জ্বলদর্চি

বাঁচার উত্তরাধিকার/কমলিকা ভট্টাচার্য/চতুর্থ খণ্ড /পর্ব ৩: বরফের ভিতর বন্দি জীবন

বাঁচার উত্তরাধিকার
কমলিকা ভট্টাচার্য
চতুর্থ খণ্ড
পর্ব ৩: বরফের ভিতর বন্দি জীবন


করিডোরে বন্দুকের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ধাতব দেওয়ালে লেগে সেই শব্দ যেন আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসছিল, পুরো পরিবেশটাকে করে তুলছিল উত্তেজনায় থরথর। ডক্টর হারগ্রিভ সামনে দাঁড়িয়ে, তার পেছনে সশস্ত্র গার্ডদের সারি। তার ঠোঁটে ঠান্ডা, আত্মবিশ্বাসী হাসি—যেন এই পরিস্থিতির প্রতিটি মুহূর্ত তার নিয়ন্ত্রণে।
“আপনি সত্যিই ভাবলেন,” সে বলল, “এত সহজে এখানে ঢুকে পড়বেন?”
টিমসনের চোখে তখন অদ্ভুত এক শান্তি। সেই শান্তি যেন বহুদিনের অস্থিরতার পর পাওয়া এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি।
“আমি জানতাম সহজ হবে না।”
হারগ্রিভ বন্দুকটা একটু উঁচু করল।
“আপনি একসময় আমাদের নেতা ছিলেন। অথচ আজ আপনি আমাদের বিরুদ্ধে।”
টিমসন ধীরে বলল—
“আমি কখনও মানুষের বিরুদ্ধে থাকতে চাইনি।”
হারগ্রিভ ঠান্ডা গলায় বলল—
“মানুষ? আপনি কি মনে করেন আমরা মানুষ নই?”
এই প্রশ্নটা যেন মুহূর্তের জন্য বাতাসে ঝুলে রইল। অনির্বাণ আর ইরা আড়ালে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি দেখছিল। দুজনেই বুঝতে পারছিল—এটা শুধু গুলির লড়াই নয়, এটা আদর্শের লড়াই।
ঋদ্ধিমান সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে অদ্ভুত স্থিরতা—যেন হিসেব করে নেওয়া প্রতিটি সম্ভাবনা, প্রতিটি ঝুঁকি।
হারগ্রিভ তাকে দেখে একটু হেসে বলল—
“ওহ… তোমাকেই তো আমরা তৈরি করতে চেয়েছিলাম।”
ঋদ্ধিমান শান্তভাবে বলল—
“আমি কারও অস্ত্র নই।”
এই একটা বাক্য যেন পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনিত হল।
হারগ্রিভ হাত তুলতেই গার্ডরা গুলি চালাল। পরের মুহূর্তেই করিডোরে আবার যুদ্ধ শুরু হল। আগুনের ঝলকানি, গুলির শব্দ, ধোঁয়ার গন্ধ—সব মিলিয়ে যেন এক যুদ্ধক্ষেত্র।
ইরা দ্রুত আড়াল থেকে গুলি চালাতে লাগল, তার নিশানা নির্ভুল। সে প্রতিটি শটের আগে পরিস্থিতি মেপে নিচ্ছিল—কোথায় আঘাত করলে শত্রু থামবে, কিন্তু সময় নষ্ট হবে না।
ঋদ্ধিমান যেন বজ্রগতিতে নড়ছিল। গুলির মাঝেও সে এগিয়ে গিয়ে একে একে গার্ডদের নিরস্ত্র করে ফেলছিল। তার চলাফেরা এত দ্রুত আর নিখুঁত ছিল যে, মনে হচ্ছিল সে আগেই এই যুদ্ধটা বহুবার লড়ে নিয়েছে নিজের ভেতরে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই করিডোর অস্থির হয়ে উঠল। ধোঁয়া আর ছায়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো যেন একে একে পড়ে যাচ্ছিল।
শেষে শুধু হারগ্রিভ দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে তখন আর আগের মতো হাসি নেই—বরং এক ধরনের তীব্র বিরক্তি আর অস্বস্তি।
“আপনারা ভাবছেন জিতে গেছেন,” সে বলল।
তারপর সে কনসোলের দিকে হাত বাড়াল।
ঋদ্ধিমান চিৎকার করল—
“না!”
সে খুব জোরে করে হারগ্রিফকে আঘাত করল,সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
লাল আলো জ্বলে উঠল। করিডোরের সাদা আলো মুহূর্তে রক্তিম হয়ে উঠল। একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল—
“Emergency lockdown activated.”
ভারী ধাতব দরজাগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। সেই শব্দ যেন একেকটা শেষ সুযোগের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো শোনাচ্ছিল।
ইরা বিরক্ত হয়ে বলল—
“উফ! এখন আমরা ফাঁদে।”
ঋদ্ধিমান দ্রুত কনসোল পরীক্ষা করতে লাগল। তার আঙুলগুলো দ্রুত কোডের উপর নাচছিল, যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে।
“Lockdown পুরোপুরি কার্যকর হতে এখনও দুই মিনিট লাগবে,” সে বলল।
অনির্বাণ বলল—
“মানে?”
ঋদ্ধিমান চোখ না তুলেই বলল—
“এই দুই মিনিটের মধ্যে vault-এ পৌঁছতে পারলে দরজা খুলতে পারব।”
এক মুহূর্তের জন্য চারজনের চোখ এক হলো। সিদ্ধান্ত নিতে সময় লাগল না।
টিমসন সামনে এগিয়ে গেল।
“চল।”
তারা দৌড়াতে শুরু করল। করিডোরের আলো লাল হয়ে জ্বলছে, সাইরেনের শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে পুরো ভবনটা যেন তাদের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে—প্রতিটি দরজা, প্রতিটি ক্যামেরা, প্রতিটি যন্ত্র যেন তাদের থামাতে চাইছে।
দৌড়তে দৌড়তে অনির্বাণের মনে একটাই কথা ঘুরছিল—সময়। আর সেই সময়ের ভেতর আটকে আছে একটা জীবন।
শেষে তারা পৌঁছাল সেই দরজার সামনে।
Cryogenic Vault
দরজাটা বিশাল, ভারী, আর নিস্তব্ধ। যেন এর ওপাশে সময় থেমে আছে।
অনির্বাণের বুকের ভিতর ধকধক করছে। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠেছে।
ঋদ্ধিমান দ্রুত কনসোলে কাজ শুরু করল।
টিমসন স্ক্যানারে হাত রাখল।
কিছু সেকেন্ড—যেন এক অনন্ত অপেক্ষা।
তারপর—
দরজা ধীরে খুলে গেল।🍂
ভিতর থেকে ঠান্ডা কুয়াশা বেরিয়ে এল। সেই কুয়াশা যেন শুধু ঠান্ডা নয়—একটা নিস্তব্ধতার, এক ধরনের মৃত্যুর গন্ধ বহন করছিল।
ঘরের ভিতরে সারি সারি cryogenic capsule। সবকিছু বরফের মতো নিস্তব্ধ। এখানে সময় যেন থেমে আছে—না কোনো শব্দ, না কোনো নড়াচড়া, শুধু জমাটবাঁধা অপেক্ষা।
ঋদ্ধিমান স্ক্যান করল।
“ওটা,” সে বলল।
একটা নির্দিষ্ট ক্যাপসুলের দিকে দেখাল।
অনির্বাণ ধীরে এগিয়ে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন ভারী হয়ে উঠছিল।
ক্যাপসুলের গায়ে লেখা—
A-N-01
তার হাত কেঁপে উঠল।
এই ছোট্ট কোষের ভিতরেই আছে তার আর নাতাশার ভবিষ্যৎ।
তার চোখ ঝাপসা হয়ে এল। সবকিছু যেন একটু অস্পষ্ট লাগছিল।
সে খুব আস্তে বলল—
“আমি এসে গেছি…”
অনির্বাণ ধীরে ক্যাপসুলটা খুলল। ভিতর থেকে একটা ছোট্ট সুরক্ষিত কন্টেইনার বেরিয়ে এল—অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষিত, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস।
ঠিক সেই মুহূর্তে আবার সাইরেন বাজল।
ঋদ্ধিমান স্ক্রিনে তাকিয়ে বলল—
“সমস্যা।”
ইরা বলল—
“এবার কি?”
ঋদ্ধিমান শান্ত গলায় বলল—
“Lockdown সম্পূর্ণ হয়ে গেছে।”
ঘরের বাইরে ভারী দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। সব পথ এখন সিল।
তারা এখন এই বরফের ঘরের ভিতর আটকে।
আর দূর থেকে ভেসে আসছে অসংখ্য পায়ের শব্দ—ধীরে ধীরে কাছে আসছে, যেন সময় ফুরিয়ে আসছে।
অনির্বাণ ধীরে কন্টেইনারটা বুকের কাছে ধরল। তার হাত শক্ত হয়ে উঠল।
তার চোখে তখন অদ্ভুত দৃঢ়তা—ভয় নেই, শুধু সিদ্ধান্ত।
“আমরা বের হব।”
ঋদ্ধিমান তার দিকে তাকাল।
“কিভাবে?”
অনির্বাণ এক মুহূর্তও না ভেবে বলল—
“যেভাবেই হোক।”
কারণ এই মুহূর্তে তাদের হাতে শুধু একটি জিনিস—
একটি জীবন।
যে এখনও জন্মায়নি।
তবু যার জন্য তারা পুরো পৃথিবীর বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত।
ক্রমশ...

Post a Comment

0 Comments