বন্ধুকে ঠকিও না
পালাউ দ্বীপপুঞ্জ (এশিয়া)
চিন্ময় দাশ
[পালাউ হোল দুনিয়ার অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দেশ। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের অন্তহীন জলরাশির ভিতর এই দ্বীপটি ছোট্ট একটি বিন্দু যেন। স্বাধীন এই দ্বীপরাষ্ট্রে কুড়িয়ে বাড়িয়ে হাজার কুড়ি মানুষের বসবাস। প্রায় সড়ে তিনশ’ আগ্নেয়গিরি আর প্রবাল দ্বীপ এখানে। স্ফটিকের মত স্বচ্ছ টলটলে জল। আর জেলিফিস দ্বীপ। পালাউর বিশেষ খ্যাতি এর বিশ্বমানের স্কুবা ডাইভিং। পর্যটনের সেরা আকর্ষণ।
আজ প্রথম সে দেশের সহজ সরল ছোট্ট একটি গল্প।]
একটা কাঁকড়া আর একটা ইঁদুর। ভারি বন্ধুত্ব দুজনের। একসাথে ওঠা বসা। একসাথে হাসি গল্প। খুব ভাবসাব দুটিতে।
একদিন ইঁদুর বলল—আজ বনে যাই চলো। নতুন কোনও খাবারের খোঁজ পাওয়া যায় যদি।
কাঁকড়া আপত্তি করল না—চলো, যাওয়া যাক।
গল্প করতে করতে চলেছে দুজনে। একটা পেয়ারা গাছ দেখতে পেয়ে গেল ইঁদুর। তার চোখ জোড়া চকচক করে উঠল। পাকা পেয়ারা ডাঁসা পেয়ারায় গাছটা ভরে আছে। দুজনে থেমে পড়ল।
এবার আলোচনা শুরু হোল, গাছে কে উঠবে। কাঁকড়ার চোখ দুটো তো তার পিঠের একেবারে গায়ে লাগানো। চোখ জোড়া দূরবিনের মত উঁচিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে গাছটাকে। জিভে জল এসে যাচ্ছে কাঁকড়ার।
সে আগ বাড়িয়ে বলল—আমি উঠছি গাছে।
তর সইছে না যেন। কথাটা বলেই শুরু হোল তার গাছে চড়া।
দশ-দশটা পা কাঁকড়ার। সামনের বড় দুটো হোল দাঁড়া। সে দুটোকে হাতের মতোই ব্যবহারকরে সে। বাকি দু’দিকের চার জোড়া পায়ে ভর করেই হাঁটাচলা করে।
এখন বেশ ভালোইগাছে চড়তে পারছে। দাঁড়া দুটো দিয়ে আঁকড়ে ধরছে গাছকে। পাগুলো দিয়ে ঠেলে ঠেলে উপরে উঠছে। মাঝামাঝি গিয়েছে, হঠাৎ বিপত্তি। সামনের একটা পা ভেঙে গেল বেচারার। হায়-হায় করে উঠল কাঁকড়া। 🍂
ইঁদুর তাড়াতাড়ি বলল—আর এক্টুও উঠবে না, বন্ধু। সাবধানে নেমে এসো। পিছলে পড়ে গেলে, ভেঙে চুরচুর হয়ে যাবে।
এবার ইঁদুর গাছে চড়ল। গাছে চড়াটা তার কাছে কিছুই নয়। তরতরিয়ে উপরে উঠে গেল। আহা, চোখ জুড়িয়ে গেল গাছ ভর্তি ফল দেখে। বেছে বেছে পকা দেখে ফল তুলছে, আর কুটুর কুটুর করে খেয়ে চলেছে। একটা শেষ হোল তো, আর একটা তুলে নিচ্ছে। নীচে যে তার বন্ধু অপেক্ষা করে হুঁশই নাই সেদিকে।
উপর পানে তাকিয়ে দেখতে কোন অসুবিধা নাই কাঁকড়ার। সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। কিন্তু মাথায় ঢুকছে না কিছুই। তার বন্ধু একাই খেয়ে চলেছে, একটা পেয়ারাও নীচে ফেলছা না বন্ধুর জন্য। ব্যাপারখানা কী?
কাঁকড়া আর থাকতে না পেরে, জিজ্ঞেস করল—কী হোল, বন্ধু? তুমি একাই খেয়ে যাচ্ছো যে। নীচে ফেলছ না যে বড়?
কানে গিয়েছে, কিন্তু সাড়াই দিল না ইঁদুর। নিজের মনে খেয়ে যেতে লাগল।
কাঁকড়া ভেবে পেল না, ব্যাপারখানা কী? এমনটা তো হওয়ার কথা নয়। আবার চেঁচিয়ে বলল—আরে, একাই খাচ্ছো। আমাকেও দাও।
কোনও সাড়া নাই ওপর থেকে। মনে ভারি কষ্ট হোল কাঁকড়ার। আর দাঁড়িয়ে থাকাটা বোকার কাজ হয়ে যাবে। মনের কষ্ট মনে চেপে, ফিরে চলল সে।
নদীর পাড় দিয়ে চলেছে। এক জায়গায় একটা রেড স্ন্যাপার মাছ দেখতে পেয়ে গেল। জলের একেবারে কিনারায় এসে, বসে আছে মাছটা।
দাঁড়িয়েপড়ল কাঁকড়া। এমন মাছ সচরাচর দেখা যায় না। যেমন এর রূপ, খেতেও তেমনি সুস্বাদু।
(ভারত মহাসাগরেও উপকুল এলাকায় এ মাছ পাওয়া যায়। শঙ্করা, মুরুমীন, রাঙ্গু বা পাহাড়ি নামে ডাকা হয় মাছটাকে। এক কাঁটার মাছ। চর্বিহীন, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ পদার্থের দারুণ ভাণ্ডার।)
চোখে পড়লে, একে শিকার না করে চলে যাওয়া যায় না। মনস্থিরকরে নিয়েছে কাঁকড়া। শিকার করতেই হবে। গুটিগুটি পায়ে জলের কিনারে পৌঁছে গেল এক সময়। উত্তেজনায় দাঁড়া দুটো অস্থির হয়ে উঠেছে। মাছের কাছাকাছি হয়েই, ঝাঁপিয়ে পড়েছে। কাঁকড়ার দাঁড়ার ভয়ানক শক্তি। সরে পড়বার কোন সুযোগই পেল না মাছটা।
মাছটাকে টানতে টানতে পাড়ে উঠেছে, এমন সময় ইঁদুর এসে হাজির। দেখে তো তার আনন্দ ধরে না। বলেও ফেলল—ভারি সুস্বাদু মাছ কিন্তু এটা। মজা আছে এ মাছ খেয়ে।
কাঁকড়া বলল—ঠিকই বলেছ। ভারি সুস্বাদু মাছ। খেয়েও সত্যিই মজা পাওয়া যায়। কিন্তু এ মাছ খাওয়া তোমার কপালে নাই।
--কেন, বন্ধু? এমন কথা বলছ কেন?
--কেন আবার? তোমার নিজের কাজের কথা মনে করো। একটা পেয়ারাও দাওনি আমাকে। বোকার মত কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে থেকে চলে এলাম। এখন মাছ চাইছ কোন মুখে?
নিজের ধূর্তামির কথা ভালোই জানে ইঁদুর। কিন্তু সেটা মেনে নেওয়া যাবে না। তাহলে মাছ জুটবে না কপালে। সে বুদ্ধি খাটিয়ে বলল—এসব কী বলছ তুমি? এতো দিনের বন্ধু আমরা। কোনদিন অবিশ্বাসের কাজ করিনি দুটিতে। আজ দুটো পেয়ারার জন্য বন্ধুর সাথে বেইমানি করব, তেমন লোক আমি নয়।
--তাহলে, দাওনি কেন, সেটা বলো শুনি।
ইঁদুর দেখল, বোঝানো যাবে বুদ্ধুটাকে। গলা নরম করে বলল—শোন তাহলে, বলি। অত উপর থেকে পেয়ারা না হয় ফেললাম। কিন্তু একটাও যদি তোমার পিঠে পড়ে যায়, তখন কী অবস্থা হোত, ভেবে দেখেছ? অমনিতে তো একখানা পা ভেঙে বসে আছো।
কাঁকড়ার মন বলল, সেটা অবশ্য ঠিক কথা।
ইঁদুর চটপট বলল-- আরে ভাই, তুমি আমার বন্ধু। তাছাড়া, আমরা একই সাথে বেরিয়েছি দুজনে। তোমাকে দেব না কেন? এই দেখো না, তোমার জন্য পাকা দেখে কতগুলো পেয়ারা এনেছি।
কাঁকড়া এমনিতে সাধাসিধে ভালো মানুষ। পাকা পেয়ারাগুলো দেখে, বন্ধুকে আর অবিশ্বাস হোল না তার। এদিকে লোভও হচ্ছে। সে আর কথা বাড়াল না।
এতো সুন্দর একটা মাছ শিকার করা হয়েছে। সময় নষ্ট করে কাজ কী? মনের আনন্দে দু’জনে খাওয়া শুরু করে দিল।
একটা প্রবাদ আছে পালাউ দ্বীপের লোকেদের মধ্যে—বন্ধুকে ঠকিও না।
0 Comments