খোলা চিঠি, কবি অরুণকে
সুমনা পাল
কবি অরুণ,
যতটুকু জেনেছি সম্ভবত আপনি পৃথিবীর প্রথম কবি, যিনি জেড প্রজন্মের কবিতার রূপ-লক্ষণ-গতিপ্রকৃতি-বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। বাঙালি হিসেবে এ আমাদের পরম প্রাপ্তি এবং আপনি আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ। আশা রাখছি আপনার ‘পরমচেতনার ম্যানিফেস্টো’ এবং ‘পরমচেতনার পথে কবিতা’ এই দুটি গ্রন্থ একদিন বিশ্বসাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেবে। আগাম শুভেছা রইল।
অনেক বছর আগে বাংলা কবিতার চেনা ছক ভেঙেছিলেন এক দুর্বোধ্য-নির্জন কবি। তিনি জীবনানন্দ দাশ। তাঁকে বুঝতে বাঙালি পাঠকের অনেকদিন সময় লেগেছে। আপনিও যেন সেই পথেই হাঁটছেন। ভাঙছেন চেনা ছক। এই ভাঙন হয়তো বর্তমান যুগধর্মের ফল। তৈরি করছেন কবিতার এক নতুন আঙ্গিক, নতুন রূপাবয়ব। আপনার লেখা পড়লে মনে হয় আপনি যেন হেঁটে চলেছেন পরমচেতনার পথ ধরে। চূড়ান্ত সত্যকে অবলম্বন করে লীন হতে চাইছেন পরম ব্রহ্মে।
কিছুদিন আগে হাতে পেলাম ‘চূর্ণীকে লেখা চিঠি’। এ যেন নিভৃত আত্মসমর্পণের গীতিকাব্য। কাব্যে সংকলিত প্রতিটি কবিতার প্রতিটি শব্দ এত নরম, এত স্নিগ্ধ, এত ভালোবাসায় ডোবানো! যেন আত্মাকে আদর মাখিয়ে দিয়ে যায়। অনেকদিন বাংলা কবিতায় এরকম শব্দের প্রয়োগ পাইনি। বিশেষণের প্রয়োগ এত সুন্দর হতে পারে! অভিমানী-জ্যোৎস্না, শান্ত-শিশির, কুমারী-পাতা,শব্দহীন-সন্ধ্যা, মায়াবী-ডানা, পাগল-শ্যাওলা, চতুর-ওড়না, নিঃশব্দ-ভিড়, বিশ্বাসী-ঠোঁট, উদাস-তারা, ঝুলন্ত চাঁদ, সূর্যনীল রোদ্দুর, অভিমানী পৃথিবী, দুষ্টু সময়, নীল নাভি… ভালো লাগায় বুঁদ হয়ে যাই।
কখনো কখনো অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায় আপনার সহজ স্বীকারোক্তিতে। শরীরী সফর শেষে আপনি বলেন_______
“শুধু স্পর্শে নয়
অনুভবেও ভালোবাসা হয়”
আবার কখনো বলেন______
“একদিন শুন্য হব জেনেও
শূন্যতা নিয়ে বসে থাকি রোজ”
এ বোধ হয় যুগের দ্বান্দ্বিক সঙ্কট থেকে উত্তরণের প্রয়াস। সেই উত্তরণের প্রয়াসে সুদুর কৃষ্ণগ্বহর থেকে ভেসে আসে বিরহী বাঁশির সুর। অনন্ত গোধূলিলগ্নে বেজে ওঠে করুণ সানাইয়ের বিষণ্ণ আলাপ।
বনলতা সেন, অরুণিমা সান্যালের মতো আপনার চূর্ণী-হৃদয়লীনারা বেঁচে থাকুক পাঠকের মননে, চেতনায়, নিভৃত জীবনযাপনে, জীবনযুদ্ধের আশ্রয়ে, নিঃসঙ্গ ভিড়ে; আর আপনি আপনার নির্জন সৃষ্টিতে... 🍂
0 Comments