। মস্তিষ্কের কোষ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। পৃথিবীর কোনো চিকিৎসাই তাকে বাঁচাতে পারেনি।” স্ক্রিনে একটি হাসপাতালের ছবি ভেসে উঠল—একটা বিছানায় শুয়ে আছে ছোট্ট মেয়েটি, তার পাশে বসে আছে টিমসন, চোখে অসহায়তা। “এলিনা মারা যায় যখন তার বয়স মাত্র আট বছর।”
ঘরের ভিতরে গভীর নীরবতা নেমে এল। ইরা ধীরে বলল, “তখনই কি সে বদলে যায়।” ঋদ্ধিমান মাথা নাড়ল। “সে বিশ্বাস করতে শুরু করে—মানুষের সীমা ভাঙতে পারলেই মৃত্যু থামানো যাবে।”
ঠিক তখন দরজায় শব্দ হল। একজন গার্ড ঢুকল। “Sir… Mr. Timson আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।” ঘরের তিনজন মানুষ একে অন্যের দিকে তাকাল।
কয়েক মিনিট পরে দরজা খুলে টিমসন ভিতরে ঢুকল। সে আগের মতো আত্মবিশ্বাসী নয়। তার চোখ ক্লান্ত, মুখে গভীর অনুশোচনা। সে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল, তারপর ধীরে বলল, “আমি জানি তোমরা কি খুঁজছ।”
অনির্বাণ ঠান্ডা গলায় বলল, “কি?”
টিমসন বলল, “Embryo।”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর টিমসন আবার বলল, “তোমরা আমাকে শাস্তি দিতে পারতে। আমি জানি আমি অপরাধী। আমি এমন অনেক কাজ করেছি যেগুলো কখনও করা উচিত ছিল না।” সে ধীরে অনির্বাণের দিকে তাকাল। “তবু তোমরা আমাকে মেরে ফেলনি… কিংবা বন্দি করে রাখনি।”
অনির্বাণ কিছু বলল না।
টিমসনের চোখে জল চিকচিক করছিল। “তোমরা আমাকে আরেকটা সুযোগ দিয়েছ—ভুল ঠিক করার সুযোগ।” সে খুব আস্তে বলল, “আমি আমার মেয়েকে বাঁচাতে পারিনি। কিন্তু আর কোনো শিশুকে অস্ত্র হতে দিতে চাই না।”
সে অনির্বাণের দিকে হাত বাড়াল। “আমাকে সাহায্য করতে দাও।”
ঘরের নীরবতার ভিতর যেন এক নতুন সম্ভাবনা জন্ম নিল।
অনির্বাণ ধীরে বলল, “তুমি আমাদের embryo-টা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে?”
টিমসন মাথা নাড়ল। “হ্যাঁ। এটাই হবে আমার প্রায়শ্চিত্ত।”
ঘরের বাতাসে যেন নতুন এক যুদ্ধের শুরু হল। কিন্তু এই যুদ্ধ আর শুধু প্রযুক্তির নয়—এটা মানুষের, অপরাধবোধের, আর বাঁচার অধিকারকে রক্ষা করার।

ক্রমশ...

Post a Comment

4 Comments

  1. Very professional writing. Will continue enjoying the suspenseful tech drama

    ReplyDelete
  2. সুন্দর প্রকাশ। আগামীর বিজ্ঞানকে ভিত্তি করে রোমাঞ্চকর লেখা খুবই কম। সেজন্যই বেশি ভালো লাগছে।

    ReplyDelete