জীবনে কিছু কথা শেষ হয়েও শেষ হয় না। স্মৃতির আশ্রয়ে মনের গভীর অনুভূতিময়তায় সেসব কথার নিরন্তর চোরাস্রোত বয়ে যায় আজীবন। শ্রদ্ধেয় কবি সিদ্ধার্থ সাঁতরা বিরচিত "লেবুফুল গন্ধরাজ তুমি" গ্রন্থের কবিতারাশি পড়ে যেসব উপলব্ধি আমার হয়েছে, লেখনির অভিসম্পাতে তা ব্যক্ত করছি। সেসব উপলব্ধি কতটা সঠিক ভাবগ্রাহী হতে পেরেছে, তার বিচার অজানার সরণিতে অপেক্ষিত রেখেই উপলব্ধিটুকু দিয়েই শব্দ রাশি সম্ভারে ভাবসমুদ্রে সেতুবন্ধ করলাম। অনভিপ্রেত ভুল ত্রুটি মার্জনীয় হবে আশা রেখে, গ্রন্থটির আলোচনায় আলোকপাত করলাম।
আমরা "কথার কথা" বলে,এমন অনেক কথা বলে ফেলি,যেগুলো কথার কথা না হয়ে অনেক বেশি কিছু হয়ে যায়। কথারা অনেক সময়ই মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। একটা মানুষ কেমন, তার অনেকখানি ভাবরূপ তার আচরণ ও কথাবার্তায় ফুটে ওঠে। কবি সিদ্ধার্থ সাঁতরা একদম সঠিক বলেছেন-" কথাদের এত শোক, এতটা বিষাদ /তবু মনে হয় এই সন্ধে, গোধূলির বিবর্ণ জীবন যেন ক্যানভাসে আঁকা ঠিক নিজের মতন... "।
সময়ের খেয়ালি পথ বেয়ে ব্যক্তি চলে যায়, বদলে যায় তার অস্তিত্ব- উপস্থিতি। কিন্তু স্মৃতি! সে তো কখনো আবছা কখনো জ্বলজ্বলে হয়ে মনের ঘরে আনাগোনায় রেখে যায় তার অমলিন অপরিবর্তন উপস্থিতি। ব্যক্তির অস্তিত্বের পরিবর্তনে স্মৃতিরা বড্ড অসহায় হয়ে পড়ে। পরিবর্তনের কঠোর বাস্তব কখনো কখনো মেনে নিতে পারে না মন। তাই সে আর্তি জানায়- "স্মৃতি হয়ে থেকো তুমি আজীবন, মনের ভেতর..."।
হৃদয়ের সব কথা বলার মত ভাষা খুঁজে পায় না ব্যক্তি। আবার অনেক সময় পরিস্থিতিও অনুকূল থাকে না। তাই কবির কথায় সুর মিলিয়ে বলতে হয়, "বলি বলি করে অনেক কথা না বলা হয়ে রয়ে গেছে এখনও..."। প্রকৃতই এই এক জীবনে সব কথা বলা হয় না- অসম্পূর্ণ কথার স্রোত অনেক সময় বাষ্পীভূত জলরাশির মতো রূপান্তরিত হয়ে যায় অনুভবের নিবিড়তায়।
🍂
হাজার ভিড়ের মাঝেও মানুষ কখনো কখনো নিজেকে একা অনুভব করে। কারণ সব ভিড় শুধু ভিড় হয়েই থেকে যায়,মনের নিস্তব্ধতা ভেঙে কোলাহল আনতে অপারগ হয় ওই ভিড়। কবির মত উদ্ধৃত করে বলা যায়, "কথা বলেনি শূন্যতা"।
কবির সাধারণ শব্দ সম্ভারে অসাধারণ সব উপলব্ধি ব্যক্ত হয়েছে গ্রন্থটিতে। কবি বলেছেন, "জানতে চাইলে প্রশ্ন করো/ উত্তর না দিলে পূর্ণতা পাবে কী?" অসাধারণ! প্রশ্ন করে ব্যক্তি, কিন্তু উত্তরটা চায় তার মত হোক্। আর তা না হলেই অসন্তুষ্টি। কিন্তু তাহলে প্রশ্ন করা কেন? উত্তর যদি জানাই থাকে! বাস্তবিকই 'নিখুঁত জীবন যেমনটা মনে মনে পৃথিবীতে নেই কোনও"- খুব বাস্তবসম্মত কথা। নিখুঁত জীবন এই পৃথিবীতে হয়না- অথচ একথা বুঝেও অবুঝের মতই আমরা নিখুঁত সবকিছু খুঁজে বেড়াই।
"অপেক্ষার শেষ নেই"- জীবনের কাছে মানুষের অসংখ্য প্রত্যাশা আর অপেক্ষাও অন্তহীন। তারই মাঝে কখন যেন অস্থায়ী জীবন তার ইতিকথা লিখে ফেলে-তা নিজেরই অজানা । এই অস্থায়ী জীবনে যেমন অপেক্ষার শেষ নেই- তেমনি রেষারেষিও কম নয়। অশান্তির বিব্রত পটভূমি তো এসবের জন্যই। তাই করির সাথে একমত হয়ে বলা যায়-"ভালো হতো যদি বন্ধ হয়ে যেত যাবতীয় রেষারেষি আমাদের পারস্পরিক..."। সহজ ভাবনাতেই তো আসে সহজ জীবন। মানুষের ঘরে মানুষ তো জন্মায়, কিন্তু মানুষের সাথে মনুষ্যত্ব কিন্তু সব সময় জন্মায় না। তাই সেক্ষেত্রে কবির ভাষায় বলতে হয়-"যদিও সেভাবে/ হয়ত মানুষ হয়ে ওঠা /বাকি রয়ে গেছে এখনও..."- এই মানুষ হয়ে ওঠা তো মনুষ্যত্বেরই দ্যোতক।
মরমী হৃদয় ছুঁয়ে যায় কবি মনের নিঃশব্দ আর্তস্বর-"নিরুদ্দেশ জীবন তোলপাড়, একঘেয়ে বরাবর।" অবশেষে "কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে গালে..."। কখনো বা মন খারাপের সময় বলে ওঠে, "এসময় আর কিছু নেই বুকের ভেতর শূন্যতাটুকু ছাড়া..."কিন্তু তাও, "অনিশ্চিত সময়ের কথা মনেতেই রেখে" স্মৃতিটুকু পাথেয় করে পথ চলতে হয় জীবনের পথে।
0 Comments