জ্বলদর্চি

গুচ্ছ কবিতা : চাঁদের আলোতে/কমলিকা ভট্টাচার্য

গুচ্ছ কবিতা : চাঁদের আলোতে
কমলিকা ভট্টাচার্য


পূর্ণিমা

পূর্ণিমা উঠলেই আকাশে দুধ-আলো নামে না—
তোমার অনুপস্থিতির সাদা সত্যি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।

আজ চাঁদ গোল নয়,
সে আমার অমোচনীয় অপেক্ষার সিলমোহর।

তোমাকে মনে করে
আমি তোমারই ছবি আঁকি—
জ্যোৎস্না তখন,
তোমার সুখ হয়ে নিঃশব্দে ঝরে আমার ভিতরে।

রাত নদী হয়ে যায়,
আমি তার নির্জন ঘাট;
তোমার স্মৃতি জোয়ারের মতো
বারবার এসে ভাসিয়ে নেয় আমাকে।

হাওয়া জানে—
আমফুলের গন্ধে আজও ভিজে থাকে আমার কোকড়ানো চুল।

পূর্ণিমা মানে আকাশে চাঁদ নয়,
আমার ভিতরে তোমার পূর্ণ হয়ে ওঠা।


দুটি সমুদ্রের আয়না

রাতের সমুদ্রে ফসফরাস মেখে
যেমন হঠাৎ জ্বলে ওঠে ঢেউ,
তেমনই একদিন আয়নায় দাঁড়িয়ে
দেখলাম—আমার চুলের অন্ধকারে
কয়েকটি সাদা জোনাকি।

কতদিন নিজেকে দেখি না!
অন্যের চোখের কাঁচে ভেসে থাকা মুখটাই
নিজের ভেবে বয়ে বেড়িয়েছি—

কেউ বলেছে চোখ সুন্দর,
কেউ বলেছে আঙুলের ভঙ্গি,
কেউ বা মনের প্রশংসায় আলতো হাত রেখেছে—
তাদের কথাগুলো শঙ্খের মতো কানে বেজে থেকেছে বহুদিন।

কিন্তু আয়না সেদিন বলল—
“তুমি তো এতদিন নিজের ভেতর ঢোকোনি।”
পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল বহু ‘আমি’—
বয়সে বদলে যাওয়া, অভিমানে নীরব,
আনন্দে দীপ্ত, অপেক্ষায় ক্লান্ত।

হঠাৎ নিজেকে সুন্দর লাগল।

নিজের হাতে আঁকা নিজের মুখ
ঝুলিয়ে দিলাম দেওয়ালে, সময়ের মতো স্থির।
অথচ মুহূর্তেই এলো ছোট্ট উচ্চারণ—
“মা, এ কেমন হারিয়ে যাওয়া মানুষের ছবি?”
সেই কণ্ঠ ছিল আয়নার চেয়েও স্বচ্ছ।

আমি ছবি বদলে দিলাম,
কিন্তু বুঝলাম—
ছেলে কষ্ট পেয়েছে,
কারণ সে আমাকে দেখে এখনো পূর্ণিমার মতো,
আমি দেখি নিজেকে ক্ষীয়মাণ চাঁদ।
সেদিন শিখলাম—
নিজেকে দেখা আর
প্রিয়জনের চোখে নিজেকে দেখা
দুটি আলাদা সমুদ্র।

একটিতে ফসফরাস মাখা ঢেউ জ্বলে ওঠে নিঃসঙ্গ আলোয়,
আরেকটিতে জোছনা থাকে
অটুট, অক্ষয়, ভালোবাসার জলে।
🍂

সন্ধ্যাদীপের আলোয় চাঁদের মুখ

সন্ধ্যাদীপ জ্বালাতে গিয়ে দেখি—
প্রতিপদের চাঁদ আজ হৃদয়ের আকারে ধুকপুক করছে,
মেঘেরা তাকে ধীরে ধীরে গলিয়ে দিচ্ছে কি?
যেন স্মৃতির ভেতর রাখা সাদা কোনো অক্ষর।

আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে
সে ভেসে যায় বাতাসের গোপন ইশারায়,
দুষ্টু হাওয়া তার কানে কী মন্ত্র ফিসফিস করে—
আমি শুনতে পাই না,
তবু অনুভব করি, আমাকে বাদ দিয়েই
কোনো প্রাচীন সমঝোতা হয়ে গেছে তাদের।

অরণ্যের দিকে টেনে নেওয়া সেই আলো
পাতার আড়ালে আড়ালে ভেঙে পড়ে—
যেন উপেক্ষার সূক্ষ্ম শাস্তি
ধীরে ধীরে নেমে আসে আমার বুকে।

চাঁদটি বলে যায়—
“আনন্দ!বড় আনন্দ!
তুমি কেবল শব্দের কারিগর,
আমার নিঃশব্দ সাজের কাছে তোমার ভাষা অচল।”

আমি হাত বাড়াই, ডাকি—ফিরে এসো!
আমার কণ্ঠ মেঘে আটকে যায়,
বাতাস তা ছিঁড়ে নিয়ে যায় অচেনা দিকে।

তখন দেখি—
দীপের শিখায় আমার ছায়া কাঁপছে,
সে ছায়া আমার নয়,
সে এক অনভিপ্রেত কবি,
যে শব্দের ভিতর লুকিয়ে থাকতে থাকতে
নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে।

আকাশের কালো পিঠে
চাঁদের হৃদয়-ছাপ মুছে যেতে থাকে,
আর আমি বুঝতে পারি—
আমি চাঁদকে সাজাইনি কোনোদিন,
চাঁদই আমাকে সাজিয়ে রেখে গেছে এতকাল।
আমি কি তবে কেবলই এক কবি?
না কি এক অনুবাদ,
যাকে আলো নিজের ভাষায় লিখে রেখে গেছে?


সমুদ্রসৈকতে

বালুকাবেলায় নেমে আসে গোধূলির নীল,
ঢেউয়ের ঠোঁটে লেগে থাকে নোনতা অবাক হাসি;
তোমার হাত ধরলেই জোয়ার বাড়ে চুপিসারে,
হৃদয় তখন শঙ্খ হয়ে শোনে জলের ভাষা রাশি।

দিগন্ত জুড়ে লালচে আলো গলে পড়ে ধীরে,
আকাশ যেন তোমার ওড়না মেলে দেয় বাতাসে;
চুলের ফাঁকে আটকে থাকা লবণাক্ত হাওয়া
আমার নাম লিখে যায় নরম অনাবিল আশ্বাসে।

পায়ের ছাপে জোড়া গল্প ভিজে ওঠে বালিতে,
ঢেউ এসে পড়তে চায় আমাদেরই অনুবাদ;
তোমার হাসি জোনাকির মতো জ্বলে নীল সন্ধ্যায়,
চোখে চোখে জেগে ওঠে লুকোনো সমুদ্র-স্বাদ।

দূরে কোনো নৌকা ফেরে আলোর বিন্দু বুকে,
আমরা বসে গুনি শুধু নক্ষত্রের দোলা;
তোমার কাঁধে মাথা রাখলেই বুঝি—
সমুদ্রও শেখে ভালোবাসা, তীর যদি পায় খোলা।

Post a Comment

6 Comments

  1. খুব সুন্দর। ❤️

    ReplyDelete
    Replies
    1. কমলিকাApril 11, 2026

      Thank you♥️

      Delete
  2. চারটি কবিতাই এক পেলবতার অনুভূতি বয়ে আনে।

    ReplyDelete
  3. Ma'am apnar kobita porle somporke nutun kore biswas prem fire ase.
    Bhalo thakben.

    ReplyDelete