জ্বলদর্চি

বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ : সচেতনতা,প্রতিরোধ ও নিরাময় /প্রসেনজিৎ রায়

বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ :  সচেতনতা,প্রতিরোধ ও নিরাময়  

প্রসেনজিৎ রায় 


প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ পালন করা হয়ে আসছে। আধুনিক চিকিৎসায় অগ্রগতি সত্ত্বেও, গ্লুকোমা এখনও বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ।  

সব ধরণের অন্ধত্বের অন্তত: ৯% থেকে ১২% ক্ষেত্রে গ্লুকোমার প্রভাব দেখা যায় এবং প্রায় ৫৯ লক্ষ মানুষ গ্লুকোমার দ্বারা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়। ছানির পরেই এটি বিশ্বব্যাপী অন্ধত্বের দ্বিতীয় প্রধান কারণ হিসেবে স্থান পেয়েছে। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ২০২০ সাল‌ নাগাদ বিশ্বজুড়ে প্রায় যে ৮ কোটি মানুষ গ্লুকোমায় আক্রান্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ৬ কোটি মানুষ ওপেন-অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমায় আক্রান্ত ছিলেন । শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় আফ্রিকান আমেরিকানদের মধ্যে গ্লুকোমা-জনিত অন্ধত্ব ৬ থেকে ৮ গুণ বেশি দেখা যায়। ৬০ বছরের বেশি বয়সী প্রবীণ ব্যক্তিদের ঝুঁকি বেশি, যদি পরিবারে গ্লুকোমার ইতিহাস থেকে থাকে।  ডায়াবেটিস রোগী এবং গুরুতর   ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও গ্লুকোমায় আক্রান্ত হওয়ার  সম্ভাবনা বেশি।

নবজাতক থেকে শুরু করে প্রবীণ পর্যন্ত সব বয়সের যে কেউই গ্লুকোমার শিকার হতে পারেন। সংখ্যাতত্ত্ব বলছে, বয়স্কদের মধ্যেই গ্লুকোমার  ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত বেশি। শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি ১০,০০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ১ জন গ্লুকোমা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আবার আফ্রিকান আমেরিকানদের মধ্যে কম বয়সে গ্লুকোমা হওয়ার হার বেশি। 

আশার কথা অন্ধত্বের আশঙ্কা থাকলেও বর্তমানে উন্নত দেশগুলিতে, মাত্র পাঁচ শতাংশ গ্লুকোমা রোগীর ক্ষেত্রেই  অন্ধত্বের পরিণতি ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়  যে সংখ্যক রোগী সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান, তাঁদের শতকরা হার এই পাঁচ শতাংশেরও কম ।🍂

প্রাণঘাতী বা মারণ রোগ হয়তো নয়, কিন্তু ক্ষতির বিচারে খুব কম হানিকারক নয় গ্লুকোমা রোগটি।  নিঃশব্দে আমাদের যে কারো চোখের আলো কেড়ে নিয়ে অবশেষে অন্ধত্বের পরিণতি উপহার দিতে পারে এই রোগ। তাই অবহেলা নয়, গুরুত্ব দিয়ে ভাবা ও সচেতনতা ছড়ানোর জন্য চক্ষু-বিশেষজ্ঞদের মতে,  অন্ধত্বের একটি প্রধান কারণ হল এই গ্লুকোমা। সময়মতো চিকিৎসা না করালে গ্লুকোমা থেকে অন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও প্রাথমিক পর্যায়েই যদি এই রোগ ধরা পড়ে যায়,  তাহলে সুনির্দিষ্ট উন্নত আধুনিক চিকিৎসার ফলে  ক্ষতিকর পরিণতি রুখে দেওয়া সম্ভব‌।

দৃষ্টিশক্তি হ্রাস থেকে উৎপাদনশীলতা হ্রাস, চাকরি হারানো এবং সামাজিক সহায়তা পরিষেবার উপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে যায়। 
বয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে, গ্লুকোমা-সম্পর্কিত অন্ধত্বের ফলে পতনজনিত আঘাত এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেতে পারে।   স্বাস্থ্যসেবার খরচ এই কারণে আরও বেড়ে যায়।  আক্রান্তদের  জীবনযাত্রার মান  হ্রাস পাওয়া ও ফলশ্রুতি হিসাবে পরিচর্যাকারীদের উপর আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়।   দৃষ্টিশক্তি রক্ষা করতে এবং এই সমস্যাব্যঞ্জক অর্থনৈতিক পরিণতিগুলো এড়িয়ে যেতে গ্লুকোমার প্রাথমিক সনাক্তকরণ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার বিষয়টি  খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গ্লুকোমা আসলে অপটিক স্নায়ুর একটি দীর্ঘস্থায়ী, ক্রমবর্ধমান, ক্ষয়জনিত রোগ যা দৃষ্টি ক্ষেত্রের বিশেষ ক্ষতি করে। অনুমান করা হয় যে বিশ্বজুড়ে গ্লুকোমায় আক্রান্ত প্রায় ৮ কোটি মানুষের
 মধ্যে প্রায় ৫০% জানেনই না যে তাঁদের এই রোগটি আছে । অনুন্নত দেশগুলিতে এই অজ্ঞতার অনুপাত আরও বেশি হতে পারে।  প্রাথমিক পর্যায়ে গ্লুকোমার কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না বলেই সময়মতো চিকিৎসা না হওয়ার কারণে গ্লুকোমা অন্ধত্বে পরিণত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাইলেটেড চক্ষু পরীক্ষাই হলো গ্লুকোমা শনাক্ত করার সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। তবে এখনও খুব বেশি মানুষ এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতন এমনকি অবগত-ও নন।  ক্যান্সার এবং হৃদরোগের পর অন্ধত্ব-ই তৃতীয় সর্বাধিক  স্বাস্থ্যগত উদ্বেগ। অনেকেই ভাবেন যে, গ্লুকোমার লক্ষণগুলো হয়তো সহজে চোখে পড়ে এবং  এটি সহজে চিকিৎসাযোগ্য। অনেকে জানেনই না এই ব্যাধির চরম পরিণতি হতে পারে দৃষ্টিশক্তিহীনতা। অনেকেই  গ্লুকোমার নাম শুনেছেন,  কিন্তু রোগটির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক অবহিত নন।

সেই কারণেই "বিশ্ব গ্লুকোমা সপ্তাহ" পালনের মাধ্যমে অর্ধপরিচিত এই রোগটি সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা প্রচারের প্রয়াস নেওয়া হয়।


ওপেন-অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। এটিই এই রোগের সবচেয়ে সাধারণ রূপ। প্রায় সকলেরই  গ্লুকোমা হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে আর কোনো চিহ্নিত পূর্বলক্ষণ ছাড়াই এই ওপেন-অ্যাঙ্গেল গ্লুকোমা দেখা দেয় । কোনো ব্যথা বা যন্ত্রণা হয় না যে আমরা বুঝতে পারব রোগটি হতে চলেছে। একটু একটু করে দৃষ্টিশক্তি কমতে থাকে- যা থেকে বুঝতে পারা সম্ভব নয় যে আমরা গ্লুকোমার মতো রোগের দিকে এগোচ্ছি।

গ্লুকোমাজনিত অন্ধত্ব প্রতিরোধ
করা সম্ভব। গ্লুকোমা সাধারণত গুরুতর পর্যায়ে না পৌঁছানো পর্যন্ত কোনো সতর্কবার্তা দেয় না।  কিন্তু এটি দৃষ্টিশক্তির যে ক্ষতি করে তা ক্রমাগত চলতে থাকে এবং চিকিৎসার অভাবে  নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই চিকিৎসার মাধ্যমে এই ক্ষতি রোধ করা সম্ভব। সেজন্য যত তাড়াতাড়ি রোগ নির্ণয় করা যায়, তত বেশি দৃষ্টিশক্তি বাঁচানো সম্ভব হয় এবং চিকিৎসাধীন ব্যক্তির অন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তত কম থাকে।  নিয়মিত সাধারণ চক্ষু পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন হলেও রোগটি দ্রুত শনাক্ত হতে পারে এবং ফলস্বরূপ দৃষ্টিশক্তি বাঁচাতে সাহায্য করে।

সাধারণ চোখের পরীক্ষা করার সময়েই ডাক্তারবাবুরা চোখের স্নায়ুর আচরণ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করেন চোখের ভেতরের চাপ অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে কি না। এই বৃদ্ধির কারণে গ্লুকোমা রোগ হতে পারে।  গ্লুকোমা ঠিক সময়ে ধরা না পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে   সরাসরি বহু টাকার চিকিৎসা ব্যয়ের দায়ে জড়িয়ে পড়তে হয়। এছাড়াও রোগ নির্ণয় পরীক্ষা, ওষুধ বা প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের বিষয়ও রয়েছে।  মনে করা হয়  প্রতি বছর ১০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ গ্লুকোমার কারণে চিকিৎসকের কাছে যান।

যদিও গ্লুকোমার এখনও কোনো প্রতিকার নেই, চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ক্রমাগত  গবেষণা আমাদের আশা জাগায়।  
স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের গবেষকরা নানান উদ্ভাবনী ঔষধ প্রয়োগ পদ্ধতি, লেজার থেরাপি এবং কম কাটাছেঁড়ার অস্ত্রোপচার পদ্ধতি সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন  যাতে গ্লুকোমার মতো রোগকেও নিরাময়ের সীমানায় নিয়ে আসা যায়। তাঁদের সহযোগিতা করতে আমাদের অবশ্যই উচিত নিজেদের অমূল্য চোখদুটিকে নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে পরীক্ষা করানোর কষ্টটুকু স্বীকার করা।

 গ্লুকোমা সপ্তাহের লক্ষ্য হোখ আমজনতার দৃষ্টিশক্তির সমস্যার প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ।  এটা করা গেলে  দৃষ্টিশক্তি হ্রাস বা গ্লুকোমাজনিত জটিলতার মতো গুরুতর সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা শুধু আমাদের শুধু আমাদের দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখতে সাহায্য করে না বরং এর ফলে   ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো শারীরিক অসুস্থতার লক্ষণও শনাক্ত করা যায়। অঙ্গ হিসাবে  চোখ কীভাবে কাজ করে সে সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং দৃষ্টিশক্তির যেকোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করা আপনাকে সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে সক্ষম করে, যা প্রয়োজনে সঠিক যত্ন এবং চিকিৎসা নিশ্চিত করে।

অন্ধত্ব এড়াতে আজীবন এই রোগের প্রতিরোধ ও পর্যবেক্ষণ করে চলতে হয়। প্রাথমিক রোগ নির্ণয়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই চোখের পাওয়ার পরীক্ষা করতে গিয়ে স্নায়ুর প্রক্ষেপণে সামান্য বিচ্যুতি পেলেই ডাক্তারবাবুরা গ্লুকোমার জন্য নির্দিষ্ট টেষ্ট করাতে বলেন। আমাদের অতি অবশ্যই তা মান্য করা উচিৎ।  একমাত্র যাঁরা নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে চোখের পরীক্ষা করান তাঁরাই বুঝতে পারেন এই রোগ হয়ে থাকতে পারে, নিশ্চিত হওয়ার জন্য ডাক্তারবাবুরা টেষ্ট করতে বলেন।

এখনও পর্যন্ত গ্লুকোমার কোনো নিরাময় নেই। ওষুধ আর প্রয়োজনে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে দৃষ্টিশক্তির ক্রমাবনতির প্রতিরোধ করা যেতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে নিয়মিত চিকিৎসায় দৃষ্টিশক্তি হ্রাস রোধ করা গেলেও গ্লুকোমা পুরোপুরি নিয়াময়যোগ্য নয় আর তাই রোগীর দৃষ্টিশক্তি কখনোই  রোগগ্রস্ত হওয়ার আগে যেমন ছিল তেমন শক্তিশালী অবস্থায় ফেরানো যায় না।  

সেইকারণে সচেতনতাই পারে চোখের আলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে। সামাজিকভাবে, সংগঠিত উপায়ে গ্লুকোমা প্রতিরোধের প্রয়াস নেওয়া প্রয়োজন। নীরব দৃষ্টিশক্তিহরণকারী রোগটির প্রতিরোধে প্রয়োজন চক্ষু পরীক্ষা শিবির আরো বেশিমাত্রায় সংগঠিত করার সদিচ্ছা এবং চিকিৎসকের উপর ভরসা রাখার যুক্তিসন্মত মানসিকতা অর্জন।

Post a Comment

0 Comments