জ্বলদর্চি

বরুণ /ভাস্করব্রত পতি

বাংলার ঘাস পাতা ফুল ফল, পর্ব -- ১১৯
বরুণ

ভাস্করব্রত পতি

হিন্দু ধর্মে বৃষ্টির দেবতা হলেন বরুণ। কোনও কারণে অনেকদিন বৃষ্টি না হলে মানুষের দুর্ভোগ বাড়তো। তখন এই বৃষ্টির দেবতা বরুণকে যে ফুল দিয়ে পূজা করা হত, সেটাই বরুণ বা বরুণা ফুল। 

এই গাছের আদিভূমি অষ্ট্রেলিয়া, জাপান, আফ্রিকা, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল। তবে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে একে দেখা যায়। সাধারণত জলাভূমি, রাস্তার ধার, নদীর পাড় কিংবা নিচু এলাকায় জন্মায়। মন্দিরের সামনেও লাগানো হয়। জলসংলগ্ন এলাকা এর বেড়ে ওঠার জন্য অন্যতম উপযোগী স্থান। এর ডাল কেটে লাগালে নতুন চারাগাছ জন্মায়। তবে গ্রামবাংলায় সচরাচর দেখতে পাওয়া যায়না। 
বরুণ ফুল

এই বসন্তে ভরা যৌবনে ডগমগ হয়ে ওঠে বরুণ বৃক্ষ। সুগন্ধি ফুলে ভরে ওঠে গাছের ডালপালা। পুরো গাছ জুড়ে ফুলে ফুলময়। বৈশাখ মাস পর্যন্ত ফুলের রমরমা থাকে। ফুলের আধিক্যহেতু গাছের পাতা দেখা যায়না। এটি একটি পর্ণমোচী বৃক্ষ। যৌগিকপত্র পরিলক্ষিত হয়। তিনটি করে পাতা থাকে। বেলপাতার মতো ত্রিপত্র। পাতার উপরিভাগ চকচকে, কিন্তু নিচের অংশ ফ্যাকাশে। এই গাছ মোটামুটি ১০-১৫ মিটার উচ্চতার হয়। 
বরুণ গাছের পাতা ও ফুল

Capparaceae পরিবারের অন্তর্গত বরুণ বৃক্ষের বিজ্ঞানসম্মত নাম Crateva religiosa। ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে এই গাছের সঙ্গে। তাই এরকম নামকরণ। এছাড়াও এর আরও যেসব প্রজাতির নাম পাওয়া যায় সেগুলি হল --
Crateva nurvala  
Crateva brownii 
Crateva hansemannii 
Crateva macrocarpa 
Crateva membranifolia 
Crateva speciosa 

বরুণ বৃক্ষকে সংস্কৃতে বরুণা, শিখীমণ্ডল, গন্ধবৃক্ষ, তিক্তশাখা, সেতুবৃক্ষ, কুমারক, সাধুবৃক্ষ, মরুতাপ, তিক্তবৃক্ষ, শ্বেতদ্রুম, হিন্দিতে বর্ণা, বরুণ, বাংলায় বরুণ গাছ, তিক্তশাক, ওড়িয়াতে Boryno, কন্নড়ে Narumbela (Naruve), Neruvala (Neruvala), গুজরাটিতে Barano, Kagdakeri, নেপালীতে Sipligein, মারাঠীতে Vaivarna (Vavavarna), কোঙ্কণিতে Narwala, Nervol, পাঞ্জাবীতে Varna, Barna, মালয়লামে Varana (Varana), Neerwala (Nirvala), তামিলে Maralingam, Marilinga, তেলুগুতে Uskia, Urumatti, Magakshalgam, Mavilingam, ইংরেজিতে Three leaved Caper, Sacred Garlic Pear, Temple Plant, Spider Tree বলে। এটি গার্লিক পিয়ার ট্রি নামেও পরিচিত।
ফুল ভর্তি বরুণ গাছ

গাছ জুড়ে বড় বড় থোকা থোকা সাদা বা বেগুনি রঙের ছোপযুক্ত সুগন্ধি ফুল ফোটে। ফুলের বোঁটা ৩-৫ সেমি লম্বা। পাঁপড়ির সংখ্যা পাঁচটি এবং সেগুলি মুক্ত। পুংকেশরচক্র ও গর্ভকেশরচক্র সুন্দর বিন্যাস তৈরি করে পাঁপড়ির মাঝে উন্মিলিত থাকে। বিভিন্ন ধরনের পাখি ও পতঙ্গদের কাছে এই ফুলের আকর্ষণ খুব। এদের শক্ত এবং শাঁসালো ধরনের ফলগুলি গোলাকার বা ডিম্বাকার দেখতে হয়। যা ৩-৫ সেমি চওড়া। 
পাঁশকুড়ার সাহড়দা গ্রামে লাল মোরামের রাস্তার পাশে রূপের পশরা সাজিয়ে বরুণ বৃক্ষ

বরুণ একটি অন্যতম ওষধি বৃক্ষ। আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে এর ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। একসময় মানুষ এই গাছের পাতা দিয়ে কাঁচা ফল পাকানোর ক্ষেত্রে ব্যাবহার করত। পরবর্তীতে ফল পাকানোর জন্য ক্যালসিয়াম কার্বাইড এবং নানাবিধ হরমোন জাতীয় উপাদান বাজারে এসে যাওয়ার দরুন এই বরুণ গাছের কদর কমে গিয়েছে অচিরেই। 

এদের ফুলের বড়া ভাজা খুব উপাদেয়। গাছের ছালও নানা রোগের নিরসনে ব্যবহৃত হয়। মানবদেহের কিডনি ও গলব্লাডারে পাথর তৈরি হলে তা দূর করতে সাহায্য করে এই গাছ। এর পাতা গরম করে সেঁক দিলে গেঁটেবাতের ব্যথা থেকে উপশম মেলে। এছাড়াও নানা ধরনের চোখের সমস্যা, অর্শ রোগ, রিউমাটয়েড আর্থাইটিস, গাঁট ফোলা, পেটের সমস্যার সমাধানে বরুণা গাছের ব্যবহার লক্ষ্যনীয়।
🍂

Post a Comment

0 Comments