জ্বলদর্চি

মেঘেদের বর্ণপরিচয়' : অন্য স্বরের ভাস্বর/অন্তরা ঘোষ

'মেঘেদের বর্ণপরিচয়' : অন্য স্বরের ভাস্বর

ড.অন্তরা ঘোষ


মেঘকে নিয়ে কবিদের ভাবনার বিন্যাস বহু পুরাতন যুগ থেকে। কবি কালিদাস মেঘকে দূত করে নির্বাসিত যক্ষের বিরহ বার্তা তার প্রিয়ার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। রবীন্দ্র সাহিত্যে মেঘের আলাপন অনন্য।কবি বলেন,
"মেঘের পরে মেঘ জমেছে আঁধার করে আসে।
আমায় কেন বসিয়ে রাখ
একা দ্বারের পাশে।" জীবনানন্দের মেঘ 'হিঙ্গুল মেঘের আলো'।
 কবি দিলীপ মহান্তীর কাব্য 'মেঘেদের বর্ণপরিচয়'।এখানে মেঘকেন্দ্রিক বহুধা ভাবনার প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। আলোচ্য কাব্যের ৫২ টি কবিতার মধ্যে ১৩ টি কবিতার  নামকরণ মেঘকেন্দ্রিক। সেগুলি হল ―মেঘেদের বর্ণপরিচয়, মেঘেদের সঞ্চার, মেঘের অক্ষর,মেঘেদের সভ্যতা,রাত্রির মেঘ, মেঘ পদাবলী, মেঘেদের ঠিকানা, মেঘেদের জন্ম, মেঘেদের সংবাদ, মেঘেদের স্বরলিপি, মেঘেদের মিছিল, মেঘেদের পাড়া,মেঘ ছিল,অন্ধকার..."। কাব্যের নাম কবিতায় কবির অনুভব―
"সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে শরীরে/
উপত্যকা জুড়ে মেঘেদের মিছিল"
এখানে নিবিড় আঁধারেও কবি এলোমেলো বয়সের নীড়ে ওঠা ঢেউ মেখেও স্নান সেরে মেঘেদের ঘরে ফেরার গান শোনেন।🍂
মেঘ নিয়ে লেখা দ্বিতীয় কবিতা 'মেঘেদের সঞ্চার'। যে কবিতায় কবি জলের অক্ষরে  ভ্রমণের কথা লেখেন। শুধু প্রকৃতি নয় শরীরেও আগুনের উত্তপ্ত হলকা টের পান তিনি। তাই মেঘের কাছে আকুতি থাকে বর্ষার জন্য।
এভাবেই কবির মেঘকেন্দ্রিক কবিতাগুলির মধ্যে মেঘ হাজির হয়েছে ভিন্ন অনুভবে, ভিন্ন ব্যঞ্জনায়। কখনও স্মৃতির আধার কখনও বা বিশল্যকরণীর সঞ্জীবনী, কখনও বিষাদের গাথা কখনও বা সভ্যতার অসুখ চিত্র।
ভোটের আবহ,করোনার বীভৎসতা, বসন্তের মর্গে বাসচিত্র স্পষ্ট হয়েছে 'রাত্রির মেঘ' কবিতায়।'মেঘ পদাবলী' কবিতায় কবি বলেছেন,―
" রাত জানে ঠিক বেদনার ভাষা মেখে/
ঘন কালো মেঘে শ্রাবণ ছড়িয়ে দিতে"।
ঝড়ের পাখিদের মতো মানুষের যাত্রা পথের ঠিকানা দিয়ে কবি বলেছেন 'তবুও এগিয়ে চলে অনন্ত সাঁতার'। কবি আশাবাদী। তাই আকাশ জুড়ে ধোঁয়ার বন্যা,ক্লেদময় পৃথিবী রক্তনদীর ধারার মাঝেও কবি মেঘেদের নবজন্মের সন্ধান করেন। আবার একই সাথে অসুস্থ মানুষের প্রাণ নিয়েও বাণিজ্যিক লাভ ক্ষতির হিসেবকারীদের ছবি তুলে ধরেন 'মেঘেদের সংবাদ' কবিতায়,―
"বাইপাশের ধারে উঁচু উঁচু বাড়ি/
ওখানে শুশ্রূষা হয় জীবনের, মরণের!/
এখানেও স্তূপাকারে লাশ জমা হয়!...

আর সংবাদমাধ্যম দেখায় সুস্থতার হার!"
হাসপাতালের বাণিজ্যিক চিত্রে ভোগী মানুষের উল্লাসের ছবি ফুটে উঠেছে এই কবিতায়। অজস্র ব্যথার কথা নিয়ে বালিধোয়া জলে কবি মেঘেদের স্বরলিপি লেখেন। আবার কখনও মেঘ হয়ে ওঠে মিছিলের মুখ। প্রশাসনের বিরুদ্ধে তার অবস্থান স্পষ্ট হয়। মেঘ ও অন্ধকারের ছবি এঁকেছেন কবি অতীতের আলাপনে, রূপকথার আবেশে,―
 "নাট মঞ্চ প্রেমিক-প্রেমিকা দাস-দাসী সবাই ঘুমোয়/
শুধু জেগে আছে রূপকথা মাখা কয়েকটি বৃষ্টি ভেজা
কুঁড়ি/
শরীর জাগার ছন্দে চোখে কথাকলি!"
কবির কাব্যে এক ভবঘুরে মানুষের চোখে দেখা জীবনের জলছবি প্রত্যক্ষ হয়। যে মানুষটি পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সাক্ষী, সাক্ষী থাকে অনেক ভাঙাগড়ার। কবি দিলীপ মহান্তীর কবিতায় তুলির টানে আশ্চর্য রকমের মায়া মালঞ্চের ছবি চিত্রিত হয়েছে। 'মরীচিকার গান' কবিতায় কবি বলেছেন'― "তমসার রূপ টানে মালঞ্চ জুড়ে মায়া/
রাস্তায় মুখের ভিড়ে ফুটে ওঠে আলো ছায়া/
রাজকন্যা মগ্ন ঘুমিয়ে প্রাচীন অট্টালিকা/
বসন্তের জাগরণে কোকিলের ভালো থাকা!"
 কোনো এক জাদুর কাঠির ছোঁয়ায় কবির কবিতা যেন প্রাণ পায়। ঘুমন্ত রাজকন্যার মত রূপকথা চুপকথা হয়ে ছড়িয়ে থাকে কবিতার অবয়বে।
মৃত্যুর অনুষঙ্গে বাস্তব জীবনের কিছু অবশ্যম্ভাবী ছবি ফুটে উঠেছে কবির 'দহন'কবিতায়। অন্ধকার, বুনোমোষ, হায়েনা, অজগরের প্রাসঙ্গিকতায় কবি বলেছেন সেকথা,―
 "কেবল কান্নার ধ্বনি বাতাস কাঁপায়/
চিতা জ্বলে এখানে ওখানে/ যত আলো, লোক তত কম/ পৃথিবীর ঘাস পুড়ে যায়!"
 'সুন্দর' কবিতায় নদীর প্রবাহমানতায় জীবনের আয়ু রেখা লেখা হয় এক অন্যরকম ছন্দে। সৌন্দর্যের কারুকার্য প্রকৃতির অনুষঙ্গে রূপ নেয় অন্যভাবে। বর্ষার পাহাড়,ধ্বস,পাহাড়ি জীবনের চাঞ্চল্যকে নিয়ে 'জঙ্গল আনন্দে থাকে শরীরে শরীর।' এখানে ভীষণ স্পষ্টতায় শরীরের গাথা কাব্য রচনা করেছেন কবি। রজনীগন্ধার আকুল গন্ধে পাগল পারা মনও। জীবনের বাস্তবতার সেই ফুলকে হাটে বাজারে বিক্রিত পণ্য হিসেবে দেখে।যে দেখার বেদন কথা ফুলের ব্যথার সাথে আদিম রাতের হাওয়ায় উড়ে যায় 'রাত্রির স্বর' কবিতায়। অতীত দিনের যন্ত্রণাকে বর্তমানের ক্যালিডোস্কোপে দেখেছেন কবি 'বিশল্যকরণী' কবিতায়। রুগ্ন কথা,বোবা অশ্রু, আগুনের রক্ত আর স্থবির হয়ে যাওয়া অস্তিত্ব সংকটে কবি বিশল্যকরণীর সঞ্জীবনীকে পেতে চেয়েছেন।
 মেদিনীপুর শহরের বুকে কাটানো সময়ের ছবি ধরা পড়েছে 'ধুলি ধূসরিত শহর ভালো আছো?' কবিতায়।শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত গোপগড়, কাঁসাই নদী, মেদিনীপুর স্টেশন, চায়ের দোকান,আবছায়া মেস এছাড়াও শহর থেকে অল্প দূরে অবস্থিত কর্ণগড় মন্দির জুড়ে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি অনুভব ধরা পড়েছে কবিতার পংক্তিতে। কবি নস্টালজিক হয়ে বলেছেন,
"শরীরের কোষে কোষে বেহায়া ফাল্গুন নেচে ওঠে/
উড়ে যায় কৃষ্ণের বাঁশি আর রাধাদের গীতি!
ওই ধুলো পথ দিয়ে হেঁটে যায় আমার অভাবী অক্ষর/ 
আমাকে বিদ্রুপ করে মাদল বাজায়!"
অরণ্য প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আর বিভূতিভূষণের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশিত হয়েছে 'বুরুডি' কবিতায়। ঝাড়খন্ডের একটি পরিচিত জায়গার নাম বুরুডি। চারিদিকে জঙ্গল ঘেরা এই বুরুডি কবিকে করে তুলেছে স্মৃতিকাতর। স্মৃতির স্মরণে তিনি পৌঁছে গেছেন বিভূতিভূষণের আরণ্যক আবহে। সেই সূত্রে কাব্যের শরীরে জায়গা করে নিচ্ছে ভানুমতী, গনু মাহাতো, পথে পথে ধাতুরিয়া। অরণ্য প্রকৃতির মায়াবী টানে বিভূতিভূষণ আজীবন সন্ধান করে বেড়িয়েছেন জীবনের অনন্যতাকে। সেই অনন্যতাকে  শ্রদ্ধা জানিয়ে কবি বলেছেন, 
 "পৃথিবীর যাবতীয় জটিলতা দূরে রেখে/
বিভূতিভূষণ/
এখানেই বসে থেকে দুদণ্ডের শান্তি পোয়াতেন।"
 সময়ের  জলছবি কবির কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে নিজস্ব মেজাজে। তাই 'বেহুলা'কবিতায় মনসামঙ্গলের নায়িকা বেহুলারও যেন নবজন্ম ঘটেছে। নারীর অধিকার হননকে এখানে কবি মঙ্গলকাব্যের অনুষঙ্গে  দেখিয়েছেন,―
"বেহুলার পথে দলের দালাল /বাধা দেয় প্রতি পায়ে/
বেহুলার ভেলা এগিয়ে চলেছে/ প্রশাসন কাঁপে ভয়ে।"
' উৎসব' কবিতায় কবি দেখিয়েছেন,―
"প্রতিমা বানায় যারা তাদেরও ঘর এলোমেলো/
ফুলের বাগান যার সেও যেন বড্ড বেশি অন্ধকারমুখী "
মানুষের মনে জমা মেঘের পাহাড় কবির চোখ এড়িয়ে যায় না। 'যে ছেলেটি পথ ভুলে জঙ্গলে হারায়', তার মনের খোঁজ 'সরকার' না রাখলেও কবি রাখেন। 
কবির কাব্যে ব্যঞ্জনা রয়েছে শব্দের শরীরে,নির্মাণকলায়। বিষয় ভাবনায় নান্দনিকতার প্রকাশ যেমন আছে,তেমনি লোকজ উপাদানের ব্যবহারে কাব্যটিতে আমরা পেয়েছি মাটির সারল্য। কবির সমগ্র কাব্যটি ধ্বনিবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্ত ছন্দের কারুকলায় বিভাসিত। ভাবের বিস্তারে উপমার অপূর্ব ব্যবহারে কবিতা গুলি শ্রুতি পাঠ্য হয়ে উঠেছে। বাক্য গঠনে ও বিশেষণের অসাধারণ ব্যবহারে দক্ষতার পরিচয় নতুনত্বের দাবি রাখে।একদিকে দুঃসময়,সন্ত্রাসের পরিবেশ,মাওবাদী আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা। অন্যদিকে মানুষের প্রতি মানুষের অবিশ্বাস,দূরত্ব, মূল্যবোধহীনতা। এই সবকিছুকে কাব্যের শরীরে জায়গা দিয়েও কবি শেষমেষ আশাবাদে আস্থা রেখে বলেছেন,―
" সমস্ত বিচ্ছেদের জন্য সমস্ত পীড়িতর জন্য আমিও আকাশদীপ জ্বালি।"
 এভাবেই অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার শপথে কবি দিলীপ মহান্তী আত্মবিভায় হয়ে উঠেছেন এক উজ্জ্বল স্রষ্টা।

Post a Comment

0 Comments