জ্বলদর্চি

সুমন রায়ের বুকে ধরে তোমার রুমাল - বইটি পড়ে মনে হল যা/মলয় সরকার


সুমন রায়ের বুকে ধরে তোমার রুমাল - বইটি পড়ে মনে হল যা

মলয় সরকার 


এটিতে কোন যতি চিহ্ন ব্যবহার হয় নি। এর ফলে  পাঠকের চিন্তা করার প্রসারতা বাড়ার মত জায়গা হয়েছে।যদিও বইটির নাম শুনে মনে হয়, বুঝি, সবই প্রেমের বা প্রেমকেন্দ্রিক কবিতা হবে, তা হয় নি বলেই মনে হয়েছে। 
তবে সব কবিতাতেই কোন যে একই ফর্ম ব্যবহার হয়েছে এমন নয়, মনে হয়েছে, কবি বিভিন্ন ফর্মের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করে নিজের সাথে এক্সপেরিমেন্ট করেছেন। 
সবগুলো  কবিতাই খুব ভাল লেগেছে মনে হয় নি। তবে কয়েকটি কবিতা মন ছুঁয়ে গেছে।” যে নূপুর পরেনি পায়ে তার অভিসার নিঃশব্দে ঘটে” “ বার বার বৃষ্টি আসা ভাল” বা এই ধরণের কিছু কথা বেশ ভাল। কখনও মনে হয়েছে কবি শান্ত হতে চেয়েছেন, কখনও মনে হয়েছে অস্থির। 
তবে ভাষা যেন আরও উন্নত ও সংযত হওয়ার জায়গা রয়েছে। উপমাও আরও একটু গুছিয়ে দিতে পারলে ভাল হত বলে মনে হয়েছে।
প্রেমের কবিতায় প্রেম অনেক ক্ষেত্রেই শরীরী প্রেম না হয়ে রোমান্টিক প্রেমের ছবি এঁকেছে, যা পাঠককে স্নিগ্ধতা বা ভাবার অনুভব করার জায়গা দেবে।প্রেম এখানে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তি বা নারীবিশেষের সঙ্গে প্রেম না হয়ে প্রকৃতি কিংবা আনুষঙ্গিক বিষয়ে ব্যাপ্ত হয়েছে। ফলে তা এককেন্দ্রিক হয় নি,  সেটাই বইটির একটি বড় ক্ষমতা মনে হয়েছে। তখনই মনে পড়ে ‘’ আসলে সে বোধ নয়,  বোধ নয়, বোধন বোধন।” কিংবা তার আগের লাইনে, “ তবু শেষ এক অস্ফূট স্বর তরঙ্গায়িত সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাসে মিলিয়ে দেয় আমাদের জীবনের বোধ”
প্রকৃতিকেও কবি নিষ্প্রাণ জড় হিসাবে না দেখে জীবনের মধ্যে এনে ফেলেন, তার মধ্যেও জীবন খোঁজেন। যখন বলেন, “আলপথ, সব সদ্যস্নাত তরুণীর মত তোয়ালেতে চুল ঢেকে বনলতা যেন”,  জীবনানন্দের রহস্যময়ী নায়িকা বনলতা আর বর্ষাভেজা গ্রাম্য আলপথ আমাদের কাছে একাকার হয়ে যায়।
‘একটা চড়ুই’ কবিতায় চড়ুই লক্ষ্য না হয়ে একটা উপলক্ষ্য হয়, পরিবেশটাকে সামনে আনার জন্য।চড়ুই এখানে একটু বৃত্তের কেন্দ্রের মত মনে হয়েছে, যাকে কেন্দ্র করে আনুষঙ্গিক বর্ণনা আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু আর একটু বেশি কাব্যিক বর্ণনা হলে ভাল হত মনে হল।
“বর্ণে অক্ষরে” কবিতায় তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী কাজ কে এক ত্রিভুজে বাঁধা হয়েছে “ যা দিয়ে….. বর্ণপরিচয়” - এ দিয়ে মনে হয় শব্দের বিশাল ব্যাপ্তিক্ষমতার পরিচয়ের ছবি আঁকতে চেয়েছেন কবি।শব্দ দিয়ে জনমানসের অন্ধকার দূর করে আলোকের ব্যাপ্তি আনা কিংবা অজ্ঞানতার আবর্জনা দূর করা অথবা নতুন জ্ঞানোন্মেষ ঘটানোর প্রচেষ্টা, সবই সম্ভব।
“প্রেমের ক্লাশরুম” কবিতায় আমার আগে আলোচনা করা কথাটির ছবি দেখা যায়, যে, প্রেম এখানে ব্যক্তিবিশেষের সঙ্গে না হয়ে মাঠে ঘাটে প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে, তাই বোঝানো হয়েছে। সেখান থেকেই প্রেমে পাঠ নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।সুনীল আকাশ, সমুদ্রসৈকত, সমস্তই এখানে প্রেমের শিক্ষাঘর। মনে পড়ে যায় সেই কবিতা, ‘আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে-’’।আসলে হৃদয়ের প্রসারতাতেই প্রেমের প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন। তাই প্রেম এখানে নির্দিষ্ট কোন স্থানে আবদ্ধ নয়।
প্রকৃতিই যে আমাদের সবচেয়ে বড় পাঠশালা, এখানে সমস্ত কিছুরই শিক্ষা নেওয়া সম্ভব, সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।যেমন মাঝে মাঝেই অনেক কবিতাতেই কুবাইএর কথা এসেছে। সে কখনও নদী, কখনো নদীর রূপে কোন মানবীর ছায়া তার মধ্যে খেলা করে যায়, যেন সে এক জীবন্ত রূপ পরিগ্রহ করে।
এ ছাড়া শূন্যতা, বৃষ্টি, সাঁকো কুয়াশা ঢাকা গ্রাম অনেক কিছুই এসেছে নানা পরিমণ্ডলে, নানা ভঙ্গিমায়।  সব গুলোই হয়ত প্রেমের ক্যানভাসে তুলি বুলায় নি, তবে সব কিছু মিলিয়ে কবিতাগুলি পাঠককে প্রেমের কুঞ্জবনের আশেপাশে পরিভ্রমণ করায়, যা হয়ত বাধার সৃষ্টি করে না এই প্রেম পরিমণ্ডলে।
🍂

তবে এই কবিতাগুলিতে একটা কথা ঠিক, তা হল, প্রেমের উদ্দামতা বা ঊচ্ছ্বাস এখানে তেমন স্পষ্ট নয়। প্রেম এখানে অনেক বেশি ধ্যানগম্ভীর,  ভাবময়,  তাপসী গৌতমীর অনুচ্ছ্বাস নীরব প্রেমের মত।
শহীদ মিনারে কবিতায় একটি শাশ্বত কথার পুনরাবৃত্তি হয়েছে, যে চলে যায় সেতো চলেই যায়…. আকাশের নীল তেমনই থাকে অনির্বচনীয় “। সেই আকাশের নীলের মতই শহীদ মিনারও দাঁড়িয়ে থাকে অচঞ্চল পরিবর্তনহীন।
আর নাম ভূমিকায় যে কবিতা তোমার রুমাল, তাও কোন দৌড়াদৌড়ি নয় প্রেমের জন্য, বা হাহুতাশ নয়, বরং দূর থেকে প্রেম নিবেদন করার মধ্যে এক অনির্বচনীয় অনুভূতির প্রচেষ্টা। প্রেমিকাকে পেতেই হবে এমন কোন দূরন্ত প্রচেষ্টা নেই, বরং সেই বিখ্যাত গানটাই মনে করিয়ে দেয়, ‘’ হয়ত কিছুই নাহি পাব, তবুও তোমায় আমি দূর হতে ভালবেসে যাব'’।  সমস্ত কবি সাহিত্যিকই প্রেমিক কে প্রেমিকার সাথে মিলিত করার চেয়ে বিচ্ছেদের মধ্যেই প্রেমের পরাকাষ্ঠা দেখাতে চেয়েছেন,এবং তাতেই প্রেম মহত্তর হয়ে ওঠে এটাই বিশ্বাস করেন। এখানেও তার অন্যথা হয় নি। 
সব মিলিয়ে কবি এখানে অনেক খানিই সার্থক, পাঠকও অবশ্যই এর মধ্যে  কিছু কাব্যরস লাভ করবেন।তবে আগামী দিনে কবি আরও ভাল কবিতা উপহার দেবেন এই আশা রাখি।

Post a Comment

0 Comments