সালেহা খাতুন
( অধ্যাপিকা : মেদিনীপুর কলেজ)
আমরা জানি রুমাল স্বাস্থ্যবিধি রক্ষার জন্য যেমন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি জিনিস তেমনি এর আভিজাত্য,মর্যাদা, আলংকারিকতা এবং অলৌকিক গুণও আছে। তবে ভালোবাসা বা আবেগের প্রতীক রূপেও প্রেমিক প্রেমিকেরা একে অন্যের কাছে রুমালের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে। আবার রুমাল উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচকতাও কাজ করে। আর ওথেলো নাটকে রুমালের যে কী ভূমিকা ছিল তা বেশিরভাগ মানুষই জানেন। কবি সুমন রায়ের "বুকে ধরে তোমার রুমাল" কাব্যগ্রন্থ পাঠ করে এমন এক অনন্য অনুভূতি হলো, যে শুরুতেই তাই রুমাল নিয়ে ভাবতে বসেছি।
২০২৬ এর এই ফেব্রুয়ারি মাসে, প্রেমের মাসে এমন একটি প্রেমের কাব্য পাঠ করে শুধু যে অসামান্য কাব্যরস আস্বাদ করলাম তা নয় নিজেও ফিরে এলাম অপ্রেম থেকে প্রেমের দিকে, হতাশা থেকে আশার দিকে, না লেখা থেকে লেখার দিকে। ব্যক্তিগত এক ভাবমোক্ষণ ঘটে গেল। লিখনে কি না ঘটে! সমগ্র সত্তায় সিঞ্চিত হলো ভিন্ন এক সুখ। সেই সুখের কবিতাটির সন্ধানই আগে দিই। কবিতাটির নাম "লিখুন আঁকুন" -
"সবাই পড়বে না, তবু লিখুন কিছু
জীর্ণ পাতায় কঠিন ছবি আঁকুন
মন পড়তে সময় লাগে এখন
চমক কেবল সকালের লাজুক
রোদে, দীর্ঘ ছায়ার পূর্বাভাষে
চুড়ির রং - এ মেলায় আগুন
বাছতে গেলে কাঠকয়লা
লিখতে হলে বর্ণমালা
আসুক নেমে অবাধ্য সব
অশ্রুধারা, যেমন ছিল
বাক্সে ভরা।"🍂
পল্লীকবি জসিমউদ্দিনের রূপাই আর সাজুর উপমা এসেছে সুমন রায়ের এই কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা "ঘূর্ণি"তে। বুকের পাঁজরে টো টো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে রুমাল চুরি করা প্রেম। এ রুমালে কী নকশী কাঁথার মাঠের নকশা আঁকা আছে? সুমনের কবিতায় প্রকৃতি ও প্রেম ওতোপ্রতো ভাবে জড়িয়ে আছে। দ্বিতীয় কবিতা "সিঞ্চনে সুখ" - এ রয়েছে কুবাই-এর নির্ভার বয়ে চলার কথা। আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে রয়েছি কুবাই নদীকে চিনি না এমন কেউ নেই। তবে সে চেনা কবির মতো করে নয়। "অবগাহন" কবিতায় তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে -
" কৈশোরের সেই স্নানবন্ধু কুবাই
এখন ফিতের মতো বয়ে যায় "- কবির কুবাইয়ের জলে অবগাহনের অভিজ্ঞতা হয়তো সমগ্র পাঠকের নেই। কিন্তু তাঁর কাব্যে স্নাত হতে কারো বাধা নেই।
সুমনের কবিতায় প্রচুর পরীক্ষা নিরীক্ষা আছে। ছেদ যতি চিহ্ন ব্যবহারের বালাই নেই বহু কবিতায়। পাঠক ইচ্ছে মতো দম নিতে পারেন। চতুর্থ কবিতা "প্রেম প্রেম" পনেরো পংক্তির গদ্যকবিতা -
" তোমাকে দেখতে চেয়ে একবার চিঠির জবাব পাইনি/ বলে সারাদিন পায়ে পায়ে বর্শার তীক্ষ্ম ফলার মতো/ আগুন কাঁটার পথ পেরিয়ে এলাম,"
পথ পেরিয়ে এসে একটু বসতেই হয়। আর কী আশ্চর্য পঞ্চম কবিতা তাই যেন হয়ে গেল "বসে আছি"। বসে বসে কী আর করা যায়, তাই অলীক বসন্তের কিশোর স্বপ্ন দেখতে থাকি।
চাঁদ নিয়ে কত যে কবিতা লেখা হয়েছে আর আমরাও তা পড়েছি গোগ্রাসে। ব্যক্তি আমির পছন্দের চাঁদ দ্বিতীয়ার সরু চাঁদের ফালি হলেও পূর্ণিমার চাঁদের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টি ফেলি না তা নয় , কিন্তু সুমনের লেখা পনেরো পংক্তির "পূর্ণশশী"ও যেন ভাসিয়ে নিয়ে গেল মনকে -
"পূর্ণশশী তুমি বড় সাজিয়ে তোলো
আবিশ্ব ঝকঝকে জ্যোৎস্নালোকে"
কবিতাটির শেষ অংশে বৈষ্ণবপদাবলীর প্রভাব লক্ষণীয় -
"যে নূপুর পরেনি পায়
তার অভিসার নিঃশব্দে ঘটে
প্রতি অমাবস্যার রাতে"
আর কবি যখন পূর্ণশশীকে কল্পনা করেন ক্লাসের যখন খুশি হেসে ওঠা মেয়েটির সঙ্গে তখন আপ্লুত হতেই হয়।
আর "আকাশে কয়েকটা মেরুণ দাগ দেখছি"র মেটাফরে বিস্মিত হয়ে "মেটাফরিক" কবিতায় সুন্দরী নয়নতারাকে হারিয়ে দেওয়া বেশ ভাবিয়ে তুলছে। "বর্ষা" কবিতায় বর্ষার রূপ বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে এসেছে সদ্য স্নাত তরুণীর কথা। এ কবিতার বনলতা শব্দটি উচ্চারণে জীবনানন্দ স্মরণে আসে।
আর "দীন দিন" কবিতার "তীব্র গাণিতিক রোদ" সরাসরি দেহ ভেদ করে মনে প্রবেশ করলো। আর চোদ্দো পংক্তির কবিতা "একা" আঙ্গিক বিচারে অনন্য এক রূপ ধারণ করেছে। এই কবিতার দশটি পংক্তি মাত্র একটি করে শব্দ দ্বারা নির্মিত।
"একটা চড়ুই" কবিতায় একটি বৃষ্টির দিন আর কবির অনুভব প্রকাশ পেয়েছে। এ কবিতায় সবথেকে ভালো লেগেছে রবীন্দ্র সংগীতের প্রসঙ্গ উত্থাপন।
কবি সাহিত্যিকদের অনেকের কাছেই অনেক সময় বা দিন প্রায় বন্ধ্যার মতোই কাটে। ধরা দেয় না কোনো শব্দ, কথা, কবিতা। এর একটি বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয়েছে "বর্ণে অক্ষরে" কবিতায়। কবিতাটি বেশ ভালো লেগেছে। একাত্ম বোধ করেছি। আর এই ভালো লাগা চূড়ান্ত স্পর্শ করে যখন উচ্চারিত হয় - " কিংবা কিনে ফেলা যেত শৈশবের বর্ণপরিচয়"। আর বর্ণপরিচয় শব্দবন্ধে বিদ্যাসাগর ঢুকে পড়েন মনের মধ্যে।
কবি আশাবাদী -
"সেদিনের বর্ণমালা আমাকে শেখাবে ভালোবেসে
যতি, ছন্দ, লয় , প্রেমের ক্লাসরুমে ঠিক একদিন।"
শুধু ভাষা নয় মনের মতো বাসা খুঁজে পাওয়া যে অলীক কল্পনা, পোড় খাওয়া ব্যক্তি মাত্রেই জানেন। "বাসা খুঁজছি" কবিতায় বাড়ি শব্দ ব্যবহার না করে কবি অনেক কঠিন অঙ্কই মিলিয়ে দিয়েছেন।"গৌতমী" কবিতায় মগ্ন হয় মন সেই অসাধারণ একটি পংক্তির মধ্যে - " সহস্র যোজন দূরে চলে যাচ্ছে ভালোবাসার সূর্য"।
স্বপ্ন ছাড়া মানুষ বাঁচে না। "খোয়াব" কবিতায় সেই চিত্রই স্পষ্ট হয়ে ওঠে -
"সে আমায় শিস দিয়ে ডাকে
এসো খোয়াব দেখবো
আজ, কাল বা পূর্ণিমা রাতে"
কিন্তু কখনও কখনও দেখা যায় এক পৃথিবী ভালোবাসাও নিরর্থক হয়ে গেছে। আর ব্যর্থ হলে অশ্রু তো ঝরবেই। তাই মনোবিদের মতো "আয় বৃষ্টি" কবিতায় কবি বলছেন -
" বার বার বৃষ্টি আসা ভালো
ওকে বারণ কোরো না
অভিমানের ঘর বাঁধা সে
খারাপ নয় তো কোনদিন"
এখানে বৃষ্টি আমরা কান্না বা অশ্রু রূপেই ধরে নিয়েছি। তবে পরবর্তী কবিতা "বৃষ্টি শেষে"তে আমাদের অনুমানই সত্য হয়ে ওঠে। বৃষ্টি আসলে অশ্রুরই রূপক -
"যেভাবে এ পথ মিশে গেছে
রিক্ত শূন্য ছায়ালোকে
সেভাবেই মেলাতে হবে
অবাধ্য কত অশ্রুবন্দনা"
পরবর্তী কবিতা "বেআব্রু"তে সংগীত শিল্প অভিনয় এর প্রসঙ্গ এসেছে।
"তোমার রুমাল" কবিতায় কবি কাকে কথা দিচ্ছেন প্রকৃতি না প্রেমিকাকে? কুবাই নদীকে? কুবাইয়ের তীরের শস্যভূমিকে? কিন্তু যখনই উচ্চারিত হলো "তোমার পছন্দের আইসক্রিম ধরব না গলে গেলে" আর বুঝতে বাকি থাকলো না আসল উত্তর -
" কথা দিচ্ছি এ বসন্ত পার হয়ে যাবে ঠিক
নদীতীরে অহেতুক ঘুরে
বুকে ধরে তোমার রুমাল"
কিন্তু হায় কবিকে বোঝা বড়ো কঠিন। "তোমরা জানোনা"য় কবি পাঠককে আবার বিপাকে ফেললেন -
"তোমরা কখনো কুবাই নদীতে যাওনি, তার মায়াবী/
পাড়ে আলো আঁধারে বসোনি কখনো/
তোমরা টুসু গান শোনোনি,ভোরের আলোয় টুসুর/
অভিমানী মুখ দেখোনি"
কুবাই নদীর সাথে তাথৈ , সমীরণ এবং মেঘ মেঘ ছেলেটিকে চেনার চেষ্টা সমানে পাঠককে আকর্ষণ করে চলেছে। আর সবার আগে কুবাই-ই জয় করে নেয় মন। "সে কুবাই সে কুবাই" কবিতা নিবিষ্ট চিত্তে পাঠ করতে করতে কবির মতো পাঠকও যে কখন কুবাইয়ের প্রেমে পড়ে যাবেন বুঝতেই পারবেন না। অনুসন্ধিৎসু পাঠককে ফিরে যেতে হবে উৎসর্গ পত্রের দিকে আর ঠিক তখনই খুঁজে পাওয়া যাবে সত্যকে -
"বলা না বলা সব কথা আজ
তোমাকে
না বলে
ভাসিয়ে দিলাম
কুবাই..."
"কুহকী কুবাই" আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে -
"ছিপ নয় জাল/ছিপ ছিল বর্ষার/এমন দুপুর/খেত জমি থই থই/ চুল ভেজা নীল সই/এক ঘাই দুঘাই/কুহকী কুবাই।" কুবাইয়ের প্রতি প্রেম "অদৃশ্য দৃশ্যমান"-এও প্রকাশিত। "বুকে ধরে তোমার রুমাল" কাব্যগ্রন্থের পঞ্চাশটি কবিতাই পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করবে , এ বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী হওয়া যেতেই পারে।
সুমনের কবিতা পড়তে পড়তে আমাদের মনে আসছে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের "জ্বলন্ত রুমাল"এর কথা। আর সুনীল গাঙ্গুলীর বরুণার কথা, যে বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখেছিল। জয় গোস্বামী বাংলার একটি মেয়েকে দেখেছিলেন রুমাল মুঠো করে প্রতিদিন টিউশনিতে যেতে। শ্রীজাত লিখলেন অপারগতা মোছার মতো রুমালের কথা। আর সুভাষ মুখোপাধ্যায় "এক অস্থায়ী চিত্র"-এ এঁকে দিলেন "ওঠানো হাত বিদায় নিচ্ছে/ রুমাল উড়ছে রুমাল উড়ছে।" আর সুমন রায়ের "বুকে ধরে তোমার রুমাল" এরই সূত্র ধরে আমাদের কাছে রূপ নিল বুকে ধরে তোমাকে কুবাই হয়ে।
কাব্যগ্রন্থ : বুকে ধরে তোমার রুমাল
প্রকাশক : শ্রীলিপি
0 Comments