মেদিনীপুরের মানুষ রতন, পর্ব -- ২০৩
সুদর্শন খাটুয়া (লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, কবি, কাঁথি)
ভাস্করব্রত পতি
সুদর্শন খাটুয়া। লিটল ম্যাগাজিনের জগতে এক অতি পরিচিত নাম। কিন্তু তিনি নিজে মোটেও প্রচারসর্বস্ব নন। অত্যন্ত ব্যতিক্রমী পার্সোনালিটির এক সম্পাদক। যেখানেই লিটল ম্যাগাজিন মেলার আয়োজন হয়, সেখানেই নির্ধারিত প্যাভিলিয়নে বইয়ের পশরা সাজিয়ে উপস্থিত হন এই সম্পাদক। কোনও দেখনদারী নেই, কোনও আত্মহঙ্কার নেই, কোনও ছলচাতুরি নেই, কোনও আত্মজাহির করার তাগিদও নেই। কেবল তাঁর হৃদয় থেকে উৎসারিত পত্রিকা উচিতমূল্যে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বাসনায় বিভোর এক আপাদমস্তক সাহিত্যানুরাগী ব্যক্তিত্ব।
লিটল ম্যাগাজিনের সম্ভার নিয়ে পত্রিকা স্টলে সুদর্শন খাটুয়া
১৯৬৬ সালের ৪ ঠা মার্চ কাঁথির কঁচুড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা কানাই খাটুয়া এবং মা সরোজিনী খাটুয়া। এক ভাই এক বোন। সংসারের অস্বচ্ছলতা ছিল। ছিল আরও নানা অসুবিধা। প্রথমে মৈশালী ত্রৈলোক্য বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা। ১৯৮১ তে মাধ্যমিক। কাঁথি মডেল হাইস্কুল থেকে ১৯৮৩ তে উচ্চ মাধ্যমিক। এরপর কাঁথি পি. কে. কলেজের ছাত্র হিসেবে গণিত বিষয় নিয়ে ভর্তি হন মেধাবী এই ছাত্রটি। কিন্তু প্রথম দুটি বর্ষ অতিক্রম করার পরে তৃতীয় বর্ষের পাঠ আর শেষ করতে পারেননি পারিবারিক, আর্থিক সমস্যার দরুন। তবে আর অন্যদের মতো অবশ্য সংসারের হাল ফেরাতে অন্য কোনও অর্থকরী কাজে যুক্ত হয়ে পড়েননি। পেটের খিদে প্রশমিত করার ভাবনাতেও চিন্তিত হয়ে পড়েননি। বরং তিনি বেছে নিয়েছিলেন মনের খিদে মেটানোর উপায়কে আঁকড়ে ধরার পথ। ওতপ্রোতভাবে সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। যা তাঁকে হয়তো অনেক অনেক অর্থ পাইয়ে দিতে পারেনি, কিন্তু একজন নিরলস সাহিত্যপ্রেমী হিসেবে পরিচিতিদান করেছে। এই কবিতা, গল্প, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, বই, লিটল ম্যাগাজিনের পথ তাঁকে জীবিকার পাথেয় করতে সহায়ক হয়ে উঠেছে।
পাঁশকুড়া রেলস্টেশনে বসে বসে পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখছেন লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক সুদর্শন খাটুয়া
সেই ১৯৮৭ সালে প্রথম মাসিক পত্রিকা হিসেবে 'দিঘলপত্র' সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশ শুরু করেন সুদর্শন খাটুয়া। যা আজও চলছে সমানভাবে। প্রতিমাসে নিয়ম করে পাঠকস্বার্থে প্রকাশিত করে চলেছেন তাঁর আদরের, স্বপ্নের এবং ভালোবাসার 'দিঘলপত্র'। তাঁর কাছে লিটল ম্যাগাজিন একটা প্রতিষ্ঠান। একটা আন্দোলন। সীমিত সাধ্য নিয়ে মনের যাবতীয় সাধপূরণের অন্যতম মাধ্যম।
সেসময় দিঘলপত্রকে সামনে রেখে তার ভিত্তিতে গড়ে তোলেন নানা সেবাব্রতী কাজকর্ম এবং পরবর্তীতে একটি অনন্য প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। যে সংস্থা ইতিমধ্যে প্রকাশ করে ফেলেছে প্রায় একশোর বেশি নানা ধরনের গ্রন্থ। কাঁথির বুক থেকে পত্রিকা প্রকাশের কাজ শুরু করে যে গতি তিনি পেয়েছেন, তা আজ ফুলপল্লবিত। হাজার সমস্যার ঘেরাটোপে আবদ্ধ হয়েও থমকে যাননি। মুচড়ে পড়েননি। মুসড়ে পড়েননি। রুদ্ধ হয়ে যাননি। খেই হারিয়ে সবকিছু ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাস নেওয়ার ইচ্ছেও হয়নি। বরং বিভিন্ন লেখা সংগ্রহ, সেগুলির টাইপ করা, প্রুফ দেখা, ছাপানো এবং মেলায় গিয়ে তার বিপনন করা -- এভাবেই চালিয়ে যাচ্ছেন লিটল ম্যাগাজিনকে আঁকড়ে ধরে।
নন্দন চত্বরে লিটল ম্যাগাজিন মেলায় সম্পাদকের সঙ্গে
আজ ৪১৮ তম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে দিঘলপত্রের। যা সত্যিই অভিনব। এই মাগ্গিগণ্ডার দিনে ছেদহীন গতিতে তিনি উপহার দিয়েই চলেছেন একের পর এক সংখ্যা। তাঁর দিঘলপত্র তাঁর কাছে অলঙ্কার। তাঁর কাছে অহঙ্কার। তাঁর কাছে স্বপ্নপূরণের চাবিকাঠি। মেদিনীপুরের বিভিন্ন মেলা থেকে শুরু করে কলকাতা বইমেলার লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন, নন্দন চত্বরের লিটল ম্যাগাজিন মেলা, তারকেশ্বর, সুন্দরবন, পুরুলিয়া, বর্ধমান লিটল ম্যাগাজিন মেলায় তিনি হাজির থাকেন নিয়ম করে। দিঘলপত্রের প্রতিটি সংখ্যাই পাঠকসমাজে সমাদৃত। সকলেই অপেক্ষায় থাকেন পরবর্তী সংখ্যা হাতে পাওয়ার জন্য। আসলে দিঘলপত্র কেবল একটি লিটল ম্যাগাজিন নয়। একটা নিরলস সাহিত্য প্রতিষ্ঠান। দিঘলপত্রের কোস্টাল মৎস্যজীবী সংখ্যা
ইতিমধ্যে দিঘলপত্রের বিশেষ সংখ্যা হিসেবে তিনি প্রকাশ করেছেন কোস্টাল মৎস্যজীবী সংখ্যা, দেশপ্রাণ সংখ্যা, লোকনাট্যকার কৃপাসিন্ধু মিশ্র সংখ্যা, কবি তুষার আদক সংখ্যা, চিত্ত সাহু সংখ্যা, নিখিল সামন্ত সংখ্যা, পরশুরাম চন্দ সংখ্যা ইত্যাদি। প্রতিটি সংখ্যাই ছিল মেদিনীপুরের এক অনাড়ম্বর লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদকের লাগাতর পরিশ্রমের ফসল। যদিও আজ পর্যন্ত তিনি কোনও পুরস্কার বা সম্মাননা পাননি। নিতেও চাননি কখনও। আসলে পুরস্কারপ্রাপ্তির ইঁদুরদৌড়ে সামিল হওয়ার মনোবাসনা তাঁর নেই। পত্রিকা প্রকাশের পাশাপাশি নিজেও লিখেছেন বেশ কিছু বই। সুদর্শন খাটুয়ার লেখা সেই বইগুলি হল - চিত্ত চর্যা (২০০৩, সম্পাদনা), কবিতা শুধু কবিতা (২০০৩, সম্পাদনা), পোয়াতি (২০০৯), জবর দখল (২০১৯) এবং বেড়াজাল (২০২৩)। এগুলি তাঁর সাহিত্যভাবনার অন্যতম পরিচায়ক হিসেবেই চিহ্নিত।
দিঘলপত্রের ৪১৭ তম সংখ্যা (ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
সুদর্শন খাটুয়ার 'দিঘলপত্র প্রকাশন' এককথায় জেলার লেখকদের কাছে নিজেদের ভাষা ও সাহিত্যচর্চার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে। মেদিনীপুরের এক প্রান্তে বসে নিরলসভাবে এবং নির্ভেজালভাবে প্রকাশ করে চলেছেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া, সাঁওতালি সাহিত্য, উপন্যাসের সম্ভার। একটা অন্যমাত্রায় নিয়ে যেতে পেরেছেন নিজেকে। একদিকে দিঘলপত্রের মাসিক সংখ্যা প্রকাশ, অন্যদিকে দিঘলপত্রের ব্যানারে নানা ধরনের বইয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েই চলেছেন চুপচাপ। দিঘলপত্র থেকে প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাস দাঁড় জাল মুক্তামাছ, সন্তোষ কর; দহন, পরিতোষ মণ্ডল; অঘ্রাণের ঘ্রাণ, সাযুজ্য সংকলন, আতঙ্কভঞ্জন জানা; এখন এই মন, সন্তোষ কর এবং ফাঁদ দ্যা ট্রাপ, অলোকনাথ মিশ্র।
এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে গানের বই গীতলিপি, গীতবীথি, হেমন্ত মাইতি; গল্পের বই বাঁকাশশির ঢিল, কার্গিলের পাখি, কথাতম্বুরা, আতঙ্কভঞ্জন জানা; প্রজন্মের গান, সুজয় জানা; ফিরে দেখা, শুক্লা মাঝি; অলোকনাথ মিশ্রর সম্পাদনায় নিখিল সামন্তের রচনাসমগ্র, আতঙ্কভঞ্জন জানার রম্যরচনা খুচরো কথার টুকরো সুর, চায়ের পেয়ালায় হাসির ফোয়ারা, কীর্তি যস্য স্ব জীবতি, সম্পাদনা - ড. নীলোৎপল জানা; সৃজনশীল প্রবন্ধ, সুনীলকুমার গিরি; আমার কথা আমাদের কথা, হরপ্রসাদ সাহু; কাব্য নাটিকা মেছুনি মঙ্গল, স্বপন জানা; জীবন শৈলী জীবনের অভিমুখ, পূর্ণচন্দ্র গিরি; ত্রিরত্ন, বিকাশ পণ্ডিত; আমার বিচরণ ভূমি, রবীন্দ্রনাথ ভূঞা; গুপ্তধন, সুদীপ্তা মাইতি; আবহাওয়া ও জলবায়ু, চিত্ত সাহু; আমার কথা, অশোককুমার হাজরা; সন্তোষ করের এখন এই সময় অসময়ের প্রতিচ্ছবি, সুনীলকুমার গিরি; সন্তোষ করের দাঁড় জাল মুক্তামাছ: সমুদ্রপারের জীবন বয়ান, ড. অনির্বাণ সাহু; সুবর্ণস্মৃতি, অনন্তমোহন মিশ্র ও অন্যান্য; লাল কাঁকড়ার দেশে, বিধান মাঝি; ভগবতী অনাথ আশ্রম, ফেরী ঘাটের মেয়ে, ব্রজেন্দ্রনাথ বর্মণ; উত্তরণ, পদ্মলোচন করণ; হিরেমোতির উপাখ্যান, বিকাশ পণ্ডিত; শুধু হাসির গল্প নয়, অমিতা পাণিগ্রাহী; উড়ানের পরে, দুর্গা, অলোকনাথ মিশ্র; সাঁজবেলার গল্প, প্রণবকান্তি ভট্টাচার্য; পঞ্চাশটি প্রিয় গল্প, শর্মিষ্টার উপকথা ও অন্যান্য গল্প, হেমন্ত মাইতি; গরল, সন্তোষ কর; স্পন্দন, চন্দ্রকান্ত; রক্ত, ভূধরচন্দ্র মান্না; Forming Excellent Human Resource, Dr. Satyapada Dikshit; পৌরাণিক প্রেমসুধা, আতঙ্কভঞ্জন জানা; স্মৃতির সারণীতে সঞ্জীবকুমার মৈশাল, প্রমথেশ মণ্ডল; সাঁওতালি ভাষার বই সারি ধরম সেরেঞ পুঁতি, রামকৃষ্ণ হেমব্রম; সেরেঞ ইঞ গলাং এদা, কাঁদনচন্দ্র মুর্মু ইত্যাদি বইগুলি। এসব আসলে সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগের বহিপ্রকাশ। একজন পত্রিকা সম্পাদকের নিরলস প্রচেষ্টার ফল। সত্যিকারের সাহিত্যানুরাগীর নীরব অহংকার।
দিঘলপত্র থেকে প্রকাশিত কবিতার বইয়ের তালিকাও দীর্ঘ। সেগুলি হল অনুভবের অঙ্গনে, তারা ও মনমিতারা, আগামী দিনের সূর্যকে, আমার জন্য এত কতা, জাগে কুসুম কলি, এ গান আমার, ইচ্ছে লেবু, তুমিও জাদুকর, ভালোবাসি আবৃত্তি, রুপোলি মেঘের খেয়া, প্রেরণা, আছে ঢেউ আকাশ ছোঁয়া, না বলা কথা, রামধনু রং, নিজস্ব ভাবনার দিনরাত, যখন দরজা খোলে, অন্তর, গোস্পদে অশান্ত ঢেউ, আগুন পাখি কৃষ্ণচূড়া, ভালোবাসার স্বর্ণবীজ, স্বপ্ন নির্জনতা, ভাঙছে হৃদয় কৃষ্ণচূড়ায়, ঈশ্বর পাগল এবং আমি, ঋতু, লাল মাটি রং, এক মুঠো প্রত্যাশা, শব্দের হাতুড়ি এবং গাঙচিল, ছন্নছাড়া মনের কথা, অন্য আমি, গাও পাখি, চোখের চাঁদে রোদের চশমা, ব্যতিক্রম, জীবনে জীবন, শালীন শীলন রোদে একা, স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, মাটি ছুঁয়ে মরশুমি, আকাশ গঙ্গায় যেতে যেতে, বাজছে নূপুর সারা দুপুর, পারিজাত, জলদাগ, পাতার ওপর মুখ রেখেছি, শব্দের উড়ান, অক্ষরে অক্ষরে শ্বাস, এস্রাজ ছড় ও শ্রেষ্ঠ কবিতাগুচ্ছ, সাগ্নিক, এক মুঠো আকাশ, এখনো মৃত্যুকে ভাসাইনি, ছন্দ মালিকা, ছন্দে মহামানব, প্রতিবিম্ব, The Treasure, তবু পথ চলি এবং শাপলা শালুক। জেলার অন্যতম কবিদের মনের ভাবপ্রকাশে এই কবিতার বইগুলি নিঃসন্দেহে প্রণিধানযোগ্য।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক নদী খেয়াঘাটে গবেষক বন্ধুদের সঙ্গে সুদর্শন খাটুয়া
আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোকসংস্কৃতির বই প্রকাশেও সুদর্শন খাটুয়ার আগ্রহ এবং বিচক্ষণতা অতুলনীয়। তিনি তাঁর সীমিত ক্ষমতার মাধ্যমে বহু গবেষক, লেখক, প্রবন্ধকারের গবেষণালব্ধ লেখনী দুই মলাটের মধ্যে তুলে এনেছেন ছাপার অক্ষরে। এধরনের বইয়ের মধ্যে খেজুরীর ইতিহাস, বৃহস্পতি মণ্ডল; দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্র উপকূলবর্তী বাংলা ভাষার রূপভেদ, ড. বাণেশ্বর দাস; উপকূলীয় দক্ষিণবঙ্গের লোকশিল্প, সম্পাদনা - রবীন্দ্রনাথ ভূঞা; হরিপদ মণ্ডলের মেদিনীপুর ও বঙ্কিমচন্দ্র এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ, ড. কালীপদ প্রধান; পশ্চিমবঙ্গের সমুদ্র উপকূলের লুপ্তপ্রায় ভাষা বৈচিত্র, সম্পাদনা - ড. অনির্বাণ সাহ; মেদিনীপুরের নদী সংস্কৃতি, ভারতের মুক্তি সংগ্রামে কবিতা ও গান, রাজকুমার পণ্ডা; সাহিত্যিকদের কলমে উপকূলের মৎস্যজীবী, ড. অনির্বাণ সাহু বিশেষ উল্লেখযোগ্য পাওয়া।
সুদর্শন খাটুয়া আজ একটি প্রতিষ্ঠান। লিটল ম্যাগাজিনের জগতে সূর্যের এক নাম। তথাকথিত সম্পাদকদের মতো তাঁর জীবন নয়। কোনও বাঁধাধরা আয়ের জীবনের পক্ষপাতীও তিনি নন। তিনি লেখকের পাণ্ডুলিপি পড়েন বাসে, ট্রেনে চলতে চলতে। তিনি টাইপ করা পাণ্ডুলিপির প্রুফ দেখেন রেলস্টেশনে বসে ট্রেনের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে। নিতান্তই আটপৌরে জীবন। চিকনচাকনহীন জীবন। তাঁর হয়ে কেবল কথা বলে তাঁর কলম। তাঁর পত্রিকা। তাঁর সাধের লিটল ম্যাগাজিন।
1 Comments
এই রকম মানুষদের কথা অনেক লিখুন।
ReplyDelete