জ্বলদর্চি

চূর্ণীকে লেখা চিঠি" নিয়ে লিখলেন চিত্রা ভট্টাচার্য্য

"চূর্ণীকে লেখা চিঠি" নিয়ে লিখলেন চিত্রা ভট্টাচার্য্য 

(কবি অরুণ দাসের লেখা কবিতার বই টি সম্পর্কে পাঠ প্রতিক্রিয়া )

'' চূর্ণীকে লেখা চিঠি;'' সুপ্রসিদ্ধ কবি অরুণ দাস মহাশয়ের নাতিদীর্ঘ অনুকবিতার সংকলনের  প্রতিটি কবিতার পাতায় মনোনিবেশ করলাম। সুন্দর সুললিত ভাষায় কথার মালা গেঁথে ছোট্টছোট্ট দৃশ্যের কাব্যিক চিত্রের পরিবেশনা গভীরভাবে পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করলো। আধুনিক কবিতার অবয়বে প্রেমিক কবি তার কবিতায় আদ্যন্ত প্রেমকে সযত্নে মুড়ে রেখেছেন নরম পালকের অসংখ্য আস্তরণের আড়ালে ,বহির্জগতের রূঢ় বাস্তবের কঠিন আঘাত যেন তাকে বিন্দু মাত্র বিচলিত না করে। কবির সূক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ,এমন চেতনার কোমল মনোরম প্রকাশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চিত্তাকর্ষক দৃশ্য ও নিবিড়তার সাথে প্রেমের আত্মিক যোগ, প্রতিটি  কবিতায় এমন নিগূঢ় আবেদন ও  তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হৃদয়ে সাড়া জাগায়।

কবিতার বইটির নাম ও প্রথম দর্শনে মনে হয়েছিল        '' চূর্ণী কে লেখা চিঠি '' বইটি  যেন কোনো ব্যর্থ প্রেমের কাহিনি। মানসিক ক্ষোভ এবং ইপ্সিত কে না পাওয়ার বেদন ভরা আঘাতের ব্যাকুলতা। কিন্তু সে ভুল ভাঙলো।  আদ্যন্ত প্রেমময় বইটির প্রতিটি পাতায় পরতেপরতে প্রকৃতির অপরূপ ক্যানভাসে সাজানো ছোট্টছোট্ট দৃশ্যের কাব্যিক পরিবেশে এক চিরন্তন প্রেমের আর্তি। কবি কল্পনায় ,--''স্নিগ্ধ কাশের মেঘ মেখে থাকি বর্ষাভীরু চোখে। আধো ঘুম অন্ধকারে।'  এক নিমেষে মন কে উতলা করে নিয়ে যায় কোন নিরুদ্দেশে। অদৃশ্য এক মায়াজালে জড়িয়ে টেনে নিয়ে চলে প্রথম থেকে শেষ দৃশ্যপট পর্যন্ত জীবনের জাগতিক চাওয়া পাওয়ায় । মানব চেতনার মেল বন্ধনে এক অপার্থিব সৌন্দর্য কাব্য গ্রন্থটি জুড়ে রয়েছে । হৃদয়ের অন্তস্থলে প্রেমের চোরা স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে এক অনন্তলোকে। অদ্ভুত সুরের মায়ার অনুরণন বেজে ওঠে বীণার তারে।  🍂

পাতা উল্টে প্রথমেই একনজরে চোখে পড়লো তিনটে নাম দিয়ে সাজানো সূচিপত্র --'না বলেছে হৃদয়লীনা '/  ' হৃদয়ে লেখা ডায়েরি '/এবং সব শেষে 'চূর্ণী,সে সব মুগ্ধদিন। মুগ্ধ রাত।' আধুনিক ছন্দের বন্ধন বা কবিতার ভাষায় চূর্ণীকে লেখা চিঠি তে খুঁজে বেড়াই প্রিয়তমের গোপন পত্রালাপ। অজস্র অনুচ্চারিত প্রেমের মালা গাঁথা।  না ---এ অতি ভ্রান্ত ধারণা ! কবিতার গভীরে  অবগাহন করে দেখি এ যেন শুধুই প্রেম পত্র নয় পুরো সংকলন টি  বিশ্বজনীন এক প্রেমের অভিজ্ঞান।  শব্দের ব্যবহারিক প্রয়োগ কৌশলে সুক্ষ রুচির পরিচয় নব প্রজন্মের কবিদের অবশ্যই প্রাণিত করবে। 

কবিতা কে নিয়ে কেমন করে পরমচেতনার আশ্বাসে শিল্পের সুউচ্চ মার্গে পৌঁছোনো যায় কবি যেন হাতে কলমে শেখালেন তার অনুভব।অপরূপ নান্দনিক বিশ্লেষণে কবি লিখলেন  --''পাতার মাঝে রাখা ,বর্ণ হীন বুক / বুকের মাঝে পলাশ রাঙা স্বপ্নের ক্ষরণ। ''সমুদ্রমন্থন শেষে কণ্ঠে নীলাকাশ মেখে নেমে এলো সেই নারী। -শেষ বসন্তের নারী।' পংক্তিটির প্রতিটা শব্দ পরিমার্জিত ভাষায় পাঠকের মন ভীষণ ভাবে আকৃষ্ট করে মননে ও  নিবিড় ছায়াঘনায়  ।       

   জোৎস্না ভেজা চাঁদের আলোয় প্রিয়তমাকে কবি আবিষ্কার করলেন প্রকৃতির অপরূপ রূপের মাঝে --''তোমাকে নির্মাণ করি অভিমানী জোৎস্নায় / একদিন উড়তে উড়তে ছুঁয়ে ফেলি তোমায়।' কিম্বা অকপটে প্রেমিক কবি বললেন ''  মেঘ খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে যাই মেঘে। নিয়ম না মানা চিঠিরা জমে ওঠে ওড়নায়। সাবধানী হয়ে উঠি লাজুক শব্দে। '' এ এক কবি প্রাণের শৈল্পিক নিপুণতায় সাজানো প্রেমিকের মনের অসংকোচে প্রেম নিবেদন।  শিল্প সাহিত্য কাব্যের আঙিনায় আপন মাধুর্যে স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার জন্য একজন সচেতন স্রষ্টা কবি অরুণদাসের নিপুন অনুশীলন। তিনি অকপটে লেখেন '' লীনা ,নিঃসঙ্গ  ছায়ারা কোনোদিন ভেজালে তোমায় , শান্ত হয়ো তুমি আমারই হাত ছুঁয়ে। ''প্রেমিকাকে সর্বস্ব উজাড় করে ভালোবেসে কবির  নিঃস্বার্থ আত্মনিবেদন। ---''এই আমি নষ্ট প্রজাপতি ,আর তুমি ,দিশেহারা পৃথিবীর খেয়ালী জোনাকী।' 

   শিল্পী কবির এ যেন কাব্য রাজ্যে নিজেকে উৎসর্গ করার এক মূল্যবান উপক্রমণিকা। কবিতা লেখার অবসরে চেতনার জগৎ কে করেছেন সুদূর প্রসারিত। তার মতে ''জলছবি ছুঁয়ে থাকে পাহাড়। মূর্ত বিমূর্ত নদী কুয়াশা মেঘ মাখা অনামী শরীর জুড়ে ''--দৃশ্য সৃষ্টি তে ভাষার কৌশলে ও দর্শন শাস্ত্রের  প্রয়োগে শান দিয়েছেন যেন অবিরত। এবারে অনায়াসে হেঁটে যেতে পারেন পথহীন পথে।  তিনি যে দেখেছেন '' সমুদ্রের মধ্যে গড়ে ওঠা সমুদ্র বৃষ্টি ভেজা স্বপ্নের এক অশান্ত হাত।'' কাব্য রসিকের কবিতার জগৎ জুড়ে এক নব দিগন্তের দ্বার উন্মোচিত হলো। কবি যেন তার প্রচ্ছন্ন ভাষার ব্যবহারিক প্রয়োগে বোঝালেন নব্যযুগের কবিদের কবিতা রচনার অভ্যাসে থাকবে নিবিড় প্রয়াস।  অন্তরের অন্তস্থল স্পর্শ  করবে কাব্যের স্বপ্নময় কাল্পনিক জগৎ আর কবিতার ভাষার অবিচ্ছেদ্য মিলনে চলবে অহর্নিশ যাপন। 
 ''এ শহর ও মৃত কোনো ভ্রমণের দিন হয়ে ওঠে। '' কবিতা সঙ্কলন টি  নিশ্চিত রূপে পাঠক মনে সুদৃঢ় আসন পেতে আপন অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। কবি লিখলেন ,''তোমাকে নির্মাণ করি কুমারী পাতায় ''---রোদহীন ---একদিন শূন্য হলে,রেখে যাবো নির্জন শহর তোমার জন্য''। 

 মনে অপার্থিব এক শিহরণ জাগে যখন পড়ি ,''আস্ত পাহাড় ও মেঘ সাজিয়ে দিই নদীর গভীরে। অভিমানী রাতে খেয়ালী চাঁদ ভাসে। ঝর্ণা বিছিয়ে দেয় পথ। ''বা জোৎস্নাডুব  জোনাকীরা ছুঁয়ে থাকে স্বপ্ন রাত। আর জন্মাবো না বলেই চিনে নিই বুনো গন্ধে ম-ম মৃত্যু। ''---- 

 অথবা  ''বুকের মধ্যে মূর্তহীন তোর মূর্তি। মনমরা মুহূর্ত। এঁকে রাখি ---চাঁদ ভেজা মেঘ। ----স্রোতহীন স্বপ্ন বুনি রূপসী রাতে।''

কবিতার প্রতি অসীম মমতা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় কবিতাকে জয়ের মালা পরালেন। এক আভ্যন্তরিক তাগাদার  প্রয়োজন প্রতিপলে অনুভব করলেন ,'' চূর্ণী --এই সমুদ্র চিনে নেয় গোধূলি। গোধূলি আকাশ। মুগ্ধ পাখিরা মাখে দিন শেষের আলো। আর তোকে ছুঁয়ে হারিয়ে যাওয়া নিভৃতে নিবিড় অন্ধকারে। ''পরবর্তী অংশেই লেখেন '',বুকের মধ্যে যতটা অন্ধমেঘ জমলে ,স্বপ্ন ছুঁয়ে হারিয়ে যাওয়া যায় তোর ঘুমের অতলে। ''

স্পর্শ কাতর প্রেমিক কবি নিরন্তর স্বীয় বিশ্বাসে প্রেম কে ঢেকে রেখেছেন  অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও রূপের প্রকাশ ঘটেছে অনাড়ম্বর ভাষায় রচিত দৃশ্যকাব্যে। তার এই অনুকবিতা ভাবনা বিশ্বকাব্যের দরবারে এক নতুন অভিমুখ দিয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থ  নিশ্চিত রূপে ঐ জেডযুগের কাব্য ধারায় অবশ্যই এক কালজয়ী অন্যতম সংযোজন। 

আমি কবিতার সমালোচক নই , একজন অতি সাধারণ পাঠক।  ''এমন নিখুঁত প্রেমের কাব্য দর্শন নিয়ে লেখা বইটির আদ্যপ্রান্ত আলোচনায় কী  লিখবো ? বা লেখার যোগ্যতা কত টুকু আমার আছে ? জানিনা। তবে বইটি যে সর্বাঙ্গ সুন্দর এবং প্রতিটি কবিতা যে অত্যন্ত মনোগ্রাহী বারবার পড়েও মনের মাঝে যে অনবদ্য ভাবের গুঞ্জন তোলে তা নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য।  কবি অরুণ তার  বই টি কে মনোগ্রাহী করে পাঠকের দরবারে শ্রেষ্ঠ আসনে বসাতে গভীর দর্শন সূক্ষ্ণ অনুভূতির চড়াই উৎরাই ডিঙিয়ে শেখালেন এ কবিতা আসলে এক অমূল্য হৃদয়ের অনুভূতি।

Post a Comment

0 Comments