জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/কমলিকা ভট্টাচার্য/চতুর্থ খণ্ড/পর্ব ৬: অনিশ্চিত শুরু

বাঁচার উত্তরাধিকার
কমলিকা ভট্টাচার্য
চতুর্থ খণ্ড
পর্ব ৬: অনিশ্চিত শুরু

হাসপাতালের বিশেষ গবেষণা ইউনিটে সেই দিনটা যেন অদ্ভুত ভারী হয়ে ছিল। বাতাসের মধ্যেও একটা চাপা টান অনুভব করা যাচ্ছিল—যেন সবাই জানে, আজকের প্রতিটা মুহূর্ত ভবিষ্যৎকে বদলে দিতে পারে।
ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে ধীরে ধীরে, কিন্তু প্রত্যেকটা মিনিট যেন অস্বাভাবিক দীর্ঘ হয়ে উঠছে। সময় যেন নিজের গতিই হারিয়ে ফেলেছে।
আজই সেই দিন।
যে সিদ্ধান্তের কথা শুনে প্রথমে সবাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।
আজ নাতাশার শরীরে embryo বসানো হবে।
ডক্টর সেন অপারেশন থিয়েটারের বাইরে দাঁড়িয়ে অনির্বাণকে শেষবারের মতো বললেন—
“আমি আবার বলছি, এটা সহজ প্রক্রিয়া নয়।”
তার কণ্ঠে ছিল সতর্কতা, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক ধরনের দায়িত্ববোধও।
অনির্বাণ চুপ করে শুনছিল। তার চোখ স্থির, কিন্তু ভেতরে যেন ঢেউ উঠছে।
ডক্টর সেন আবার বললেন—
“শারীরিক দিক থেকে নাতাশা এখনও পুরোপুরি সুস্থ নয়। গর্ভধারণের চাপ তার শরীর সহ্য নাও করতে পারে।”
কিছুক্ষণ নীরবতার পর অনির্বাণ ধীরে বলল—
“আমি জানি।”
ডক্টর সেন তাকালেন—
“তাহলে?”
অনির্বাণের চোখে তখন অদ্ভুত একটা দৃঢ়তা। ভয়ের সঙ্গে মিশে থাকা বিশ্বাস।
“তবু আমরা চেষ্টা করব।”🍂
এই “আমরা”-র মধ্যে শুধু সে আর নাতাশা নয়—ছিল তাদের সম্পর্ক, তাদের বিশ্বাস, আর তাদের ভবিষ্যৎ।
ঠিক তখন দরজা খুলে নাতাশাকে ভিতরে নিয়ে যাওয়া হল।
সে স্ট্রেচারে শুয়ে আছে, শরীর ক্লান্ত, কিন্তু তার চোখে কোনো ভয় নেই। বরং এক অদ্ভুত শান্ত হাসি—যেন সে নিজের ভিতরেই সব উত্তর খুঁজে পেয়েছে।
অনির্বাণ তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
“এখনও সময় আছে,” সে খুব আস্তে বলল।
নাতাশা মাথা নাড়ল—
“না।”
তার হাতটা অনির্বাণের হাত শক্ত করে ধরল। সেই স্পর্শে ছিল অটল সিদ্ধান্ত।
“এই লড়াইটা আমি শেষ পর্যন্ত দেখতে চাই।”
ইরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার ভিতরে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিল—ভয়, উদ্বেগ, আর এক ধরনের গভীর শ্রদ্ধা। সে বুঝতে পারছিল, এই সিদ্ধান্ত শুধু শারীরিক নয়—এটা এক ধরনের আত্মিক সাহস।
ডক্টর সেন বললেন—
“আমরা শুরু করছি।”
নাতাশাকে অপারেশন থিয়েটারের ভিতরে নিয়ে যাওয়া হল।
দরজাটা ধীরে বন্ধ হয়ে গেল।
বাইরে অপেক্ষা শুরু হল।
অনির্বাণ চুপ করে বসে আছে। তার হাত দুটো শক্ত করে ধরা—যেন নিজেকে সামলানোর শেষ চেষ্টা।
ঋদ্ধিমান পাশে দাঁড়িয়ে, নিরব পর্যবেক্ষকের মতো।
ইরা করিডোরে এদিক-ওদিক হাঁটছিল। তার পায়ের শব্দ নীরবতার মধ্যে আরও স্পষ্ট শোনাচ্ছিল।
মনে হচ্ছিল সময় যেন থেমে গেছে।
হঠাৎ ইরা থেমে বলল—
“তুমি ভয় পাচ্ছ?”
অনির্বাণ একটু হেসে বলল—
“খুব।”
তার এই স্বীকারোক্তিতে কোনো লজ্জা নেই—শুধু সত্য।
ইরা বলল—
“তবু তুমি তাকে থামালে না।”
অনির্বাণ জানালার দিকে তাকিয়ে বলল—
“কিছু মানুষ আছে যারা নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়।”
সে একটু থামল।
“নাতাশা তাদের একজন।”
ঋদ্ধিমান শান্ত গলায় বলল—
“মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আশা।”
ইরা হালকা হাসল—
“তুমি মাঝে মাঝে খুব মানুষের মতো কথা বলো।”
ঋদ্ধিমান বলল—
“হয়তো মানুষের কাছেই শিখেছি।”
এই ছোট ছোট কথোপকথনই যেন অপেক্ষার সময়টাকে সহনীয় করে তুলছিল।
প্রায় দুই ঘণ্টা পরে অপারেশন থিয়েটারের দরজা খুলল।
ডক্টর সেন বেরিয়ে এলেন। তার চোখে ক্লান্তি, কিন্তু মুখে একটা সংযত স্থিরতা।
অনির্বাণ তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়াল—
“কি হয়েছে?”
ডক্টর সেন ক্লান্তভাবে বললেন—
“প্রক্রিয়া সফল হয়েছে।”
ইরার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটল। যেন এতক্ষণ ধরে জমে থাকা শ্বাস একসঙ্গে বেরিয়ে এল।
কিন্তু ডক্টর সেন হাত তুলে থামালেন—
“তবে এখনই কিছু বলা যাবে না।”
তার কণ্ঠে আবার সেই সতর্কতা ফিরে এল।
তিনি বললেন—
“আগামী কয়েকটা সপ্তাহ খুব গুরুত্বপূর্ণ।”
“Embryo শরীরে ঠিকভাবে স্থাপন হয় কিনা… সেটা দেখতে হবে।”
অনির্বাণ ধীরে মাথা নাড়ল—
“আমি বুঝেছি।”
ডক্টর সেন আবার বললেন—
“আর একটা কথা।”
তার কণ্ঠ একটু গম্ভীর হয়ে উঠল—
“যদি শরীর এই গর্ভধারণকে প্রত্যাখ্যান করে… তাহলে পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক হতে পারে।”
এই কথাটা করিডোরে ছড়িয়ে পড়ল। আবার নেমে এল নীরবতা—এইবার আরও গভীর, আরও ভারী।
কিছুক্ষণ পরে অনির্বাণ নাতাশার কেবিনে ঢুকল।
নাতাশা তখন অচেতন ঘুমে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস ধীর, মুখে শান্তি—যেন যুদ্ধের মাঝেও সে একটু বিশ্রাম পেয়েছে।
অনির্বাণ ধীরে তার পাশে বসে পড়ল। তার হাতটা আলতো করে ধরল।
“তুমি সবসময় এমনই ছিলে,” সে খুব আস্তে বলল।
“সবচেয়ে কঠিন পথটাই বেছে নাও।”
তার কণ্ঠে মমতা, অভিমান, আর গর্ব—সব একসঙ্গে মিশে ছিল।
জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যার আলো নেমে আসছে। দিনের শেষ আলোটা ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে—ঠিক যেমন একটা নতুন শুরু ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করছে।
একটা নতুন জীবনের শুরু হয়েছে।
কিন্তু সেই শুরু এখনও খুব অনিশ্চিত।
কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় অলৌকিক ঘটনাগুলো—
সবসময়ই ঝুঁকি নিয়ে আসে।
আর সেই ঝুঁকির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ভবিষ্যৎ,
লুকিয়ে থাকে অজানা সম্ভাবনা,
আর কখনও কখনও—
অবিশ্বাস্য এক আলো,
যা অন্ধকারের মধ্যেও পথ দেখায়।
ক্রমশ..

Post a Comment

0 Comments